শেয়ার করুন:

সোয়েব সাইফীর গল্পের মতো উপন্যাসও রহস্যময়। একটি ছায়াভাষার ভিতর দিয়ে তার কল্পনায় ভাষার সফর করতে হয়। দর্শন, ধর্ম, জীবন, জগৎ ও পরজগতের আলো-আঁধারির ভিতর অয়ংচির চরিত্ররা বিচরণ করে। সাইফীর ভাষা সরল তবে বিষয় গভীর। ছোট ছোট বাক্যের ভিতর গল্পের উত্তেজনা বিরাজমান।অয়ংচি ‘রিটার্ন টু এনাদার ওয়ার্ল্ড আফটার ডেথ।’ আড্ডাপত্রের প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাস। একজন তরুণকে তুলে ধরতে পেরে আমরা আনন্দিত।

সাত.

পঁচা লাশের গন্ধে চারপাশ বিষাক্ত!
নির্জন শ্বেতজোছনায় এক বৃদ্ধ কাঁশছে। সামনে দাঁড়িয়ে জমিন অন্ধকার করে কাঁশছে। কাঁশির সাথে উবু হয়ে হয়ে পড়ছে। মুখ হতে কালো তরল কিছু বেয়ে মাটিতে পরছে।
‘ও বাজান.. বাজানরে, আমার বড় কষ্ট।’
থেমে থেমে বললাম, ‘কে আপনি?’
‘আমি? আমি তোমার বেঁধে দেয়া সময়। বৃদ্ধ বেশে সামনে দাঁড়িয়ে আছি।’
সময় বৃদ্ধ বেশে সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে এটিই এখন বাস্তব। ভীতিপ্রদ পুন্যিপ্রহরে যুক্তিকে অযোক্তিক মনে হয়। যুক্তি খণ্ডনের সময় কোথায়? শুধু তাকিয়ে দেখছি বৃদ্ধের মুখ হতে কালো তরল কিছু বেয়ে বেয়ে মাটিতে পরছে।

শ্বাস টেনে বৃদ্ধ বললো, ‘বাজান শুনছো কিছু?’
নিস্তব্ধ নীরবতায় ধুকপুক হৃদকম্পন শুনতে পাচ্ছি। ওটা হয়তো বুক চিড়ে বেরিয়ে আসবে।
মাথা অল্প ঝুঁকিয়ে বৃদ্ধ ফের বললো, ‘বাজান শুনছো কিছু?’
দূরের ঐ কালো গ্রামে শেয়ালেরা ডাকছে। কালো গাছেরা আমায় দেখছে। আমি অদৃশ্য পিশাচের অট্টহাসি শুনতে পেলাম। দূর হতে বলছে, ‘পালাও, দৌঁড়ে পালাও। এ মানুষ নয়, এ মানুষ নয়।’
আমি দৌঁড়ে পালাতে চাইলাম। পা’জোড়া অসাড় হয়ে রইলো। চিৎকার করলাম, মুখ হতে শব্দ বেরলো না। মুখের ভেতর জিভ গরম হতে হতে ভাঁপ বেরোচ্ছে। দৃষ্টি থেকে থেকে ঝাপসা হয়ে আসছে।
‘ভয় হচ্ছে বাজান? আশরাফুল মাখলুকাত ভয় পায় না।’
ভয়ে ফোঁটা ফোঁটা পেশাব বেরিয়ে গেলো। কী অবস্থা, এমন সময় মসজিদে আজান হলো- ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান্নাউন’…
নামাজের আহ্বানে বৃদ্ধকে বেশ আনন্দিত মনে হলো। বললো, ‘দিঘিতে নামো, পাক হও। চলো সালাত কায়েম করি।’

নামাজের আহ্বানে উদ্বেগ আমাকে ঘিরে ধরে। আমি উদ্বেগ নিয়ে বললাম, ‘সালাত কায়েম করবো না।’
বৃদ্ধের চোয়াল শক্ত হলো। ‘আমি বৃদ্ধ, খুব কথা বলতি পারিনে। তবু মৃত্যুর আগে প্রতিটা মানুষের কাছে আসি অন্য বেশে। আমি আসি কখনো মানুষের ভীড় হয়ে কখনো বা একলা। কখনো ঘুম ঘোরে, কখনো বা জাগরণে। আমার ছদ্মবেশ কেউ ধরতে পারে, কেউ পারে না। নিজ ইচ্ছেয় আসি নে বাজান, আমাকে পাঠানো হয়। কে পাঠায় জানতি ইচ্ছে করে?’
বড় জানতে ইচ্ছে হলো। তবু বললাম, ‘ইচ্ছে করে না।’
‘আমাকে অপচয় করো না, বুঝতে চিষ্টা করো। যেদিন দয়াময় জিজ্ঞেস করবিনি- তোমার যৌবন কার পেছনে ব্যয় করেছ, কি উত্তর দিবানে? আলোময় ঝলমলে শহরে মরার কথা স্মরণ থাকে না বাজান, চলো নামাজ কায়েম করি।’
উৎকন্ঠা নিয়ে ফের বললাম, ‘আমি তৈরি নই।’

দুটো ছায়ামূর্তি এইমাত্র বৃদ্ধের পেছনে এসে দাঁড়ালো। একই সাথে আকাশ সফেদ হতে শুরু করলো।
বৃদ্ধ আকাশে তাকিয়ে নিমগ্ন কন্ঠে বললো, ‘আজ বিদায়। যদিও আজ শেষ নয়। আমি ফের আসবো। হয়তো মানুষ নয়, হয়তো অন্য কোন বেশে। নিজের নগন্য পরিচয় দেই। মায়া জগতে আমার বসবাস। সবাই এ জগৎে নিমন্ত্রণ পায় না। তুমি সৌভাগ্যবান, তোমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে। যেমনটা পূর্বেও করা হয়েছিলো অনেকের মাঝে একজনকে।’

সেদিন সমস্ত রাত দিঘির পাড়ে পড়ে ছিলাম। কিভাবে গিয়েছি, কেন গিয়েছি, আমি জানি না। মাঝ দুপুরে দিঘির পাড় হতে উদ্ধার করা হয় আমায়। সে রাতের পরে জীবন পাল্টে যায়। ভালো লাগে দরজা আটকে ঝিম ধরে ঘরে বসে থাকতে। কী অদ্ভুত! এর পর হতে কালো মেঘ আমার ডাকে সাড়া দিতে শুরু করলো। রাতের পুর্ণী আমার কথায় আলো ছড়াল।

অতঃপর প্রতি গভীর রাতে আমাকে দিঘির পাড়ে দেখা যেত। বৃদ্ধ আমার কাছে আসতো, সাথে ত্রিফলা হাতে কালো ছায়া দুটোও। কেন যেতাম, কিভাবে যেতাম- আমি জানি না। একসময় আমি নামাজ কায়েম শুরু করি। নামাজ শেষে কাচের জিনিস ভাঙতে শুরু করি।

বাবা-মা বড় হুজুর ডাকলেন। বড় হুজুর বললেন, মারিদ (শক্তিশালী জ্বীন সম্প্রদায়) আছর করেছে।
ছোট মামা হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরলেন। ‘জ্বীন বলে কিছু আছে নাকি?’
উঠে গিয়ে মামার গালে স্বজোড়ে চড় বসালাম। মামা চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। একটি দাঁত খুলে পড়ে গেলো। আমাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হলো ঘরে। তবুও প্রতি রাতে দিঘির পাড়ে আমাকে দেখা যেত। কিভাবে যেতাম, আমি জানি না।

আমি সমাজ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। বৃদ্ধ বললেন, ‘সময় হয়েছে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাও।’ বৃদ্ধকে সালাম করে সে রাতেই ঘর হতে বেরিয়ে যাই। আমার ক্ষুধা পায় না। রাস্তায় পড়ে থাকা খাবার পেলে খাই, ভিক্ষা চাই না। বৈশাখের কালবৈশাখে সবাই যখন দরজা বন্ধ করে, আমি দাঁড়িয়ে রই ঘরের বাইরে। দেখি ঝড়ের সৈান্দর্য। বৃদ্ধ আমার পাশে বসে থাকেন। তিনিও ঝড়ের সৌন্দর্যে বিমোহিত হন।
মধ্য রাতের রমণীরা আসে আমার কাছে। ‘টেকা লাগবো না, বিগার থামায় দে। পারবি?’
বৃদ্ধ হাসে, আমি দূরে সরে যাই।

বৃদ্ধ জ্ঞান মূলক প্রশ্ন করে, উত্তর দিতে পারি না। উদাহারণ দেই। এক রাতে বললেন, ‘যদি আলোর উৎস সূর্য হয় তবে অন্ধকারের উৎস কী?’
আমি অন্ধকারে তাকিয়ে রই। ‘অন্ধকারের উৎস কী?’

আট.

“যে আল্লাহর জন্য হারাম ছেড়ে দেয় এবং হালালের জন্য হারামকে ত্যাগ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে অকল্পনীয় প্রতিদান দেন। আসহাব (গুহাবাসীগণ) ইসলামের জন্য ঘর ছেড়েছিলেন। আল্লাহ এর বিনিময়ে পৃথিবীতে তাঁদের কর্তৃত্ব দিয়েছিলেন। সুলায়মান (আঃ) আল্লাহর জন্য তাঁর ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ এর বিনিময়ে বাতাসকে তাঁর অনুগত করে দিলেন। ইয়সুফ (আঃ) আল্লাহর জন্য হারাম নারীকে বর্জন করেছিলেন। আল্লাহ এর বিনিময়ে তাঁকে মিশরের ক্ষমতা দান করলেন।
আপনি যে হারামের মধ্যে আছেন তা ত্যাগ করুন। আল্লাহ এর বিনিময়ে এমন কিছু দিবেন যা আপনার আশাতীত।
হারামের জন্য এখন কোথাও যেতে হয় না। হারাম ঢুকে পরেছে আপনার বেডরুমে, আপনার সিথানে। আপনার ল্যপটপে, স্মার্ট ফোনে।
কিয়ামতের দিন কিছু মুসলিম পাহার সমান নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবেন। কিন্তু মহামহীম আল্লাহ্ সেই নেক আমলকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণায় পরিণত করবেন। যদিও তারা এমন মুসলিম ছিলেন, যারা মাঝ রাতে তাহজ্জুদের নামাজ পরতেন। তাদের পূণ্যকে বিনষ্ট করা হবে। তাহলে তাদের গুনাহ্ কি? তাদের গুনাহ্ হলো, তারা একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত ছিল।”
দেশ বরেণ্য বক্তা ওয়াজ করছেন ভারি গলায়।
বারেক মন্ডল বসে আছে মাহফিলে। তার চোখে জল। এক জীবনে না জানা কত পাপ, কত গোপন হারাম.. তিনি আকাশে তাকালেন, তওবা করলেন।
মোনাজাত দিয়ে মাহফিল শেষ হতে হতে রাত একটা বেঁজে ত্রিশ। বারেক মন্ডল ঘরে এলেন। ক্ষুধা নেই, নিদ্রা নেই। চারপাশে শুধু নিস্তব্ধ নীরবতা। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে করে রাত তিনটা ত্রিশ। এদিকে ইবলিশ বারে বার যন্ত্রণা দিচ্ছে, একলা ঘরে গোপন হারামের মন্ত্রণা দিচ্ছে। ‘প্রতিদিনের মতো আজো একবার হয়ে যাক! উফ্… কত মজা, ভেবেছ?’ আর মনটাও পরাজয় মেনে নিতে চাইছে। যদিও বারেক মন্ডল আজ পরাজয় মানতে নারাজ। তিনি আজ ইবলিশের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন।
ও’দিকে, রান্না ঘরে খুট-খাট শব্দ হচ্ছে। বারেক মন্ডল কান খাড়া করলেন। এতো রাতে রান্না ঘরে কে? নিশ্চয়ই বদ বেড়ালটা। ‘মাছ খেতে এসেছে, খাওয়াচ্ছি।’

তিনি বিছানা থেকে নেমে চটি পায় দিলেন। সন্তর্পণে দেয়ালে ঝোলানো দো’নালা বন্দুক হাতে নিয়ে রান্না ঘরে রওনা হলেন। রান্না ঘরের বাতি নেভানো। বাতি জ্বালিয়ে দেখলেন, কালো বেড়াল পাতিল উল্টে মাছ খাচ্ছে। বারেক মন্ডলকে দেখে মহাউৎসবে বললো, ‘মেউ।’..
বারেক মন্ডল বন্দুক উঁচিয়ে বললো, ‘শেষ ওয়ারনিং দিতেছি বদের বাচ্চা। আরেকবার মেউ বললে আইজ তর জীবন শেষ।’
বেড়ালটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাত উঁচু করলো। ‘বারেক সাব, ভুল হইছে। গুল্লি করবেন না প্লিজ। আমি সিলেন্ডার।’
বারেক মন্ডল কপালে হাত দিলেন। কপাল ঠান্ডা। জ্বর আসে নি। তাহলে বেড়াল কথা বলে কি করে? তিনি নিঃশব্দে বাতি নিভিয়ে দিলেন। অতঃপর আচ্ছন্নের মতো শোবার ঘরের দরজায় এসে দেখলেন, এক রমণী ড্রেসিং টেবিলের সামনে উলঙ্গ হয়ে চুল আঁচরাচ্ছে। বারেক মন্ডলকে দেখে বললো, ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলে? সেই কখন হতে দাঁড়িয়ে আছি!’
‘আপনি কে আফা? এতো রাইতে লেঙটা হয়ে দাঁড়ায়ে আছেন?’
‘ছিঃ … আপা বলছো কেন? আমাকে চিনতে পারছো না?’
‘জ্বি না। আপনার পরিচয়?’
‘সন্ধায় রাস্তার মোড়ে আমাকে দেখে জিভেয় কেমন জল এসেছিল তোমার, এখন পরিচয় জানতে চাইছো? এসো, ভেতরে এসো!’
‘আমি আইজ ভেতরে আসবো না।’
বারেক মন্ডল দরজাতেই দাঁড়িয়ে রইলেন। এমন সময় বিদ্যুৎ গেলো চলে, ঘর হলো অন্ধকার। বারেক মন্ডল চেঁচিয়ে বললেন, ‘মোম কোথায়, আরে এতো রাইতে মোম কোথায়?’
‘চুপ, আজ একটি কথাও বলবে না।’
বারেক মন্ডল চুপ হয়ে গেলেন। একটি কথাও বললেন না।
রমণী কাছে এলো, ধীরে কাছে এসে হাত ধরলো, জড়িয়ে ধরলো অন্ধকারে। নারী চুলের গন্ধ নাকে এলো। নাকে এলো পারফিউমের তীব্র গন্ধ। তিনি বুঁদ হয়ে গেলেন গন্ধে, বারেক মন্ডল নিরুপায় হয়ে গেলেন।
শুরু হলো ঝড়। ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেলো একলা ঘরে জিহাদ ঘোষণা। আর পরাজিত মানবের এমন জিহাদ দেখে ইবলিশ হাসলো অট্টহাসি।
নির্দিষ্ট সময়ে ঝড় থেমে গেলো।
বিদ্ধস্ত শরীরে বিছানায় এলিয়ে পরলো বারেক মন্ডল। আর রমণী চলে গেলো দৃশ্যের অদৃশ্যে।

রান্না ঘরে ফের খুটখাট শব্দ হচ্ছে। ‘বেড়াল মাছ খাচ্ছে।’
ঘুম ঘুম চোখে বারেক মন্ডল বললেন, ‘হারামির বাচ্চা মাছ খাচ্ছে। খাকগে যা।’ তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন, ঘুমিয়ে পড়লেন অপবিত্র অবস্থায়।

কালো বেড়ালটি উঠে এলো বিছানায়। সিথানে এসে কানে কানে বললো, ‘ইবলিশ দেখেছেন?’
সে এমন এক অস্তিত্ব, যে মানুষ বেশে আপনার পাশেই বসে থাকে। যাকে খুব কাছের বন্ধু-পরিজন মনে হয়। যে পাশে বসে কু’মন্ত্রণা দেয়। নারীর প্রতি আগ্রহী করে তোলে, লোভকে জাগ্রত করে। শিরক, যেনা আর গীবত শেখায়.. কারণ মানুষকে প্রথম শেখাতে হয়। আপনি প্রথম মিথ্যে শেখেন আপনার কাছের মানুষ হতে, তখন আপনি ছোট। ধীরে বড় হলেন। সময়ের সাথে সে’ও সময় উপযোগী হারাম শেখালো কাছের মানুষ বেশে। যখন আপনি শিখে গেলেন, তার বসবাস শুরু হলো অবচেতনে, সকল চিন্তার শেকড় যেখানে।

কখনো প্রিয়তমা সেঁজে আপনার হাত ধরে। তার রূপে আপনি বিমুগ্ধ হন, এলোচুলে বিমোহিত হন। অপলক চেয়ে থাকেন মায়াবী সেই চোখে। সময় বয়ে যায়। একদিন শোনেন, সেই মায়াবী চোখ আর নেই, অন্যের ঘরণী হয়েছে। বুক ফেটে যায় কষ্টে। ভুলে থাকা নরকময় মনে হয়।
পাশ হতে কেউ বলে, ‘নরকময়তা ভুলে থাকার উপায় আছে। নেশা পানি গ্রহণ করো। ভুলে যাবে সকল নরকময়তা।’

যে এ’কথা বলে, সে কোন অস্তিত্ব? এখন মূল কথাটা বলবো? পাগল বলতে পারেন।
বারেক মন্ডল নাক ডেকে বললো, ‘বলেন, আমি তৈরী।’…
মানুষের ভীড়ে ইবলিশ চেনা কঠিন নয়। খোলা দৃষ্টিতে দেখুন। আপনি ইবলিশ চিনবেন, পাশে বসে থাকা মানুষটি ইবলিশ কিনা চিনতে পারবেন। অপরূপ রমণীটি ইবলিশ কিনা চিনবেন। সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও চিনবেন। ইবলিশ তো হারাম বিনে ভিন্ন কিছুর ইন্দন দেয় না।
আদম (অঃ) এর দুই পুত্র হাবিল, কাবিল। ঘটনা জেনে থাকবেন। যেদিন নারীর জন্য পৃথিবীর প্রথম হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। তারা বললো, দু’জনই আল্লাহ্র ওয়াস্তে কোরবাণী দেবে। যার কোরবানী কবুল হবে, রমণী হবে তার।

যে কথা সে কাজ। কোরবাণী শেষে আল্লাহ্র তরফ হতে একটি আগুন এলো এবং হাবিলের কোরবাণী পুড়িয়ে দিলো। হাবিলের কোরবাণী কবুল হলো। কিন্তু কাবিল তা মানতে নারাজ। সে হাবিলের গলা চেপে ধরলো। যদিও তাকে হত্যা করতে পারছিল না।
অতঃপর ইবলিশ সেখানে উপস্থিত হয়। বাঁদর বেশে একখানা পাথর নিয়ে এক জন্তুর মাথায় আঘাত করে। জন্তুটি মারা যায়। এ দেখে একইভাবে কাবিল পাথর হাতে হাবিলের মাথায় আঘাত করে। হাবিল শহীদ হন।

অনুশোচনা নিয়ে কাবিল হতাশ হয়ে পড়ে। হতাশা নিয়ে সে দৌঁড়ে পালায়। আদম (আঃ) এবং হাওয়া (আঃ) পূত্র হারিয়ে যখন শোকে বিহবল, তখন আল্লাহ্ তায়ালা তাদের একটি উপহার দিলেন। শিথ (আঃ) এর জন্ম হলো। সময় গেলো। আদম (আঃ) এর পরে শিথ (আঃ) সমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। পাহারের উঁচুতে সমাজ গঠন করলেন। আল্লাহ্কে ভয় করে সেখানে জীবনপ্রবাহ শুরু হলো। অন্যদিকে পাহাড়ের নিচে বসতি স্থাপন করলো কাবিলের গোষ্ঠী।

ইবলিশ একদিন তরুণ বেশে কাবিলের সমাজে ঢুকে পরলো। একজন ধাতু কর্মীর সাথে কাজ শুরু করলো।
সেই তরুণ একদিন অদ্ভুত এক যন্ত্র আবিস্কার করলো, একটি বাঁশি বানালো। যার সুর সবাইকে আকর্ষণ করলো, চমকপ্রদ করলো। বাঁশির সুরে পাগলপ্রায় হলো যুবসমাজ।

আর সপ্তাহের একটি দিন ধার্য করা হলো, যেদিন সকলে একসাথে বাঁশিসুর উপভোগ করবে। যে ধারা এখনো সমাজে দেখা যায়, স্যাটারডে নাইট অথবা কনসার্টে।

বাঁশির সুর শীথ (আঃ) এর সমাজের লোকের কানে গেলো। কেউ কেউ বললো, ‘কি শোনা যায়?’
শীথ (আঃ) বললেন, ‘ওখানে যেতে আল্লাহ্ নিষেধ করেছেন, যে পর্যন্ত না তারা তওবা করে।’
‘তারা আমাদের আত্মীয়, আমরা যেতেই পারি।’ শীথ (আঃ) সম্প্রদায়ের কিছু লোক পাহাড় হতে নিচে নেমে এলো। বাঁশিসুর শুনে আত্মহারা হলো।

শীথ (আঃ) এর গোষ্ঠীর পুরুষেরা ছিলো সুগঠিত, অধিক সুন্দর। আর কাবিল গোষ্ঠির নারীরা ছিলো অপরূপ সুন্দরী। অতঃপর যখন তারা একসাথে বাঁশিসুর শুনলো, একে অন্যর চোখে চোখ পরলো। কাবিল গোষ্ঠীর নারীরা শীথ (আঃ) গোষ্ঠীর পুরুষের প্রতি দূর্বল হয়ে পরলো, ওরা একে অন্যর প্রেমে পরলো। অতঃপর প্রথমবারের মতো সেজেগুজে ঘর হতে বেরোতে শুরু করলো। আর এভাবেই পৃথিবীতে প্রথম শুরু হলো যেনা।

আর ইবলিশ তো এক কাজ নিয়ে বসে নেই। সে একই সাথে কাবিলের চিন্তায় বাসা বাঁধলো। ‘তোমার কোরবাণী কবুল হলো না, হাবিলের কোরবাণী কবুল হলো, কেন জানো?’
কাবিলের কপালে ভাঁজ পরলো।
‘আগুনের প্রতি হাবিলের ছিলো গভীর শ্রদ্ধা। তাই আগুন তার দেয়া পশু পুড়িয়ে দিয়েছে।’
কাবিল ভাবলো, ঘটনা সত্যও হতে পারে।
কাবিলের আগুনের প্রতি ভক্তি বেড়ে গেলো। আর এভাবেই ইবলিশ ‘শিরকের’ বিষ ঢেলে দিতে শুরু করলো মানব চিন্তায়।
শুরু হলো অগ্নি পূঁজো।
এই কাবিল গোষ্টিতেই নূহ (আঃ) এর জন্ম ঘটে।
নূহ (আঃ) এবঙ শীথ (আঃ) এর মাঝে আরেকজন নবীর আগমন ঘটে। ইদ্রিস (আঃ), পৃথিবীতে যিনি প্রথম লিখা আবিষ্কার করেন। এবং প্রথম বস্ত্রবুনন শুরু করেন।

বারেক মন্ডল আরমোড় ভেঙে উঠে বসে। ‘এতো কথা কে কয়?’
কালো বেড়াল বললো, ‘শুয়ে পড়েন। ঘটনা এখন অন্যদিকে মোড় নেবে। খেয়াল করেন।’
বারেক মন্ডল শুয়ে পরলেন। বেড়ালের চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘শুরু করেন। আমি পাগল।’

ইদ্রিস (আঃ) এর মৃত্যুর দীর্ঘকাল পর পৃথিবীতে কোন নবীর আগমন ঘটেনি। আর এই সুযোগ ইবলিশ কাজে লাগাতে শুরু করলো, মানুষ তখন আঁকতে পারে।
এ সময়ে ধার্মিক লোক মারা গেলে ইবলিশ মন্ত্রণা দিতে শুরু করলো। ‘লোকটা কতো ভালো ছিলো, একটা ছবি তো এঁকে রাখতে পারো! যাতে করে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের চিনতে পারে।’
মানুষ ভাবলো,‘ঘটনায় যুক্তি আছে।’
তারা ছবি আঁকতে শুরু করলো।
অতঃপর পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তায় একই ভাবে বাসা বাঁধলো। ‘শুধু ছবি আঁকলে সম্মান করা হয়? একটা মূর্তি তো বানিয়ে রাখতে পারো! কেন ভুল বুঝছো? প্রার্থনার জন্য নয়, শুধু সম্মানের জন্য।’
পরবর্তী প্রজন্ম ভাবলো, ‘কথা যুক্তিসঙ্গত।’
তার পরবর্তী প্রজন্মকে বললো, ‘তোমাদের পূর্ব পুরুষেরা এই মূর্তিকেই পুঁজো করতো। যদি না করো, তবে আল্লাহ্র লানত।’
তারা তুফানে ভয় পেলো। শুরু হলো মূর্তি পূঁজো।
আর এভাবেই ইবলিশ ধীরে ধীরে শিরক এর বিষ ঢেলে দিতে শুরু করলো মানব মনে।
এখনো সে থেমে নেই। চিন্তা করুন, ইবলিশকে পাশেই পাবেন। হতাশ হবেন না। ইবলিশ মানুষকে হতাশ করে আল্লাহর দয়া থেকে। যেভাবে কাবিলকে করেছিলো। সে ক্ষমা না চেয়ে হতাশা নিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে ছিলো।

নয়.

“ইবলিশ বললো,
আপনি আমাকে পথ ভ্রষ্ট করলেন। এ কারণে শপথ করছি, বনি আদমকে বিভ্রান্ত করার জন্য সরল পথের মাথায় ওঁৎ পেতে বসে থাকবো। তাদের সম্মুখ দিয়ে, পেছন দিয়ে, ডান দিক এবং বাম দিক দিয়ে কাছে আসবো। আপনি কম সংখ্যক মানুষকেই কৃতজ্ঞ রূপে পাবেন।
দয়াময় বললেন,
লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত অবস্থায় বেরিয়ে যাও। বনি আদমের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, নিশ্চই আমি তাদের দ্বাড়া জাহান্নাম পূর্ণ করবো।”
‘দয়াময় মানুষ সৃষ্টি করলেন। সেই মানুষকে পরীক্ষার জন্য উপকরণ দরকার। তাই তিনি ইবলিশ সৃষ্টি করলেন, যা ছিলো পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা। যদি তাই হয়, তবে ইবলিশের দোষ কোথায়?’
পবিত্র লিলানের দৃষ্টি তিক্ষ্ণ হলো। ‘যা জানো না, তা নিয়ে কেন প্রশ্ন তুলছো?’
‘পরিস্কার করুন, নির্দোষ ইবলিশ কেন জাহান্নামের কালো আগুনে জ্বলছে?’

চলবে..

Facebook Comments