শেয়ার করুন:

প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রথম কবিতা আড্ডাপত্র প্রকাশ করছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থের সাথে কবির আনন্দ, উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি পাঠকের কানে নতুন কবিতার গুঞ্জরণ ভেসে আসে। পাঠকের মনে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি তুলে ধরতে চায় আড্ডাপত্র। কবিতা পাঠের সাথে সাথে জানবো কবি সম্পর্কেও। এই আয়োজনটি পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে

প্রতিশোধে হ্যামলেট

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

পিতা জেনে যাও, তোমার এ অবিবেকী অন্যায় হত্যার
রক্ত-ঘাতী বিনিময় হবে।
তোমার সে নির্বোধ বিশ্বাস, প্রেম, রাজধর্ম, হে রাজন,
বিশালতা-ঈর্ষিত, উদার,
কালকূট হয়ে দ্যাখো তোমাকেই করেছে আঘাত।
হায় মানবিক কৃতঘ্নতা! পশু আর প্রিয়তমা এক হয়ে গেছে
সততার স্নায়ু ছিঁড়ে নিতে।
তোমাদের উদ্বাহু বিশ্বাস, পিতা, কুকুরের
খাদ্য দ্যাখো আজ। স্বল্পায়ু স্বর্ণলালসায় চতুর্দিকে
মরিয়া কৃতান্তকুল; আমাদের কামনার প্রিয়তমারাও
পশুর দাঁতাল আলিঙ্গনে তৃপ্তি চায় শুধু আজ!
শত্রুকে চিনেছি আমি পিতা। আমাদের এই প্রাসাদের
মান্যবর বাসিন্দা সে আজ : ডেনমার্কের সম্মানিত প্রভু।
দেহরক্ষী, অমাত্য, বৈভব, সম্পদ, রাণী, রাজদণ্ড
পরিবৃত-সহজ নাগাল থেকে দূরে।
তোমার প্রাক্তন রাণী-আমার মায়ের
কলুষিত প্রশ্রয়ে (হা ঈশ্বর!)
তোমার শয়নঘর কলঙ্কিত করে প্রতিরাত্রে।
ঘৃণ্য আরোহনে প্রতিদিন
অপমান করে ডেনমার্কের প্রিয়তম সিংহাসন।
রক্তে বাজে প্রতিশোধ। পিতা, আমি প্রতি পলে
ধূর্ত বেড়ালের মত প্রাসাদের সতর্ক ছায়ায়
সুযোগের প্রতীক্ষায় হেঁটে ফিরি; উন্মাদের বেশে
এড়াই সন্দেহ; নিদ্রাকে
চিরশত্রু করেছি; দুর্লভ প্রেমকেও
অবৈধ অশ্রুর সাথে কবর দিয়েছি অন্ধকারে।
রক্তে বাজে প্রতিশোধ। প্রতিটি স্নায়ুর
ক্ষুধার্ত চিৎকারে, দাঁতের প্রতিটি
উন্মত্ত দংশনে, উচ্চকিত শিরাদের ক্ষোভে,
শরীরময় রক্তকণাদের বন্যতায়

বিনিদ্র চোখের মত, দ্যাখো, শুধু প্রতিশোধ জ্বলে।

[আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বাংলাদেশের একজন কবি, কথাশিল্পী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক। তিনি ষাটের দশকে একজন প্রগতিশীল কবি হিসেবে পরিচিতি পান। সে সময়ে সমালোচক এবং সাহিত্য-সম্পাদক হিসাবেও তিনি অবদান রেখেছিলেন। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য কীর্তি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, যা চল্লিশ বছর ধরে বাংলাদেশে ‘আলোকিত মানুষ’ তৈরির কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ১৯৩৯ সালের২৫ জুলাই কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার অন্তর্গত কামারগাতি গ্রামে। তাঁর পিতা আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন কলেজ শিক্ষক। মাতা বেগম করিমুন্নেসা। স্ত্রী রওশন আরা সায়ীদ। ১৯৫৫ সালে তিনি পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৫৭ সালে বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি ১৯৬১ সালে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে কিছুকাল সিলেট মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ সালের পহেলা এপ্রিল তিনি রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকুরিজীবন শুরু করেন। সেখানে পাঁচ মাস শিক্ষকতা করার পর ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে যোগ দেন (বর্তমানে সরকারী বিজ্ঞান কলেজ)। এই কলেজে তিনি দু’ বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।এরপর তিনি ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে সেখানে যোগদান করেন। আবু সায়ীদ যখন ঢাকা কলেজে যোগ দেন তখন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান৷
ষাটের দশকে বাংলাদেশে যে নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলন হয়, তিনি ছিলেন তাঁর নেতৃত্বে। সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ (১৯৬৪-১৯৮৩) সম্পাদনার মাধ্যমে সেকালের নবীন সাহিত্যযাত্রাকে তিনি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সংহত ও বেগবান করে রেখেছিলেন । আবু সায়ীদ ১৯৬০ এর দশকে বেশ কিছু প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা লিখেছেন। সত্তর এর দশকে তিনি টিভি উপস্থাপক হিসাবে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ- কাব্যগ্রন্থ: মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ- ১৯৮৮। ছোটগল্প: রোদনরূপসী- ১৯৯৬; খর যৌবনের বন্দি- ১৯৯৮; বিদায় অবন্তী – ১৯৯৫।নাটক: যুদ্ধযাত্রা – ১৯৯৭। প্রবন্ধ-গবেষণা: দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য প্রবন্ধ – ১৯৭৬; উত্তর প্রজন্ম- ১৯৯২; বন্ধ দরোজায় ধাক্কা – ২০০০; স্বনির্বাচিত প্রবন্ধ ও রচনা – ২০০১; নিউইয়র্কের আড্ডায়- ২০০১ । স্মৃতিকথা: নিষ্ফলা মাঠের কৃষক – ১৯৯৯; ভালোবাসার সাম্পান- ২০০২ । বক্তৃতা সংকলন: রসট্রাম থেকে – ২০০০। অনুবাদ: দ্যাগ হ্যামমশোল্ড- ১৯৬৯; শৃঙ্খলিত প্রমিথিউস- ১৯৮২। জার্নাল: বিস্রস্ত জর্নাল – ১৯৯৩; আমার অনুভূতিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র – ১৯৯৭ ।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ১৯৭৮ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিস্তারে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। এ প্রসঙ্গে সায়ীদ বলেন: দেশের এই সার্বিক অবক্ষয় এবং সম্ভাবনাহীনতার ভেতর সীমিত সংখ্যায় হলেও যাতে শিক্ষিত ও উচ্চমূল্যবোধসম্পন্ন আত্মোৎসর্গিত এবং পরিপূর্ণ মানুষ বিকশিত হওয়ার পরিবেশ উপহার দেয়া যায়, সেই উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি। একজন মানুষ যাতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অধ্যয়ন, মূল্যবোধের চর্চা এবং মানবসভ্যতার যা-কিছু শ্রেয় ও মহান তার ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বসম্পন্ন হয়ে বেড়ে উঠতে পারে- আমরা এখানে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই। কাজেই আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রাণহীন, কৃত্রিম, গতানুগতিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সর্বাঙ্গীণ জীবন-পরিবেশ। বাংলাদেশে পাঠাগারের অপ্রতুলতা অনুধাবন করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ১৯৯৮ সালে ‘ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’ কার্যক্রম শুরু হয়।
লেখালেখি ও কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশে অ-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তারে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৫ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। প্রবন্ধে অবদানের জন্য তিনি ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার ১৯৭৭; মাহবুবুল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার ১৯৯৮; রোটারী গিড পুরস্কার ১৯৯৯; বাংলাদেশ বুক ক্লাব পুরস্কার ২০০০; এম.এ হক ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক ২০০১; র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার ২০০৪; বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন থেকে পালমোকন-১৭ সম্মাননা ২০১৭ লাভ করেন।

Facebook Comments