শেয়ার করুন:

প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রথম কবিতা আড্ডাপত্র প্রকাশ করছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থের সাথে কবির আনন্দ, উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি পাঠকের কানে নতুন কবিতার গুঞ্জরণ ভেসে আসে। পাঠকের মনে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি তুলে ধরতে চায় আড্ডাপত্র। কবিতা পাঠের সাথে সাথে জানবো কবি সম্পর্কেও। এই আয়োজনটি পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে..
*আজ কবির জন্মদিন, তাকে আড্ডাপত্রের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা–

ললাটি

শাহেদ কায়েস

স্মৃতিগ্রহের বর্ষা: শৈশব বিভাগ
………………………………
রহস্য খোলার বয়স সেটা নয়
উলঙ্গ হয়ে গোসল সারি মায়ের হাতে
ডুব চিতলের স্বপ্নে সখির হাত ধরে নেমে যাই পুকুরে
সোনালী কানকো থেকে নেমে আসে আল্ফা সেঞ্চুরী স্রোত
নিষ্পাপ আনন্দে জল ছিঁড়ি, ইজেল টেনে খুলে ফেলি
একদিন যা হয় অপার রহস্য– তোরটা কেমন যেন!
সুতার বাণিজ্যে ঘুম
দরজা টেনে দেন প্রপিতামহ মাঝ দুপুরে
পাশ ফিরে পাশাপাশি কাঁচা সড়ক উড়াই বউচি খেলার মাঠ
নাবালক হাতের রেখায় জেগে ওঠে পানচিনি সন্ধ্যা
পুতুল কন্যার বিয়ের আসরে তোর পা গড়িয়ে রক্ত নামলে
জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলি– তোকে আমি মরতে দেবনা।
শৈশব সখির গভীরে ঘুম যাই আজীবন
স্মৃতিগ্রহের বর্ষা: কৈশোর বিভাগ
……………………………….
কার্পাস, যেন উড়তে থাকে চারপাশ
যতদূর দৃষ্টি– মাঠ মাঠ সর্ষেফুল…
জানালার বাইরে পথের যে বাঁক–
হলুদের স্বপ্নে ধীরে ধীরে বিন্দু হয় সহপাঠিনী সখিদের ঝাঁক
বিন্দু থেকে কখনো মিলায় শূন্যে, কখনো গহন স্পর্শে!
ঘরের বাইরে রাখি পা–
ভিন গাঁওয়ের সখি আমার বুকের পাঁজরে বেঁধায় বর্শার ফলা
রেল লাইনের স্লিপারে কান পেতে প্রতীক্ষায় থাকি সখির আগমন
হলুদের শয্যায় একদিন খুলে ফেলি লজ্জার বোতাম…
আকাশের রাশ রাশ নীলভর্তি ইয়ে দুটি
নিষ্পাপ সৌন্দর্যে কেঁপে ওঠে অচিন হাওয়ায়!
লিওনার্দোর হাত ধরে এগিয়ে যাই
রাইশস্যে ভরে ওঠে উল্টানো শব্দের ডিঙ্গি, সংকেত পাঠাই
আয়নার সামনে মেলে ধরি উত্তর, মোনালিসার চক্ষু নয়– উড়ে যায় কৃষ্ণচূড়া চেলি
একদিন এইসব সখিরা অতীত হয়ে যায়।
স্মৃতি গ্রহের বর্ষা: উত্তর কৈশোর বিভাগ ১
…………………………………………
কার্জন হলের এপাশ স্বজন হয়ে ওঠে
ডিসেকশন টেবিলে একটি পাখি
হাতের ফরসেপ কেড়ে নেয়, নাইফ-সিজর এবং যাবতীয় কিছু
তারপর উড়তে থাকে দিগন্ত থেকে দিগন্তে…
টেবিলে পড়ে থাকে এ্যাপ্রনশাদা একটি পালক!
অযত্নে পালকটি পকেটে রেখে বাড়ি ফিরি।
স্বপ্ন
অসম্ভব শাদা রঙ আমার চারপাশে। দেয়াল, মেঝে, ছাদ এবং বিকেলের আকাশে শ্বেত শূন্যতা; পাশের কক্ষ থেকে জেগে ওঠে সুর, সম্ভবত ভৈরবী– তাও সাদা। হঠাৎ দেখি সমস্ত শাদা পুঞ্জিভূত রূপ নেয় পালকে– পালক থেকে অসহ্য সুন্দর একটি পাখি বেরিয়ে আসে; আমাথা-পা শাদা কাপড়ে ঢাকা– আমি চিৎকার করে উঠি ভয়ংকর শাদা স্পর্শে!
জাগরণ
পাখিটি এখনো আমার চারপাশে
কখনো লেখার টেবিলে, কখনো বাথরুমে, কখনো কম্পিউটারের জটিল স্ক্রীনে!
অনল নিয়ে আমি খেলি, কখনো রাখিনা বিশ্বাস।
স্মৃতি গ্রহের বর্ষা: উত্তর কৈশোর বিভাগ ২
নানীগঙ্গার পাশেই আমার ঘর
নিত্য পাঁচওয়াক্ত ওজু করে ভাসাই তরী
কবির মাজারে রাখি হাত, ঠোঁটের লজ্জায় নেমে আসে শিল্পের চড়াই
ডাক পাঠাই খোলা বুকের পালক, আর যত পাথুরে অভিমান…
লাল মাটির স্বপ্নে ভেঙ্গে ফেলি অসহ্য কসম
লাবণ্যজলে গোসল সেরে ছিটিয়ে দিই কবিতার বিষ
আজানের ধ্বনিতে ভরে ওঠে রহস্য পেয়ালা
প্রকৌশল ঘাসতীর্থে সমাজিক ঘৃণা!
নিজের বিরুদ্ধে গড়ে তুলি প্রাচীর, ঘৃণার দেয়াল।
স্মৃতি গ্রহের বর্ষা: দশমাস দশদিন
…………………………………
ছিল বসন্ত, ছিল রৌদ্র সুদিন
খরগোশ চাতুরিতে ছিল মাসিদের ঋণ
উড়াল স্বরে আটকে গেল বুকের নিঃশ্বাস!
দূরবন থেকে তুলে আনি হলুদ অবকাশ
যদিবা লতিয়ে ওঠে স্বর্ণলতার স্বাদ
যদিবা আমার মৃত্যু হয়–
মুহূর্ত আদরে ভেঙ্গে ফেলি জরায়ুর ত্রাস
সখির গর্ভে আবারো আমার জন্ম হয়!

আমার থেকে বেরিয়ে এসে আমি আমাকেই খুঁজি।

[শাহেদ কায়েস নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি। জন্ম ঢাকায় ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, মিটফোর্ড হাসপাতালে। মেডিকেলে ভর্তি হলেও পরে চলে যান বুয়েটে। এরপর কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়েছেন দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই-এ। পরবর্তীতে ‘হিউম্যান রাইটস’ বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়াংজু শহরে, চোন্নাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে। এখন পুরোপুরি সামাজিক প্রকৌশলী, কাজ করেন মানুষের অধিকার নিয়ে, সেই সঙ্গে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। বসবাস করছেন নিজ গ্রাম সোনারগাঁয়ে। শখ ভ্রমণ। সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়ান দেশ-বিদেশ। নিজগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশন’।
লেখালেখির শুরু ১৯৮৮ সালে।প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে।এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে আটটি গ্রন্থ। তার মধ্যে কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা পাঁচটি। বাঁক ফেরার অভিজ্ঞতা (১৯৯৯), চূড়ায় হারানো কণ্ঠ (২০০৩), মায়াদ্বীপ (২০১৫), ‘কৃষক ও কবির সেমিনার (২০২০); ‘নির্বাচিত কবিতা (২০২০)। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: এশিয়ার বারটি দেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে লেখা ‘Who really they are?’ (Publisher: May 18 Memorial Foundation, Gwangju, South Korea, 2015); মঙ্গলসন্ধ্যা প্রেমের কবিতা (সম্পাদিত, ২০১৭); বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম স্মরণগ্রন্থ (২০২০)। প্রথম কাব্যগ্রন্থে কবির নাম ‘সাহেদ কায়েস’ হলেও পরবর্তী গ্রন্থে তাকে পাওয়া যায় শাহেদ কায়েস হিসেবে। আমরা শাহেদ কায়েস নামটিই রাখলাম।
লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন: শালুক সম্মাননা (২০১৯)

Facebook Comments