শেয়ার করুন:

মাতৃভাষা/মাতৃভূমি

ফরহাদ মজহার

তোর সাথেই তো তুই তোকারি তোর সাথেই তো আবোলতাবোল
আধখানা স্বাদ সোহাগ-ভরা ফষ্টনষ্ট চিমটি টোকা
ভিমরি খাচ্ছি যখন তখন তবু তো নাকমুখ দিয়েছি
শূ’ড়ের ব্যতিব্যস্ত ভঙ্গি সাবড়ে খাচ্ছে সুখদ রেণু।
আমি তো তোর বিদ্যা চাইনা রাখিস মা এই দাসরে মনে
ভ্রূণভনিতা ভাঙ্গতে যদি বিফলতাই ঘটে, ঘটুক
অ্যামনায়োটিক জলতারল্যে খেলতে খেলতে জীবন যাবে
তুইতোকারির আজ্ঞা না হয় তোমায় ঘিরেই ঘুরতে থাকবো।
আপা আমার আম্মা-আপা আপার মতোই প্রিয়তমা
শিশুশাবক নখে এবং দুধদাঁতে যে আঁচড় খাচ্ছি
পাচ্ছো কি টের? পাচ্ছো সাড়া এই যে আমি হাতপা নাড়ছি?
তল পেটে কি ঢেউ লাগে না? নাভি এবং প্রজাপতি
একটুও টের পায় যদি তাও রাখিস মা এই দাসরে মনে।
দশমাস দশদিন কি হয়নি, আমায় কি তুই উগরে দিবি?
এই অগাষ্টে পঁচিশ বছর পুরবে তবুও সময় হয়নি?
আম্মা আমার আম্মা-আপা, প্রিয়তমার মতোন আম্মা
ভ্রূণভনিতার ছদ্মবেশে আর কতদিন থাকবো পড়ে।
আমারতো চোখমুখ ফুটেছে অস্থিমজ্জা বাড়ছে ভালোই
চোখের ঘ্রাণেই বুঝতে পারি কি বস্তু কদ্দুরে আছে
কদ্দুরে কাশবনের নিশদ বন্ধগ্রীবা বাড়ছে অবাধ
কদ্দুরে কোন যুদ্ধক্ষেত্রে আমার মানুষ মরছে বৃথা।
যুদ্ধক্ষেত্রে থাকুক পতিত আবাদ করলে তোমরা করো
আমারতো চোখমুখ ফুটেছে আমি সবের অর্থ বুঝি;
বাহাত্তরের এই অগাষ্টে আমার পঁচিশ বছর পুরবে
পঁচিশ বছর অনেক বয়েস আমার তো চোখমুখ ফুটেছে।
আবাদ করলে ফলবে সোনা আমি তেমন যুদ্ধ যাবো-
দশমাস দশদিন হয়েছে এবার আমায় উগরিয়ে দে
পাপড়ি মেলুক ভগোষ্ঠ তোর ফেলোপীয়ান টিউব কিম্বা
আমবিলিকাল কর্ড ছি’ড়েছি পেয়েছি উৎকৃষ্ট সময়।
প্রিয়তমা আম্মা আমার আম্মা-আপা তোমার পদ্ম
ফুটুক আমার শিশুশাবক হাত-পা নাড়া ক্ষান্ত হবে;
আমার তো চোখমুখ ফুটেছে আমি এখন বাইরে যাবো,
প্রিয়তমা আম্মা-আপা তোমায় ছাড়াই বাঁচতে পারবো।
শিশু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন বয়েসে বাইরে ছিল!
আমার মতোন তার তো তেমন অবিজ্ঞতা নেই, ছিলো না;
আমি বিশদ যুদ্ধ জানি, খুব সহজে মরতে জানি
তোমার জন্যে লক্ষ লক্ষ বারএ আমি খুন হয়েছি।
কেউ কি এমন রক্ত ঢালে! রাখিস মা এই দাসরে মনে,
তোমার পদ্ম ফুটুক এবং আমায় পরিপার্শে রাখো
আম্মা আমার আম্মা-আপা আম্মাময়ী প্রিয়তমা
এবার তোর পতিত জমি আবাদ করবো ফলবে সোনা।
…………………………………………………
ফরহাদ মজহার একজন বাংলাদেশি কবি, কলামিস্ট, লেখক, ঔষধশাস্ত্রবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী, সামাজিক ও মানবাধিকার কর্মী এবং পরিবেশবাদী। ফরহাদ মজহার এর জন্ম ৯ আগস্ট ১৯৪৭, নোয়াখালী জেলার মাইজদী কোর্ট এলাকায়।পিতা মফিজুল হক ও মাতা ফাতেমা খাতুন। স্ত্রী ফরিদা আক্তার। বর্তমানে বসবসা করছেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে।
ফরহাদ মজহার নোয়াখালী জিলা স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক ও ১৯৬৪ সালে চৌমুহনী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ ফলিত রসায়ণ বিষয়ে স্নাতক এবং ১৯৭৬ সালে নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভারসিটি থেকে ঔষধশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।পরবর্তীতে নিউ স্কুল ফর স্যোসাল রিসার্স, নিউইয়র্ক থেকে অর্থশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন।
তিনি পর্যালোচনা (১৯৮০), ‘প্রতিপক্ষ’ (১০৮৮-) ও‘ চিন্তা’ নামে পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।
এছড়া উবিনীগ এনজিও গঠন করে নয়াকৃষি আন্দোলনও শুরু করেন।
মার্কসবাদ থেকে ইসলাম, গণিত থেকে বাংলার ভাবান্দোলন, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা, বনায়ন ও পরিবেশ বিচিত্র বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য ও সামাজিক সুরক্ষা আন্দোলন। শুধু লেখনী নয়, বৈঠকী আড্ডা, সংগঠন-সক্রিয়তার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছেন শিষ্য ও পাঠককূল। তরুণ ইন্টেলেকটুয়াল মহলে তিনি নিজেকে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে যচেষ্ট হয়েছেন।
২০১৭ সালের ৩ জুলাই ঢাকার শ্যামলীর আদাবরের নিজ বাড়ি থেকে ভোর পাঁচটার দিকে ফরহাদ মজহারকে অপহরণ করা হয়। এর ১৮ ঘণ্টা পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে যশোরের অভয়নগরে একটি বাস থেকে উদ্ধার করে। পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পুলিশ অবশ্য এই সন্দেহ প্রকাশ করে যে, ফরহাদ মজহারকে গুম করা হয়নি, বরং তিনি নিজেই আত্মগোপন করেছিলেন। গুম কিংবা আত্মগোপন এই ঘটনা ওই সময় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।শুরু থেকেই তার লেখায় একটা আলাদা বাচনভঙ্গী লক্ষ করা যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো:
কাব্যগন্থ: খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ (১৯৭২); ত্রিভঙ্গের তিনটি জ্যামিতি (১৯৭৭); আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে (১৯৮৩); লেফটেনান্ট জেনারেল ট্রাক (১৯৮৪); সুভাকুসুম দুই ফর্মা (১৯৮৫); বৃক্ষ: মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিষয়ক কবিতা (১৯৮৫); অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারীমেশিন (১৯৮৫); খসড়া গদ্য (১৯৮৭); মেঘমেশিনের সঙ্গীত (১৯৮৮); এবাদতনামা )(১৯৯০); অসময়ের নোটবই (১৯৯৪); দরদী বকুল (১৯৯৪); গুবরে পোকার শ্বশুর (২০০০); কবিতার বোনের সঙ্গে আবার (২০০৩); কবিতা সংগ্রহ (২০০৫); ক্যামেরাগিরি (২০১০); এ সময়ের কবিতা (২০১১); যে তুমি রঙ দেখোনি (২০১১); কবিতাসংগ্রহ (২০১১); তুমি ছাড়া আর কোন্ শালারে আমি কেয়ার করি? (২০১৬); সদরুদ্দীন (২০১৮);
গবেষণা-প্রবন্ধ-গদ্য : প্রস্তাব (১৯৭৬); সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্থান প্রসঙ্গে (১৯৮৫); Illness Behavior-Experiences from Villages in Bangladesh (1989); Implications of the Introduction of New Technologies for the Role of Women in the Textile and Clothing Industry : The Case of Bangladesh (1991); রাজকুমারী হাসিনা (১৯৯৫); সাঁইজীর দৈন্য গান (২০০০); জগদীশ (২০০২); সামনা সামনি: ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা (২০০৪); বাণিজ্য ও বাংলাদেশের জনগণ (২০০৪); মোকাবিলা (২০০৬); গণপ্রতিরক্ষা (২০০৬); ক্ষমতার বিকার ও গণশক্তির উদ্বোধন (২০০৭); পুরুষতন্ত্র ও নারী (২০০৮); ভাবান্দোলন (২০০৮); সাম্রাজ্যবাদ (২০০৮); রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ (২০০৮); সংবিধান ও গণতন্ত্র (২০০৮); নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০০৮); জ্যাক দেরিদা-র চিহ্ন বিচার (২০১০); তিমির জন্য লজিকবিদ্যা (২০১১); প্রাণ ও প্রকৃতি (২০১১); মার্কস পাঠের ভূমিকা (২০১১); ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ (২০১২); যুদ্ধ আরো কঠিন আরো গভীর (২০১৪); ব্যক্তি বন্ধুত্ব ও সাহিত্য (২০১৬); মার্কস, ফুকো ও রুহানিয়াত (২০১৮)।
নাটক: প্রজাপতির লীলালাস্য (১৯৭২); ঘাতক দেশকাল (১৯৭৬); শয্যা (১৯৭৭)।
অনুবাদ: অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনার একটি ভূমিকা (মূল: কার্ল মার্ক্স) (২০১০); খুন হবার দুই রকম পদ্ধতি (মূল: রোকে ডাল্টন, ২০১১)।

Facebook Comments