শেয়ার করুন:

প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রথম কবিতা আড্ডাপত্র প্রকাশ করছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থের সাথে কবির আনন্দ, উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি পাঠকের কানে নতুন কবিতার গুঞ্জরণ ভেসে আসে। পাঠকের মনে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি তুলে ধরতে চায় আড্ডাপত্র। কবিতা পাঠের সাথে সাথে জানবো কবি সম্পর্কেও। এই আয়োজনটি পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে..

শীতার্ত চরাচরে

নাসির আহমেদ

শীতই একমাত্র ঋতু
অন্ততঃ আমার বোধে অন্য ঋতু নেই।
যদিও গোলাপ ফোটে দক্ষিণ হাওয়ায়
কোকিলের কুহুস্বরে মুখরিত হয়ে ওঠে সংসারী বাগান,
বৃষ্টির নূপুরধ্বনি বেজেওঠা আভাসে কখনো
শ্রাবণ-মেঘলা দিনে দেখেছি ময়ূর
নাচের মুদ্রায় খুব আগ্রহে হঠাৎ
মেলছে পেখম তার;
আবার দেখেছি সেই চৈত্রের লকলকে রোদ
ছড়াতে ছড়াতে লালা চাটছে সজীব শস্য
লাবণ্যের উজ্জ্বল শরীর।
তবু যেন গ্রীষ্ম নয়, বর্ষা বা শরৎ নয়, বসন্তও নয়
আমার অস্তিত্বে এই চরাচর শুধু সেই শীতার্ত প্রান্তর–
ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মতো অপ্রাপ্তির দুঃসহ বরফ
আদিগন্ত জমে ওঠে নিত্য যার বুকে
আর সেই সহ্যাতীত শীতে
একান্ত চাদর ছাড়া বিকল্প পোশাক নেই কোনো।
জন্মেই জেনেছি এই ধুলি-ধুসরিত
প্রাচীন চাদর ছাড়া আর কোনো
দ্বিতীয় পোশাক তার উমের আদর আমাকে দেবে না; তাই
প্রাত্যহিক ব্যর্থতায় শতছিন্ন মলিন চাদরটাকে আমি
প্রহ্যত সেলাই করি আশ্বাসের মিহিন সুতোয় আর
স্বপ্নের রুপালি জলে ধুয়ে মুছে নিই। একান্ত সম্বল তাই
ধুয়েমুছে যতটা সুন্দর রাখা যায়:
ভাবতে ভাবতে ভাসে স্মৃতিতে আমার-দূর কৈশোরের ছবি
কলিম মাঝির ফুটো সেই নৌকোখানি
জল সেচে সেচে রোজ দুঃসাহসে পাড়ি দিয়ে মেঘনার বুক
সর্বনাশা ঢেউ থেকে গলুই বাঁচিয়ে যায় ওপারে গঞ্জের হাটে
পুনর্বার ফিরে আসে: দুঃখ জল সেচে সেচে ভাসছে জীবন।

আমার চাদর সেই নৌকোর মতই।

কবি নাসির আহমেদ সত্তর দশকের অগ্রগণ্য কবি। তিনি খ্যাতিমান সাংবাদিক, গীতিকার, নাট্যকার ও শিশুসাহিত্যিক। স্বাধীনতা উত্তর যে কয়জন কবি-লেখক তাঁদের মনন ও সৃজনে আমারদের ভাষার মাঠ উর্বর করেছেন তিনি তাদের অগ্রগণ্য। কবি নাসির আহমেদ ১৯৫২ সালের ৫ ডিসেম্বর ভোলা জেলার আলীনগর (রোহিতা) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোঃ আবদুল গফুর ও মাতা উম্মে কুলসুম।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (প্রথম শ্রেণী) ডিগ্রী অর্জন করেন।
সাপ্তাহিক গণমুক্তি পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে ১৯৭৬ সালে সাংবাদিকতা পেশায় যোগদান করেন তিনি তাঁর রয়েছে বর্ণাঢ্য বাংবাদিকজীবন ।তিনি দৈনিক বাংলা’র (১৯৭৯-৯২) সহ-সম্পাদক; দৈনিক জনকণ্ঠ’র (৯৯৩-২০১০) সহকারি সম্পাদক, সামিয়িকী সম্পাদক ও কলাম লেখক, দৈনিক সমকাল’র (২০০৮) ফিচার এডিটর; দৈনিক বর্তমান’র (২০১৩-১৪) যুগ্ম সম্পাদক পদে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন-এ ২০১৪ সালের ৫ ডিসেম্বর পরিচালক (বার্তা) পদে চুক্তিভিত্তিক যোগদান করেন। এক বছরের চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হলে পরবর্তীকালে দুবার এক্সটেনশন সহ মোট ৪ বছর সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর চাকরি হতে অবসরে যান।
এছাড়াও তিনি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে পাঠদান, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ের বিশেযজ্ঞ প্রশ্ন প্রণেতা ও পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কবি নাসির আহমেদ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথেও যুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন ও করছেন। তিনি বাংলা একাডেমি–এর সম্মানিত ফেলো। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-এর সদস্য। সাবেক সদস্য বাংলাদেশ ফিল্মস সেন্সর বোর্ড, তথ্য মন্ত্রণালয় গঠিত জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদান কমিটির পাণ্ডুলিপি নির্বাচক সদস্য, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগের চলচ্চিত্র প্রিভিউ কমিটি। সাবেক সদস্য, কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা, চাঁদের হাট, উপদেষ্টা: সারগাম ললিতাকলা একাডেমি, ঢাকা।
কবি নাসির আহমেদ ১৯৭২ সাল থেকে নিয়মিত লেখালেখি করে আসছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৩৭টি। তার মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ২৬টি। শিশু সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থ ৭টি। এছাড়াও রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কলাম গ্রন্থ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: আকুলতা শুভ্রতার জন্যে (১৯৮৫); পাথরগুলো দুঃখগুলো (১৯৮৬); তোমাকেই আশালতা (১৯৮৭); আমি স্বপ্ন তুমি রাত্রি (১৯৯১, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৯৯৬); ভালোবাসা গেছে এই পথে (১৯৯৪); বৃক্ষমঙ্গল (১৯৯৬); তোমার জন্যে অনিন্দিতা (১৯৯৮); বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে যেতে যেতে (১৯৯৯); কবিতা সংগ্রহ-১ (১৯৯৯); একাত্তরের পদাবলী (২০০০); ঝরাপাতার নৃত্যকলা (২০০০); গোপন তোমার সঙ্গে (২০০১); ভয়াবহ এই নির্জনতা (২০০৩); নিজের সঙ্গে নিজের কথা (২০০৩); কবিতা সমগ্র-১ (২০০৫); নির্বাচিত কবিতা (২০০৬); নির্বাচিত প্রেমের কবিতা (২০০৬); শ্রাবণের দুঃখপদাবলী (২০০৭); গলে যাচ্ছে আকাঙ্খার মোম (২০০৭); স্বপ্নে পাওয়া (২০০৯); কবিতা সংগ্রহ-২ (২০১০); ভালোথাকার নির্দেশ আছে (২০১৭); প্রতীক্ষা তোমার জন্য (২০১৯); মিশে যাবো তোমার সবুজে (২০২০ )।
শিশুসাহিত্য: ‘রক্তেরাঙা বাংলা আমার’(কলম্বিয়া প্রকাশনী); ‘সাতরঙে ঝিলমিল’ (পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স); ‘রঙিন যত ছড়া’ (বাংলাদেশ শিশু একাডেমি); ‘মেঘের দেশে তারার দেশে’ (মাতৃভাষা প্রকাশ); কিশোরপাঠ্য উপন্যাস ‘একাত্তুরের বীরকাহিনী (কলম্বিয়া প্রকাশনী)
তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের প্রথম শ্রেণীর তালিকাভূক্ত গীতিকার। তাঁর এ যাবত প্রচারিত গানের সংখ্যা সহস্রাধিক।
একজন নাট্যকার হিসেবেও বাংলাদেশ বেতারে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস বিজয় দিবস ও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিশু কিশোরদের জন্য শিক্ষামূলক বহু নাটিকা রচনা করেছেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শওকত ওসমানের ‘দুই সৈনিক’ উপন্যাস বিটিভিতে ধারাবাহিক নাট্যরূপ দিয়েছেন তিনি। এটিএন বাংলায় স্বরচিত মেগাসিরিয়াল (১০৪ পর্ব) সুখের লাগিয়া, স্বপ্নমঙ্গল (৭৮ পর্ব) প্রচারিত হয়েছে তাঁর। চ্যানেল আইতে প্রচারিত হয়েছে ধারাবাহিক নাটক (৫২ পর্ব) ঝরাপাতার কাব্য।
পুরস্কার-সম্মাননা: বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০১০)। এছাড়াও সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন- পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত পুরস্কার ‘বিষ্ণুদে পুরস্কার’; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মাননা পদক; সাগরদাড়ির মধুসূদন
একাডেমির ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার’; জীবনানন্দ দাশ সাহিত্য পুরস্কার; বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পদক; খুলনার কবিতালাপ পুরস্কার; চন্দ্রাবতী একাডেমি পদক; জাতীয় মঙ্গল পদকসহ নানা সম্মাননা ও স্বীকৃতি।
নাটকের স্বীকৃতিস্বরূপ : দু’বার সেরা নাট্যকার হিসেবে বাচসাস পুরস্কার , ‘খাঁচা’ নামক টেলিভিশন নাটকের জন্য টেলিশিনাস পুরস্কার , খাগড়াছড়ি থিয়েটার পদক (১৯৯৪) ও স্বরচিত গানের জন্য লালন পুরস্কার (১৯৯৭) অর্জন করেন।

Facebook Comments