শেয়ার করুন:

প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রথম কবিতা আড্ডাপত্র প্রকাশ করছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থের সাথে কবির আনন্দ, উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি পাঠকের কানে নতুন কবিতার গুঞ্জরণ ভেসে আসে। পাঠকের মনে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি তুলে ধরতে চায় আড্ডাপত্র। কবিতা পাঠের সাথে সাথে জানবো কবি সম্পর্কেও। এই আয়োজনটি পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে।

সুলভ সুখের প্রতি

মোফাজ্জল করিম

একদিন কতিপয় লোক ঘষে-মেজে সাধের সংসার
রূপোর চামচ খোঁজে পই-পই সোনার সিন্দুকে,
ক্রান্তীয় রোদের জলে স্নান করে সুখী ঘরবাড়ি
সদর্পে উড়াতে দেয় ভাগ্যের নিশান।
একদিন কতিপয় লোকের মুখে বলিষ্ঠ শ্লোগানঃ
‘নগরীতে যাবো চলো, নিসর্গের নিগড় থেকে
মুক্তি চাই, নগরীতে চলো, ভাগ্যের ধূলোট পায়ে
বিলোবো না গণিকার মতো, চলো নগরীতে চলো,’
বলে তারা চলে গেলো দুন্দাড় মাড়িয়ে দিয়ে
শিশুর ঘুমের মতো নিশ্চিন্ত পথঘাট সহজ গ্রামের।
আমাকেও বলে গেলোঃ ‘চলো, চলো, ঘর ছেড়ে এসো দেখি
নির্মোহ মানুষ। প্রসন্ন আকাশতলে
নগরীর পথে পথে সুখেরা জমায় ভীড়। তুমি কি
শোননি ওহে সৌভাগ্য দেদার ফেরী হয়
সহজ কিস্তিতে আজ, সূতীক্ষ্ণ ছোরার ঘায়ে পেট কেটে
স্বর্ণডিম্ব বের করে নিপূণ হাযাম?
আর কতোকাল জল ঢেলে আলবালে ফোটাবে বকুল
বনেদী চিন্তার ডালে পরাহত সততার দিনে।’
যদি বলি এ-ভুবন ছেড়ে আমি কোথা যাবো
কোথা যাবো আমি এই মাটির দেয়াল ঘেরা
মায়ের মুখের মতো পরিচিত একান্ত আপন
ঘরবাড়ি ছেড়ে, যদি বলি, মিশে গেছি এইসব সংজ্ঞাহীন
সুখ-দুঃখে নিরন্তর দোলায়িত মানুষের মাঝে,
চুমু খাই শিশুদের ধূসর শরীরে, বারংবার
পুঁতে রাখি আজন্মের সংযোজিত নাড়ী
শালিকের সমাবেশে গুঞ্জরিত মাঠের কোণায়, যদি বলি,
এ-আমার সঙ্ঘারাম, ‘শাংগ্রি-লা’ আমার,
তা হলে কী করে যাবো, কোথা যাবো বলো?
আমার এ-ঘর চির-চেনা এ-ঘর ছেড়ে আমার
আমি যাবো না, যাবো না কোনোদিন কোনোখানে
অলৌকিক সুখের নিলয় যতোদিক হাতছানি অষ্টপ্রহর

আমি যাবো না, না, কোথাও যাবো না।

মোফাজ্জল করিম জন্ম ষাট দশকের অন্যতম কবি।জন্ম ৬ আগস্ট ১৯৪১, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়।তার পিতার নাম এরশাদ আলী। পড়াশোনা করেছেন মৌলভীবাজার, বগুড়া, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঢাকা ও মেলবোর্ন (অস্ট্রেলিয়া)। তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে ১৯৬১ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।এরপর মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন থেকে ১৯৮০ সালে মাস্টারস অব এ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিগ্রি গ্রহণ করেন। হরগঙ্গা কলেজ, মুন্সিগঞ্জ ও সরকারি মুরারীচাঁদ কলেজ, সিলেট-এর অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করার পর সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সি এস পি)- এ যোগ দেন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় কমিশনার হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন। সবশেষে সচিব পদে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পারনের পর ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০০ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০০৩-২০০৫ সময়ে যুক্তরাজ্যে ও আয়ার্ল্যাভে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কবি মোফাজ্জল করিম এর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশের অধিক।চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে আত্মজীবনী। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি:
কাব্যগ্রন্থ: অবচেতনে রাজাধিরাজ (১৯৮৩); একটি সার্টিফিকট চাই (১৯৮৪); ভেবো না বৃষ্টি হবে না (১৯৮৬); আড়াল থেকে (১৯৮৯); চলে গেলে পারলে যেতে (১৯৯২); তোমার হাতে গ্রেনেড এবং আমার বুকে প্রেম (১৯৯৭); প্রথম দেখার দিন; দিনগুলি রাতগুলি (২০১৩); মুমূর্ষু বিকেল (২০১৩)।
ছড়াগ্রন্থ: কারণ বলা বারন (১৯৮৭); লেজ ধর (১৯৯০)
আত্মজীবনী: সোনালি সকাল, দুরন্ত দুপুর (২০১১); আপন ভুবন, অচেনা আকাশ (২০১২); জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য (২০১৩); মনে পড়ে মেলবোর্ন ভুলিনি তো ঢাকা (২০১৪); শেষ হইয়াও হইল না শেষ (২০১৮)।
গদ্যগ্রন্থ: জলের লিখন; সেলাই করা খোলা মুখ (কলাম, ২০১৪); আট কুঠুরি নয় দরজা-১ম ও ২য় খণ্ড।
পুরস্কার ও সম্মাননা: হুমায়ুন কবীর স্মৃতিপুরস্কার; কবিতালাপ পুরস্কার; অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার (১৯৮৮); জালালাবাদ যুব ফোরাম স্বাধীনতা পদক; শেরে বাংলা স্মৃতি পুরস্কার; মাওলানা আকরম খাঁ স্মৃতি পুরস্কার ও আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৭)।

Facebook Comments