শেয়ার করুন:

জানাজা

ধীরে ধীরে আমার জানাজার প্রস্তুতি চলছে। শ’খানেক লোক জানাজায় দাঁড়িয়েছে। সামনে ঈমাম সাহেব। পিছনের লোকগুলো আমার চেয়ে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে ফাঁকা ফাঁকা হয়ে।সে সারিতে আমার আদরের কয়েক জন সন্তানও আছে।

যখন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় তখন আমার অনেক টাকা ছিল। ঢাকা শহরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও নামকরা হাসপাতালে আমাকে ভর্তি করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন ডাক্তার ও নার্স করোনা-করোনা বলে চিৎকার করা শুরু করে। ঠিক তখনই আমার প্রিয়তমা স্ত্রী ও সন্তানেরা আমাকে রেখে হাসপাতালের বাইরে চলে যায়।

আমি বড় একা হয়ে পড়ি। রাতে আইসিইউতে কিছুক্ষণ সময় রেখে ছবি তোলে। এরপর বের করে পাশের একটা রুমে চিৎ করে শোয়ায়ে রেখে দেয়। সকালে স্ত্রী একটা চিরকুটসহ চেকবই পাঠিয়েছে নার্সকে দিয়ে। চিরকুটে লেখা ‘প্রতিদিন তোমার তিনলাখ করে টাকা লাগবে। সেই হিসাব করে অনেকগুলো চেকের পাতায় স্বাক্ষর দিও।’
অথচ আমার জন্য কোনো ভালো খাবারও পাঠায়নি।
আমি তো আইসিইউতে নেই, আমাকে তেমন কোনো চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে কেন এত টাকা লাগবে?

কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতে পায়নি।কতবার হাত ইশারা করেছি, সবাই দূরে সরে গেছে।
তারপর আমাকে প্রশাসণের সহযোগিতায় কবরস্থানে আনা হয়েছে।
জানাজায় যারা এসেছে তারা সবাই পাওনাদার। আমি ওদের কাছ থেকে চাকুরি দেওয়ার নাম করে কোটি কোটি টাকা নিয়েছিলাম। খরচ করেছি আমার সন্তানদের পিছনে। ওদের বাড়ি গাড়ি করে দিয়েছি।
গরুর ফার্ম করে দিয়েছি,মার্কেট করে দিয়েছি, ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছি, বিলাসবহুল জীবন যাপনের জন্য ফার্নিচার করে দিয়েছি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু মানুষের জীবিকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছি।

যাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি তারা কেউই আসেনি। আহা, সারাজীবনের প্রেমভালোবাসা স্ত্রীকে দিয়েছি। তাকেও দেখছি না!হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো গুণগুণ করে উঠলো। তারা সকলেই টাকা পাবে। অথচ আমি খাটিয়ায় শুয়ে ওদের বলতে চাচ্ছি, শোন আমি পৃথিবী থেকে কিছুই নিয়ে যাচ্ছি না।সুন্দর গাছগাছালি, স্নিগ্ধভালোবাসা অথবা ভয়ংকর অহংকার সবই রেখে যাচ্ছি।

আমার কথা কেউ শুনছে না।আমার সন্তানরাও অন্য মানুষের মতই অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
মাওলানা সাহেব বললেন, আজ এই মৃত ব্যক্তি হিংসা-বিদ্বেষ, আদর-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা এবং সকল ধনসম্পদ পৃথিবীতে রেখে চলে গেছেন। কিছুই নিয়ে যাননি, পৃথিবীর মানুষের মধ্যেই রেখে গেছে। আপনারা সকলেই মাফ করে দেন।

এরপর একে একে সবাই চলে গেল।আমার সন্তানেরাও চলে গেল, শুধু প্রশাসণের ছয়জন লোক আমাকে কবরের ধারে নিয়ে গিয়ে রাখলো। তখন আমার এক গরীব বোন এসে দাঁড়ালো। যাকে আমি কোনোদিন দেখতেও যাইনি। বরং ওর ছেলের চাকুরি দেওয়ার কথা বলে,বাড়ির ভিটিটাও বিক্রি করে নিয়ে, আমার ছেলেকে ইউরোপে পাঠিয়েছিলাম। আমার সে ছেলে আমাকে দেখতেও আসেনি।
সামান্য দূরে বোনটি বার বার হুঁ হুঁ করে কাঁদছিল আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চোখ মুছছিল।
প্রশাসণের দু’জন লোক আমার গরীব বোনটিকে সকল প্রকার সাহা্য্য দিতে প্রতিশ্রুতি দিলে, সেও চলে গেল।
আমি অজানা অন্ধকারে অথবা কোনো ঠিকানাহীন পথে ধীরে ধীরে চলে গেলাম।

প্রাচীর

তহমিনা স্নান সেরে বাইরে টাঙানো তারের উপর শাড়ি, ব্লাউজ ও পেটিকোর্ট নেড়ে দিচ্ছে। একতলা ঘরের ছাদে বসে দেখছে শফিক আহমেদ। শীতের মিষ্টি রোদের ওম, শফিক আহমেদের শরীর ও মনে যেন,দীর্ঘসময়ের আরাম খুঁজে পাচ্ছে।

রফিক, আযাদ ও শাহিদা তিনজনই ইংল্যান্ডে থাকে। তারা শুধুই টাকা পাঠায়। তাদের মা দিলারা খাতুন পরপারে চলে গেলে দেখতেও আসেনি।শুধু ভিডিওতে মায়ের লাশ খাটিয়াতে দেখেছে।
তারপর গ্রামের মানুষ ও আত্মীয়-স্বজনেরা কবরে রেখে এসেছে লাশটি।কবরে লাশ রেখে আসার পর শফিক আহমেদ একা হয়ে গেছেন।আত্মীয়-স্বজনেরা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে অনেক মেয়ের বাবাকে। বাবা টাকা-পয়সা জমিজায়গার লোভে রাজি হলেও, মেয়ে রাজি হয়নি। মেয়েরা বলেছে, তারা বুড়ো মানুষকে বিয়ে করতে পারবে না।

এ কথা শুনতে শুনতে শফিক আহমেদ এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আর বিয়ে করবেন না।
তহমিনা খাতুন শফিক আহমেদের প্রতিদ্বন্দী প্রতিবেশী। সেও পাল্লা দিয়ে, উচ্চ শিক্ষা অর্জন করিয়ে, তিন ছেলেকে কানাডায় পাঠিয়েছে। স্বামী ছিল কলেজ শিক্ষক। তিনিও পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন।
মৃত্যুবরণ করলে তিন ছেলের পক্ষে বড় ছেলে দেশে এসে, তাদের বাবার কবরে দোয়া-কালাম-খতম পড়ানোসহ প্রয়োজনীয় সব অনুষ্ঠান করে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছে। এ গ্রামের মানুষজন, এ বাড়ি দুটো পরিবারের বাবা-মাকে সব সময় বলেছে ধন্য-ধন্য। এমনকি গ্রামের বিভিন্ন উৎসবে,তাদের ডেকে, সম্মান বা পদক দিয়ে বলেছে, রত্নগর্ভধারিণী মা ও গর্বিত পিতা।

শীতের শেষ সময়। বসন্ত আসি-আসি করছে। শফিক আহমেদ একা-একা বসে থাকে। গাঁয়ের এক মেয়ে এসে, রান্না-বান্না ও ঘরদোর পরিস্কার করে দিয়ে চলে যায়। শফিক আহমেদ ছাদে বসে পত্রিকা পড়ে আর উদাসভাবে এদিকওদিক তাকায়। একটা দৈনিক ও একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা বাড়িতে দিয়ে যায় হকার। যাতায়াতের অব্যবস্থার কারণে দৈনিক পত্রিকাটি বাড়ি পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। পরের দিন সেই পত্রিকা হাতে করে ঘরের ছাদে চেয়ার পেতে বসে পড়েন।

তহমিনা খাতুনেরও সময় কাটতে চায় না। তাই সকাল-সকাল নিজেই ঘরদোর মুছে রান্নাবান্না সেরে স্নান করে। তহমিনা খাতুনের একতলা বাড়ি। সামনে বড় উঠান রয়েছে। ফুলের বাগানে গাছগুলো বেশ রঙিন হয়ে উঠছে বসন্তের আগমনী বার্তায়।

আজ কাপড়চোপড় নেড়ে দিতে দিতে শফিক আহমেদের চোখে চোখ পড়ে।
দু’জনেই খানিক নীরব থাকে এবং অপলক ও অসহায় চোখ যেন আবেগঘন হয়ে ওঠে।
তহমিনা খাতুনই মুখ খোলে, শুধু পত্রিকা পড়ে কী দিন যায় ভাই?
শফিক আহমেদ না ভেবে ঝটপট বলেন, ঘর মুছে আর শুধু রান্না করেই কী তোমার দিন যায়?
তহমিনা খাতুন একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়।তারপর ঘাড়ে রাখা তোয়ালেটা তারের উপর দিতে দিতে বলে, কী আর করি ভাই? তোমার সাথে পাল্লা দিয়ে তো ছেলেদের বিদেশ পাঠালাম।বুড়িকালে একা হবো, কোনোদিনই তো ভাবিনি!

শফিক আহমেদ হোঁ-হোঁ করে, উচ্চস্বরে হেসে বলে, যদি বলতে বলো, একটা কথা বলি?
শফিক আহমেদের কথা শোনার জন্য তহমিনা খাতুন অপেক্ষা করে, মুখে কিছুই বলে না।
শফিক আহমেদ পত্রিকাগুলো গোঁছাতে গোঁছাতে বলে, এতকাল যে জমির আল ঠেলাঠেলি করেছি, প্রাচীর দেওয়া নিয়ে বারবার আমীন এনে, জমি মেপেছি, মন কষাকষি করেছি। সে প্রাচীরের দেওয়াল ভেঙে দিলে কেমন হয়?

তহমিনা খাতুন মৃদু হাসতে হাসতে বলে, আমার তো এখন আর ঘর পাহারা দেওয়ার কেউ নাই, তোমার যা ভালো মনে হয়, তাই করো।

শফিক আহমেদ পত্রিকাগুলো দু’হাতে কড়মড় শব্দে মুড়িয়ে তাহমিনা খাতুনের উঠানে ফেলে দেয়। পত্রিকা মাড়ানোর শব্দে, দু’বাড়ির সীমানা প্রাচীরে ফাঁটল ধরে।

Facebook Comments