শেয়ার করুন:
একটা গল্পপাঠের আসরে গেছে পিয়া। শিমু গল্প পড়ছে। ওর গল্পটার শুরু শুনেই মনে মনে হাসতে থাকে পিয়া। মনের সেই হাসির স্ফুরণ মুখেও কিছুটা ভেসে ওঠে। ও লুকাতে চেষ্টা করে না। গল্পটার সাথে নিজের জীবনের অনেক মিল খুঁজে পায় পিয়া। তাই হাসি ফুটে ওঠে মুখে । একজন সিঙ্গেল মাদার, দুটো বাচ্চা নিয়ে তার লড়াইয়ের গল্প এটা। মা একজন লেখক। গল্পের শুরুর দিকেই তার বিছানার বর্ণনা। বিছানায় ল্যাপটপ, আনুষঙ্গিক জিনিগুলো আশেপাশে।

গল্পের নাম মৃন্ময়ী । নায়িকা বা কেন্দ্রীয় চরিত্র যাই-ই বলা হোক না কেন, তার নাম এটা। এ মহিলার বয়স কত সেটার অবশ্য উল্লেখ নেই গল্পে। চাকরিতে ছিলেন, কিন্তু তখনও মানে গল্প বিস্তারের সময়টাতে আছেন কিনা সেটা স্পষ্ট নয়। ছেলে মেয়ে দুটোই বিদেশে এস্টাবলিশড । এক্ষেত্রে মার চাকরি না থাকারই কথা। চাকরি বোধহয় নেই। থাকলে কিঞ্চিৎ হলেও বর্ণনা থাকার কথা। নেই যে তাও বলা নেই। বাড়িতে গৃহকর্মী আছে কিনা সে বর্ণনাও নেই। না থাকারই কথা। আজকাল স্থায়ী গৃহকর্মী দুর্লভ, ডুমুরের ফুলের মতো দুষ্প্রাপ্য। পিয়ার নিজেরও নেই। মৃন্ময়ীর বিছানার বর্ণনা শুনতে শুনতে নিজের বিছানার কথা মনে পড়ে পিয়ার। মৃন্ময়ীর স্মরণশক্তি পিয়ার থেকে ভাল। কারণ সে জিনিসগুলো বিছানায় কাছাকাছি রেখে নিশ্চিন্ত হয়েছে। কিন্তু পিয়াকে প্রতিটি জিনিস রাখতে হয়েছে সুতো দিয়ে বেধে। সুতো বেধেছে বিছানা লাগা জানালার গ্রিলের সাথে। পাঁচ ছয়টা সুতো। শক্ত সুতো। লাল আর সাদার প্যাচ দেয়া যে সুতোর গুটি পাওয়া যায় সেই সুতো। অফিস আদালতে যে সুতো ফাইল বাঁধতে ব্যবহার করা হয়। ছেলেবেলায় এই সুতো দিয়ে পিয়ার ভাইরা ওর খাতা সেলাই করে দিতো। কাগজ ভাঁজ করে, অনেক মোটা লেপ সেলাই করা সুঁচ দিয়ে কাগজের দুই পাশ আর মাঝে ছিদ্র করে এই সুতো ঢুকিয়ে সেলাই করা হতো। এখন আর কেউ খাতা বাঁধে না। আগে দিস্তা কাগজ কিনে খাতা বাঁধার চল ছিল। এখন সব রেডিমেড। কত সুবিধা। কিন্তু সেই কাগজ কিনে খাতা বেঁধে লেখায় যে আনন্দ সেটা যেন এখন আর নেই।

সেই সুতো বেঁধেছে পিয়া। প্রত্যেকটা সুতোর মাথায় একটা করে জিনিস বেঁধেছে। কোনটার মাথায় কলম, কোনটাতে স্টাপলার, কোনটাতে রিমোট আবার কোনটাতে কাগজ। কাচিও বেধেছে একখানা । ওষুধ কাটতে লাগে। না রেখে উপায় নেই। দরকারের সময় একটা জিনিসও সে খুঁজে পায় না। প্রতিদিনই তার বেশ কয়েকঘণ্টা কাটে কাগজ আর জিনিস খুঁজতে। পিয়ার বয়স এখন ষাট এর প্রায় চল্লিশ ভাগই ও নষ্ট করে ফেলেছে কাগজ আর জিনিস খুঁজে। যতো দিন যাচ্ছে ততই যেন খুঁজে না পাওয়া আর ভুলে যাবার ব্যাপারটা বাড়ছে। মাঝে মাঝেই বোতলের মুখ না খুলে কল খুলে দিচ্ছে পানি ভরতে। পানিতে ভেসে যাচ্ছে ঘরদোর। কাপের জায়গায় বাটি বসিয়ে চা ঢালছে । ঘরে চাবি রেখে দরজা লক করে দিচ্ছে। রাতে-বিরেতে তাকে চাবিওয়ালা ডাকতে হচ্ছে অহরহ। রান্না করে ফ্রিজে ভরতে ভুলে যাচ্ছে। দিন শেষে ঘরে ফিরে দেখছে ভাত তরকারি পচে শেষ। তখন পাউরুটি খেয়ে থাকতে হচ্ছে। আর ওই অত রাতে যে সবদিন পাউরুটি থাকে তাও না। এমন নানান কিছু। এইত আজ সকালেই সে ব্যাংকে গিয়েছিল একটা জরুরি কাজে। যে কাগজটা নেবার কথা, দুদিন আগে গিয়ে নোটও করে নিয়ে এসেছিল সেটাই নেয়নি। এমন ঘটছে প্রায়ই। আর কিছু কিছু অদ্ভুত ব্যাপারও ঘটছে । মাসে ৮ হাজার টাকা গ্যাস বিল দেয় পিয়া। ব্যাংকের সামনে গাড়ি থামিয়ে ও ড্রাইভারকে দিয়ে টাকা জমা দেয়। পিয়ার অভ্যাস বিল বা অন্য যেকোন ধরনের টাকা সে আগের দিন গুছিয়ে রাখে। এমনকি যাবার আগেও সে আরেকবার গুনে নেয়। পরপর দুমাস একই ঘটনা ঘটল। গোনা টাকা ব্যাংকে নিয়ে ড্রাইভারকে দেয়ার পর দেখা গেল পাঁচশ টাকা কম। পিয়ার চোখের সামনেই এ ঘটনা ঘটল। পিয়া নিজেও গুণে দেখল পাঁচশ টাকা কম। দ্বিতীয় মাসে এ ঘটনা ঘটার পর রীতিমতো মুষড়ে পড়ল পিয়া। বাড়িতে এসে অনেকক্ষণ গুম হয়ে থেকে রাতে ছেলে- মেয়েকে ডেকে বলল। ছেলে মেয়ে তো হেসেই খুন। তারা হাসতে হাসতে বলল,
: এটা বোধহয় কোন ভূত করছে । আম্মু তোমার এমন ভুল হওয়ার কথা না।

এমন যখন হয় আত্মবিশ্বাস কমে যায়। সেটার হাত থেকে মুক্তি পেতেই এ ব্যবস্থা।
কিন্তু এতেও শেষরক্ষা হয় না। মাঝে মাঝেই সুতোয় সুতোয় প্যাচ লেগে যায়। সে প্যাচ খোলা রীতিমতো কষ্টসাধ্য ব্যাপার। খুলতে না পেরে কান্না পায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায় প্যাচ খুলতে। যে সময় আর কষ্ট সে বাঁচাতে চেয়েছিল সুতোয় জিনিস বেঁধে তার দ্বিগুণ খরচ হয়ে যায় একবার প্যাচ লাগলেই। খুলতে না পেরে মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলে পিয়া । তখন সুতো কেটে নতুন সুতো বাধা ছাড়া উপায় থাকে না। এ ছাড়াও সমস্যা আছে। কলমের ক্যাপ পড়ে যায়। সুতার কারণে স্টাপলারে পিন ঠিকমতো বসতে চায় না। কাঁচিতে পিঠ কেটে যায় কিনা সে চিন্তা খাকে। এমন নানান বায়নাক্কা।

পিয়ার বিছানাটা অদ্ভুত। বিছানার সাড়ে তিনভাগ জুড়ে কাপড় চোপড়। পত্রিকা ফাইল ওষুধ চশমার বকস টাকা পয়সা ছড়ানো। বাইরে থেকে ফিরে পরনের কাপড়টা খুলে সে বিছানাতেই রাখে। একবার কোন কাপড় পরলে একমাসের মধ্যে তোলার কথা মনে থাকে না ওর। মনে থাকলেও আজকাল কাজ করতে কষ্ট হয়। একটা কাপড় গোছাতেই যেন হাঁফ ধরে যায়। বার বার ভ্যানিটি ব্যাগ বদলানো পিয়ার অভ্যাস। একবার ব্যাগ বদলালে ভেতরের সব জিনিস কাগজপত্র সে বিছানাতেই ঢেলে রাখে। সেগুলো আর তোলা হয় না। সেগুলো হারায়। আবার খুঁজতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সাজার জিনিস, চাবির গোছা থেকে শুরু করে টিসু বকস প্রেসার মাপার যন্ত্র সবই বিছানায়। পারলে যেন সারাটা বাড়িই পিয়া তুলে আনত বিছানায়, হাতের কাছে। একটা প্রবাদ আছে বিছানায় খুঁজলে হাতি পাওয়া যায়। হাতি না পাওয়া গেলেও পিয়ার বিছানায় বিচিত্র ধরনের জিনিস পাওয়া যায়। বিছানার এক কোণে সামান্য একটু জায়গা বের করে শোয় পিয়া। অতটুকু জায়গায় শুতে পারার কথা নয়, তবু শোয় ও। আর মাথার একেবারে পাশে থাকে ল্যাপটপ আর মোবাইল। একবারে তুলতুলে বালিশ না হলে ও ঘুমাতে পারে না। পিয়ার কোন বালিশেরই কাভার নেই। পায়ের নিচে একটা আর পাশে একটা পাশ বালিশ চাই-ই চাই। এটা নিয়েও সে বিরক্ত। ছেলেবেলায় মা নিজেই বালিশের কাভার বানাতেন। তখন কাভার বাঁধার জন্য ফিতে রাখা হতো। কী ভাল ব্যবস্থা যে ছিল! ব্যস বেধে দিলেই নিশ্চিন্ত। না খোলা পর্যন্ত ওইভাবেই থাকবে। এখন এই কাভার পরালে তো কিছুক্ষণ পরেই কাভার নেই, হাওয়া। ফিতে ছাড়া কাভার কতক্ষণ থাকে! ও যে বালিশে মাথা রেখে আরামে ঘুমায় তা দেখে একদিন ওর এক বান্ধবী বলেছিল, অমন বালিশে নাকি বস্তির মানুষও ঘুমায় না। পিয়ার শুনে মোটেও খারাপ লাগেনি। বস্তির মানুষও তো মানুষ, তাদের নিচে যারা তারাও মানুষ। পিয়ার বাম কাঁধে প্রচণ্ড ব্যথা। অথচ বাম কাতে শুতেই ওর ভাল লাগে। কিছুক্ষণ কষ্ট করে শোয় । তারপর কাত ফেরে।

গল্প শুনতে শুনতে এসব কথাই ভাবছিল পিয়া। শিমুর গল্পে স্বামী স্ত্রীর ইগো কনফিক্টের কারণে আলাদা হওয়ার কথা আছে। না ইগো কনফিক্ট কখনই পিয়ার জীবনে ছিল না। ওর স্বামী বরাবরই চেয়ে এসেছে ও আরো বড় হোক। তার থেকেও বড় হোক। কিন্তু তার থেকে বড় হওয়া কি সহজ! সে নিজে এতটাই বড় যে পিয়ার কী সাধ্য ওর কাছাকাছি পৌঁছাবে!

মৃন্ময়ী মেয়েটার ছেলে মেয়েরা বিদেশে থাকে। পিয়ার ছেলে মেয়ে অবশ্য ওর কাছেই থাকে। কিন্তু কতটুকুই বা পায় তাদের পিয়া। মৃন্ময়ী জলপাইয়ের আচার খেয়েছিল। সেই থেকে মাথাঘোরা বুকে ব্যথা। আর শেষমেশ একটা কবিতা পোস্ট করে সে মারাই গেল একা ঘরে। মনে হতে পারে মৃত্যুটা যেন আচমকা হল। এটা খুবই এবনরমাল। কিন্তু পিয়া জানে এটা মোটেও এবনরমার না। দিন কয়েক আগে এক লেখক বন্ধুর বাড়িতে দাওয়াত ছিল। শরীরের কথা ভেবে সামান্যই খেয়েছিল ও। বাসায় ফিরে সে রাতে গ্যাস বদহজম পেটফাঁপায় সে মারাই যাচ্ছিল। ভেবেছিল আর বুঝি ছেলেমেয়ের সাথে দেখা হবে না। ছেলেমেয়েকে ডাকার সাধ্য তার ছিল না। পেটের ব্যথায় মুখ দিয়েও যেন স্বর বের হচ্ছিল না। অনেকক্ষণ অসহ্য ব্যথা সহ্য করে হাতড়ে হাতড়ে বাথরুমে গিয়ে অনেক চেষ্টা করেছিল বমি করতে। হয়নি। অথচ মনে হচ্ছিল প্রচণ্ড বমি পাচ্ছে তার। বমি হলে বেঁচে যাবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কমোডে বসেছিল। ভেবেছিল পেট থেকে কিছু বেরিয়ে গেলে স্বস্তি পাবে। বের হয়নি। তারপর কাঁদতে কাঁদতে হাতড়ে হাতড়ে ঘরে এসে ওর মনে পড়েছিল ইমোটিল আছে। ইমোটিল খেয়েছিল প্রথমে একটা তারপর আর একটা। এরপর পেট হালকা হতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই ধকল গিয়েছিল পুরো তিনটে দিন। এরপর থেকে সে কোথাও কিছু খেতে ভয় পায়। এখন ব্যাপার হয়েছে বিপরীত। না খাওয়ার কারণে গ্যাস হয়। কোনদিকে যাবে পিয়া!

এই যে যেমন আজকের এই গল্পপাঠের আসরে পিয়াজু বেগুনি চায়ের আয়োজন। তিন চারটে করে দিয়েছে প্লেটে। এসব ভাজাভুজি পিয়ার খুবই পছন্দ। কিন্তু একটা পিয়াজু আর একটা বেগুনি খাবার পর ও প্লেট ধরে ফিরিয়ে দেয়। ভাবে সামনে থাকলে সম্বরণ করতে পারবে না, খেয়ে ফেলবে। কিন্তু তাতেও মনে হচ্ছে পেট যেন ফাঁপছে।
সিঙ্গেল মাদারের লড়াইয়ের কথা লিখেছে শিমু। কিন্তু সিঙ্গেল মাদার না হলে কি লড়াই নেই। আছে। মনে আছে ১৫ মাইল দূরের একটা উপজেলায় চাকরি করত পিয়া। বাসে যেতে হত প্রতিদিন। সেই সময়টা স্বামী ছেলেটাকে সামলাতো। কাজের মেয়ের কাছে থাকতে চাইতো না ছেলেটা। তারস্বরে চিৎকার করত। ছেলেটা সারাদিন কিছুই খেতো না। গাদা গাদা বিস্কুট কিনতো আর গুড়ো গুড়ো করত। একটা দানা মুখে তুলত না। ছেলেটাকে সামলে প্রতিদিনই অফিসে যেতে দেরি হত স্বামীর। বসের বকা খেত। আর পিয়া অফিস থেকে ফিরলেই ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়ত কোলে । তখন থেকে রাত দেড়টা দুটোয় ছেলের ঘুমানো পর্যন্ত একহাতে রান্না সংসার ছেলে সব সামলাতে হতো পিয়াকে। তখন শক্তি ছিল। তারপরতো ঘটল আরো খারাপ অবস্থা। স্বামী স্ত্রী দুজন দুস্টেশনে । দুজায়গায় থাকা শুরু হল। আর ছেলেটা কখনও বাবাকে কখনও মাকে হারাতে থাকল। আর কষ্ট শতগুণ হলো পিয়ার। বাজারঘাট ছেলেকে লেখাপড়া শেখানো অফিস হাজার একটা কাজ। এরপর মেয়ে জন্মালো। এই করতে করতে কখন যেন ছেলে মেয়েগুলো বড় হয়ে গেল! বড় হল আর দূরে গেল। আর একদিন ডায়াবেটিসে মারা গেল স্বামী। আজকাল ছাগলনাইয়াতেও ডায়াবিটিসের ভাল স্টিটমেন্ট হয়। অথচ স্বামী মারা গেল বারডেমে। ডায়াবিটিসের রোগীর ব্রেনের ট্রিটমেন্ট করল বিজ্ঞ ডাক্তাররা। সময়মতো ব্লাড জোগাড় হবার পরও পুশ হল না। আর পরিণতি যা হবার হল। ওদের কি এলো গেল। ওদের রোগীরও অভাব নেই মৃত্যুরও অভাব নেই। গেল পিয়ার। লড়াই বাড়ল। স্বামীর কাজগুলোও এসে চাপল তার কাঁধে।

স্বামী বেঁচে থাকতে কেমন যেন ভরপুর মনে হত নিজেকে। অসহায়ত্বের কোন ভাব ছিল না। ছিল নির্ভরতার একটা আশ্রয়। সে পিয়া চাক বা না চাক। এখন মাথার উপরে বা পাশে কেউ নেই। বন্ধুবিহীন একা। এ জীবন যে এত কষ্টের কোন ধারনা ছিল না পিয়ার।

শিমুর গল্প মৃন্ময়ীর মৃত্যুর মধ্য গিয়ে শেষ হল। মারা যাবার আগে সে ফেসবুকে দুটো কবিতা পোস্ট করেছিল। মারা যাবার পরও সে কবিতায় লাইক কমেন্ট পড়তে লাগল। এখানে গল্প শেষ। হাততালি হল। এরপর আলোচনা। দুজন আলোচনা করার পর আসরের মধ্যমণি ঝরনা বলল পিয়াকে কিছু বলতে। পিয়া দুচারটে কথা বলে বলল, গল্পটা মনে হচ্ছিল আমার নিজের। আমি ইনপুট দিচ্ছি। তোমরাতো সবাই লেখক, লিখতে পারবে। আমার জানালায় ছয়টা সুতো বাঁধা.. সুতোর ডগায় কাগজ স্টাপলার থেকে কাঁচি সবই বেঁধে রেখেছি। সময় বাঁচানো আর সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য । কিন্তু মাঝে মাঝে প্যাচ লেগে যায় সুতোয়..।

এরপর আরো কিছুক্ষণ আলোচনা হল। হঠাৎ করে ঝরনা বলল,
: পিয়া তুমি ভাল গল্প লেখো। তুমি কিন্তু ওই ছয় সুতো আর প্যাচ লাগা নিয়ে গল্প লিখবে। পরের আসরে পড়বে। আমি কিন্তু তোমাকে খোঁচাবো।
পিয়া হাসল। গল্প লেখা কি অতই সহজ। গল্প কি বললেই হয়। গল্প দৈববাণীর মতো হঠাৎ হঠাৎ নাজিল হয়। এই একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সে কি গল্প লিখবে। কয়েকটা সুতোর মাথায় বাঁধা কিছু জিনিস আর মাঝে মাঝে তাতে প্যাচ লেগে যাওয়া, একজন ষাট বছর বয়সী ভুলোমনের মানুষ নিজের সুবিধার জন্য যা করেছে সেটা নিয়ে কি গল্প লিখবে সে। বরং সে গল্পপাঠের আসরে যাবার সময় হঠাৎ করে একটা গল্প তার মাথায় চলে এসেছিল। সারাটা রাস্তা ওটাই ভেবেছে সে। আসরের মাঝে মাঝে আনমনাও হয়ে যাচ্ছিল গল্পটার কথা ভেবে। একটা মথ তার ঘরে আসছে। সে মনে করছে তার স্বামী আসছে । এটা নিয়ে একটা চমৎকার গল্প সে মনে মনে বুনে ফেলেছে। এখন অক্ষরে প্রকাশ করাই বাকি। সেটা করবে সে এখন। ওসব সুতোয় সুতোয় প্যাচ লাগার মধ্যে কোন গল্প নেই। ও গল্প সে লিখবে না। অহেতুক পণ্ডশ্রম করবে না সে। গল্প লিখতে হলে তো ভেতরে গল্প থাকতে হবে।

পিয়া বিছানায় উঠে ল্যাপটপ টেনে হাঁটুর ওপরে রাখে। এখন ও আধশোয়া । পিঠের পেছনে দুটো বালিশ। এটাই তার লেখার সাধারণ ভঙ্গি। পিয়ার অভ্যাস গল্প লেখার আগে দুচারটে পয়েন্ট নোট করা। সেই নোট করার জন্য ও খাতা টেনে নেয়। প্রতিমাসে শাহবাগের আবিদ ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনে পিয়া। প্রায় আট নয় হাজার টাকার ওষুধ। তার মধ্যে তিনটে ইনহেলার আছে। একটা দেখতে চাকতির মতো, একটা ক্যাপসুল। মেশিনে দিয়ে ভেঙে টানতে হয়। আর একটা নরমাল। এই পান্থপথ থেকে ওসুধ কিনতে প্রতিমাসে শাহবাগ যায় পিয়া । ওখানে একটু কমে পাওয়া যায়। আর দোকানিরাও নিয়মিত অনেক টাকার কাস্টমার বলে ওকে খাতির করে। কোন একদিন খাতির করে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের সরবরাহ করা দুচারটে প্যাড আর কলম ওকে দিয়েছিল। সেটাই হয়েছিল ওদের ভুল। এখন প্রতিমাসেই ওষুধ নেয়ার সময় প্যাড আর কলম চায় পিয়া। একসময় নোট করার জন্য ছোট ছোট প্যাডও চাইতে শুরু করল। ওরা দেয় বটে তবে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেয় না। আর ছোট ছোট ছেলে দুটো কিছুটা হাসিমুখে দিলেও বড়দের চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ থাকে। কোন কিছু নিয়ম বানিয়ে নিলে কার ভালো লাগে। পিয়া সব বুঝেও চায় । ছোট ছোট প্যাডগুলো খুব কাজের। ভ্যানিটি ব্যাগে রাখা যায়। প্রতিদিনের কাজগুলো নোট করা যায়। ওদের দেয়া কলমে এখন অবশ্য লেখে হয় না। নতুন কলমেও না। ছোট একটা প্যাড টেনে নেয় পিয়া। এবার ও কলম নেবার জন্য সুতোয় টান দেয়। আর তখনই লাগে বিপত্তি। সুতো আর কিছুতেই আসেনা। টানাটানিতে স্টাপলার ক্যাচি কলম সব মিলে একটা দলা মতো হয়ে ওর পাশে আসে। ও আপ্রাণ চেষ্টা করে জট ছাড়াতে। পারে না। পারে না। একপর্যায়ে প্রবল অসহায়ত্বে ওর কান্না পায়। ও আরো কিছুক্ষণ চেষ্টা করে হতাশ হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর আবার ওঠে। জট ছাড়াতে চেষ্টা করে। এখন নোট না করলে লেখাটা আর হবে না । সকাল পর্যন্ত সে ভুলেই যাবে। জট খোলে না, আরো বাড়ে। এক পর্যায়ে অসহ্য হয়ে সুতোগুলো কেটে ফেলে পিয়া। রাগে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে কলম কাঁচি স্টাপলার। এসব করতে গিয়ে শরীরে মনে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে পিয়া । এখন আর ওর শক্তি নেই কোন গল্প লেখার। ও শুয়ে পড়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে সামান্য একটু জায়গার মধ্যে। সবগুলো বাতি জ¦লছে। ও রাতে খায়নি। ওষুধও খাওয়া হয়নি। কিছুই মনে পড়ে না ওর। প্রথমে কিছুক্ষণ ঘুম আসে না। এপাশ-ওপাশ করে। তারপর একটু করে ঘুম আসে আর ভেঙে যায়। একসময় ঘুম এসে যায়। বুকে কষ্ট নিয়ে বেঘোরে ঘুমায় ও। ঘুমায় তবে শান্তি হয় না। গল্পটা লেখা হল না । প্যাচ লেগে গেল। এ কষ্ট ঘুমের মধ্যেও রয়ে যায়।

সকালে ঘুম খেকে উঠল পিয়া। ওর মন তখনও খারাপ। সেই মন খারাপ নিয়ে ও বাথরুমে গেল, নাস্তা করল। তারপর এসে বসল বিছানায়। সুতোগুলো নতুন করে বাঁধতে হবে। বাঁধতে হবে স্টাপলার কলম কাচি। কিন্তু সুতো বাধার জন্য গ্রিলে হাত দিয়ে ও অবাক। সবকটা সুতো অক্ষত। সুতোর আগায় ঝুলছে জিনিসগুলো আলাদাভাবে, কোন প্যাচ নেই। তাহলে! কাল রাতে যে ও নিজ হাতে সুতো কাটল তার কি হল? এবার ও নোট প্যাড খুলল। কি অবাক গোটা গোটা অক্ষরে নোট করা গল্পের কিছু অংশ। ওর নিজ হাতের লেখা। এবার প্রবল অস্বস্তি নিয়ে কমপিউটার খুলল পিয়া। ডি ড্রাইভে নতুন একটা ফাউল প্যাচ। প্যাচ ওপেন করতেই বেরিয়ে এল গোটা একটা গল্প।

স্থানুর মতো অনেকক্ষণ বসে রইল পিয়া। তারপর উঠল। বাথরুমে গিয়ে ভাল করে চোখে মুখে পানি দিলো। সে জেগে আছে তো? নাকি স্বপ্ন দেখছে? কোন হ্যালুসিনেশেনের মধ্যে নেই তো? অনেককক্ষণ হাঁটল এ ঘর ওঘর। এক সময় নিশ্চন্ত হল সে জেগে আছে এবং সুস্থ আছে। এবার সে কম্পিউটার খুলল আবারো। আছে আছে, প্যাচ নামে একটা গল্প আছে।

ঝরনাকে ফোন ঘুরালো পিয়া,
: হ্যালো ঝরনা
: কি ব্যাপার এত সকালে । খুব খুশি মনে হচ্ছে ।
: শোন গল্পটা লেখা হয়ে গেছে। ওই যে সুতোয় সুতোয় প্যাচ লেগে যায়। তুমি লিখতে বললে যে। গল্পের নাম প্যাচ
: কী কাণ্ড তুমি পারোও। কার রাতে বললাম আর এরমধ্যেই লিখে ফেললে! অভিনন্দন। আগামী আসরে গল্পটা পড়বে তুমি।
ঝরনার প্রশংসার কোন জবাব দিলোনা পিয়া। গল্পটা ও লিখেছে এ কথা ও বলবে কি করে। এ প্রশংসা কি সত্যিই ওর প্রাপ্য!
যাকগে ওর এখন একমাত্র কাজ দ্রুত গল্পটার বেশ কয়েকটা প্রিন্ট বের করা। কেজানে এখনই আবার কমপিউটার থেকে উধাও হয়ে যাবে কিনা। যা সব ঘটছে আজকাল!

Facebook Comments