শেয়ার করুন:

গ্রীক ভাষায় ইক্কুস মানে ঘোড়া । ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা রাজা-বাদশাদের শহর হবার কারণে ঢাকায় ঘোড়া ছিলো। শামসুর রাহমান আবাল্য ঘোড়া দেখেছিলেন। এই আলোচনাটি ঘোড়া বিষয়ক দুটি কবিতা- ‘সেই ঘোড়াটা’/ শামসুর রাহমান এবং ‘আজকের এই মুহূর্ত ‘/জীবনানন্দ দাশ। স্মরণ করা যাক। পুরনো ঢাকায় জন্মানো এবং গড়ে ওঠা রাহমান ঘোড়ার সঙ্গে আবাল্য পরিচিত। এই কবিতাটি সন্ধ্যায় এক আস্তাবলের দৃশ্য দিয়ে শুরু। “আস্তাবলে ফিকে অন্ধকার, ঝুলছে নিষ্কম্প স্তব্ধতা, আর সেই বেতো ঘোড়াটা অনেকক্ষণ থেকে ঝিমোচ্ছে নিঃশব্দে। আরও কিছু বর্ণনা, তারপর “আস্তাবলে সেই বেতো ঘোড়াটা নিমেষে
তন্দ্রার ঘোর কাটিয়ে উঠল, আশ্চর্য এক ফুল হয়ে
জন্ম নিল তার ইচ্ছা, শিরায় শিরায়
সঞ্চারিত হল সে ফুলের সৌরভ। চকিতে নোংরা নর্দমা হয়ে ওঠে অপরূপ সরোবর,
খড়কুটো, ছেঁড়া ন্যাকড়া থ্যাঁতলানো ইঁদুর, ফুলের তোড়া মণিরত্ন হয়ে
ঝলসে ওঠে ওর চোখে, আর সে নিজে উড়ে গেল
মেঘপুঞ্জে, নক্ষত্রগুচ্ছে, শূন্যের নীলিমায়।“ বলেছেন, “কবির মতো নিঃশঙ্ক, সহজ একা”। কোনো এক ভাবনা-কল্পনাগ্রস্থ কবির রূপক ভাবা যেতে পারে।

এক.
সেই ঘোড়াটা / প্রথমগান, দ্বিতীয় মৃত্যুও আগে (১৯৬০)

আস্তাবলে ফিকে অন্ধকার, ঝুলছে নিষ্কম্প স্তব্ধতা,
আর সেই বেতো ঘোড়াটা অনেকক্ষণ থেকে ঝিমোচ্ছে
নিঃশব্দে কোনো আফিমখোরের মতো, মাঝে-মাঝে শুধু
ফোলা-পা নাড়ছে ঘাড় ঝাঁকিয়ে।
আস্তাবলে ধারে নোংরা নর্দমা, তার পিছল জলে
একটা থ্যাঁতলানো ইঁদুর ক্রমাগত ধুয়ে-ধুয়ে
রূপান্তরিত বিলীয়মান সমাতন স্বপ্ন-স্মৃতি যেন
মঞ্জরিত ওর বিকল্প অস্তিত্বে।
বিশাল আকাশে ফুটেছে পারিজাতের মতো চাঁদ,
হলদে খড়ের শয্যায় বুড়ো সহিস ঘুমিয়ে আছে সেখানে
ক্লান্তদেহে, নিঃসন্তান, বিপত্মীক-নিদ্রিত
কাঠের নকশা যেন অবিকল।
ঘোড়াটাও ঝিমোচ্ছে, কিন্তু তার ক্ষত-নিঃসৃত মদিরা
মাতালের মতো অধীর আগ্রহে বুঁদ হয়ে পান করছে তিনজন মাছি;
এককোণে নিস্তেজ কুপিটা কোনো প্রেমিকের বিলুপ্ত প্রেমের মতো
জ্বলছে এক বিষণ্ন আচ্ছন্নতায়।
এইতো এখানে নর্দমার ধাওে কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন প্রৌঢ়
মাটির ভাঁড়ে ঢক্ ঢক্ শব্দ করে গিলেছে তাড়ি,
সব অনুতাপ হাওয়ায় উড়িয়ে, জ্যোৎস্নায় ভেজা ঠোঁটে
পান করেছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি-বিষ!
আর রাত্রির তারাময় আঁধারে তারা হাতের মুঠোয়
কামনা করেছে অপ্সরীর স্তন, তারপর বিষাক্ত কোনো বাষ্পে
স্ফীত হয়ে ট’লে-ট’লে চলে গেছে যে যার গণিকার ঘরে।
এখন এখানে শূন্যতার ভার।
আস্তাবলে সেই বেতো ঘোড়াটা নিমেষে
তন্দ্রার ঘোর কাটিয়ে উঠল, আশ্চর্য এক ফুল হয়ে
জন্ম নিল তার ইচ্ছা, শিরায় শিরায়
সঞ্চারিত হল সে ফুলের সৌরভ।
চকিতে নোংরা নর্দমা হয়ে ওঠে অপরূপ সরোবর,
খড়কুটো, ছেঁড়া ন্যাকড়া থ্যাঁতলানো ইঁদুর, ফুলের তোড়া মণি-রত্ম হয়ে
ঝলসে ওঠে ওর চোখে, আর সে নিজে উড়ে গেল
মেঘপুঞ্জে, নক্ষত্রগুচ্ছে, শূন্যের নীলিমায়।
মুহূর্তে মুছে গেল সময়ের সব ব্যবধান,
মেঘের বৈভবে সে ফিওে পেল তার অবলুপ্ত কান্তি,
আর ভেসে চলল আকাশ থেকে আকাশে অক্লান্ত গতিতে
কবির মতো নিঃশঙ্ক, সহজ একা।

দুই.

দ্বিতীয়টি জীবনানন্দ-র ‘আজকের এই মুহূর্ত ‘ ।
আজকের এই মুহূর্ত/ মহাপৃথিবী

হে মৃত্যু,
তুমি আমাকে ছেড়ে চলেছো ব’লে আমি খুব গভীর খুশী?
কিন্তু আরো খানিকটা চেয়েছিলাম।
চারিদিকে তুমি পাহাড় বানিয়ে রেখেছো ; –
যে ঘোড়ায় চ’ড়ে আমি
অতীত ঋষিদের সঙ্গে আকাশে নক্ষত্রে উড়ে যাবো
এইখানে মৃতবতসা, মাতাল, ভিখিরি ও কুকুরদের ভিড়ে
কোথায় তাকে রেখে দিলে তুমি?

এতোদিন ব’সে পুরোনো বীজগণিতের শেষ পাতা শেষ করতে-না-করতেই
সমস্ত মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেলো,
কোনো-এক গভীর নতুন বীজগণিত যেন
পরিহাসের চোখ নিয়ে অপেক্ষা করছে, –
আবার মিথ্যা প্রমাণিত হবে ব’লে ?
সে-ই সত্য হবে ব’লে?
জীবন : ভারতের, চীনের, আফ্রিকার নদী পাহাড়ে বিচরণের
মূঢ় আনন্দ নয় আর
বরং নির্ভীক বীরদের রচিত পৃথিবীর ছিদ্রে ছিদ্রে
ইস্ক্রুপের মতো আটকে থাকবার শৌর্য ও আমোদ।
তারপর চুম্বক পাহাড়ে গিয়ে নিস্তব্ধ হবার মতো আস্বাদ?

জীবন : নির্ভীক নারীদের সৌন্দর্যের আঘাতে
নিগ্রো সংগীতের বেদনার ধুলোরাশি ?
কিন্তু এ বেদনা আত্মিক, তাই ঝাপসা,– একাকীঃ তাই কিছু নয়–
কিন্তু তিলে তিলে আটকে থাকবার বেদনা;
পৃথিবীর সমস্ত কুকুর ফুটপাথে বোধ করছে আজ।
যেনো এতো দিনের বীজগণিত কিছু নয়,
যেনো নতুন বীজগণিত নিয়ে এসেছে আকাশ।

বাংলার পাড়াগাঁয়ে শীতের জ্যোৎস্নায় আমি কতবার দেখলাম
কত বালিকাকে নিয়ে গেল বাঘ – জঙ্গলের অন্ধকারে ;
কত বার হটেনট-জুলু দম্পতির কথাবার্তার ভিতর
আফ্রিকার সিংহকে লাফিয়ে পড়তে দেখলাম।

কিন্তু সেই সব মূঢ়তার দিন আর নেই সিংহদের :
নীলিমার থেকে সমুদ্রের থেকে উঠে এসে
পরিস্ফুট রোদের ভিতর
উজ্জ্বল দেহ অদৃশ্য রাখে তারা ;
শাদা, হলদে, লাল কালো মানুষদের
আর-কোনো শেষ বক্তব্য আছে কি না জিজ্ঞাসা করে।

যে ঘোড়ায় চ’ড়ে আমরা অতীত ঋষিদের সঙ্গে আকাশে নক্ষত্রে উড়ে যাবো
সেই সব শাদা শাদা ঘোড়ার ভিড়
যেন কোনো জ্যোৎস্নার নদীকে ঘিরে
নিস্তব্ধ হ’য়ে অপেক্ষা করছে কোথাও ;

আমার হৃদয়ের ভিতর
সেই সুপক্ক রাত্রির গন্ধ পাই আমি।
[আজকের এক মুহূর্ত / মহাপৃথিবী ]

তিন.

“জীবনানন্দ-র সুররিয়ালিজম”, একটি প্রবন্ধে এই কবিতাটির আলোচনা করেছি। তার থেকে একটু উদ্ধৃতি : ‘এই কবিতাটির অন্তর্গত গল্পটির ঘটনাগুলিকে বোঝা গেলেও, অদ্ভুত উপমা, চিত্রকল্প এবং বর্ণনার মধ্যে ংঁংঢ়বহংব হেতু কবিতাটি বোধ্যতা ও রহস্যের মধ্যে দোদুল্যমান। ‘আজকের এক মুহূর্ত’ একটি অদ্ভুত গদ্যকবিতা। বিষয়বস্তু আকাশে নক্ষত্রে উড়ে যাবার অভীপ্সা। ঠিক ‘গভীর হাওয়ার রাত’-এর মতো নয়, যেখানে তাঁর বিছানা মশারিসহ স্বাতী তারার পাশে উড়ছে। এখানে ঠিক উড্ডীন অবস্থা এখনো হয়নি, বরং পৃথিবীতেই প্রস্তুতি, কল্পনা এবং কিছু রহস্যময় পারিপার্শ্বিকতার কথা। কবিতাটির আটটি গদ্য সর্গ। কিন্তু কোলাজে একটির থেকে আরেকটি সম্পর্কচ্ছিন্ন। শুরু মৃত্যুকে সম্বোধন করে। মৃত্যু ছেড়ে গিয়েছে তাই স্বস্তি, তবু জিজ্ঞাসা হচ্ছে অতীত ঋষিদের সঙ্গে শাদা যে সব ঘোড়ায় চড়ে যাবার কথা, সে সব কোথায় রেখেছে মৃত্যু। কেন, কোথায়, কি ভাবে– আমরা কি খুব ভালো করে বুঝি? দ্বিতীয় সর্গে আরেক উপস্থাপনা। পৃথিবীর পুরনো বীজগণিত শেষ হয়ে নতুন বীজগণিত এসেছে– সত্য, মিথ্যা প্রমাণ হবে এক দিন। এই কি জীবনানন্দর ‘নতুন সময়ের জন্য নতুন, ও নতুনভাবে নির্ণীত পুরোনো মূল্য, নতুন চেতনা ও নতুনভাবে আবিষ্কৃত পুরোনো চেতনা …’? হয়তো! তৃতীয়, চতুর্থ সর্গে জীবনের অভিনব সংজ্ঞা, নতুন বীজগণিতে। বিস্ময়কর উপমা দিয়ে শৌর্য, আমোদ ও বেদনার সংজ্ঞা। উদ্দীপিত হই, যদিও স্বচ্ছভাবে বোঝা যায় না। কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত কুকুর বোধ করে এই নতুন বীজগণিত। সপ্তম সর্গে “কিন্তু সেই সব মূঢ়তার দিন আর নেই সিংহদের : নীলিমার থেকে সমুদ্রের থেকে উঠে এসে পরিস্ফূট রোদের ভিতর উজ্জ্বল দেহ অদৃশ্য রাখে তারা; শাদা, হলদে, লাল কালো মানুষদের আর-কোনো শেষ বক্তব্য আছে কি না জিজ্ঞাসা করে”– এই চিত্রণ আঁরি রুসো-র জিপসি এবং সিংহ-র ছবি মনে করায়। হৃদয়ের ভিতর সেই সুপক্ক রাত্রির গন্ধ, যখন শাদা ‘ঘোড়ায় চ’ড়ে আমরা অতীত ঋষিদের সঙ্গে আকাশে নক্ষত্রে উড়ে যাবো’। স্পষ্ট বুঝি না, তবুও আকর্ষিত হই। এই কবিতাটিকে পরাবাস্তবিক বলা যায়।’

আমার মনে হয়েছে, শামসুর রাহমান-এর ঘোড়া বিষয়ক কবিতাটি জীবনানন্দ-র ঘোড়া বিষয়ক কবিতাটি পড়ার পর লেখা। কিন্তু এর জন্য আমি আদালতে দলিল, সাক্ষ্য দিতে অপারগ।

Facebook Comments