ডোরবেলের মিষ্টি শব্দটা একটা হাতুরির বাড়ি মারল যেন ছোট্ট বুকটাতে। পাচঁটা সাত, দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক একটা সেকেন্ড গুনছিল পিউ। মিন্টু মামা যেন আজ না আসেন। পড়ার টেবিলে বসে নিজের ভিতরে হালকা একটা কাঁপুনি অনুভব করে পিউ। পিউ’র নিজের কোনো মামা নেই, মিন্টু মামা আম্মুর দুঃসম্পর্কের ভাই। মিন্টুমামাকে পিউ আর পিয়ালের এর খুব পছন্দ। মামা খুব শান্ত, নম্র; পড়ানোর মধ্যে কেমন জাদু আছে। পিইসিতে শুধু গণিতেই এ প্লাস পায়নি পিউ। গণিত টিচার হিসেবে এলাকায় মিন্টু মামার খুব নাম। ক্লাস সিক্স থেকে মিন্টুমামাই পিউকে পড়ান। গণিতের পাশাপাশি অন্য বিষয়গুলোও দেখিয়ে দেন। বরাবর গণিতে দূর্বল পিউ মিন্টুমামার কারণেই এখন বেশ পাকা হয়ে উঠেছে। পড়ানোর পরও মিন্টু মামা অনেকদিন ড্রইংরুমে বসে গল্প করেন। আব্বুই অনুরোধ করেছেন মিন্টু মামাকে, ওদের প্রতি একটু খেয়াল রাখতে। কিন্তু বেশ ক’দিন হলো মিন্টু মামার মধ্যে একটা পরিবর্তন বোধ করছে পিউ, কী ঠিক বুঝতেও পারে না। মামা কেন যে এমন করছে তার সাথে?

দুই

সাপ্তাহিক টেস্টের খাতা দিচ্ছিলেন ক্লাসটিচার তনিমা রহমান । খাতা হাতে দ্বিতীয় বেঞ্চের মাঝখানে বসা ছাত্রীটির দিকে এগিয়ে গেলেন। বেশ কিছুদিন হলো চোখে পড়ছে, উচ্ছল মেয়েটির চোখেমুখে বিষন্নতার ছাপ। মেয়েটির ফাইনালের রেজাল্ট ভালো, ক্লাসেও সবসময় ভালো রেসপন্স। কিন্তু ইদানিং ক্লাসে অমনোযোগী মেয়েটি, ক্লাস টেস্টগুলোতেও বেশ খারাপ করছে। নতমুখে দাঁড়ানো ছাত্রীর হাতে খাতাটি দিলেন তনিমা। ‘পিউ, টিফিনের বিরতিতে টির্চাস এ্যাসেম্বলিতে আমার সাথে দেখা করবে।’
‘জি ম্যাম’, সামান্য ঘাড় কাত করে মাথা নীচু করে পিউ ।
‘আসব ম্যাম?’ টির্চাস এ্যাসেম্বলির দরজায় জড়সড়ো দাঁড়িয়ে পিউ।
‘ভেতরে এসো পিউ।’ তনিমার কথায় দু’পা এগিয়ে তিন চার চেয়ার পরে বসা স্যারদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আরও গুটিয়ে যায় পিউ। বয়সের স্বাভাবিক প্রাণ চঞ্চলতাটুকু হঠাৎই যেন উবে গেছে মেয়েটির মধ্যে থেকে, খেয়াল করে করে তনিমা।
‘তুমি কি অসুস্থ পিউ?’
’জি, না ম্যাম।’
‘বাসায় কোনো সমস্যা?’ ঘাড় নাড়ে পিউ।
‘স্কুলে আসতে ভালো লাগে না?’
‘লাগে।’ প্রায় অনুচ্চারিত শব্দ।
‘পড়তে ভালো লাগে না?’ নিরুত্তর পিউ।
‘ উত্তর দিচ্ছ না কেন?’ হালকা ধমকের সুরে কেঁপে ওঠে এর ফড়িং এর মতো পাতলা মেয়েটা। মেয়েটির নির্বাক চাহনিতে মনটা আদ্র হয়ে ওঠে তনিমার, হাত ধরে কিছুটা কাছে টেনে নেন। টপটপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে গাল বেয়ে।
‘কী নিয়ে ভয় পাচ্ছো তুমি? না বললে তো বুঝতে পারব না।’ পিউ এর নত মাথা আরও নত হয়ে বুকে ঠেকে যায়। মেয়েটির মাথায় আলতো হাত রাখেন তনিমা। ‘ঠিক আছে কিছু বলতে হবে না, এখন ক্লাসে যাও, পরে কথা বলব আমরা।’তনিমার দিকে বোবা চোখে তাকিয়ে খুব ধীর পায়ে টিচার্স এ্যাসেম্বলি থেকে বের হয়ে যায় পিউ। মেয়েটির দীপ্তিহীন ভীত চোখদুটোতে তনিমার কৈশোরের একটা দুঃস্বপ্ন যেন ভেসে ওঠে নতুন করে ।

তিন

তখন তনিমা ক্লাস সেভেনে। বাড়িতে সেদিন চাচাতো বোন রুনু আপার হলুদের আয়োজনে ব্যস্ত সবাই। বড়ো চাচার উঠোনেই চৌকি পেতে হলুদের মঞ্চ ঘিরে আত্মীয় স্বজনের ভিড়। পাশের উঠোনটাই তনিমাদের। দুপুরের পর ফাঁকা বাড়িতে নিজের ঘরে বসে নিবিষ্ট মনে শাড়ি চুড়ি গোছগাছে ব্যস্ত ছিল তনিমা। দরজায় কারো পায়ের শব্দে ঘুরে তাকাতেই হঠাৎ অক্টোপাসের ভেতর বন্দি তণিমার শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এল। তীব্র আতঙ্কে মুহূতের্ই তনিমার হাত,পা, মাথা সব জমে নিস্তেজ। নিজেকে ছাড়ানোর সামান্য চেষ্টা করতেও ভুলে গেল সে। ঠিক সেইসময় বারান্দায় মায়ের শব্দ, ‘তনু…’
তনিমাকে ঝট করে ছেড়ে দিয়ে কোঁচকানো পাঞ্জাবি টেনে টানটান করে খুব শান্তভাবে ঘর থেকে বের হয়ে গেল আত্মীয়রূপী পশুটা। বারান্দায় বসে তনিমার মায়ের সাথে খুব স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলে কিছুক্ষন পর বিদায় নিলো সেই নিকটজন।
মা যদি না আসতো, ঠিক তক্ষুনি? চৌদ্দ বছরের তনিমা মুখ ফুটে মায়ের কাছে কিছুই বলতে পারেনি সেদিন । রুনু আপার বিয়েটা তার বমি আর জ্বরের ঘোরেই কেটে গিয়েছিল। সেই পরম আত্মীয়ের সাথে তো এখনো পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে হরদম দেখা হয়, দিব্যি তনিমার চোখে চোখ রেখে হেসে কথা বলে। এখনও কেন মাথা উঁচু করে কিছু বলতে পারে না তনিমা? কেন মানুষরূপী পশুটার নিপাট সভ্য মুখোশটা ছিঁড়ে ফেলতে পারে না সবার সামনে? এখনও কীসের লজ্জা তনিমার? না শুধুই একজন নারী হিসেবে লৌকিকতার ভয়?

চার

মোড়ের দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট কিনছিল সৌরভ। গলি থেকে বের হয়ে মিন্টু পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ফোড়ন কাটল সে, ‘কীরে স্বর্ণার বিয়ে আর তুই রাস্তায় দাঁড়িয়ে মরিচ বাতি গুনছিস?’ স্বর্ণা মিন্টুর প্রাক্তন ছাত্রী, এখন অনার্স ফার্ষ্ট ইয়ার। স্বর্ণাকে নাইন, টেন দুই বছর পড়ানোর সময়ই সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল তাদের।
‘ভালোই তো হট লাইন চলছিল তারপরও কেমন সুযোগ বুঝে তোকে ল্যাং মেরে দিল। মেয়েগুলো মাইরি এমনই হয়!’ ইচ্ছে করে কাঁচা ঘায়ে নূনের ছিটা দিচ্ছে সৌরভ। সত্যি, স্বর্ণার সরল প্রশ্রয়ে স¤পর্কটা অনেক দূর গড়িয়েছিল তাদের। স্বর্ণার এক ফুপাতো বোনের বাসায় দেখা করত দু’জন। স্বর্ণার মা হাতেনাতে ধরে ফেলল সেদিন। এক মাসও হয়নি, এরই মধ্যে স্বর্ণার বিয়ের ব্যবস্থা।
‘ও চলে আসতে চেয়েছিল, আমিই রাজি হইনি।’ মিন্টুর কথায় ব্যাঙ্গের হাসি ফুটে উঠে সৌরভের চোখেমুখে, ‘পয়সাওয়ালা বাপের একমাত্র মেয়ে, আটকে দিতে পারলি না? গুডিগুডি চেহারা নিয়ে বসে থাকলে হয়? এজন্যই স্বর্ণা তোর মতো ভ্যাদা মাছকে ছেড়ে বাধ্য মেয়ের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেল। এখন আর কী? গুডবয় হয়ে বসে বসে লেবেনচুস খাও।’

দোকানের কৌটা থেকে একটা চকলেট নিয়ে মিন্টুর হাতে ধরিয়ে দেয় সৌরভ। বিজ্ঞ সৌরভের মন্তব্যে কথা খুঁজে পায় না মিন্টু। চকলেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিকেলের মরা আলোয় মাথা হেঁট করে দ্রুতপদে হাঁটতে থাকে বাস রাস্তার দিকে। সাতটায় আর একটা টিউশন আছে মিন্টুর, পৌছতে আধঘন্টার মতো লাগবে। ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে নয়টা, দশটা। কবে যে এই চক্র থেকে বের হতে পারবে সে?
ফিজিক্সে মাস্টার্স শেষ হয়েছে প্রায় দু’বছর, এখন মিন্টুর একেকটা দিন যেন একেকটা মাস। একটার পর একটা ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছে, রিটেন টেস্টে টিকলেও শেষমেষ কিছুই হয় না। বেসরকারি কয়েকটা চাকরির সুযোগ এল, অভিজ্ঞতা নাই বলে মাইনে এত কম যে নিজে চলতে পারলেও বাড়ি ভাড়া দিয়ে চারজনের সংসার টানা সম্ভব নয়। এর চেয়ে বাড়ি বাড়ি টিউশন করেই মাসে ভালো একটা অঙ্ক হাতে আসে মিন্টুর।
বাড়িতে মা আর ছোট দুই বোন। মুন্নী এবার এইচএসসি দেবে, তানি নাইনে। মুন্নীর বিয়েশাদির প্রস্তাব আসছে, কিন্তু ব্যাটে বলে ঠিক মিলছে না। টাকা পয়সা জোগাড়ের বিষয়ও আছে। মায়ের ইচ্ছে গ্রামের ধানি জমিটুকু বেচে মুন্নীকে বিদায় করে। মিন্টু মাকে বোঝায় একটু ধৈর্য ধরতে, কিন্তু মিন্টুর নিজের ধৈর্যই এখন তলানিতে।

মিন্টুর বাবা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। মূত্রথলির ক্যান্সারে ভূগছিলেন দীর্ঘদিন, চিকিৎসা হয়নি ঠিকমতো। মিন্টুর মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক দু’টোতেই ভালো রেজাল্ট। নিজের টিউশনির টাকায় ভর্তি কোচিংও করেছিল সে। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরপরই বাবার মৃত্যু সব ওলট পালট করে দিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সিইইতে চান্স হলো। কিন্তু মা আর বোনদুটোকে রেখে এতদূরে যাওয়া সম্ভব হলো না, ঢাকায় হলে তবু চেষ্টা করা যেত।

রাতে বাড়ি ফেরার সময় মোড় থেকে স্বর্ণাদের বাড়ি পর্যন্ত টিপটিপ করে জ্বলতে থাকা রঙিন বাতিগুলো হাজার সূর্য হয়ে খাঁক করে দেয় মিন্টুকে, কী অপরাধ তার ? কেন এই শাস্তি মাথা পেতে নিতে হচ্ছে তাকে? ইচ্ছে করে সব কিছুই পুড়িয়ে ছাই করে দিতে।

পাঁচ

‘পিউ, কোনদিকে মনোযোগ?’ মিন্টুর হালকা গম্ভীর স্বরে কুঁকড়ে যায় পিউ, আবার শরীরের কোথাও মামার হাত লেগে যাবে নাতো? ইদানিং, মাঝে মাঝেই মামা পিউ’র হাতে হাত রাখে, গাল টিপে দেয়। কাল পড়াচ্ছলে ঊরুর উপর হাত রাখল। পিউ কেঁদে ফেলেছিল প্রায়, পানি খাওয়ার কথা বলে উঠে গিয়েছিল মিন্টু মামার সামনে থেকে। পিউ’র নিভে যাওয়া মুখ দেখে সামনে থেকে খাতা টেনে নেয় মিন্টু ‘দাও, দেখিয়ে দিচ্ছি।’ এমন সময় ডোরবেলের শব্দে প্রাণপাখিটা যেন বুকে ফিরে আসে পিউ’র।
‘কী খবর মিন্টু?’ ঘরে উঁকি দেয় রুমানা।
‘এই তো।’
‘সাপ্তাহিক টেস্টে ছাত্রী গণিতে কত পেয়েছে জানো? বিশে বারো।’ হতাশা ঝরে পড়ে রুমানার কন্ঠে।
‘জানা অংকগুলো ভুল করেছে আপা।’
‘হু, মাঝে মাঝে দু’একটা বেত না মারলে ঠিক হবে না। পড়ানো শেষ হলে চা খেয়ে যেও।’
ড্রয়িং রুমে বসে চা শেষ করে মিন্টু গ্যাস বিলের কাগজটা ফেরত দেয় রুমানাকে। ‘অনেক ধন্যবাদ, ভাই। একটা বিল দিতে এত সময় লাগে! সারাদিন দুইটার পিছে দৌড়ে সময় বের করা খুব কষ্ট হয়ে যায়। আগামী পরশু পিউ’র জন্মদিন, তুমি কিন্তু ঐদিন দুপুরে খাবে আমাদের সাথে। মনে থাকে যেন।’
রুমানার কথায় মিন্টু মৃদু হাসে, ‘ঠিক আছে আপা।’ মিন্টু মামার হাসিটা খুব সুন্দর, দরজার ওপাশে পর্দা ধরে দাঁড়ানো পিউ’র একটু আগের ভয়টা যেন হঠাৎই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
মিন্টু চলে যাওয়ার পর মেয়েকে কাছে ডেকে শাসায় রুমানা ‘তুমি যদি বারবার পরীক্ষায় এমন নম্বর পেতে থাকো, তাহলে পড়াশোনা একদম বন্ধ! শুধু তোমাদের পড়াশোনার জন্য ওদিকে তোমার বাবা কষ্ট করছে, এদিকে তোমাদের দুইজনকে নিয়ে একা আমি। এত বড়ো হয়েছ, তবু এসব নিয়ে একটুও মাথাব্যাথা নেই? ফোন হাতে নিয়েছিলে আবার?’

‘না আম্মু, সত্যি বলছি।’ ভয় পেয়ে যায় পিউ। সেদিন অনিক ভাই এর মেসেজটা দেখে এমন চড় কষলো আম্মু। পিউ এত করে বলল ‘আমি কিছু জানি না।’ আম্মু একদম বিশ্বাস করল না, চোখ রাঙিয়ে বলল ‘পড়াশোনা বাদ দিয়ে যদি আজেবাজে বিষয়ে মাথা ঘামাও, তবে তোমার মতো মেয়ের দরকার নেই আমার!’ আম্মুর রাগী মুখটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয় পিউ’র।

ছয়

সৌরভের বিছানায় আধশোয়া মিন্টু উঠে বসে। ‘দশটাই বাজল না, এখনই উঠছিস যে। গরম গরম একটা মুভি দেখা যাবে। রিপনও আসবে, বোস।’ সৌরভের কথায় তার আইফোনের স্ক্রিনে কোন দেশের ডোনার খোলামেলা ছবিটার দিকে অলস চোখ রেখে আবার বসে পড়ে মিন্টু।
‘পছন্দ? চাইলে লাইভে.. গোল করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মিন্টুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের হাসিটা আরো দীর্ঘ হয় সৌরভের। সারাদিন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ছোটাছুটির পর কখনো কখনো দু’চার ঘন্টা সৌরভের ঘরে এভাবেই নষ্ট করে মিন্টু। তার সুখ বিবর্জিত জীবনে, এই অযাচিত সুখটুকু চাইলেও ফিরিয়ে দিতে পারে না সে।
‘এই তোর আদালত রোডের সেই আপাকে দেখি মাঝে মাঝে, কী দারুণ ফিগার! দুইদুইটা বাচ্চার মা বুঝাই যায় না।’ সৌরভের কথায় বিরক্তি ফুটে ওঠে মিন্টুর কন্ঠে ‘বাজে বকিস নাতো, সম্পর্কে আমার বোন হয়।’
‘ গ্রামের সম্পর্কের বোনও আবার বোন! মিষ্টি মিষ্টি কথায় অল্প পয়সায় খাটিয়ে নিচ্ছে। মিষ্টি কথায় তোর ফায়দা কী?’
‘ বাদ দিবি? তোর এতসব না ভাবলেও চলবে।’
‘ মেয়েটা কিন্তু মায়ের চেয়ে সুন্দর হবে। তুই বরঞ্চ মেয়েটার পিছেই লেগে থাক।’
‘বাচ্চা মেয়ে নিয়ে অসভ্য সব কথা বলিস না।’সৌরভকে ধমক দিয়ে উঠে দাঁড়ায় মিন্টু। ‘আরে বোস তো।’ মিন্টুর হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে বসিয়ে দেয় সৌরভ। সৌরভ, রিপনের সাথে ভার্চুয়াল জগতের অন্ধকারে হারিয়ে যায় মিন্টু। মরে যেতে থাকে তার মনুষ্যত্ব বোধ। যে বোধ ধারণ করবে বলেই কুকুর বেড়াল অথবা অন্য কোনো পশুর গর্ভে নয়, এক নারীর গর্ভে জন্ম হয়েছিল তার।

সাত

‘সহজ একটা সমীকরণ মেলাতে এতক্ষন?’ মিন্টুর হালকা ধমকে অংকে মন দেওয়ার চেষ্টা করে পিউ। আম্মু গেছে পিয়ালের সাথে ড্রয়িং ক্লাসে। ময়না খালা ছাদে গেছে কাপড় আনতে। পিউ’র চোখ খাতা থেকে ভেজানো দরজায় চলে যায় বারবার।
‘ঠিক আছে রাখো , করতে হবে না এখন। পিউকাঁহা…’ হঠাৎ অচেনা কন্ঠে চমকে যায় পিউ। মিন্টু মামার চোখে চেয়ে জমে বরফ হয়ে যায় । যে হাতটা ধরে চকলেট কিনতে যেত পিউ, সেই হাতটা তার কোমল বাহুতে এমনভাবে চেপে বসে; মনে হয় এক্ষুনি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে সে। কেঁদে ফেলে পিউ ।

‘ কী হইছে?’ ময়নার ভীত কর্কশ কন্ঠে সম্বিত ফিরে মিন্টুর। ‘হঠাৎ উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল। ইয়ে ময়না, ওকে একটু পানি এনে দাও।’ অপ্রস্তুত কন্ঠে ব্যাখ্যা করে পিউকে ছেড়ে দিয়ে মিন্টু ড্রয়িংরুমে গিয়ে দাঁড়ায় ময়নার অপেক্ষায়।
‘ময়না শোনো, এ নিয়ে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। বুঝতে পারছ?’ ময়নার সন্দিহান চোখের দিকে তাকিয়ে একশত টাকার একখানা নোট হাতে গুঁজে দিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে যায় মিন্টু।

আট

বিছানায় বসে মেয়ের মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল রুমানা। চেয়ারে বসা মিন্টুর দিকে চিন্তিত চোখে চেয়ে বলে ‘ তিনদিন হয়ে গেল মেয়েটার জ্বর। কাল কমে গেছিল, আজ আবার বেড়েছে। দেখি, পিউকে আজ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। এ সপ্তাহটা তুমি আর কষ্ট করে এসো না মিন্টু।’

রুমানার বিষন্ন স্বর কানে লাগে মিন্টুর ‘এত জোরে স্কেল দিয়ে মারাটা সত্যি ঠিক হয়নি আমার। আসলে পিউ এত অমনোযোগী থাকে ইদানিং।’ মিন্টুর অপরাধী চেহারা দেখে মনে মনে বেশ খারাপ লাগে রুমানার।
বের হয়ে আসবার সময় দরজায় দাঁড়ায় মিন্টু, ‘আপা একটা কথা বলব ভাবছিলাম, মানে যাওয়ার সময় অনিক নামের ছেলেটাকে প্রায়ই বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করতে দেখি…।’ মিন্টুর কথায় মাথা নাড়ে রুমানা ‘হ্যাঁ আমার চোখেও পড়েছে দু’দিন’।
মিন্টু চলে যাওয়ার পর ভয়ে ভয়ে মায়ের কাছে আর্জিটা জানায় পিউ , ‘আম্মু, মিন্টু মামার কাছে আর পড়ব না আমি।’

‘একটু শাসন করেছে বলে এটা কী ধরনের বায়না?’ মায়ের কঠিন স্বরে কিছু বলার চেষ্টা করতে জিভটা শুকিয়ে আসে ‘আম্মু প্লি…জ।’ কিছু বলতে চেয়ে লজ্জায় গলা বুজে আসে পিউ’র।

‘মিন্টু কত ভালো পড়ায়। আর্থিক সমস্যার কারণে ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে পারল না। ভাগ্য ভালো এত কমে ওর মত স্যারের কাছে পড়াতে পারছি, আত্মীয় বলে আপত্তি করছে না। ওর মতো ছেলে হয় এই যুগে?’ রুমানার ঘুরে ফিরে এক কথা।
‘মিন্টু মামাকে কেমন ভয় করে আমার।’
‘বলে দিবো আমি, আর মারবে না তোমাকে। এই বছরটা পড়ো, চাইলেই ভাল টিচার পাওয়া যায় যখন তখন?’ মেয়েকে সান্ত্বনা দেয় রুমানা।

নয়

‘সামনের সপ্তাহ থেকে স্কুলে সেকেন্ড সেমিষ্টার পরীক্ষা। ক’দিন হলো পিউ স্কুলে আসছে না। ও কী অসুস্থ?’
‘তেমন কিছু না ম্যাডাম। হালকা জ্বর, মাথাব্যাথা।’
‘বেশ চটপটে মেয়ে আপনার, মাথাও খুব ভালো। দিন দিন রেজাল্ট খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মোবাইলে আসক্তি অথবা কোনো কারণে ভয় পাচ্ছে না তো? বাচ্চা মেয়ে তো…’ ইতস্তত বলে ফেলে তনিমা।
‘না, না ম্যাডাম, ওরা দু ভাই বোনতো আমার চোখে চোখে থাকে সবসময়’
‘তাহলে স্কুলের কোনো সমস্যা? দরকার হলে আমাকে জানাতে দ্বিধা করবেন না।’
এর আগেও ভদ্রমহিলার সাথে এ ধরনের ফোনালাপ হয়েছে তনিমার। ভদ্রমহিলা বিষয়টাকে কেন যে গুরুত্ব দিচ্ছেন না? নাকি এড়িয়ে যাচ্ছেন? সপ্তাহ পার হয়ে এল, স্কুলে অনুপস্থিত মেয়েটা। অসহায় ফ্যাকাশে মুখখানি মনে পড়লেই পুরোনো ক্ষতটায় নতুন করে যন্ত্রণা শুরু হয় তনিমার।

দশ

মুন্নীর বিয়ের তারিখ পাকা হয়ে গেল, বৈশাখের পঁচিশ তারিখ। ছেলে সরকারি চাকুরে। পাত্রপক্ষের মুন্নীকে খুব পছন্দ, বাড়তি কোনো বায়নাক্কা নেই। দুইটা এনজিও থেকে হাজার পঞ্চাশেক টাকা ঋণ নিয়ে বিয়ের খরচার ব্যবস্থাও হয়ে গেল। ঋণের কিস্তি বাবদ আরও পাঁচ হাজার টাকার মাসিক দায় বাড়ে মিন্টুর।
‘তো যাচ্ছিস কবে দোস্ত?’ দোকানের সামনের বেঞ্চিতে পাশে বসা রিপনের কাঁধে হালকা চাপড় দিয়ে পাশে বসে মিন্টু।
‘ত্রিশ তারিখ, এক তারিখেই জয়েন করব ভাবছি। সৌরভ কাল বিয়ে করেছে জানিস?’ রিপনের কথায় হতবাক মিন্টু।
‘নাতো! আনবিক কমিশনের ভাইভাটা দিয়ে এলাম, দেখা হয়নি বেশ কয়েক দিন।’
‘বাড়ির কাজের মেয়েটার সাথে লটঘট শুরু করেছিল না? ওর মা তাই হুট করে তার ক্লাস টেনে পড়া বোনঝিকে সৌরভের বউ করে নিয়ে এল।’
‘বেশ হয়েছে, গলায় বেড়ী পড়েছে এইবারে। দেরি হয়ে যাচ্ছে, যাইরে এখন।’ মিন্টু তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ে।
সৌরভের বাবার পিঁয়াজের বিশাল পাইকারি ব্যবসা। সেই ব্যবসা দেখাশোনা করেই জীবনটা আরামে আয়েশে কাটিয়ে দেবে সৌরভ, ওর চিন্তা কি? কেন সেই শুধু সব কিছু থেকে বঞ্চিত? হাঁটতে হাঁটতে ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভটা ফুঁসে উঠতে থাকে মিন্টুর।

এগারো

পিয়াল কে নিয়ে ড্রয়িং ক্লাসে যাওয়ার আগে ময়না খালাকে বারবার বলে গেছে আম্মু ‘ফিরতে একটু দেরি হবে, পিউকে একা রেখে কোথাও না যেতে। তবু ময়না খালা যাব আর আসব বলে ছাদ থেকে আর নামছে না কেন? বুকটা ধ্বক ধ্বক করতে থাকে পিউ’র। হঠাৎ বিদ্যুত চলে গেলে খাতার উপর মাথা ঝুঁকিয়ে শরীরের কাঁপুনিটাকে চেষ্টা করেও আর সামাল দিতে পারে না পিউ।
আধো অন্ধকারে খাতার পরে ঝুঁকে থাকা প্রস্ফুটিত মুখটাকে যেন ভার্চুয়াল জগৎ এর সামান্থা বলে ভ্রম হয় মিন্টুর। ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে ছোট্ট শরীরটা কাছে টেনে নেয় সে।
‘মামা প্লি..জ, গলা বুজে আসে পিউ’র, …ময়না খা…লা.., আম্মু…’ প্রাণপনে শব্দ করার চেষ্টা করলে পিউ’র মুখটা সজোরে চেপে ধরে মিন্টু। পিউ জ্ঞান হারিয়ে ফেললে নিথর দেহটা ফেলে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য মিন্টু ক্ষিপ্রগতিতে ছুটতে ছুটতে রেললাইনের উপরে গিয়ে বসে পড়ে। শূন্য মস্তিষ্কে দূর থেকে ধেয়ে আসতে থাকা ছুটন্ত ট্রেনের বিন্দুর মতো লাল বাতিটার দিকে চেয়ে বসে থাকে নিথর। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে হাতে বাজতে থাকা ফোনটার দিকে তাকিয়ে মিন্টুর উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়, মেয়েটা কে কি মেরে ফেলেছে সে?
রাত পেরিয়ে প্রায় ভোর। ‘মিন্টুতো না বলে রাতে বাইরে থাকে না কোনোদিন…’ ঘুমন্ত তানির পাশে শুয়ে মিন্টুর মা খুনখুন সুরে কাঁদে। ‘ভাইজান কেন যে ফোনটা ধরছে না? কোনো বিপদ হয়ে গেল নাতো?’ আনবিক কমিশন থেকে আসা সরকারি খামটা হাতে নিয়ে মায়ের পাশে বসে ভাইয়ের অপেক্ষায় ছটফট করতে থাকে মুন্নী।

বারো

অসুস্থতার কারণে সেকেন্ডটার্ম পরীক্ষায় বসতে পারেনি পিউ। ছাত্রীকে বাসায় দেখতে এসে বিছানার সাথে মিশে যাওয়া মেয়েটিকে চিনতে যেন কষ্ট হয় তনিমার। পাশে বসে পিউ’র শীর্ণ হয়ে যাওয়া শরীরে হাত বুলায় তনিমা ‘পিউ, তুমি তো সাহসী একটা মেয়ে। কী নিয়ে ভয় এত পাচ্ছো তুমি? আমাকে বলো কোনো ভয় নেই।’
শব্দহীন শুকনো ঠোঁট দুটো কেঁপে যায় শুধু, চাপা কান্নার দমকে থমকে যায় আতঙ্কগ্রস্ত মেয়েটা।
‘ঘন ঘন জ্বর আসছে, খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ। দূর্বলতার কারণে পরীক্ষাটাও দিতে পারছে না।’ পিউ এর কোলের কাছে বসে তনিমার কাছে মলিন কন্ঠে ব্যাখ্যা দিতে থাকে রুমানা ।
‘ডাক্তার কী বলেছে?’ ম্রিয়মান কন্ঠে তনিমার প্রশ্নের জবাব দেয় রুমানা, ‘সব চেকআপ করানো করানো হয়েছে। ডাক্তার বলেছে সমস্যা নেই। জ্বরের ঔষধ আর কিছু ভিটামিন দিয়েছে দূর্বলতা কাটাতে।’
ড্রইংরুমে বসে দেয়ালে ঝোলানো ভাইবোনের হাস্যোজ্জ্বল ছবি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চায়ের কাপে ঠোটঁ ছোঁয়ায় তনিমা। রুমানাকে বোঝানোর চেষ্টা করে ‘আপা পিউ এর সমস্যাটা আপনি না বললেও আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছি। আমার কথায় দুঃখ পাবেন না, প্লিজ। অধিকাংশ মেয়েই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়। কিন্তু লজ্জায়, ভয়ে মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারে না। পিউ যে ভয় পাচ্ছে এটা কিন্তু না ও কাটতে পারে, দিনদিন হয়তো আরো বেড়ে যাবে। সমস্যাটা জটিল হওয়ার আগেই ওকে একজন সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানো জরুরি।’
‘আপা, আমার মেয়েটা অসুস্থ। কিন্তু পাগল হয়ে তো যায়নি। কিছুদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’ তনিমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে দূর্বল কন্ঠে উত্তর দেয় রুমানা।

‘ সাময়িকভাবে ঠিক হলেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মানসিকতা হারিয়ে ফেলতে পারে। লেখাপড়া এমনকি ওর বিবাহিত জীবনেও এই আতঙ্ক মারাত্মক খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যান্য রোগের মত এটিও একটি রোগ। মানসিক রোগ, এ্যাগ্রোফোবিয়া। চিকিৎসা না হলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই অসুখ ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।’
‘পাগলের ডাক্তারের কাছে মেয়েকে নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখলে পাড়া প্রতিবেশিরা সব আজেবাজে কথা বলাবলি করবে।
‘ মাথা নীচু করে আঁচলে চোখের জল গোপন করার চেষ্টা করে রুমানা। রুমানার হাতের উপর নিজেরে হাতটা রাখে তনিমা ‘ কেউ জানবে না। আর জানলেও। মেয়েকে নিয়ে আপনাদের স্বপ্ন, পিউ’র স্বাভাবিক সুন্দর একটা জীবন এসব কথার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাছে, তাই না?’

ক্লাসে পড়ানোর ফাঁকে বয়ঃসন্ধিকাল, স্বাস্থ্য ও সচেতনতা নিয়ে কথা বলছিলেন তনিমা, ‘কারও কথা, আচরণ বা স্পর্শে যদি অস্বস্তি হয় অথবা খারাপ লাগে; তাহলে দ্বিধা না করে, ভয় না পেয়ে আমাদেরকে অবশ্যই পরিবারের কাউকে বিষয়টি জানাতে হবে। ভয় পেলে সুযোগ সন্ধানী, অসৎ মানুষ আরও বেশি ক্ষতি করার সুযোগ পায়। কোনো লজ্জা বা ভয় নেই আমাদের। মেয়েরা তো এখন অনেক সাহসী, তাই না?’
‘ জি… ম্যাম’ মেয়েদের সমবেত কন্ঠ প্রতিধ্বনিত হয় পুরো ক্লাসরুমে। ঝলমলে মুখগুলোর দিকে চেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তনিমার মুখ। সামনের বেঞ্চে বসা পিউ’র জ্বলজ্বলে চোখের তারায় চোখ রেখে কৈশোরের দগদগে ক্ষতটা যেন চিরতরে মুছে ফেলতে চায় সে।

Facebook Comments