শেয়ার করুন:

সায়মা ইসলাম

ঘুম কাতুরে চোখদুটো এক কাপ চায়ের খোঁজে আঁতিপাঁতি ঘুরছিল চারপাশটা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিতেও ভোরবেলায় লেপের ওম ছেড়ে বেরুতে হল। শোভনের বোন ঢাকায় এসেছে মেয়েকে ভিকারুননিসায় ভর্তি পরীক্ষা দেওয়াতে। ভাগনিকে পরীক্ষার হলে বসিয়ে দিয়ে এসে কলেজের গেট থেকে কিছুটা দূরে পার্কিং করা গাড়ির দরজায় ঠেস দিয়ে হাঁফ ছেড়ে দাঁড়ায় শোভন। এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে পুবদিকের দেয়াল ঘেসে চোখ পড়তে হঠাৎই বুকের ভেতর কেমন ছলকে যায় শোভনের।

হৃদয়ের আন্দোলনে সকালের অলস মস্তিষ্ক জেগে উঠতে চোখজোড়া আটকে যায় কিছুটা দূরে পামগাছের গুঁড়ি বাঁধানো বেদির উপর। সকালের নরম আলো গায়ে মেখে শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে হালকা পাতলা গড়নের এক ভদ্রমহিলা। হালকা নীল রঙের তাত পরিহিত মহিলাটিকে এপাশ থেকে অনেকটা সুমনার মতো দেখতে। ধীরপায়ে এগিয়ে কাছাকাছি যেতে বাঁ-পাশ থেকে মুখটা স্পষ্ট। চল্লিশ পেরিয়ে এসেও এক নারীর দর্শনে বুকের ভেতর হার্টবিটের অস্বাভাবিক গতি টের পেয়ে শোভন নিজেই বিস্মিত। এতদিন তো দিব্যি কেটে গেল, তবে এত কাল পর এমন তো হবার কথা নয়! ভেতরের উত্তেজনাটুকু নিয়ন্ত্রণ করে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় শোভন। বহুকাল পর মুখোমুখি দু’জন। চোখের পাতা একটু কেঁপে গেল বোধ হয়। অস্বস্তিটুকু কাটিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা সুমনার। ‘ওমা, তুমি!

‘হ্যা, রুমার মেয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। ওকেই নিয়ে এসেছি’

‘ তোমার রাজশাহীতে পোস্টিং শুনেছিলাম…

‘ছিলাম, এ বছর জুলাই মাসে বদলি হয়ে এলাম। তুমি এখানে?

‘আমার মেয়ে, নীলাঞ্জনা পরীক্ষায় বসেছে।’ চিন্তিত স্বর সুমনার।

‘ওমা তাই! সেই ছোট্টবেলায় দেখেছিলাম একবার। কোথায় আছো এখন?’ প্রসঙ্গটা উঠতেই সুমনার মুখটা দপ করে নিভে গেল এবং তা লুকাতেই হয়ত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বিষণ্ন চোখজোড়া কলেজ গেটের উপর নিবদ্ধ করল সে।

‘দেখি, তোমাকে এককাপ চা খাওয়াতে পারি কিনা… কথায় কথায় বহুদিন পর সুমনার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রাণপ্রাচুর্য ভরা হাসিতে উদ্ভাসিত হয় শোভন। হৃদয় উদ্বেলিত সেই ধ্বনিতে মুহূর্তের জন্য থমকে যায় নির্বাক সুমনা।

সুমনার মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে শোভন। এই মুখের সামনে দাঁড়ালেইতো একসময় বঙ্গোপসাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ত শোভনের বুকের মসৃণ বেলাভুমিতে! তারপর অজানা অচেনা স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে গভীর রেখা হয়ে ফুটত। এই মুখে মেঘের ছায়া ঘনালে শোভনের ভেতরে তখন বিদ্যুতের ঝলকানি। ঘুমে জাগরণে স্বপ্নের কান্ডারি হয়ে দিবানিশি রাজত্ব করত যে মুখচ্ছবি। এই সেই সুমনা! কপালের সামনের চুল পাতলা হয়ে সিঁথিটা বেশ প্রশস্ত, মাধুর্যভরা মুখশ্রী পেলবতা হারিয়ে মলিন। এমন কী আর বয়স সুমনার? দুই মেয়ের মা মিলিকেতো এখনো কলেজে পড়ে বলে দিব্যি চালিয়ে দেয়া যায়। শোভনও দেখতে যথেষ্ট হ্যান্ডসাম এই মধ্যবয়সে। নিজের অজান্তেই বোধহয় মনে মনে একটু আত্মপ্রসাদ অনুভব করে শোভন।

‘কেমন আছো?’ বলতে গিয়েও বাক্যটি হারিয়ে যায় শোভনের আড়ষ্ট মুখগহ্বরে। অনেক প্রশ্ন মনে এসে থমকে যায়, বাহ্যত নিরুত্তাপ সুমনার অভিব্যক্তিতে। সুমনার ডিভোর্সের খবরটা শোনার পর অন্তত একটিবার ওর সাথে যোগাযোগ করার তীব্র ইচ্ছাটা দমন করতে নির্ঘুম কতো রাত পার করতে হয়েছে তাকে।

শোভন সেবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে। পয়লা ফাল্গুনের প্রোগ্রামে মামাতো বোন ঝুমার সাথে ক্যাম্পসে সুমনাকে প্রথম দেখা। শোভনকে সামনে পেয়ে ঝুমা অনুরোধ করল, বান্ধবীদের সাথে কয়েকটা ছবি তুলে দিতে। কপালে বড়ো লাল টিপ পরা, ডানপাশের স্মিত হাসিমাখা মুখটি ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে শোভনের বুকের ভেতর গেঁথে গেল যেন। মেয়েদের সামনে বরাবর অপ্রতিভ শোভন তারপর থেকে শুধু দূর থেকেই দেখত সুমনাকে। বাঁশির মতো টিকালো নাক নাকি গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল ঔষ্ঠ্যযুগল, কাজলকালো টানা চোখ, কী সুন্দর, কী অসুন্দর সেগুলো খুব একটা চোখে লাগত না শোভনের। শুধুই দেখা হলে, অষ্টাদশী মেয়েটির স্নিগ্ধতার আবেশে আবিষ্ট শোভনের বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠত। পথ চলতি শুভেচ্ছা বাক্য বিনিময়ের ফাঁকে ফাঁকে সম্পর্কটা তৈরি হতে মাস চারেক। এরপর চোখের পলকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফুরিয়ে গেল বছরটি।

একান্তে খুব বেশি সময় কেটেছে দু’জনার, সেরকমও নয়। ক্যাম্পাসে ক্লাসের ফাঁকে নিরিবিলিতে সুমনাই মুখর থাকত, শোভন মুগ্ধ শ্রোতা। পাশাপাশি পথ হাঁটত দু’জনে, নির্বাক কথোপকথনে। ঝুমার সাথে সুমনা শোভনের বাড়িও গিয়েছিল দু’বার। শোভনের মা আর দুই বোনের খুব পছন্দ ছিল সুমনাকে।

সুমনা ভয় করত খুব ওর বড়ো ভাইদের। তাই সুমনাদের এলাকায় শোভনের প্রবেশ ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। মাস্টার্সের রেজাল্ট হবে হবে করেও হচ্ছে না। শোভনের ছোটবোন রুমা তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে, শিমু কলেজে। রুমার বিয়ের সম্বন্ধ আসছে, বাবা মা তাই নিয়ে অস্থির সারাক্ষণ। এর মধ্যে সুমনার বিয়ের সংবাদে দিশেহারা শোভন। সেই সময়ে সুমনাকে অপেক্ষা করতে বলা ছাড়া আর কোনো উপায়ান্তর ছিল না শোভনের। নিশ্চিত,সুন্দর ভবিষ্যত ফেলে সুমনাকে তার অনিশ্চিত জীবনে খোলাখুলি আহ্বান করতে পারেনি সে। তবু বিশ্বাস ছিল, শোভনকে ছাড়া অন্য কারো সহযাত্রী হয়ে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত হয়ত শেষ পর্যন্ত নিতে পারবে না সুমনা।

সুমনার বিয়ের পরের বছরই শোভনের ব্যাংকের চাকরিটা হলো । পরপর দুই বোনের বিয়ের পর শোভন তখন অনেকটা ভারমুক্ত। এজিএম স্যারের খুব পছন্দ ছিল, সদ্য অফিসার থেকে সিনিয়র অফিসার হওয়া ধীরস্থির কর্মোদ্যমী মইনুল হোসেন শোভনকে। নিজের ছোটো বোনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলেন। মা বাবাও হন্যে হয়ে পাত্রী খুঁজছে তখন, শোভন দ্বিধাদ্বন্দ্বে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না।

সুমনার বিয়ের পর নীলক্ষেতে সেই প্রথম সুমনার সাথে দেখা। শোভনের অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল, হ্যাংলা পাতলা সুমনার একটু ভারী হয়ে যাওয়া সর্বাঙ্গে জ্বলজ্বল করছে কী সুখী সুখী পরিতৃপ্তির ছাপ! শোভনের বুকের তালাবন্দি তোরঙ্গে তুলে রাখা বাসন্তী রঙের শাড়িতে খোঁপায় গাঁদার মালা জড়ানো সেই অমলিন মুখের ছবিটা, সেদিনই যেন বদলে গেল।

মিলিকে দেখার পর বয়সের ব্যবধান নিয়ে শোভন খুব অস্বস্তিতে পড়েছিল। কিন্তু মায়ের ইচ্ছের জোরেই শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়ে গেল। প্রায় নয় বছরের ছোট মিলির আব্দার আহ্লাদ, বিয়ের পর প্রথম প্রথম বেশ উপভোগই করত শোভন।

ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকল বিত্ত বৈভবে বেড়ে ওঠা মিলির মধ্যকার নিরেট অহংকার। মধ্যবিত্ত টানাপোড়েনে শোভনের পরিবারের প্রতি মিলির গোপন তাচ্ছিল্যটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সময় সময়। বাবা মারা যাওয়ার পর একা হয়ে যাওয়ায় মাকে নিজের কাছে নিয়ে এল শোভন। কিন্তু মিলির আচরণগত কারণে মা যেন ঠিক সহজ হতে পারত না শোভনের সংসারে। নানা অজুহাতে দুই মেয়ের কাছে গিয়ে থাকত বছরের বেশিরভাগ সময়। বিয়ের এক বছরের মাথায় এ.জি.এম সাহেবের নিকট বোনের সুপারিশেই শ্বশুড়বাড়ির অঞ্চল রাজশাহীতে শোভনের বদলির অর্ডার। শোভনের শ্বশুরের পাঁচটা ফলের বাগান। দেশের বাইরে রপ্তানী হয় মিলিদের বাগানের অধিকাংশ আম, লিচু। মিলির বড়ো দু’বোনজামাইও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে ছা-পোষা শোভন যেন একটু বেমানান। ছোটোখাটো উপলক্ষ কেন্দ্র করে বিত্তবান শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় পরিজনদের নানা পার্টিতে মিলিকে সঙ্গ দিতে দিতে ক্লান্ত, শ্রান্ত শোভন। মাঝে মাঝে এড়িয়ে যেতে চাইলে বড়োভাই এর কাছে মিলির নালিশে শোভনের বিড়ম্বনার একশেষ।

এসব মান অভিমানেই ধীরে ধীরে মানিয়ে গিয়েছিল শোভনের দাম্পত্য জীবন। মুন আর মীম আসার পর নতুন ছন্দ পেল শোভন আর মিলির সংসার। গতকাল দীর্ঘকাল বাদে সুমনার সাথে দেখা হওয়ার রেশটা মনে মনে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল শোভনকে। অফিস থেকে ফেরার পথে জ্যামে আটকে থাকা লম্বা বিরক্তিকর সময়টুকু আর পাঁচটা দিন মোবাইল কিম্বা ল্যাপটপে চোখ রেখে পার করে দেয় শোভন। আজ পথটা যেন খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ‘সুমনার সাথে ঠিক কেমন হতো শোভনের সংসার, কতটা অন্যরকম হতে পারতো এই যান্ত্রিক জীবন? সেদিন ভূত-ভবিষ্যত ভুলে যদি শোভন প্রকাশ করত নিজেকে, তাহলে আজ…

গাড়িতে বসে এলোমেলো অসম্ভব সব ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিল শোভন। তবে কি মিলির প্রতি তার ভালবাসায় খামতি আছে এখনো? নিজের ভেতরটা খুঁড়ে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে শোভন। রিংটোনের সুরেলা শব্দে ধ্যান ভাঙে শোভনের, পাশের সিটে পড়ে থাকা মোবাইলের স্ক্রিনে মিলির হাস্যোজ্জল মুখে দৃষ্টি পড়তে যন্ত্রটা আলগোছে তুলে নেয় কানের কাছে ‘হ্যাঁ, বলো…

‘এ্যাই, তুমি কোথায় এখন?

‘এইতো প্রায় চলে এসেছি।’ ‘মীম আইসক্রিমের জন্য বায়না করছে, চকোলেট আইসক্রিম। মুনের কম্পাস ভেঙে গেছে, অংক করতে পারছে না। একটা জ্যামিতি বক্স নিয়ে এসো। আর হ্যাঁ, আমার নাইটক্রিমটা শেষ হয়ে গেছে। মনে করে নিয়ে আসবে কিন্তু’

‘জো হুকুম মহারানি… কথা শেষ হতে ম্রিয়মান হাসির সাথে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে শোভনের প্রশস্ত বুকের পোক্ত খোলস ভেদ করে।

এ্যপার্টমেন্টের কাছাকাছি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে এলে ড্রাইভার কে গাড়িটা রাখতে বলে শোভন। কী কী নিতে হবে ভাবতে ভাবতে আলোকিত বিপণীটাতে ঢুকে পড়ে আলো আঁধারি মন নিয়ে। আইসক্রিম, জ্যামিতি বক্স নিয়ে স্ত্রীর ফরমায়েশকৃত ক্রিমের খোঁজে নিপাট সংসারি মানুষগুলোর ভিড়ে মিশে যায় কর্তব্যপরায়ণ গৃহকর্তা মইনুল হোসেন শোভন।

Facebook Comments