শেয়ার করুন:

আজ সকাল সকালেই আফিয়ার পিঠে পড়ছে তাল। একের পর এক আব্বাস মৃধা দিয়ে যাচ্ছে পিঠে কিল, ঘুষি, পেটে লাথি আর মুখে গালি। ‘চুতমারানি ফকিরনি এইজন্যি তোরে বিয়া কইরা আনছি! সময় মতো ভাত দিবি না! খালি মারা দিয়া বেড়াবি। গতর সোহাগী নরম বিছানা ছেড়ে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করে না!’
সালেহার আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছিল পনেরো মিনিট। তাই আব্বাস মৃধা কে গরম ভাত, খাটি ঘিয়ে আলু ভর্তা, চিংড়ি ভাপা, ডাল ভুনা দিতে একটু দেরি হয়েছে। আবার ডাল ভুনায় লবণ কম। ডাল মুখে দিয়েই আব্বাস মৃধা হাঁক দেয়, ‘এই চুতমারানি এদিকে আয়। তোর মা চুতমারানি, খানকি মাগি তোরে কিছু শিখায় নায়?’ আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল আর মনে মনে আল্লাহ কে ডাকছিল। মনে মনে জপে চলছিল, ‘আল্লাহ এই জালেমের হাত থেকে তুমি আমারে বাঁচাও।’

এরই মধ্যে আব্বাস রান্না ঘরে এসে উলটে ফেলে দিয়েছে ডালের হাঁড়ি। প্রথমেই আফিয়ার চুল ধরে নীচে শুইয়ে দেয়। তারপর উপূর্যুপরী কিল, ঘুষি, লাথি। আব্বাস মৃধার বড় দুই ছেলে হুড়োহুড়ি করে খেয়ে স্কুলে গেছে। ছোট ছেলে দাওয়াইখানা বসে ভাত খাচ্ছিলো। বাপের অগ্নিমূর্তি দেখে ভাত ফেলে দৌড়ে মাঠে খেলতে গিয়েছে।

আব্বাস মৃধা শরীরের জ্বালা আর রিপুর দাবী মিটিয়ে বেরিয়ে গেছে গালি দিতে দিতে। বাজারের হোটেলে যেয়ে পরোটা, গরুর গোশত খাবে। হোটেলের লোকজন এসে বন্দনা করে বলে, যার অন্তত শত বিঘা জমি, ইউনিয়ন পরিষদের নামকরা মেম্বার তার ঘরে শান্তি না থাকলে চলে!
টিপসের আশায় মেম্বার সাহেবকে প্যাচের পরোটা ভেজে দেয় মুচমুচে করে। গরুর গোশত একটু বেশিই দেয়। সঙ্গে গরুর খাঁটি দুধের চা। খেয়েদেয়ে মেম্বার আড্ডায় মেতে ওঠে বাজারে।

বাজারেই মসজিদের মুয়াজ্জিন এর সঙ্গে দেখা। মুয়াজ্জিন লম্বা সালাম দেয় আব্বাস মৃধাকে। বলে, ‘মেম্বার সাহেবের মতো দীনদরদী লোক আর দেখি নাই। আপনাদের জমির ওপরেই তো মসজিদ খানা।’ মেম্বার অমায়িক হাসি হেসে বলে, ‘একসময় বাড়ি এসে চা – পানি খেয়ে যাবেন মুয়াজ্জিন সাব।’

মার খেয়ে চোখের জলে প্রায় দেড় ঘন্টা একইভাবে শুয়েছিল আফিয়া। এরই মধ্যে পাশের বাড়ির রহিম শেখের বউ এসে বলে, ‘তোমার বাপ এরচেয়ে তোমারে কাইট্টা গাঙ্গে ভাসাইয়া দিতে পারলো না? গরীব হইলেই কি মাইয়া কসাইয়ের কাছে দিতে হইব?’
আফিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে বলে, ‘তহন তো আমার বাপরে কইছে, আপনেরে দুই বিঘা জমি লেইখা দিমু, ঘর তুইলা দিমু আর পানির কলের ব্যাবস্থা কইরা দিমু। আমার মা মরা ছেলে তিনটার মা দরকার। তহন আমার সোনার বরণ গতর ছেল। এই জালেমের সংসারে পাঁচ বছর খেটে খেটে সোনার অঙ্গ ছাই করছি। দেওনের মধ্যে খালি দোচালা একখানা ঘর তুইলা দিছে। জমির কতা কইলে গালি দেয়। এতদিন কওনের পর আধাবিঘা জমি দিতে রাজি হইছে।’ দরদ ভরা গলায় হালিমা শুধায় ; বু বাচ্চাকাচ্চা নেও না ক্যান? আফিয়ার বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। বলে, ‘বু কিছুতেই রাজি করতে পারতেছি না। লোকটা আমারে হাসপাতালে পাডাইয়া কপাট্টি পরাইয়া নিয়া আইছে। খালি কয়, ছোট পোলাডার দশ বছর বয়স হইলে বাচ্চা নিবে।’ হালিমা মনে মনে বলে, ‘তহন তোমারে খেদাইয়াও দিতে পারে।’ হালিমা তাড়া দেয় আফিয়াকে বলে, বু উঠো। যা আছে ভাগ্যে তাই হবে। সংসার পরে আছে। উঠে খেয়ে ব্যাতার বড়ি খাইয়া লও।’

এরই মধ্যে প্যাক প্যাক শুরু করেছে আফিয়ার এক ডজন হাঁস, দশ দশটা মুরগী কক কক করে, হাম্বা ডাকে মাতিয়ে তুলেছে তিন তিনটি গরু। আফিয়া ওদের সকলের জননী। ওদের সকলের ক্ষুধায় অন্ন সরবরাহকারী। সবার পেট ঠান্ডা করে নিজে আগায় খাবার খাওয়ার জন্য। আসতে আসতেই চোখে পড়ে সীমের ফুল, লাউ এসেছে গাছে, লাল শাকগুলো লক লক করে বেড়ে উঠেছে।

মেম্বারের আজ বন্ধুর বাড়ি দাওয়াত হয়েছে। দাওয়াতে যাবার উদ্দেশ্যে বাড়ি ফেরার পথেই দেখে ছাগল বাঁধতে যাচ্ছে আলমগীর এর বউ। বউটা আগে তবু ব্লাউজ পরতো। ওর বাস হেল্পার স্বামীর আয় রোজগারে ভাটা পড়েছে করোনাকালে। ব্লাউজ ও জোটে না আজকাল। ময়লা, ছেড়া শাড়ির নীচে স্তনযুগল যেন কচি লাউয়ের মতো মোহনীয় হয়ে ঝুলে আছে। ডাগর চোখগুলো পটলচেরা। কাঁচি হলুদ গায়ের রঙ তার।
মেম্বার মনে মনে বলে, বাস হেল্পার এর ঘরে অমন বউ বড় বেমানান।
মেম্বার বলে, কিগো আম্বিয়া পান টান তো খাওয়াতে পারো। আম্বিয়া লাজুক দুষ্ট হাসি হেসে বলে আইলেই তো মেম্বার ভাইরে খাওয়াই। মেম্বার হাতে পাঁচশত টাকার নোট গুজে দিয়ে বাড়ির পথ ধরে।

আফিয়া দুপুরের রান্নাবান্না সেরে ঘর দোর ঝাড়ু দিয়ে। গরু, হাঁস, মুরগী সবের খাবার দিয়ে গোসল সেরে আসতে, আসতে প্রায় চারটা বেজে যায়। সন্ধ্যায় ছেলেরা পড়তে বসলে ছেলেদের বানিয়ে দেয় তেলের পিঠা। প্রায়ই মেম্বার ও সন্ধ্যায় বাড়ি আসে লোকজন নিয়ে। দাওয়ায় বসে চা খায়, তেলের পিঠা খায়। আজও আফিয়া পাঠিয়ে দিয়েছে বড় ছেলেকে দিয়ে।

পরের দিন বাজার থেকে মেম্বার একটা লাল আর জরি মিশেল নীল শাড়ি নিয়ে এসে আফিয়ারে হাঁক দিয়ে ডাকে। কই সবজি ওয়ালার ঝি মুখটা একটু দেখা। আফিয়া আসলে শাড়িটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, জানস তো, রাগ উঠলে আমি মানুষ থাহি না। কাইল রাইতে তোরে সোহাগ করুম। আইজ একটু কয়জন বন্ধু মিলে গপ্পো সপ্পো করি।

পাশের বাড়ির গফুর আসে আফিয়ার সঙ্গে ছলে ছূতোয় গল্প করতে। বলে ভাবী, গায় গতরে তো কম নাই। কোনো সাহায্য সহযোগিতা লাগলে কিন্তু কইয়েন। আফিয়া একটা পবিত্র হাসি হেসে বলে, ভাই তোমাদেরকে নিজের ভাই ছাড়া কোনোদিন অন্যচোখে দ্যাকতে পারি না। যদি তোমার এই বুনুর কোনো উপকার লাগে অবশ্যই কমু। আইজ আমারে কয়ডা নারিকেল পাইড়া দিয়া যাও। নারিকেল পাড়া হলে আফিয়া গফুরের হাতে তিনটা নারকেল দিয়ে দেয়। গফুর আর কোনোদিন আফিয়ার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকায় নি।
মনে মনে গফুর ভাবে, অমানুষ মেম্বারের ঘরে কত ভালো বউ, ঘর সংসার ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না।

রাইত বারোটা বাজলেই আম্বিয়ার দরোজায় টোকার শব্দ হয়। ঘরে ঢুকেই টোকা দেয়া লোকটা বলে, আম্বিয়া তোমার ছেলে কই? আম্বিয়া হাতে পান গুজে দিয়ে বলে, অত চিন্তা ক্যান মেম্বার সাইবের? আমি কি নাদান? পাশের ঘরে ঘুমায় সোনার চান আমার। তারপর সারা রাত দুটি দেহ উপভোগ করেছে দুটি দেহের উষ্ণতা আর উদগ্র বাসনা।

অগ্রহায়ণ থেকে পৌষ মাস অব্দি আফিয়ার এক সোনালি সময় কাটে। নতুন ধানের গন্ধ বাড়ির আঙিনায় ভুর ভুর করে। আফিয়ার গায়ে গতরেও যেন সে গন্ধ লেগে থাকে। মেম্বার সবসময়ই সবকিছুর হিসাব রাখে না। কুটা বিক্রির টাকা, দুএক বস্তা ধান বিক্রি করেই কয় বছরে আফিয়া এক জোড়া কানের দুল বানিয়েছে। শীতকালে হাঁসগুলো ও ডিম দেয় ভালো। মাঝে মাঝেই দু এক ডজন ডিম বাপের বাড়ি দিতে পারে। তাছাড়া দু’এক বস্তা চালও পাঠায় বাপের বাড়ি।
সবমিলিয়ে আফিয়া এই সংসারের গৃহিণী হয়ে সুখী। ছেলে তিনটাও আম্মা বলে ডাকে।

আম্বিয়ার স্বামী মাসে পনেরো দিন আয় রোজগারের জন্য ঢাকা থাকে। বাকি পনেরো দিন বাড়ি থাকে। অই পনেরো দিন আফিয়া মাথায় সুগন্ধি তেল মাখে, ট্যালকম পাউডার মাখে। মাইর ধর করলেও মেম্বার অই সময় জোর করে হলেও সোহাগ করে। মেম্বারের প্রাপ্তির পেয়ালা সবদিক থেকেই পরিপূর্ণ।

এলাকায় অনেকেই মাসে অন্তত তিন, চার রাত মেম্বার কে আম্বিয়ার ঘরে টোকা দিতে দেখেছে।
আজকাল আম্বিয়ার পরনেও দেখা যায় নতুন শাড়ি, ব্লাউজ। গা গতর থেকে ফেটে পরছে রূপ যৌবন।

আম্বিয়ার স্বামী ভাসা ভাসা কিছু শুনেছে মানুষের মুখে। কিন্তু গায়ে মাখে না। কারণ সংসারের উন্নতি হচ্ছে, তাছাড়া আলমগীর বাড়ি থাকলে মেম্বার কাছে ঘেষে না। আলমগীর ভাবে, কিছু বলতে গেলেও বিপদ আর এই বউ ছাড়তে গেলেও মেম্বার বিচার বসিয়ে আলমগীরকে বিপদে ফেলবে। এলাকার সব হুজুরও মেম্বারের পক্ষে। মেম্বার চেয়ারম্যান এর ডাইন হাত। আলমগীরের মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

হঠাৎই ঢাকা থেকে আম্বিয়ার মোবাইলে ফোন আসে। আম্বিয়ার স্বামী আলমগীর হোসেন রোড এক্সিডেন্ট করে মারা গেছে। থেতলে গেছে আলমগীরের মাথা। মেম্বার লোকজন পাঠিয়ে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে এলাকায় লাশ নিয়ে এসে দাফন করানোর ব্যবস্থা করে। আম্বিয়াকে টাকা পয়সা দিয়ে মিলাদেরও ব্যবস্থা করে।

সুদিন বুঝি পথের মতই মিলিয়ে যায়। মেম্বার ধীরে ধীরে আফিয়ার কাছে কথা তোলে। সংসার এত বড় তুই একলা পারিস না। আম্বিয়ারে আনি। তুই হুকুম করবিও খাটবে। আফিয়া দৃঢ় কন্ঠে বলে, না আ। বাইরে আপনে যা ইচ্ছা করেন। ঘরে আমি সতীন সইতে পারমু না।

নতুন শাড়ি, সোহাগ, সুগন্ধি তেল কোনকিছু দিয়েই যখন কাজ হচ্ছে না। আব্বাস বাড়িয়ে দেয় অত্যাচারের মাত্রা। পান থেকে চুন খসলেই মেরে জখম করে আফিয়াকে। আফিয়া আবার হাঁসের প্যাক,প্যাক, মুরগীর ককাক কক, গরুর হাম্বা ডাকে ব্যাথা বেদনা ভুলে উঠে দাঁড়ায়। থালাবাটি ধুতে পুকুরে গেলে মাছগুলো পানির ভেতর ভীড় করে, আফিয়া ভাত দেয়, কুড়া দেয়। এ যেন এক পরম মায়ার জাল বিছানো এই জীবনের পরতে পরতে।

আম্বিয়ার দরোজায় আজকাল সপ্তাহে দুই তিন রাত টোকা পরে। আম্বিয়ার স্বামী মারা গেছে এই পাঁচ মাস। আজকাল আর আফিয়াকে রাতে মেম্বারের প্রয়োজন পরে না বললেই চলে। আফিয়া সবকিছু জেনেও ভ্রুক্ষেপ করে না। মনে মনে বলে, অই জালেম যা খুশি করুক। সংসার আমার হাতে থাকলেই চলে। এরই মধ্যে একরাতে আম্বিয়া মেম্বার কে জানায়, সে পোয়াতি মেম্বার ঘরে না তুল্লে সে সবাইকে সব জানিয়ে গলায় দড়ি দেবে। মেম্বার বলে সদর হাসপাতালে যেয়ে বাচ্চা ফেলে আয়। তোর তো পোলা আছেই। ঘরে আমি তোরে আইজ নাইলে কাইল তুলমু। কিন্তু আম্বিয়া সুযোগ হেলায় হারাতে নারাজ। সে জানায় পোয়াতি কালের সাড়ে তিনমাস। এখন কেউ সহজে রাজি হইব না। তবে সে চেষ্টা করে দেখবে। তবে তারে একবিঘা জমি দিতে হইব।

হাড় ভাঙা খাটুনি আর মেম্বারের মার খেয়ে খেয়ে ছোট খাটো মানুষ আফিয়া আজকাল প্রায়ই জ্বরে ভোগে। এর মধ্যে একদিন ছোট ছেলে সন্ধ্যায় তেলের পিঠার বায়না ধরে। আফিয়া প্রথমে বুঝিয়ে বলে, যে সুস্থ হয়ে বানিয়ে দেবে কিন্তু আজগর (ছোট ছেলে) কিছুতেই মানছিল না। আফিয়া রাগের মাথায় গালে আস্তে একটা থাপ্পড় দেয়। আর আজগর চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। এমন সময় মেম্বার বাড়ি প্রবেশ করে। আজগরকে কাঁদতে দেখেই মেম্বার জিজ্ঞেস করে, আজগর কি হইছে? বাপ আমার! আজগর চিৎকার দিয়ে বলে, আম্মায় আমারে মারছে। আমি তেলের পিটে (পিঠা) খাইতে চাইছি তাই। আব্বাস মৃধার চোখ দিয়ে আগুন বের হয়। বলে আইজকা চুতমারানি মাগীর একদিন কি আমার একদিন। আফিয়ার চুল ধরে নীচে ফেলে দিলে আফিয়া পা জড়িয়ে ধরে বলে, আমার গায়ে জ্বর, আমারে মাইরেন না। আপনের দোহাই লাগে। মেম্বার বলে তোর জ্বরের মায়রে বাপ। তোর মতো খানকির লগে আমি আর সংসার করমু না। তোরে তালাক দিলাম। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক, তোরে দিলাম বাইন তালাক। আফিয়াকে রাতে পাঠিয়ে দেয়া হয় রান্নাঘরে শুতে।

পরের দিন খবর পাঠানো হয় আফিয়ার বাবাকে। দিয়ে দেয়া হয় দেনমোহরের পঁচিশ হাজার টাকা আর খোরপোষের দশ হাজার টাকা। পরের দিন সকালে আফিয়া বাপের বাড়ির উঠানে জ্বর গায়ে রোদে বসে আছে ; আফিয়ার চোখে ভেসে ওঠে হাঁস, মুরগীর পাল, গরুর খড় খাওয়া, পুকুরের পানিতে আসা মাছের ঝাঁক। কানে বেজে ওঠে প্যাক,প্যাক, ককাক কক, হাম্বা হাম্বা। মনে পড়ে নতুন ধানের গন্ধ। অজান্তেই বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে সং সা আর!

Facebook Comments