শেয়ার করুন:

 

সমাজে-রাষ্ট্রে যখন কোনো অন্যায়ের সূচনা হয় তখন প্রথম প্রতিবাদ আসে শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গন থেকে। শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষেরা দ্রুত এই অন্যায় ও অন্যায্যতাকে ধরতে পারেন তত দ্রুত সাধারণ মানুষ পারেন না। তাই শিল্পী-সাহিত্যিকরাই অবিচার, বিশৃঙ্খলা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ করেন। এ দলে অবশ্যই বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কথাও উল্লেখ্য। সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষরা যেমন তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের (নাটক, গান ইত্যাদি) মাধ্যমে কুপ্রথা, ধর্মান্ধতা, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, তেমনি সাহিত্যিকরাও অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে কলম ধরেন দৃঢ়ভাবে। আবার একজন চিত্রশিল্পী যখন প্রতিবাদ করেন, তখন স্বাভাবিকভাবে মাধ্যম হিসেবে তিনি চিত্রকলাকেই বেছে নেন। সেই সাথে ব্যক্তির যাপন, রাজনীতি, বিশ্বাস ও আদর্শ তো রয়েছেই। চিত্রকলাকে অবলম্বন করে শত শত বছর ধরে বিশ্বের অসংখ্য চিত্রশিল্পী অসুন্দরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মিছিলে রাজপথে থেকেছেন। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায় মেটানোর পাশাপাশি শিল্পী মিটিয়েছেন শিল্পের দায়ও।

 

বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী কর্তৃত্বধারী, নৃশংস অ্যাডলফ হিটলার সমালোচিত হয়েছেন, আর কেউ তেমনটা হয়েছেন কি না তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। হিটলারের সময়কালে অনেক বরেণ্য চিত্রশিল্পীই ছিলেন, যারা স্বভাবতই ছবির মাধ্যমে হিটলারের কর্মকাণ্ডের জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সালভাদর দালি সেসব শিল্পীদের অন্যতম। সুররিয়ালিজম ধারার এই শিল্পী হিটলারকে এঁকেছিলেন একজন নারী হিসেবে। হিটলারকে নারীর রূপ দেয়া ব্যতিক্রম ও জোরালো প্রতিবাদ বটে। এ ছাড়া ‘দি ইনিগমা অব হিটলার’ও হিটলারকে নিয়ে আঁকা দালির একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি। এই ছবি আঁকার পর দালি তাঁর স্বভাবসুলভ স্বাভাবিকতাই বৈশ্বিকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন।

অন্যদিকে হিটলার তাঁর মতার্দশের বিরুদ্ধে যাওয়া চিত্রকর্মগুলো জোর করে বিভিন্ন মিউজিয়াম ও সংগ্রহশালা থেকে নিয়ে এসেছিলেন। এমনকি এসব ছবি বিক্রি ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছিলেন। হিটলার এসব ছবির নাম দিয়েছিলেন ‘অবক্ষয়ী শিল্প’। সেসময়ে হিটলারের নির্দেশে শতাধিক মিউজিয়াম ও ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে প্রায় ২০ হাজার চিত্রকর্ম জব্দ করা হয়। হিটলারের শাসনবিরোধী এ চিত্রকর্মগুলো কর্মপক্ষে ৪শ’ শিল্পীর আঁকা। জব্দ করা ছবিগুলোর মধ্যে পাবলো পিকাসো, মার্ক শাগাল, অঁরি মাতিস, অটো ডিক্স, ম্যাক্স লিবারম্যান, এমিল নলডে, ফ্রাঞ্জ মার্ক, ম্যাক্স বেকম্যান প্রমুখ বিশ্ববরেণ্যদেরও ছবি ছিলো। ছবি জব্দ দিয়েই শেষ নয় এমন অনেক শিল্পী আছেন যাঁরা নিজ শাসকগোষ্ঠীর শাসন অথবা প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে যাওয়ায় তাঁদেরকে জেল, অত্যাচার ও নিগৃহের শিকার হতে হয়েছে।

দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কণ্ঠধারী পৃথিবীর আরেক বরেণ্য চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো। দুঃশাসন, মিথ্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে পিকাসোর অবস্থান সবসময়ই ছিলো অবিচল। চিত্রকলাকে তিনি প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন বহুবার। তাঁর বহুল আলোচিত চিত্রকর্ম ‘গের্নিকা’। এটি স্পেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালিন সময়ের আঁকা। ১৯৩৮ সালের ২৬ এপ্রিল স্পেনের জাতীয়তাবাদী বাহিনীর নির্দেশে উত্তর স্পেনের গ্রাম গের্নিকায় বোমা হামলা হয়। এতে শত শত মানুষ নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রতিবাদে এ চিত্রকর্মটি আঁকেন পিকাসো। তিনি গের্নিকায় বোমবর্ষণ পরবর্তী বিভৎসতা, কদর্যতা, লোমহর্ষক ও অমানবিকতা এ চিত্রকর্মে তীব্রভাবে তুলে ধরেছেন। গের্নিকা আঁকার পরপরই এটি যুদ্ধবিরোধী প্রতীক হিসেবে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি বিশ্ব দরবারে স্পেনের গৃহযুদ্ধের কদর্যতাকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করে। যার কারনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ গৃহযুদ্ধ অবসানের প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। পিকাসো বলতেন, ‘চিত্রকলা কেবল হচ্ছে শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষার অস্ত্র। আমি সবসময়ই শিল্পকে মারণাস্ত্র ভেবে সময়ের সঙ্গে লড়াই করেছি। বিবেক, বুদ্ধি ও হৃদয় দিয়ে আমি এক এক করে শিল্প রচনা করি।’ একারণেই পিকাসো স্পেনের দুঃশাসক ফ্রাঙ্কোর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কখনো আপস করেন নি। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাবার জন্যে ফ্রাঙ্কো-সরকারের ছাড়পত্র নিতে হবে বলে পিকাসো আর সেখানে যান নি। উল্টো তিনি ফ্রাঙ্কোর শাসনকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘ফ্রাঙ্কোর কাছ থেকে কাগজ নেবার মতো ঘৃণ্য কাজ আমি করতে পারি না। আর আপনাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি যে, পিকাসো নির্বাসনে আছে মানে স্পেন দেশটাই নির্বাসনে আছে।’ এমনি প্রতিবাদী ও নির্ভিক ছিলেন পিকাসো সেই প্রতিবাদ যেমন চিত্রকর্মের, তেমনি ব্যক্তিগতও।

 

পিকাসোর খানিক আগে প্রচলিত সংস্কৃতি, পুঁজিসভ্যতা ও শাসকদের আচরণের বিরুদ্ধে যুথবদ্ধ কথা বলতে গিয়ে জন্ম নেয় দাদাবাদ বা দাদাইজমের। এমন চিন্তা লালন ও ধারণ করেই একদল প্রতিভাবান শিল্পীগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। তারা স্পষ্টভাবেই যুদ্ধ, হানাহানি, পুঁজিবাদকে ঘৃণা করতেন। এ গোষ্ঠীর শিল্পীদের আঁকায় ও যাপনে প্রচলিত ধারণার প্রতি তাঁদের ক্ষীপ্ত ও অবিশ্বাসী মনোভাব বারবারই মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯২২ সাল পর্যন্ত দাদাবাদ সারা বিশ্বে খুব আলোচিত ছিলো। ম্যাক্স আর্নেস্ট, মার্সেল জ্যাঙ্কো, হার্নস বেলমার, ম্যান রে, বেনজামিন প্যারেট, ফ্যান্সিস পিকাবিয়া প্রমুখ এ ধারার বরেণ্য শিল্পী।

 

ধনিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে কজন শিল্পী শক্ত অবস্থান নিয়েছেন তাঁদের মধ্যে কামিল পিসারোর কথা বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর জন্ম ১৮৩০ সালে ভার্জিন আইল্যান্ডে। তিনি কিশোর বয়স থেকেই ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ অবস্থান নেন। নিম্নবিত্ত মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিলো অতুলনীয়। বিশেষত শ্রমিক শ্রেণির প্রতি তাঁর অন্তর্নীন টান ছিলো। যার কারণে পুঁজিবাদ, ধনিক, শাসক শ্রেণির প্রতি রূঢ় ছিলেন। তাঁর নানা চিত্রকলাতেও এসব বিষয়ের ছাপ পড়েছে। তিনি সযতনে নাগরিক জীবন, ধনিক শ্রেণির পরিবেশকে এড়িয়ে গেছেন। তাঁর সাথে ভ্যান গগের ‘শ্রমিকপ্রীতি’র কথাও এখানে উল্লেখ্য। আবার ফ্রেডরিক বাযিল ছিলেন একটু ভিন্ন ধরনের। বরেণ্য এ চিত্রশিল্পী রণক্ষেত্রে গিয়েছেন। তিনি ১৮৭০ সালে ফরাসীদের হয়ে  ‘ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান’ যুদ্ধে অংশ নেন এবং জার্মানদের হাতে নিহত হন। জন্ম-মৃত্যু-সৃষ্টি ও চিন্তাকে যেন তিনি এক সুঁতোয় গেঁথে দিয়ে গেছেন।

 

মেক্সিকান চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরা মনে করতেন, ছবি আঁকা হচ্ছে প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেয়া, বিপ্লবে শামিল হওয়া। তিনি নিজে রাজনীতি সচেতন ছিলেন এবং সাম্যবাদী চিন্তা লালন করতেন। স্বদেশ ও উপমহাদেশের ওপর শত শত বছরের পীড়ন সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা ছিলো। সেকারণেই তিনি মুক্তির পথ হিসেবে চিত্রকলাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি প্রত্যন্তভাবে রাজনীতি করতেন, নিজের সংস্কৃতিকে বৈশ্বিকভাবে উপস্থাপন করতেন। পুঁজিবাদ, শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলাতে রিভেরার প্রতি আমেরিকান শাসক ও পুঁজিবাদী সমাজ তীব্র অসন্তুষ্ট ছিলো। তারাই একসময় রিভেরার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ দাঁড় করালেন। সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিলো রিভেরা ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করিয়েছেন এবং শিল্প সৃষ্টির আড়ালে কমিউনিজমের তত্ত্ব প্রচার করছেন’। সাথে সাথে এটাও যুক্ত করা হলো যে ‘তাঁর চিত্রকলায় যৌনতার চাপটাও প্রবল ও নগ্ন। তাকে পর্নোগ্রাফি বললেও চলে।… মানুষের জীবনের নেতিবাচক দিকই অনূদিত হয়েছে রিভেরার কাজে।’ রকফেলার সেন্টারের লেলিনের মুখ আঁকা নিয়ে রিভেরা চরম সমালোচনা ও সমস্যার মুখোমুখি হন। সাধারণ মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে মিছিল বের করে। এমনকি রকফেলার সেন্টারের ‘মানুষ, ভ্রম্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক’ শিল্পকর্মটিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। রিভেরা মেক্সিকো ফিরে এলো সেখানেও তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। শরবিদ্ধ হলেও শিল্পী চিত্রকর্ম থেকে দূরে সরে যান নি। যার ফলে ‘আফটার দ্য স্ট্রম’, ‘দি অ্যালার্ম ক্লর্ক’, ‘দ্য ওমেন এট দ্যা ওয়াল্ড’সহ আরো অনেক চিত্রকর্ম এ শিল্পীর কাছ থেকে বিশ্ববাসী অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালে পাবলো পিকাসো যেমন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছবি এঁকেছেন, তেমনি বাঙালি যখন দুঃশাসন ও শোষণের শিকার তখনও চিত্রশিল্পীরা রঙ-তুলি হাতে নিয়েছিলেন। ক্যানভাসকে তাঁরা করেছেন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র। উপমহাদেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের নাম এ আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রাজনীতি ও সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে কামরুল হাসান বসে থাকতে পারেন নি। তাই মুক্তিযুদ্ধকালিন প্রবাসী সরকারের ‘আর্ট ও ডিজাইন সেন্টার’-এর গুরু দায়িত্ব তিনি তুলে নিয়েছেন নিদ্বিধায়। সেখানেই দায়িত্বরত অবস্থায় তিনি আঁকেন বিখ্যাত ছবি ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’। তিনি এই চিত্রকর্মে ইয়াহিয়া খানের মুখমণ্ডলকে দানবের বিভৎস আদলে উপস্থাপন করেছেন। কামরুল হাসানের আঁকা এ ছবিতে প্রথম দেখায় চোখে পড়বে ‘রাঙানো চোখ, রক্তলাল জিব ও বিষদাঁত’। শাসক ইয়াহিয়া নামমাত্র মানুষ হলেও তিনি প্রকৃত অর্থে ছিলেন দানবতূল্য শোষক। ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ চিত্রটি কেবল ইয়াহিয়াকে এককভাবে নয় বরং প্রতীকীভাবে পুরো হানাদারদেরই প্রতিচ্ছবিকেই বহন করে। কামরুল হাসান তাঁর প্রতিবাদের ধারা মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলেন। ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ আঁকার কয়েকমিনিট পরেই হৃদক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ ছিলো স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আঁকা কার্টুনচিত্র।

 

সুন্দর ও সমৃদ্ধ সমাজের প্রত্যাশা করেন শিল্পীবৃন্দ। সমাজ ও রাষ্ট্র যখন ভুল পথে হাঁটে, শাসক যখন অন্ধ, রাজনীতি যখন হয়ে ওঠে ব্যক্তি স্বার্থসংশ্লিষ্ট শুদ্ধতা মলিন হয়, যাপন হয় বিষাদ গ্রস্থ ক্লান্ত এই ক্ষেত্রে যাওয়া সময়কে শিল্পীরাই প্রথম অনুধাবন করতে পারেন। সচেতন ও বিশেষ মানুষ হিসেবে তাঁরাই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কখনো এই রুখে দাঁড়ানো বা প্রতিবাদ ভাষা পায় রঙ ও তুলিতে; আবার এমনও হয় শিল্পী নিজেই তাঁর কণ্ঠকে উচ্চকিত করেন এবং সুন্দরের আহ্বানধ্বনি ছড়িয়ে দেন বিশ্বময়। বিগত কয়েকশ’ বছর ধরে এভাবেই শিল্প ও শিল্পী প্রতিবাদের তপ্তভূমিতে হাতে হাত রেখে চলে এসেছে, জন্ম দিয়েছে বিবিধ আন্দোলন ও প্রতিক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে গেছে সভ্যতা ও সুন্দরকে।

 

Facebook Comments