শেয়ার করুন:

কষ্ট

তুমি আমায় কষ্ট দিও আনন্দ চাই না
আনন্দ আজ হাট-বাজারে কষ্টতো পাই না
নেবার যে সে যাক না নিয়ে আনন্দভান্ডার
হোক সে মালিক বাড়ি-গাড়ি, রাষ্ট্রীয় ঝান্ডার
আমার শুধু কষ্টটা থাক একান্ত আমার
বুকের করায়ত্তে থাকুক কষ্টেরই খামার
কষ্ট চাষাবাদেই আমার ছড়িয়ে যাক নাম
কষ্ট পেতেই চালিয়ে যাব কষ্টেরই সংগ্রাম।

লোভ

এই যে দালানের সারি, হাডসনের তীরে গড়ে ওঠা প্রায়ান্ধ সভ্যতার মন্যুমেন্টগুলো,
মানুষের ক্রমবর্ধমান লোভের গুদামঘর ছাড়া কিছু নয়
নিজেদের জন্যে নির্মিত সুশোভিত জেলখানা একেকটা,
স্বেচ্ছাবন্দিত্বের অতি পুরাতন নিদর্শন

মানুষের পছন্দ স্বাধীনতা, কিন্তু বন্দিত্বই পরিণতি
লোভ এবং প্রতিযোগীতাই এর জন্যে দায়ী

লোভের চেয়ে দীর্ঘ মানুষই কেবল স্বাধীন।

পাতা ঝাঁঝি

(Venus Flytrap)

এটি খুব সাধারণ এবং পুরনো গল্প

আপনারা সবাই প্রেমের দেবী ভেনাসের কথা জানেন, গ্রীকদের কাছে যিনি
যৌনতার প্রস্ফুটিত গোলাপ, আফ্রোদিতি
মর্ত্যের মানুষ এডোনিসের সাথে হয় গভীর প্রণয় স্বর্গের দেবী ভেনাসের।
কবি অভিদের সাথে আরো একজন
দেখে ফেলে অসম মৈথুন ফলৈ-ওক অরণ্যের
স্যাঁতস্যাঁতে নরোম কাদায়
পাপরতির মূক-সাক্ষী অতি ক্ষুদ্র এক তৃণ
আতঙ্কে-উৎকণ্ঠায় হঠাৎ পায় মানবকন্ঠ।
ফলৈ-ওক অরণ্যের নরম কাদায়, পাপবোধে মূর্ছা যায় ক্রন্দনরতা ক্ষুদ্র তৃণ।

মৈথুনক্রিয়া শেষে ক্ষুদ্র সে তৃণটিকে কোলে তুলে
নেন দেবী, দেন স্বীয় যৌনাঙ্গের বর।

ভেনাসের যোনি নিয়ে ফুটে আছে পাতা ঝাঁঝি শহরের প্রতিটি শোবার ঘরে
প্রতিদিন ফাদে ফেলে গিলে খায় অজস্র ভ্রমর।

অচেনা শহর

অচেনা শহরে অচেনা অনেক লোক
কারো কারো চোখে মৃত নগরীর শোক
কারো চোখে দেখি ভয়াবহ দুর্যোগ
সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে কারো চোখ
চারপাশে কিছু কাস্তের মতো নোখ
রক্তলোলুপ পায়ে পায়ে কিছু জোঁক
কেউ গেলে শুধু লোভী শৃগালের ঢোক।

আমার যে তবু অচেনার প্রতি ঝোঁক
প্রতিদিন কিছু নতুন বন্ধু হোক।

এল সালভাদর

মাঝরাতে খাড়া হয় এল সালভাদর
চিলের সঙ্গীত চেতন সত্তার ছেনালি শৃঙ্গার
ঘাটের মাস্তুল ডুবে যেতে যেতে আড়চোখে চায়
একজোড়া লক্ষ্মীপেঁচা চেপে ধরে জেটির নাবিক
কালচে পন্টুন দুলে ওঠে আলফ্রেডো আলফ্রেডো বলে…
এপার-ওপার। হাত সাফাই চলে রাতভর। য়্যুনিফমর্ সহচর।
ঘাটের টানেই চিরকাল ছুটে যায় দূরের শহর
বুক দিয়ে রাত্রি ঢাকে এ শহর, উন্মাসিক
মাঝরাতে মালিভুর জলে ডুবে যেতে যেতে
সটান দাঁড়িয়ে পড়ে এল সালভাদর…
.
রোজ রাতে মেঘ করে দূরের আকাশে
বৃষ্টির তাপে পোড়ে এল সালভাদর
কোর্তার পকেটে শীতল বাতাস নিয়ে হাঁটে হোসে নেপোলিয়ন
তবু বৃষ্টির উত্তাপ, ও হোসে, হোসে নেপোলিয়ন…
জামার বোতাম খুলে ডাকে নগ্নবক্ষ তাপাক্রান্ত সালভাদরিয়ান তরুণীদল
বাঁচাও, বাঁচাও, এক পশলা শীতল বাতাস দাও…একটি চুমু…
সান সালভাদরে ঢং ঢং ঘণ্টা বাজায় ভোরের ক্যাথিড্রাল
সকালের রোদে মুছে যায় তাপের প্রদাহ।
৩.
হন্ডুরাস হামাগুড়ি দিয়ে নেমে আসে, অন্ধকারে
বুকে ফুটবল ফুটিয়ে হাঁটেন সালভাদরিয়ান তরুণীরা
কেড়ে নেবে? হন্ডুরাস?
সালভাদরিয়ান রক্তের স্রোত নেমে যায় পশ্চিমে, প্রশান্ত নীল জলে
বিজয়, একটি দীর্ঘ চুমু
মাঝরাতে ফের জেগে ওঠে এল সালভাদর।

স্বাধীন বাংলাদেশ

(যুদ্ধশিশু মনোয়ারা ক্লার্ক কে)

যুদ্ধ শিশু
শুদ্ধ শিশু
একাত্তুরের বুদ্ধ-যীশু
এই শিশুটি পদ্মা এবং মেঘনা নদীর জল
সব বাঙ্গালীর রক্তস্রোতে বইছে অবিরল
এই শিশুটি রমনার মাঠ রেসকোর্স ময়দান
এই শিশুটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-গান
এই শিশুটি উত্তাল মার্চ, বজ্রকন্ঠ ধ্বনি
এই শিশুটি তোমার আমার সবার নয়ন মনি
এই শিশুটি একটি জাতির সগৌরব উন্মেষ
এই শিশুটিই সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ।

পা

আজকে দুটো পা কিনেছি আমি
ওই দুটো পা ছিল না খুব দামী
পড়েই ছিল অবহেলায় খোলা টেবিলটাতে
কি খুঁজতে কি খুঁজে পেলাম,
ওরা আমার হাতে।
মোটাসোটা মাংসল পা রঙটি খুবই কালো
কী বিচ্ছিরি নোখের ওপর পড়লো এসে আলো
ওখানে তো কাদামাটি, দূরের ধূলিঝড়
পায়ের ওপর তখন দেখি খাড়া একাব্বর।

একাত্তুরে এই দু’পায়েই মাড়িয়ে কাদা-জল
এনেছিলো এক মুঠো রোদ টকটকে উজ্জ্বল
হঠাৎ আমায় হেচকা টানে নামিয়ে দিলো পথে
কোথায় যেন লাগলো আঘাত
অচেনা কোন ক্ষতে!
একাব্বরের পাশে আমি, সমান্তরাল কাঁধ
নব্বুইয়ে তো গুঁড়িয়ে দিলাম স্বৈরাচারের বাঁধ।

আজকে এমন ভিতু আমি, বুক কাঁপে থরথর
ব্যক্তিগত সুখে আমার নিমগ্ন অন্তর
আমার দেশের জমি চষে অন্য দেশের ভুত
সুখে আমি আঙুল চুষি, আহা কী অদ্ভুত!

হে পাও সুখি পাও পথে নেমে যাও
আরও যতো পাও আছে সাথে করে নাও
দুই থেকে চার, আট, ষোল হয়ে যাক
রাজপথ– আলপথ সরবে দাঁড়াক

আজ যে দুটো পা কিনেছি এই দুটো পা কার?
এই দুটো পা বদলা নেবে সমস্ত হত্যার
এই দুটো পা বাংলাদেশের জমিন থেকে আসা
এই দুটো পা একাব্বর আর মঞ্জুরালী চাষা
এই দুটো পা একাত্তরের, এই দুটো পা লাল
এই দুটো পা গণতন্ত্রের মিছিল কী উত্তাল
এই দুটো পা রুখে দেবে কারসাজি-রামপাল
এই দুটো পা মাড়িয়ে দেবে অশুভ জঞ্জাল।

মেলার মাঠে চলছে কানাঘুষা
মেয়েটি যেন আরক্তিম এক উষা
বলছে আমায়, পা দুটো কি দেবো?
আমিও ভাবি, এই দুটো পা নেবো?

এই দু’পায়ে কেমন যেন জলোচ্ছাসের গান
এই দু’পা কি দেবে আমায় পথেরই সন্ধান?
এই দু’পায়ের ওপর খাড়া গাজী একাব্বর
এই দু’টি পা লোহার মতো সুদৃঢ় প্রস্তর
এই দু’পায়ে গর্জে ওঠে অনন্য সংঘাত
এই দু’পাই গুঁড়িয়ে দেবে দূরের কালো হাত।

হলিসউড, নিউ ইয়র্ক। ১৬ জুলাই ২০১৬

একা একা

মনের ওপর জিপার টেনে রাখো!
গেলাম আমি, একাই তুমি থাকো।
একা একা বৃক্ষ হয়ে যাও,
কান্ড-মূল আর শাখাতে ছড়াও,
শাখায় শাখায় ফুটুক রাতে ফুল,
সেই ফুলে কেউ ফোটাবে না হুল।

একা একা আরও উঁচু হও,
মেঘের সাথে গোপন কথা কও।
মেঘ থেকে এক বৃষ্টি ঝরার রাতে
কয়েক ফোটা পড়ুক না এই হাতে,

সেই জলে বীজ বুনি ভালোবাসার
জল ছাড়া কি আছেই বলো চাষার?

সূর্যাস্তের পরের ফিরিস্তি

স্বরবৃত্ত সন্ধ্যায় কয়েক পঙক্তি খুনসুটি মেয়ের সাথে,
কিছুক্ষণ ফেইসবুক উদ্যানে হৃদয়ের খোসা-ছড়ানো;
ক্রমশ রাতের ভলিউম বাড়ে, ঘুমও এগুতে থাকে মাত্রাবৃত্তের তালে,
ছন্দহীন ডিনার পুড়ছে তেলছাড়া ফ্রাইপ্যানে,
তিনি তখনো বাইরে, অমিত্রাক্ষর ঘোরাঘুরি রুমা ভাবীর সাথে।
আমি ভাবি, বিছানা না জেসিকা অ্যালবা,
ত্রিশমাত্রার অক্ষরবৃত্ত, দীর্ঘ পঙক্তির ভারী ঘুম, স্বরমাত্রিক-স্বপ্নে এগুতে
থাকে মধ্যযুগের প্রণয়কাব্যে।

হাওয়ার নেকলেস

বৃষ্টির সিঁড়ি হেঁটে যায় ধীরে নিচে
হাওয়ার পাখি ছুরি হয়ে বুকে বেঁধে
আকাশের নীল ডানা ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ে
গলে গলে পড়ে আকাশের নীল ডানা
পাথর-খন্ড রক্তবৃষ্টিপাত
দরোজা খুলেছে এ কোন সভ্য রাত
রাত নাকি দিন, আলো না আগুন জ্বলে
বোধের প্রান্ত নির্বোধ ঘুমে বোবা
ঝুলে আছে দূরে বহুরঙা নেকলেস
শিশুরা লাফায় প্রলুব্ধ আহ্লাদে
নিচে নেমে যায় বৃষ্টি-প্রহর দ্রুত
কিছু লোক হাঁটে না বুঝে হাঁটার তাল।

কালো দম্পতি খুঁজে পায় যদি ঘর
না পেয়ে শিকার শাদা নেকড়ে কি ফেরে?
হরিণের পাল রাজপথে উঠে আসে
লেক ছেড়ে মাছ ডাঙ্গায় বেঁধেছে বাসা
মৌমাছিদের গুঞ্জন নেই ফুলে
সমকামীতায় নিমগ্ন চারাগাছ
ফসলের ঘুম মৃত্যুর বিছানায়।

মাটি সরে যায় ঘন-বর্ষণ স্রোতে
পুরনো বৃক্ষ ভেঙ্গে পড়ে একে একে
লেক-নদী ছেড়ে উঠে আসে জল মাঠে
জলহীন নদী, হাঙর দুপায়ে হাঁটে
অভিবাসীগণ ছুটে যায় আরও দূরে
হাওয়ায় ভাসে বহুরঙা নেকলেস।

Facebook Comments