শেয়ার করুন:

নদীর নিখোঁজ-সংবাদ

জীবন গিয়েছে চলে জীবনের কুড়ি কুড়ি জোড়া-কুড়ি বছরের পার
তখন আমার মানুষ-জীবন ছিলো, মনুষ্য-শোভন জীবন অপার।
তখন কিশোরকাল, জীবনানন্দ-নন্দিত ছিলো প্রতিদিনকার ভোর
সজনে ফুলের সফেদ চিবুকে কাঁচা রোদ বার্তা দিতো অসীম আলোর।

তখন জীবনে হৃদয়খেলার ভীরু হাতছানি
ভালোলাগা শিহরণ, অচেনা নাম-না-জানা অনুভবে কেঁপে ওঠা
তখন বকুলবেলা, লুকানো আয়না ভাঁজ খুললেই
কার যেন আবছায়া মুখ, চকিত বিদ্যুৎ বুঝি–
বিকেলের সহজ খেলার সাথী, তবু দিনমান আড়ালে আড়ালে
টনটনে ব্যথায় উতল ক্ষণে ক্ষণে অনামা শিহর।
তখন বিস্ময়-ভরা জাদুকাল–
যুবতী ধানের ঘ্রাণ, তার নীরব গোপন গাঢ় গর্ভদুধ,
সদ্য-হেমন্তের মাঠভরা মায়া, কচি ভোর– আমার রঙিন পাঠশালা।
ধান কাটা হয়ে গেলে হু’ হু’ শূন্যতায় খোলাবুক রিক্ত জমি
গোছা গোছা শুষ্ক রুক্ষ মুথা, অগভীর ধানের শেকড়–
সে-ও কিন্তু জীবনের অনুষঙ্গ, শীত-তাড়ানিয়া সুলভ জ্বালানি।

আলপথে দূর্বাঘাস তখনো সবুজ, অমেয় প্রাণের দুরন্ত প্রতীক
ততদিনে চষাক্ষেতে রাইশস্য মেলেছে সবুজ ডানা
তিল তিসি মসুরের ডাল, খেসারির চিরল সবুজ পাতা,
সর্ষেফুল– দিগন্তে হলুদ ঢেউ, সোনা সোনা কাঁচা সোনা ঢেউ।

তখন আমার কিশোর প্রণয়–
বুকের ভেতর ধড়ফড়-করা কচিপাতা ভয়ের বাতাসে কাঁপে
পায়ে পায়ে শাসনের বেড়ি, বাৎসল্যে উদ্বিগ্ন স্বজন
তবু হৃদ-জলে নিবিড় গোপন তার মুখ, তার মুখ, তার মুখ …
মন-যমুনার দু’কূল ভাসিয়ে তরঙ্গ উছল, জলে ভাসে নবীন দু’চোখ
তখন আমার নামায়নহীন কৈশোরিক প্রেম, নিকষিত হেম।
আহা! তখন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আয়ু– আশাদীপ্ত মানুষ-জীবন,
শালিক চড়ুই টিয়া ফিঙেদের চপল ডানায় উড়ে চলে
তন্ময় মন্ময় আমার প্রতিটা দিন, মানুষ-জীবন।
আহা মানুষ-জীবন ! স্বপ্ন আর সম্ভাবনা। বিকাশের পরিপূর্ণ নাম।

আজ এই কুড়ি কুড়ি দুইকুড়ি বছর পেরিয়ে এসে
জরাজীর্ণ মরা শীতে বেঁচে-থাকা লড়াকু পাতার উদ্গ্রীব চোখ
এক সুদূরকালের পলাতক কিশোরের খোঁজে
নিষ্কলুষ হেম-প্রেম, ভরা জোয়ারের নদীটির খোঁজে
তোলপাড় করে ফেলে মাটির পৃথিবী–
দূরে গির্জায়, মন্দিরে সন্ধ্যারতির ঘণ্টায়, আযান-ধ্বনিতে
উচ্ছল সময়-নদীর নিখোঁজ-সংবাদ সোচ্চার ধ্বনিত হতে থাকে।

রচনাকাল ২১-১২-২০২০

দূরত্ব

তখন বিকেল । রোদেরা ফেরেনি তবু ঘরে ।
রোদেরা তখনো ডানা মেলে আছে জনপদে
মানুষের চোখে , বুকে, কাঁচে ও কার্পেটে,
সড়কের পিচে, সবুজের শীর্ষে
দাহ হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে যাবতীয় স্নিগ্ধতায় ।

তাতানো রোদের নিচে একটি শ্যামল মেয়ে ।
মেয়েটি হাঁটছে দ্রুত । মেয়েটি পুড়ছে ।
মেয়েটি ভীষণ একা । মেয়েটি পুড়ছে ।
পুড়তে পুড়তে পৌঁছে যেতে চাচ্ছে
একটি গন্তব্যে ।
মেয়েটি ছুটছে ।
ছেলেটি ঘরে নেই । ছেলেটি ফেরেনি ।
দরোজার সন্ধিস্থলে জড়িয়ে রয়েছে শীতল ধাতব ।
ছেলেটি ফেরেনি ।
খরাপোড়া নগরীর বিশাল জান্তব পেটে
ছেলেটি একটি বিন্দুর আকারে মিশে গেছে ।
মিশে আছে ব্যস্ততায় । মানুষের ভিড়ে, কোলাহলে ।
ছেলেটি ফিরবে । সময় তখন বেপথু হারিয়ে যাবে
প্রতিকূল সময়ের জলে । সময় হবে না ।

ছেলেটি ফিরবে । তখনি ফিরবে, অসময়ে ।
ঘর তাকে একবার টেনে আনবেই ছাদটির নিচে —
‘ঘর তাকে ঘরে আনবে তো ? ঘরের মায়াতে ?’
মেয়েটি ভাবলো । একলক্ষ পাখি তার
বুকের ভেতর পাখা ঝাপটালো , উদ্বেগে আকুল
সহসা উঠলো কেঁদে অযুত আহত কবুতর ।
নিরেট দেয়ালে আর বদ্ধ দরোজায় বিষণ্ণ আর্তিতে
আছড়ে পড়লো একাকী বাতাস ।
মেয়েটি আশ্রয়হীন মুখ ফেরালো আবার পথে ।

মেয়েটি ফিরছে । ফিরে যাচ্ছে একা ।
চোখ তার ম্লান, তবু চোখ তার উৎসুক ।
ঘরমুখো প্রতিটি মানুষ ছেলেটির মুখ
ধরে আছে প্রতিটি আলাদা মুখে ।
ফুরিয়ে আসছে ফিরবার পথ । দূরত্ব বাড়ছে ।
দূরত্ব বাড়ছেই ।
ছেলেটি জানে না, মেয়েটি সে দাহের বিকেলে
ভালোবেসে বড়ো বেশি নারী হয়েছিলো ।
মেয়েটি ফিরছে । শ্রাবণের মেয়ে । একা …
দু’চোখে প্লাবন, ভালোবাসা ফিরে যাচ্ছে একা ।

আড়াল

আমাকে চিনতে চেয়ে পথ খুব দীর্ঘ হবে
দীর্ঘ পথ হাঁটাবে আমায় একা। সেই ফাঁকে
দেখবে আমার আত্মা ও বহির্কাঠামো, অন্দর-বাহির,
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেবে চোখ, মুখ, ঠোঁটের আদল,
পদক্ষেপে কতোখানি গতিস্পৃহা, জড়তা কতোটা
কতোখানি ভার আমি রেখে যাই পৃথিবীর নির্বিরোধ দেহে,
কতোখানি হাড় মজ্জা, কতোখানি পোশাক আশাক —
এসব ওজন হবে।
কতোটা ঘৃণা ও প্রেম, কতোখানি বিদ্বেষের ধোঁয়া
রেখেছি বুকের ঘরে, গোপন পকেটে
কতোখানি রেখেছি আগুন, অশ্রু, ঈর্ষা ও জিগীষা
এইসব দেখার নিয়ম ধ’রে পথ আর সহযাত্রী পথচারী
দেখবে আমাকে সন্তর্পণে।
চেনা হবে ঘরবাড়ি, পরিচয় হবে, দেখা হবে বাম ও দক্ষিণ,
চেনা হবে ঘরবাড়ি, চলাচল হবে, দেখা হবে নদী ও পর্বত,
তবু কেউ কোনোদিন চিনবে না আমার আমাকে।

আমাকে লুকাতে চেয়ে বন খুব ঘন হবে
বৃক্ষদের সবুজ পত্রালী হবে হলুদ সহসা,
খুব দ্রুত ঝ’রে যাবে। বিবর্ণ পাতার স্তুপে ঢেকে দেবে
নিজদেহে ঢেকে-রাখা গোপন লজ্জার মতো ঢেকে দেবে
আমার দারিদ্র্য আর দরিদ্র শরীর, শব।
এইভাবে দিন যাবে, ঋতুভেদে বৃক্ষ ফের পত্রময় পুষ্পময় হবে,
দিগন্ত-বিস্তারী রোদ নতুন পাতার ফাঁকে
একটি পুরানো মুখ আতিপাতি খুঁজবে ভীষণ
মেঘে ও সমুদ্রে খুব চুপিচুপি সন্ধি হবে; ঝড় হবে
পাতারা নিবিড় হবে আরো–
আততায়ী অন্ধকার জয়ী হবে, জয়ী হবে খুব সহজেই।

তবু কোনো ঘনঘোর আড়ালেই ঢাকবে না আমার আগুন।

আমিও থাকবো জেগে, থাকবে আমার দাহ, আমার মনীষা
শুধু কেউ কোনোদিন বুঝবে না আমার আমাকে।

কম্পোজিশন ১৯৭১

যুবকের দুই চোখে উদভ্রান্ত শশকের চোখ
যুবকের দুই চোখে অশ্রুময় তরল অনল
যুবকের দুই চোখে নিষ্পলক পাথরের চোখ
যুবকের দুই চোখে নীলাকাশ, পিপাসার জল।

যুবকের দুই হাত নিরুপায় শৃঙ্খলিত হাত
যুবকের দুই হাত জলবন্দী গৃহীর বিলাপ
যুবকের দুই হাত মিছিলের উত্তোলিত হাত
যুবকের দুই হাত ছিঁড়ে দেবে ময়ূর-কলাপ।

যুবকের দুই পায়ে শতকের রুগ্ন ধুলো, ক্লেদ
যুবকের দুই পায়ে সংক্রামক সভ্যতা-মড়ক
যুবকের দুই পায়ে ধ্রুবরেখা, শ্রমক্লান্তি, স্বেদ
যুবকের দুই পায়ে তীব্র গতি, সমুখে সড়ক।

যুবকের বুক জুড়ে জলোচ্ছ্বাস, বিরাণ বসতি
যুবকের বুক জুড়ে বালুবেলা, শস্যহীন চর
যুবকের বুক জুড়ে শস্যময় আবাল্য বসতি
যুবকের বুক জুড়ে বনস্থলী, স্বপ্নবোনা ঘর।

যুবকের হাত নাচে, কাস্তে নাচে ফলবতী মাঠে
যুবকের পায়ে হাঁটে উন্মোচিত সূর্যরেখা হাঁটে
যুবকের চোখ হাসে রৌদ্রময় প্রান্তরের ঘাসে
যুবকের বুক দোলে, স্বপ্নময় ঋদ্ধ দিন আসে।।

রচনাকাল ২৯.০৫.১৯৯১

উদ্যত তোমার সঙ্গিনেরা

আমাকে হত্যার জন্য উদ্যত করেছো যে মারণযন্ত্র
একদিন সে নির্ভুল ঘুরে যাবে তোমার দিকেই
তোমার হাতের টিপ চিনে রেখে খুঁজে নেবে তোমার ঠিকানা
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি কৃষ্ণ আফ্রিকান, ঈশ্বরের দলিত সৃজন
আমি ফিলিস্তিনের সন্তান, স্বাধীনতা-পিপাসায় আর্ত যুদ্ধরত
জন্ম-মুহূর্তেই মৃত্যুর সাথে মিতালি আমার
আমি সিরিয়ার রক্তক্ষয়ী রণে ক্লান্ত বিধ্বস্ত বিপন্ন মানবতা
মৃত্যু-উপত্যকা আমার বসতভূমি– আমাকে বাঁচাও।
ইরাকে মরেছি আমি অজস্র সহস্রবার
ইরানে খড়গ-তলে মাথা পেতে আত্মাহুতি দিয়েছি অযুত
যুক্তরাষ্ট্রে ঘাতকের হাতে ম’রে যেতে যেতে
জেনেছি জন্মের পাপ– ধর্ম আর বর্ণই আমার অপরাধ।
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি বাংলার দাঙ্গায় নিহত নিরপরাধ, গৃহহীন স্বজন সুজনহীন
ভিটেমাটি স্বদেশ-হারানো অগণ্য রুদ্ধ প্রাণের অপচয়।

আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাকামী যুবা
তিরিশ লক্ষ অমর শহীদ–
বুলেটে ঝাঁঝরা বুক, বেয়োনেটের খোঁচায় বিক্ষত শরীর,
শরীরের নিচে কালোপানা-লাল বাসি রক্তের নহর।
অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর ধর্ষিতা গর্ভিণী আমি
আমার যোনীতে পশুর দলনে ছিন্নভিন্ন ক্লান্ত রক্তজবা।

আমার যোনীতে পশুর দলনে ছিন্নভিন্ন ক্লান্ত রক্তজবা।

আমি রাতারাতি রাজাসন থেকে ধুলায় লুটিয়ে-পড়া পরাস্ত ভুস্বামী,
যুদ্ধ-বিপর্যয়ে ম্লানমুখ বাংলায় সোমত্ত কন্যার ভয়ার্ত জনক —
অনিবার্য বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চিতি, অন্ন ফেলে পলায়ন, লাঞ্ছনাতিলক
আমার নিয়তি।
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারী
গণধর্ষণে অলক্ষ্যে খ’সে গেছে অমূল্য প্রাণের বীজ
আমি অসহায় পিতা
নামশূন্য হাজারো সন্তানের খণ্ডিত লাশ পাহারায়
আমি বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলে ভাসমান
প্রাণভয়ে পলায়নরত আরাকান-বাসী, আমাকে বাঁচাও–
নিজের ভূভাগ থেকে, জন্মের মৃত্তিকা থেকে উৎখাত
আমি লক্ষ লক্ষ নিরন্ন উদ্বাস্তু। আমাকে বাঁচাও।
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি নাইজেরিয়ার শত শত ক্ষুধার্ত কংকালপ্রায় শিশু
আমার প্রাণ-বাঁচানো অন্নের গায়ে ধর্মের পোশাক পরিয়ো না
আমাকে দিয়ো না কোনো সম্প্রদায়-আবরণ
বিপন্নতাই চূড়ান্ত লেবাস আমার– আমাকে বাঁচাও !

অন্যথায় তোমার প্রশিক্ষিত প্রাণঘাতী মারণ-দানব
অতর্কিতে একদিন পাল্টে দেবে নিজেদের গতি
আমার রক্তের ধারা বেয়ে বেয়ে ছুটে আসবেই
অদম্য ঘাতক রক্তবীজ, তোমার বিনাশ–
উদ্যত তোমার সঙ্গিনেরা ঘুরে যাবে তোমাকে নিশানা করে।
আমি যুগে যুগে ধর্মান্ধের পাশবিক হত্যাযজ্ঞে
অসহায় নরবলি– ক্ষমা করো, আমাকে রেহাই দাও
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

লগ্নভ্রষ্ট

কার মুখ চেয়ে সাজিয়ে রাখছো রুদ্ধ পুষ্পবাণ
কার কাছে চাও শর্তমুক্ত ঠাই–
সব জেনো মিছে, যদি জেনে থাকো
শূন্য অভ্র, চারিপাশ ফাঁকা, প্রিয়জন পাশে নাই।

কার বিপরীতে শাণিয়ে রাখছো ক্রুদ্ধ অগ্নিবাণ
কার মুখে চাও কম্প্র নম্র চোখে–
সব স’য়ে যাবে ঝড়-জল-খরা
স্বর্ণকুম্ভ মাটি হয়ে যাবে, নিয়তি যদি না-রোখে।

কার স্মৃতি পুষে বাসনা ভুলেছো, পূর্ণ অধিষ্ঠান
কার হাতে চাও দিব্য মুক্তি পেতে–
সে-ই হবে দেখো অজেয় শেকল
পূর্ণস্থিতি কোথাও পাবে না, কোথাও পাবে না যেতে।

কার হাত ছুঁয়ে উড়বে আকাশে স্বপ্নঋদ্ধ প্রাণ
কোন ঘাটে যাবে লগ্নভ্রষ্ট তরী —
বলবে না কেউ, চাঁদ ডুবে যাবে,
স্বপ্নচ্যুত আহা ভুল বিভাবরী! আহা, ভুল বিভাবরী!

উপাসনা-৭

আবার খোয়াব দেখে ঝিলমিল করে কার্তিকের মাটি।

চিত্রময় ধূসর কুয়াশা থেকে আমি তুলি ফলবান আশা–
অনাবাদী মানবজমিনে ফের সুবাতাস বয়ে যাবে,
আন্দোলিত সুখে হাসবে আবার শস্যময় প্রগাঢ় সবুজ
চাষবাস, হেমন্তের গার্হস্থ্য সুদিন, আগামীর শিশু
যেন ফের সত্যিই সেসব হবে সত্য– স্বপ্ন দেখি।

বৈরি জলধারা সবলে সরিয়ে পলিময় চর জেগে উঠবার
দূরাশায় মরা কার্তিকেও জমা রাখি বীজধান–
পরিচর্যা করি তার,
ওমের আশায় যত্ন করে তুলে রাখি অনন্য সীবন।
একদিন আমরা যুগল শয্যা পেতে আকাশ-গঙ্গায়
তরল চাঁদিনী-ছোঁয়া তরুণ রাতের গর্ভে
জমা করে দেবো বিস্ময়ে নীরব লগ্ন
জমা করে দেবো খণ্ড মহাকাল,
যেন ফের সত্যিই তেমন হবে সব– স্বপ্ন দেখি।

নিরুদ্বিগ্ন ঘুম হবে একদিন– দূরাশায় থিতু রাখি মন
আশ্বিনের শেষ ভোরে
নগ্ন পায়ে হেঁটে যাবো ঘাসমোড়া সরু আলপথে।
সহস্র বরষা পার হয়ে আমি তো এসেছি ফিরে
শস্যঋদ্ধ হেমন্তের নিবিড় দুয়ারে
আমি স্বপ্ন, আমি ফলবতী আশা, মেঘ আমি সুদূরের
হাত বাড়ালেই হাতে পাবে– আমি সেই মূর্ত বাস্তবতা,
অগ্নি-জল-মাটি ও বাতাসে আমি চিরন্তন বীজের ধারক।

আমি বারবার স্বপ্ন দেখি, বারবার স্বপ্ন ভেঙে যায়
বারবার সত্য হাতে পাই, বারবার সত্য সরে যায়।
আমি বারবার আলো জ্বালি, ধুলিঝড়ে আলো নিভে যায়
আমি বহুবার মাটি খুঁজে পাই, মত্তজলে মাটি ধু’য়ে যায়।

তবু আজো ধরিত্রী বলেই আমি বীজের সবল মহাজন
হাতখানা ধরেছো সত্যই যদি– পাথর সরাও, পথ হাঁটি।

সেই বৃক্ষের কাছে

পথের পাশে খুঁজতে খুঁজতে পথ পেরুচ্ছি
পথ পেরুচ্ছি বৃক্ষ তোমায় খুঁজে খুঁজে
কোথায় আছো?
বনের পাশে খুঁজতে খুঁজতে বন পেরুচ্ছি
বনের ভেতর পথ হারাচ্ছি তোমায় খুঁজে
কোথায় আছো?
অজান অচিন অন্ধকারে পা বাড়াচ্ছি
পা বাড়াচ্ছি অনিশ্চিতির দু’হাত ধ’রে
বুঝতে পারো?
যন্ত্রবন্দী কুটিল শহর আমার সকল
সবুজ বাগান কিনবে সখের ঘর সাজাতে,
সইতে পারো?
বৃক্ষ তোমার কোন অভিমান অতো প্রবল
নিজের ভেতর বন্ধ দুয়ার, শুনতে পাও না
অমন ডাকি?
রোদ -জ্বলা ভর দুপুরবেলা ঘুঘুর ডাকে
নিঝুম একা কাঁদছিলো কার দুঃখী গলা
চিনলে না কি?
এই জনপদ, ব্যস্ত নগর, ক্লান্ত প্রহর —
সব ছেড়ে যাই তোমার কাছে ছায়ার খোঁজে,
কোথায় হারাও?
তোমার পাতায়, ফুলের ডালে একটুও নেই
আলোর কাঁপন, শূন্য দু’হাত ফিরিয়ে নেই
দেখতে কি পাও?
খুঁজতে খুঁজতে পথের সাথে পথ মিলে যায়
নদীর সঙ্গে নদীর দেখা, কেবল তোমার
হাত এখনো আমার দুয়ার পায় না ছুঁতে–
সে কি কেবল আমার বলেই এমন সুদূর?

আমি কার কাছে

আমি কার কাছে আগুন শিখতে যাবো!
আমার আগুনে ঝাঁপ দিয়ে খোলা চোখে
পুড়ে পুড়ে নিভে গেছে লেলিহান অনেক দোজখ।

আমি কার কাছে শিখি বলো অনন্ত শূন্যতা–
অনিত্য আমিই নৈরামণি চলিষ্ণু চর্যায়
আমার শূন্যতা থেকে জন্ম ঘটে অযুত প্রাণের।

কার কাছ থেকে আমি পাঠ নেবো ঘাট-আঘাটার!
আমিই তো পদপিষ্ট মায়াকাড়া ঘাট–
আমাকে মাড়িয়ে সবে উদিত সূর্যের দেশ খুঁজে খুঁজে
স্বজন পড়শি ছেড়ে অন্ধকারে নিরুদ্দেশে যায়।

আমি কার কাছে উষ্ণতা চিনতে যাই, বলো–
আমার উষ্ণতা দিয়ে মোম নয়, গলিয়েছি উষর পাথর
বহুশত বর্ষা যাকে ভিজিয়েছে, ছাই হয়ে যেতে যাকে
প্ররোচনা দিয়েছে হাজারবর্ষী তীব্র অগ্নি আর খরা।

আমি কার ছবি দেখে চিনবো দহন, তৃষ্ণা!
আমার দু’চোখে কালীদহ নদী, বুকে আরবের মরু
পুড়ন্ত দুপুরে নেই একফোঁটা জল কোনো কলসেই।

আমি কাকে পাঠ করে শিখি শীতলতা, অবিচল ক্ষমা!
সহিষ্ণু পশুর নিষ্ঠা পূর্ণমাত্রা আয়ত্ত করেছি আমি
আমাকে চৌকাঠ করে চাঁদ হাতে ছুঁতে
ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেছে স্বনির্ভর সকল স্বজন।

আমি কার অনুবাদে পড়বো মাটিকে সংশয়হীন !
আমিই যে নির্যাতিতা ফসল-সম্ভবা মাটি
নির্বিবাদে সর্বপাপ সকল পুন্যের বোঝা গর্ভে ধারণ করি
নিরুপায় স্বাক্ষী আমি সহস্র খরার
প্রতিবাদহীন আমিই পৃথিবী বোবা, আমিই পৃথিবী।

আঙরা

এমুন বাইস্যা-কালে কুড়া পক্ষী উড়া দিতো চায়,
এমুন বাইস্যা-কালে ভাগ্যবানে লগে সাথী পায়।
ডলকে ভাসায় মাডি, পাড় ভাঙ্গে নিদয়া বানেলা
ত্যাও তো গাঙ্গের মন টানে তারে, বুক রাহে মেলা।

না জানি কেমুন বুলি, কী সুরের জালে বান্ধা মন
প্যাঁক-পানি-আগুনের বাতাসের না মানে শাসন
আতাল পাতাল ভাঙ্গা ঢেউ তোলে, কোমরে মোচড়
রঙ্গিলা গাঙ্গের টানে ছোডে ম্যাঘ, উডে কালি-ঝড়।

আমার পরান-বন্ধু এই দ্যাশো কাডায় জীবন
বাইস্যা কালের এই আসমান, ঘনরঙ্গা বন
পড়ে না কি চোক্ষো তার, মনো তার কে দিলো দুয়ার
জংলী কুড়ার মতো ক্যান মনো উডে না জোয়ার !

ত্যা’ কি তার কানা চোখ– হুঁশ নাই, পড়ন্ত বেইল
না’ হি করে তালিবালি, সুহে খেলে নির্দয়া খেইল !

ডাহি আমি কুড়াপক্ষী, খুঁজি তার পাখনার ছায়া
জগত আমারে বুঝে, হে-ই খালি অচিনা নিমায়া।
কও গো কুডুম কও– দিবা কিনা ফসলী বিছন
না’ হি দিবা জ্বলা তুষ, আঙরা করবা পুড়া মন।

Facebook Comments