শেয়ার করুন:

আজ ২২ নভেম্বর , আশির  দশকের শ্রেষ্ঠ কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন এর  জন্মদিন।  জীবনের এই বর্ণাঢ্য উদযাপনকে স্মরণীয় করে রাখতে আজ তার ১০টি বাছাই করা কবিতা প্রকাশ করা হলো। সেই সাথে আড্ডাপত্র’র পক্ষ থেকে জানাই ফুলেল শুভেচ্ছা।

কে সেই মানুষ

(মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী স্মরণ)
কার বজ্রকণ্ঠ আজো বাজে
কে সেই মানুষ
সাহসের তরবারি হাতে নিয়ে ছুটতেন
দিগন্তের দিকে
ক্ষমাহীন ঘৃণার আগুনে শত্রুর ছাউনিগুলো পুড়িয়ে দিতেন
নিজের বিবেক আর বিশ্বাসের কাছে বারবার ফিরে আসতেন
পবিত্র স্বপ্নের মতো সদা সর্বদায় গায়ে জড়াতেন জনতার প্রতীকী পান্জ্ঞাবি
কে সেই মানুষ
মরণের মধ্য থেকে জীবনকে টেনে তুলতেন
সন্দীপের মাঝিদের কাছে শুনতেন ইলিশের আশ্চর্য খবর
ভোলা ও নেত্রকোনা নয়নের নিকটে রাখতেন
উৎকলিত আত্রাই আবেগ নিয়ে ছুটতেন পেয়ারা বাগান
বুড়িগঙ্গার জলে জুড়াতেন দীঘল শরীর
রেসকোর্সের মাঠে যে দাঁড়ালে সবচেয়ে সুুন্দর মানাতো
খামোশ শব্দটি যার উত্তরাধিকার
তিনি কি রাজার পুত্র কিংবা কোনো সামন্ত প্রভুর সন্তান
নাকি নগণ্য চাষীর ছেলে চরভাষানের কোনো রুদ্র লাঠিয়াল
পিতা যার শস্যের শ্লোক ছাড়া জানতেন না কিছুই
নগরের লোহার হাঙরগুলো কামড়ে দেবে বলে যেতেন না নগর তোরণে

তারই পুত্র প্রমিথিউস হলো স্পার্টাকাস
হাতের হার্পুন ছুড়ে হত্যা করলো লক্ষ হাঙর
এবং আদর্শের অশ্বে চড়ে প্রদক্ষিণ করলো পৃথিবী

দায়

যে ঘরে দরোজা নেই
তার কি প্রয়োজন প্রহরীর
ভ্রূণ ধারণে অক্ষম যে গর্ভ
তার কেনো প্রসব যন্ত্রণা
উড়তেই হবে কেনো
যদি না থাকে ডানা তার
প্রবাহ পুতে রাখে যে স্রোত
তাকে স্রোতস্বিনী হতে কে দিব্যি দেয়
মৃত্যুকে ভয় পায় যে জীবন
তাকে বাঁচতে কে বলে

ফলহীন বৃক্ষ সেতো অগ্নিউপাসক

শেকলের শব্দে যে অভিভূত
তাকে মুক্তি দেবে কে

আত্মার ইতিহাস

দামি রাস্তাঘাট
আর সংখ্যা দাগা পরিচয় পত্রের পাশে
শুয়ে আছে জর্জ ফ্লয়েড
চারিদিকে অঙ্কের হিসেবের মধ্যে
ভেসে বেড়াচ্ছে লোক
জীবপ্রাণীর হৃৎপিণ্ডের উপর সিমেন্টের পাহাড়
নিধনের সমাচার দিয়ে সাজানো সংবিধান
রাষ্ট্র স্বর্গের লোভে
সত্যকে তুলে দিয়েছে শয়তানের হাতে

পূর্ণ সমপর্ণের পরও দু’টুকরো করা হলো অর্জিত শ্বাস
ইস্পাতের সম্পর্কের মধ্যে ফ্লয়েড খুঁজছে ঝর্না
পিকাসোর গোর্নিকা থেকে ছুটে আসা বলবর্দ
ফ্লয়েডের বুক ঢেকে দিচ্ছে ক্রোধের ফেনায়
যন্ত্রণার ব্যাপ্তিতে পৃথিবীর-
সব প্রতিপাদ্য মিথ্যে
ধ্বংসের মধ্যে দাঁড়ানো চাঁদ দেখছে ফ্লয়েড
আমেরিকার পাঠাগার থেকে ভয়ে
পালিয়ে যাচ্ছে ওয়েস্টল্যান্ডের অক্ষর

মৃতদেহরা নালিশ জানায় শূন্যতার স্রষ্টার কাছে
জিভ পুড়িয়ে দেয় যিশুর অহিংসা
একুশ শতক আর হার্লেমের কালো মানুষ
হিংস্রতার কুণ্ডলি পাকানো সম্প্রীতি
নিজের দেশে শ্বাস হারানোর হাজার গল্প

আত্মশুদ্ধির প্রার্থনা
গীর্জার গুহ্যদ্বারে আটকে গেছে ক্রুশ
হত্যার প্রতিকল্প মাঠে মাঠে সঞ্চারিত
মৃত্যুর শর্ত এক ষাঁড়ের লড়াই
গোরখানায় প্লাবিত কৃষ্ণবিনয়

অমলিন ঐ নৈঃশব্দের নাক দিয়ে রক্ত শোনা যাচ্ছে
ফ্লয়েড জর্জ ফ্লয়েড
গৃহযুদ্ধের বিভীশিখা নয়
নিজভূমে নিঃসঙ্গ প্রশ্ন ভেঙে পড়ে

প্রতিবাদ এক ছোঁয়াচে মহামারী
পৃথিবীর প্রতিটি শহর আক্রান্ত
কাঁধের উপত্যকা ভরে গেছে প্লাকার্ডে-ফেস্টুনে
জর্জ ফ্লয়েড
চাবুক শীষ দিচ্ছে পিঠে
জুতোর পেরেক খুঁজছে কণ্ঠনালী
শিরানদীর তলস্পন্দন কোথায়
চোখের তারা হারিয়ে যায় মাতৃগর্ভে
শৈশবে
তারুণ্যে
যৌবনে

বিন্দুমাত্র সময়
চূর্ণ হয়ে যায় সিংহমূর্তি
শিরা নদীতে উত্তেজিত নৌকা
ডুবে যাচ্ছে পাক খেতে খেতে
ফ্লয়েড হালের্মের রাজা হবে
রওনা দিয়েছিলা একা নিঃসঙ্গ

বিকেলের ঠোঁট চোষে সান্ত্রীর ছায়া
মিনাপোলিসের পথের কাঁটায়
গেঁথে আছে ফ্লয়েড
আর খাকি নেকড়ে পালের শিশ্নের ছোরায়
ছিন্ন ভিন্ন মেরির স্তন
ঘন-ঘন শ্বাসস নিচ্ছে হোয়াইট হাউস

জর্জ ফ্লয়েড
নোটিশ টাঙানো নামগুলো কি শহীদের
সমকামীদের লেজে আগুন লাগানো দুপুর
ভোর আর রাত্রির ঘুম ভাঙানো লিঙ্গ

এখন বাতাসের দেবতারা ফিরে যাচ্ছে
প্রাচীন গিলোটিন ফেলে যাচ্ছে পৃথিবীতে
পাথরের টিস্যুতে চোখ মুছছে কান্না

অভিযোগের ঢের বয়স হয়েছে
উঁচু করে দেখাচ্ছে পাকা দাঁত
টাগরার নিচেয় ডানা মেলছে ঈগল
উঁইপোকার পেটে তলিয়ে যাচ্ছে শ্বাস বাক্স
ঈশ্বরের আসতে দেরি হবে
ফ্লয়েড তুমি যাত্রা শুরু করো
স্বর্গ দূরের পথ

রক্ত গড়ানো আকাশের ড্রেনে বুটের বুদ্বুদ
নীল ঘোড়ার হ্রেষা
নির্জনতা নেমে আসছে মেনিসোটায়
পৃথিবীর সব ২৫ মে শুয়ে আছে ফুটপাতের জিহ্বায়

শ্বাস নিতে নিতে এলিয়ে পড়া প্রান্তর
স্তব্ধতার কান দিয়ে বেরুনো বাতাসে
ভেসে যাচ্ছে কবিতা
আফিম খাওয়ানো পোষা নদী
উত্তাল হবে না
ক্রস ফায়ারের ভয়ে কাঁদবে না পাখিরা
জল ঘোড়ায় চুপচাপ বসে থাকবে হাওয়া
সরকারী প্রেসনোট বলবে অক্সিজেনের অভাবে শিশুর মৃত্যু

এতো কাঁটার ছটফট
ছেঁড়া ফুসফুসের ফূর্তি
পালিয়ে যাওয়া হাওয়া
পাহারা দিয়ে রাখা প্রশ্ন
সাদা গ্রাসের মধ্যে শিউরে ওঠা জিহ্বা
দিশেহারা সব বৃষ্টি আর ছাতা

পথে পথ জুতোর নিষ্ঠুর চুমু
আর শিরদাঁড়ায় ধীরে ধীরে জড়ো হওয়া বিদ্যুৎ
ফ্লয়েড ফিরে যাবে চাঁদের দেশে
যেখানে বাতাস ছাড়া বেঁচে থাকে আত্মার ইতিহাস

স্পর্ধা

আরেকবার আমাকে দাঁড়াতে হয়েছিলো
সেই সত্যের মুখোমুখি
যেখান থেকে শুরু পারদের পৃথিবী
মানুষের হাড়গোড আর মজ্জা দিয়ে তৈরি
চোখের নুন আর জিহ্বার কান্না দিয়ে
কর্কট আর মকর ক্রান্তির অন্তিমে
দু:খের অনি:শেষ দরোজায়
না মাড়ানো সেই সব গহীন পথ
হৃদয়ের ফাঁক ফোকর
বাতি না জ্বালানো সন্ধ্যার তলদেশ
দেখা যায় না জীবন তা সন্ধিক্ষণে
আরেকবার আমাকে দাঁডাতে হয়েছিলো
নজিরবিহীন দু:খস্তূপের উপর
ভেঙে খান খান হয়ে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা
আর যেখান থেকে ফেরা যায় না
অরব রাত্রির উপর

হতাশার হিংস্রতায় আটকে যাওয়া পদক্ষেপ
শিকার লোলুপ নারকীয়তার মাঝখানে
রক্তচিহ্ন রেখে না যাওয়া তরবারির সামনে
নিকষ কালো বর্ণমালার মুখোমুখি
পাঠ করা যায় না যে সূর্যাস্ত
চিৎকারের প্রতিবিম্ব ঠাসা স্বপ্ন
জানালার দাঁত ভাঙা দৃষ্টির হাতুড়ি

কোনো দেয়াল আঁকড়ে থাকা লতাগুল্ম নয়
হাতের মধ্যে সহজ হয়ে যাওয়া
স্তনের অবাধ্যতা নয়
আকাশের উগরে দেয়া বজ্রের সামনে
আমাকে আরেকবার দাঁড়াতে হয়েছিলো

তুচ্ছ সব সাবধানবাণীর অট্টালিকা
রুটিমোড়া চুল্লির গনগনে শাসনের সামনে
সবুজ আর লালে তৈরি কালোর সংকেত
আর খড়গের এক কোপে বলি দেয়া প্রতিজ্ঞা

ডানা পালক নখ চিবুক আঙুলের
খণ্ড খণ্ড আর্তনাদের সামনে
আরেকবার আমাকে দাঁড়াতে হয়েছিলো

ভেঙে ফেলা সব উল্লম্ফন
ছুঁড়ে ফেলা কণ্ঠস্বর
টুকরো করা অনুভব

আত্মাসন্ধানী কণ্ঠনালীর পরিণাম
যুক্তির শিরোচ্ছদ খ্যাত বধ্যভূমি
আগ্নেয়াস্ত্র আড্ডা দেয়া সড়ক
অন্তহীন অভিযোগের শ্রোতা-সদা প্রভুর সামনে
আরেকবার দাঁড়াতে হয়েছিলো আমাকে

আমার অহংকার হাঁটু মুড়ে বসতে চেয়েছিলো
এবং মনুষ্যত্ব ক্ষমা প্রার্থনায় নত হতে
কোটি কোটি বছরের শ্রমে তৈরি পা
কি করে উবু হবে
হাজার বছরের ভালোবাসায় তৈরি
এই মনুষ্যত্ব কি করে নত হবে

কবির গল্প

কবি লিখলো ভোরের আকাশ
আর সাথে সাথে জানালায় গলা বাড়িয়ে দিলো সূর্য
লিখলো স্রোতস্বিনী নদী
শব্দের ভেতর থেকে বেরিয়ে
নদী ছুটলো সমুদ্রে
এলো রূপালি মাছের কথা
সাথে সাথে লাফিয়ে নদীতে
গিয়ে পড়লো
লিখলো যখন খাঁচায় বন্দি
পাখির দীর্ঘশ্বাস
অমনি খাঁচা খুলে গেলো
আর উড়াল দিলো সে
ঝাঁকড়াচুলো গাছের সৌন্দর্য তুলে ধরতেই-গাছ হেঁটে অরণ্যের দিকে
চলে গেলো

কতই না বিষ্ময়কর গল্প থাকে কবিতায়
চিরচেনা শৈশবের পথের কথা এলে
পথ সোজা নেমে গেলো দিগন্তে

কবি পথে নামলো
আর পিছু নিলো সন্দেহ
কবি লিখলো প্রতিবাদ
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো
জলকামান-টিয়ারগ্যাস
আর একদল রাষ্ট্ররক্ষী
ঘিরে ফেললো তাকে

সনেটের দিন

সনেটের দিন শেষ,কার তবে শুরু
সোনালি মোড়কে পেলে নতুনের স্বাদ
কিছুটা মিলবে;বোধে ছড়াবে অগরু
পাঠক খুঁজবে ছন্দে আছে নাকি খাদ।

অক্ষর বৃত্তের কাছে স্বরবৃত্ত শিশু
মাত্রাবৃত্ত শ্রম দেয় কুলিনের ঘরে
মুক্তছন্দ কি উদার ক্ষমাশীল যিশু
তাকেই আঁকড়ে আছি বাহিরে অন্তরে

আমরা কোথায় যাবো হাভাতে বর্ণের
কতটুকু আঁকা যায় -আকালের ছবি
জ্বরা দু:খ মারী থেকে অতিক্রমণের
পথ কোন ছন্দে আছে-খুঁজবেন কবি

এখন সোনালি স্বপ্নে ডুবে আছে মন
ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করো হে মধুসূদন।

প্রতিধ্বনি সেতু

কোথাও থামার সুযোগ নেই
মানুষ নামের অর্থ বহুদূর
শুধু স্রষ্টার আলো পড়ে জীবনজয়ী মানুষের ওপর
যারা পার হয় প্রতিষ্ঠানের সেতু

জগতে কী ঘটছে জানলে সহজ হয় নিজেকে জানাও
অসীম সমুদ্র কিংবা পর্বতে
আমরা আত্মার মুখোমুখি হই
আর অগস্থ্য যাত্রায় পাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে
নিজেকে ক্ষমা করে পরিশুদ্ধ
পবিত্র বেদনায় ঝরে পড়া চোখের জলইতো আত্মার রক্ত

এগুবার পথ কোনো ফ্রেমবন্দী ফিতে নয়
সামনে পেছনে টানা যাবে
মহাবিশ্ব সমান্তরাল
দ্বিতীয় যাত্রার কখনো এক থাকে না পথ
হেরাক্লিটাস জালে এক নদীর স্রোতে
দু’বার স্নান অসম্ভব কোনো

ভালো না বাসলে এগুলো কঠিন
বৃষ্টিকে ভালো না বাসলে কি করে পাবো রঙধনুর স্বাদ
কোথাও থামার সুযোগ নেই
থামাতেই মহান হানিবলের ঘটেছিলো পতন
আর মুছে গিয়েছিলো কার্থেজ

উপলব্ধির ছয় লাইন

একদিন আমি থাকবো না তুমি জানো,
একদিন তুমি থাকবে না আমি জানি।
থাকবে না নীল আকাশের উদ্যানও।
কোনোমতে টানি
জীবনের যত গ্লানি।

না থাকার কথা মনে পড়লেই চুপ
হাজার প্রাপ্তি যেনো ভষ্মস্তূপ।

পিতা

পৃথিবীর প্রথম মানুষ নারী না পুরুষ
পুরুষই প্রথম নাকি প্রকৃতির পিতা
ধর্মগ্রন্হ আদমের সমর্থনে থিতু
যিশু ঈশ্বরের পুত্র আত্মস্বীকৃত

আমি যাকে পিতা জানি পরিচয় দিই
প্রতিটি সনদে যার আঙুলের ছাপ
যার সম্পদের প্রতি তীব্র অধিকার

আমার আদলে যার জন্মের আঘাত
বিজ্ঞান তাকেও প্রশ্নবাণে বিক্ষত করে
একুশ শতকে মানুষ একাই মানুষ
তার কোনো ঔরস জন্মদাতা নেই
পুরুষ কি আনুভূমিক ঈশ্বরের ছায়া
তাহলে আমার আর বংশঋণ কেনো
আমি যদি যিশুর প্রতিধ্বনি তবে
ঈশ্বরের সব সম্পদের ভাগ দিতে হবে
পৃথিবীর প্রতিটি পুরষ যদি পিতা
আমিও পিতার বৃষ্টি দীর্ঘ রঙধনু

জানাতেই হবে প্রার্থনা

মঙ্গলের প্রভু এ জীবন মুক্ত করো মরীচিকা থেকে
সুন্দরের আরাধনা ক্লান্তি থেকে ত্রাণ করো
মানব রচিত বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে
হৃদয়কে বিচ্ছিন্ন করো জাগতিক থেকে
স্বনির্বাচিত করো সংমুদ্ধ সময়ে

Facebook Comments