শেয়ার করুন:

আলমগীরের জবানবন্দী

 

তিনি বারবার বলার চেষ্টা করছিলেন যে তখনকার রাজনীতির নিয়ম মেনেই করতে হয়েছে সব। তিনি তাদের হত্যা না করলে তারা ঠিকই হত্যা করত তাঁকে। সম্রাট অশোক নিরানব্বই ভাইকে খুন করার পরে নিরামিষভোজী হয়েছিলেন। তার পিতা নিজের পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তিনি অন্তত পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি।

 

জিগ্যেস তখন করতেই হয়– আপনিও তো পিতার বিরুদ্ধে সৈন্যদল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন রাজধানীতে?

তিনি নিজের বক্তব্যে অটল– তা এসেছিলাম। কিন্তু পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নয়। বরং আমার অন্য ভাইয়েরাই শুরু করেছিলো পিতার বিরোধিতা।

এসব শোনার কোনো আগ্রহ আমার ছিলো না। আর প্রায় পাঁচশো বছর আগে মরে যাওয়া একজন মানুষের পরিচয় নিয়ে কেউ এসে যদি বলে, আমিই সেই মানুষই, আমিই বাদশাহ আওরঙ্গজেব, যাকে তোমরা আলমগীর নামে ডাকো, শুধু তোমাকে কিছু কথা বলবো বলে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা সহ্য করে এখানে এসেছি; আমার হাতে বেশি সময় নেই: কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে আমার বর্তমান অবস্থানে; তাই তার আগেই তোমাকে কথাগুলো বলে যেতে চাই– তখন নিজেকে গাঁজার ঘোরে থাকা মানুষ ছাড়া আর কীই-বা ভাবা যায়!

 

কিন্তু আমি তো কখনোই মদ-গাঁজা নিয়ে মত্ত ছিলাম না, আবার অলৌকিক বলে কোনোকিছু সেভাবে বিশ্বাসও করি না। সাইন্স ফিকশনও একধরনের অলৌকিক গল্প বলে সেগুলোও আমি পড়ি না। অথচ ঠিক কী কারণে জানি না, বিশ্বাস করে ফেললাম যে আমার সামনে দাঁড়ানো এই মানুষটাই শেষ পরাক্রমী মোগল সম্রাট আলমগীর! ইহকাল আর পরকালের সীমানা অস্বীকার করে মাধ্যাকর্ষণকে পরাজিত করে উপস্থিত হয়েছেন আমার রিডিং রুমে।

 

বলেছিলাম অবশ্য– তা আমাকে বলে আপনার তো কোনো লাভ হবে না। বরং কোনো সাংবাদিক, মানে সংবাদ সম্মেলন করলে আপনার কথাগুলো মিডিয়াতে আসতো। সেটাই ভালো হতো না?

তিনি তিক্ত হাসলেন। বললেন– এতোদিনে আমি এটুকু অন্তত বুঝেছি যে মিডিয়া যতো প্রভাবশালীই হোক না কেনো, তা খুবই অস্থায়ী। কিন্তু তোমরা লেখকরা ফিকশন আকারে লিখে ফেললেও সেটা সত্যের চাইতেও বড় হয়ে যায়। আজ তোমাদের মতো লেখকদের কল্যাণেই দারা শিকোহ চিরজীবিত হয়ে গেছে। আর আমি হয়েছি ইতিহাসের খলনায়ক, গোঁড়া, মৌলবাদী।

 

তার সামনে সিগারেট ধরানো ঠিক হবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। নিকোটিনের গন্ধ লেগে থাকা আঙুলদুটো শুঁকতে শুঁকতে বললাম– তা কথাটা তো মিথ্যে নয়। আপনি তো গোঁড়া ছিলেনই। দরবার থেকে লেখক-গায়ক-শিল্পী সবাইকে বের করে দিয়েছিলেন। আর আজ পাঁচশো বছর পরে আপনাকে আসতে হয়েছে একজন লেখকেরই কাছে।

 

তিনি আবারও মৃদু হাসলেন। বললেন– এসব বলতে গেলে আমার মূলকথাটা জানাতে দেরি হয়ে যাবে। তবু বলছি। শোনো। মোগল দরবারে আনুষ্ঠানিকতা ছিলো অনেক। একটা ছিলো ‘বাদশাহপরস্তি’। প্রজাদের বিশ্বাস করানোর চেষ্টা হতো যে বাদশাহ একটি শক্তি। তিনি এই মাটির পৃথিবীতে আসমানী খোদার মতোই আরেকজন খোদা। মহান আকবরের দর্শনলাভকে অনেকে এবাদত বলে গণ্য করত। প্রকাশ্য দরবারে তাঁকে সেজদা করা হতো। আমার পিতা সম্রাট শাজাহান এই সেজদা প্রথা বাতিল করেছিলেন। তার পরিবর্তে চালু করেছিলেন বাদশাহ’র পায়ের সামনের মাটিতে চুম্বন করা। আমি এটা বন্ধ করেছিলাম। শির ঝুঁকিয়ে কুর্ণিশ করার প্রথা বাতিল করেছিলাম। কিছু আমির-ওমরাহ ছিলেন, যারা সকালে ঘুমভাঙামাত্র দরবারে এসে অপেক্ষা করতেন। বাদশাহকে দর্শন না করা পর্যন্ত পানি পর্যন্ত খেতেন না। অর্থাৎ এটাও ছিলো তাদের একটা এবাদত। আমি এই দর্শনদান বন্ধ করেছিলাম। দরবারে যেসব কবিদের জায়গা দেওয়া হয়েছিলো, তারা বাদশাহকে মর্ত্যরে খোদা বানিয়ে কবিতা লিখতেন, আর গায়করা সুর দিয়ে সেইসব গান পরিবেশন করতেন। আমি কবিদের অনুরোধ করেছিলাম এই ধরনের কবিতা না লিখতে। কিন্তু তারা বাদশাহকে দুনিয়ার খোদার নিচে অন্য কিছু ভাবতে অপারগ। তাই তাদেরকে আমি বিদায় করতে বাধ্য হয়েছিলাম দরবার থেকে।

 

বাহ! দারুণ তো! আপনাকে খোদা বানিয়েও কবিতা লেখা হয়েছিলো?

তিনি মাথা একদিকে কাত করে সায় দিলেন। হয়েছিলো।

সেসব কবিতা মনে আছে আপনার? একটা শোনাবেন নাকি?

তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন– যা আমি তখনই নষ্ট করার আদেশ দিয়েছি, তা এখন আমার মনে রাখার কোনো কারণ আছে কী?

তাইতো! আমার বোকার মতো আব্দারের জন্য আমি নিজেই শরমিন্দা।

দুঃখিত জনাব! আমি বলি– এবার আপনি আপনার কথা বলুন।

তিনি আমার ছোট্ট পড়ার ঘরটার এমাথা থেকে আরেক মাথায় গেলেন। র‌্যাকের বইগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। বিড়বিড় করে বললেন– তোমার কিতাবখানা বেশ ভালো। নানান ধরনের বই। বই খুব ভালো জিনিস। তবে কখনো কখনো বই খুব একপেশে হয়ে যায়। কাজীর বিচারের চাইতেও বইয়ের বিচার অনেক কঠোর। কাজীর বিচার এককালীন। আর বইয়ের বিচার চিরকালীন।

আমি তাকেই কথা বলতে দিয়ে নিজে চুপ করে রইলাম।

তিনি হঠাৎ তীব্রদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন– তোমরা মনে করো দারা শিকোহ খুব উঁচুমনের মানুষ ছিলেন তাই না?

 

আমাদের কাছে এখন একজন সাম্প্রদায়িকের তুলনায় একজন উদারপন্থী তো অবশ্যই উঁচুমানের মানুষ বলেই তো বিচার্য। সেটাই বললাম। তিনি তীক্ষ্ণকণ্ঠে বললেন– কিন্তু তার সাথে আমার বা আমাদের বিরোধ তো ধর্ম নিয়ে ছিলো না। ছিলো সিংহাসন নিয়ে।

এইবার আমাকে নড়ে-চড়ে বসতেই হয়। আমাদের ওয়াজ-মিলাদে যাকে ‘জিন্দাপীর’ আখ্যা দেওয়া হয়, দাবি করা হয় যে তিনি সিংহাসনে না বসলে ভারতবর্ষ থেকে ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে যেত, তিনি আজ সরাসরি বলছেন যে, ইসলাম রক্ষার জন্য তিনি যুদ্ধ করেননি। যুদ্ধ করেছেন ক্ষমতা দখল করার জন্য!

 

দুই.

 

ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিলো হিজরি ১০৬৭ সালে। আমার পিতা হুজুরে আকদাস সম্রাট শাজাহান বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হলেন। আমরা পরে জেনেছি যে ঐ বছর জিলহজ মাসের ৭ তারিখ থেকে তিনি শারীরিকভাবে পরিপূর্ণ অপারগ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর নামে সাম্রাজ্য পরিচালনা করছিলেন দারা শিকোহ। তখন আমি দাক্ষিণাত্যে, আমার মেজো ভাই শাহ সুজা বাংলা মুলুকে, প্রিয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা মির্জা মুরাদ গুজরাতে। আব্বাজান আমাদের সেই সেই এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে পাঠিয়েছিলেন। আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব একজন করে বিশ্বস্ত প্রতিনিধি থাকতো রাজধানী দিল্লীতে। তার মাধ্যমেই আমরা দিল্লীর খবর পেতাম। এবং আমাদের খবর পাঠাতাম রাজধানীতে। আমার সেই প্রতিনিধি ছিলেন ইসা বেগ। তার সাথে হঠাৎ আমার সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলো। শুনলাম শাহ সুজা এবং মির্জা মুরাদও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না। পরে অবশ্য জেনেছি যে দারা শিকোহ তিন প্রতিনিধিকেই গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন। তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে মুচলেকা আদায় করেছিলেন যে কেউ-ই আমাদের কাছে কোনো খবর পাঠানোর চেষ্টা করবেন না। তখন আমরা গুপ্তচর পাঠাই। আমরা জানতে পারি দারা শিকোহ হুজুরে আকদাসকে রাজধানী থেকে দূরে আগ্রা দূর্গে সরিয়ে দিয়েছেন। আমার পিতার হাতের লেখা এবং স্বাক্ষর সম্পূর্ণ নকল করে বিভিন্ন ফরমান জারি করছেন। আব্বাজান শাজাহানের নামে আসলে দারাই সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন। আমি এই ব্যাপারটি প্রথমে বুঝতে পারিনি। আমি তখন ছিলাম বিজাপুরের যুদ্ধক্ষেত্রে। মোগলবাহিনী যখন বিজাপুর দখলে এনে ফেলেছে প্রায়, ঠিক সেই সময় সম্রাট শাজাহানের নামাঙ্কিত একটি হুকুমনামা এসে পৌঁছুলো। সেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধে নিয়োজিত সকল সেনাপতি এবং অমাত্যগণকে অবিলম্বে রাজধানীতে ফিরে যেতে হবে। পিতার আদেশ অলঙ্ঘনীয়। আমি তাই যুদ্ধ স্থগিত করার বিনিময়ে বিজাপুরের রাজার কাছ থেকে এক কোটি টাকা নজরানা আদায় করলাম। তারপর সেই টাকাসহ আমির-অমাত্য-সেনাপতিদের পাঠিয়ে দিলাম রাজধানীতে। পরে জেনেছি, আমাকে শক্তি খর্ব করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দারা শিকোহ আমার সেনাপতি এবং আস্থাভাজন অমাত্যদের আমার কাছে সরিয়ে নিয়েছিলেন সেই ফরমানের দ্বারা।

 

তার মানে দারা ভালোই বুঝতেন রাজনীতি! তাকে এখনকার মানুষ যে আত্মভোলা দার্শনিক কবি মনে করে, সেটা ঠিক নয়!

মখমলের মতো সাদা পোশাক পরা মানুষটি হাসলেন। হাসিতে বেদনা মিশে আছে। তাঁর উষ্ণীষে লাগানো জমরুদ পাথরটাতে একবার হাত বুলালেন তিনি। তারপর বলতে শুরু করলেন– শাহ সুজা এবং মির্জা মুরাদ অধৈর্য হয়ে উঠছিলেন। তারা বলছিলেন যে আব্বাহুজুর ইন্তেকাল করেছেন। এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দারা শিকোহ সবকিছু কুক্ষিগত করে নেবেন। কিন্তু আমি আরো ধৈর্য ধরার পক্ষপাতী ছিলাম। আমার গুপ্তচররা যেসব খবর আনছিলো, তা থেকে বোঝা যাচ্ছিলো যে হুজুরে আকদাস সম্রাট শাজাহান বেঁচে আছেন। আমি তখনো তাঁর বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা রেখেছিলাম।

কিন্তু শাহ সুজা আর দেরি করলেন না। তিনি বাংলা মুলুকে বসেই নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন। এবং রাজধানীর দিকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন।

 

মির্জা মুরাদ আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। তবে তিনিও আমার মতামত না নিয়েই গুজরাতে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন। নিজের নামে মুদ্রা চালু করলেন। মসজিদে তার নামে খুৎবা পড়তে নির্দেশ দিলেন। তিনিও রাজধানীর দিকে অগ্রসর হবার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠলেন। আমি তাকে চিঠি লিখে বারণ করলাম– ‘এখন পর্যন্ত যেহেতু অবশ্যম্ভাবী ঘটনাটা (শাজাহানের মৃত্যু) ঘটবার সংবাদ আমাদের কাছে পৌঁছায়নি, বরং তাঁর স্বাস্থ্যোন্নতির লক্ষণই প্রকাশ পাচ্ছে, তখন নিজ নিজ স্থান ত্যাগ করা এবং মর্যাদা ও পদের অধিকারে নিয়োজিত হওয়া আমাদের পক্ষে সমীচীন নয়।’

কিন্তু মির্জা মুরাদ তখনই যুদ্ধযাত্রার পক্ষে। তিনি রবিউল আউয়াল মাসে আমাকে ফিরতি চিঠিতে লিখলেন– ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো কিছুতেই বিশ্বাস স্থাপন চলে না। কেনোনা, (ক) গুপ্তচরদের রিপোর্টে বিশ্বস্তভাবে জানা যাচ্ছে যে জিলহজ মাসের মাঝামাঝি হজরত পরলোকগমন করেছেন। এবং (খ) আমার ভ্রাতৃবৃন্দের প্রতিনিধিরা প্রকৃত প্রস্তাবে নজরবন্দি হয়ে আছেন। এই উভয়বিধ অবস্থাতেই সংবাদের অপেক্ষা করা, সময় এবং সুযোগকে হাতছাড়া করা, শত্রুর সঙ্গে আলোচনায় বাজি রাখা এবং তার বশ্যতা স্বীকার করতে আদৌ মন চায় না।

এই সমস্ত ব্যাপারের সারকথা এই যে, আমি আমার কার্যাবলীর পূর্ণ সমাধান যুদ্ধ এবং সংগ্রামের মধ্যেই নিহিত বলে মনে করি। বিধায় আমি সর্বত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি। যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোনো চিন্তাই আমার নেই।

যদি আপনার ন্যায় মহিমান্বিত ব্যক্তির মতামতের অপেক্ষা আমাকে না করতে হতো তাহলে এতোদিন আমি ঐ অঞ্চলে পৌঁছে যেতাম।’

 

একটানা কথা বলায় তাঁকে ক্লান্ত মনে হচ্ছিলো। আমি ভদ্রতার খাতিরে বললাম– আপনি কি চা বা পানি খাবেন?

তিনি মাথা নাড়লেন। বললেন– আমি এখন ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে মুক্ত। আমি এখন যেখানে অবস্থান করি, সেখানে এসব নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই।

আমি এই সুযোগে চট করে জানতে চাইলাম– ইহজগৎ ত্যাগ করার পরে আপনি এখন কোথায় আছেন? বেহেস্তে নিশ্চয়ই!

ধারালো বুদ্ধির মানুষ। আমার চালাকি ঠিকই ধরে ফেললেন। একটু শব্দ করেই হেসে বললেন– এই প্রশ্নের উত্তর পৃথিবীবাসীর কাছে আমৃত্যু অজানাই থাকবে।

আমি আবার কথার খেই ধরলাম– এরপর আপনারা দারা শিকোহ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন?

তিনি উত্তরে বললেন– আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছিলো। দারা শিকোহ কাউকে আক্রমণ করলে আমরা আক্রান্তের সাহায্যে এগিয়ে যেতে বাধ্য হবো। তো দারা সেনাবাহিনী পাঠালেন শাহ সুজাকে আক্রমণ করার জন্য। তখন আমাদের রাজধানী অভিমুখে অভিযান চালানো ছাড়া উপায় রইলো না।

কেনো, রাজধানীতে কেনো আক্রমণ করতে গেলেন? শাহ সুজা ছিলেন বাংলায়। আপনাদের তো সেখানে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত ছিলো।

যুক্তি অনুযায়ী তোমার কথা ঠিক। কিন্তু যুদ্ধজয় করতে হলে যেসব কৌশল অবলম্বন করতে হয়, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আঘাতের জন্য সুবিধাজনক জায়গা বেছে নেওয়া। আমরা বাংলার দিকে অগ্রসর হলে সেখানে পৌঁছুতে বেশ কয়েকমাস সময় লেগে যেতো। তার চাইতে রাজধানী দখল করে দারাকে পরাজিত করতে পারলে সুজার বিরুদ্ধে পাঠানো দারার বাহিনীকে আমরা হুকুম দিয়েই ফেরত আনতে পারবো। সেই হিসাবেই আমাদের রাজধানীর উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলাম।

দিল্লীর উপকণ্ঠে পৌঁছে আমরা জানলাম যে পিতা সম্রাট শাজাহান জীবিত আছেন। তবে দারা শিকোহ তাঁকে আগ্রা দূর্গে সরিয়ে রেখেছে। তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে জাহানারা বেগম। দারা শিকোহ এবং জাহানারা ছিলো সম্রাটের চোখের মণি। তিনি সবসময়েই দারার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।

আমি প্রশ্ন করলাম– আপনাদের পিতা যদি দারাকেই নিজের সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করতেন, তাহলে তো সেটা মেনে নেওয়া ছাড়া আপনাদের আর কোনো উপায় ছিলো না।

তিনি একমত হলেন– তুমি ঠিকই বলেছো। পিতা হয়তো একসময় ঘোষণাটি দিতেন। কিন্তু দারার আর তর সইছিলো না। তিনি পিতাকে আগ্রাতে সরিয়ে রেখে নিজেই সাম্রাজ্যের অধিকার নিজের হাতে তুলে নিলেন।

তাকে একটু থামিয়ে প্রশ্ন করলাম– কিন্তু আমরা তো কোনো কোনো ঐতিহাসিকের লেখায় দেখেছি যে সম্রাট শাজাহান তাঁর সাম্রাজ্য একটি কেন্দ্রের অধীনে রেখে চার পুত্রের মধ্যে ভাগ করে দিতে চেয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে যে দারা শিকোহ’র জন্য পাঞ্জাব আর কাবুল, সুজার জন্য বাংলা, মুরাদের জন্য গুজরাত, আর আওরঙ্গজেবের জন্য যুবরাজের মনসব এবং রাজধানীর রাজত্ব।

এইশেষের অংশেই তীব্র আপত্তি ছিলো দারার। সেই কারণেই সে পিতাকে সরিয়ে নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলো শাসনভার।

অতএব যুদ্ধ এড়ানোর আর কোনো সুযোগ রইলো না।

 

তিন.

 

“১০৬৮ হিজরির জমাদিউল আউয়াল মাসের ১৭ তারিখে আলমগীর বিজাপুর থেকে রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। বুরহানপুরে পৌঁছালেন ২৫ তারিখে। এখানেই তিনি অবস্থান করলেন পুরো একমাস। রাজধানীসহ সাম্রাজ্যের খবর সংগ্রহ করলেন। মির্জা মুরাদও রওনা দিয়েছেন। নর্মদা নদী পেরিয়ে দিয়ালপুর নামক স্থানে দুই ভাই একত্রিত হলেন। দারা শিকোহ আগেই সেদিকে সৈন্য পাঠিয়েছেন রাজা যশোবন্ত সিং-এর নেতৃত্বে। যশোবন্ত সিং নিজে শিবির স্থাপন করলেন আলমগীরের শিবির থেকে মাত্র দেড় মাইল দূরে।

 

আলমগীর তখন বিখ্যাত কবি কবকালাছ ব্রাহ্মণকে পাঠালেন যশোবন্ত সিং-এর কাছে। কবির মাধ্যমে জানালেন যে তিনি যুদ্ধ করতে আসেননি। তিনি এসেছেন অসুস্থ পিতা সম্রাট শাজাহানকে দেখতে। অতএব পথরোধ না করে তাকে রাজধানীতে যেতে দেওয়া হোক। কিন্তু দারার আদেশ ছিলো যে কোনোক্রমেই আলমগীরকে রাজধানীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। কাজেই যশোবন্ত সিং কবির মাধ্যমে পাঠানো আলমগীরের বার্তায় কর্ণপাত করলেন না। বরং নিজে থেকেই আক্রমণ করলেন আলমগীরের বাহিনীকে। কিন্তু হেরে গেলেন আলমগীরের কাছে। জীবন বাঁচাতে সৈন্যদল পেছনে ফেলে যশোবন্ত সিং সোজা ফিরে গেলেন নিজের ঘরে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিলো আরেক ট্র্যাজেডি। তার স্ত্রী সোজা বলে দিলেন যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা কোনো ব্যক্তির সাথে তিনি একশয্যায় শয়ন করতে রাজি নন। এবং বাকি জীবন এই নারী নিজের প্রতিজ্ঞায় অটল ছিলেন।

 

এবার দারা শিকোহ স্বয়ং ৬০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে আলমগীর এবং মুরাদের বিপক্ষে যুদ্ধে চললেন। সম্রাট শাজাহান জানতেন যে, দারা যতোই জ্ঞানচর্চা করুক না কেন, যুদ্ধবিদ্যায় এবং বীরত্বে আলমগীরের তুলনায় নিতান্তই নাবালক। তিনি বারবার দারাকে নিষেধ করলেন। বরং চাইলেন একটা সমঝোতার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু দারা শুনলেন না পিতার কথা। তিনি পিতাকে প্রায় জোর করেই ফেরত পাঠালেন আগ্রায়। আর বাহিনী নিয়ে সমুগড়ে অবস্থানরত আলমগীর এবং মুরাদকে আক্রমণ করলেন।

এই যুদ্ধে অতুলনীয় বীরত্ব দেখিয়েছিলেন মির্জা মুরাদ। নিজেও আহত হয়েছিলেন তিনি। রক্তে তার হাতির হাওদা ভিজে গিয়েছিলো। কিন্তু যুদ্ধ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছু হটেননি তিনি।

পরাজিত দারা আগ্রায় ফিরে এলেন বটে। কিন্তু লজ্জায় পিতার সাথে দেখা করলেন না। সেই রাতেই তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে রওনা দিলেন লাহোরের উদ্দেশ্যে।”

 

তার কথা শেষ হলে বললাম– কিন্তু দারা তো আপনার ভাই ছিলেন। আপনাদেরই বড় ভাই। ছেলেবেলায় নিশ্চয়ই একসাথে আপনারা খেলাধুলা করেছেন। তিনিও তো নিশ্চয়ই আপনাকে আদর করেছেন।

আলমগীরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো– হ্যাঁ। ছোটবেলা তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। ছেলেবেলার সেইসব দিন! আহ!

সেইসব দিনের কথা মনে রেখে আপনি তো তাঁকে হত্যা না করলেও পারতেন! বন্দি করে রাখতে পারতেন! নির্বাসনে পাঠাতে পারতেন! ভাই হিসাবে তিনি তো এটুকু পেতেই পারতেন!

তাঁর মুখে আবার ফিরে এলো সেই পাথুরে কাঠিণ্য। বললেন– বিপদ ছিলো। দারা বিদ্রোহ করতে পারতো। দল পাকিয়ে আমার বিরুদ্ধে ঠিকই আবার ষড়যন্ত্র করতো।

কীভাবে বুঝলেন?

 

দারার অনুসারীর সংখ্যা ছিলো অনেক। প্রজাদের মধ্যেও অসংখ্য অনুরাগী ছিলো তার।

কাফী খাঁর লেখা বইয়ের বিবরণ মনে পড়ে আমার– “দারা শিকোহ ছিলেন বড়ই শান-শওকতের শাহজাদা। তিনি যখন রাস্তায় বেরুতেন, অকাতরে দান করতেন মানুষদের।

সেই তাঁকে যখন বন্দি অবস্থায় দিল্লীতে নিয়ে আসা হলো, তাঁকে দেখে আহাজারি শুরু করলো রাজধানীর মানুষ। নরনারী নির্বিশেষে অঝোরে রোদন করছিলো, বালাখানার ছাদগুলো থেকে সরকারি কর্মচারিদের উপর অজস্র ঢিল এবং পাথর নিক্ষেপিত হচ্ছিলো। মালেক জীবন নামক যে সেনাপতি দারা শিকোহকে বন্দি করে এনেছিলো, তার প্রতি অনর্গল গালি এবং অভিশাপ বর্ষণ করছিলো দিল্লীবাসী। যে শাহাজাদা খুব শান-শওকতের সাথে দিল্লীর পথে বের হতেন, লোকে যখন তাকে দুর্দশাগ্রস্ত, পদযুগল শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং অসহায় অবস্থায় বাজার অতিক্রম করতে দেখেছে, তখন এমন পাষাণহৃদয় কে আছে যে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ না করে থাকতে পারে!”

 

তার মানে, দারা শিকোহ আপনাদের তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিলেন!

তিনি অস্বীকার করলেন না। তবে বললেন– জনপ্রিয়তা আর যোগ্যতা এক জিনিস না। তাছাড়া তখন তো তোমাদের আমলের মতো ভোটের ব্যবস্থা ছিলো না। ছিলো না বলেই মানুষ যোগ্য শাসক পেয়েছে।

কথাটা মেনে নিতে আমি বাধ্য।

এবার প্রশ্ন করলাম– দারা শিকোহর ব্যাপারে নাহয় আপনার কথা মেনে নেওয়া গেলো। কিন্তু মির্জা মুরাদ? তিনি তো আপনাকে সিংহাসনে বসানোর ব্যাপারে সবচাইতে বেশি ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর বীরত্বের কথা আপনি নিজেও বলেছেন। তাঁকেও কেনো হত্যা করলেন আপনি?

আলমগীরের চোখে-মুখে বিষাদ। কিছুক্ষণ কোনো উত্তর করলেন না। একটি চিঠি এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। ফারসিতে লেখা। আমি ফারসি জানি না। কিন্তু এখন দেখলাম দিব্যি পড়তে পারছি। আলমগীর নিজেই চিঠিটা লিখেছেন মির্জা মুরাদকে– ‘ভ্রাতৃবর! আপনাকে একথা স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজন নেই যে, রাষ্ট্রীয় গুরুভার বহন করার মতো কষ্ট স্বীকার করা বাস্তবিক আমার স্বভাব ও চরিত্রের একান্তই বিরোধী। আমি রাজত্বের অধিকার এবং দাবিদাওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে অপসারিত হয়ে যাচ্ছি। পক্ষান্তরে দারা শিকোহ রাজ্য পরিচালনা করার গুণাবলী থেকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, বরং ধর্মহীন ও কাফের; বিধায় সে সিংহাসনে আরোহন ও মুকুট ধারণের একান্তই উপযুক্ত। সুতরাং এমতাবস্থায় এই বিরাট রাজ্যের রাজকার্য পরিচালনভার গ্রহণ করবার যোগ্য ব্যক্তি একমাত্র আপনিই। আমার সম্বন্ধে আপনি মনে রাখবেন, আপনার পক্ষ থেকে আমি যদি এইরূপ দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পেয়ে যাই যে, খোদার অনুগ্রহে আপনি রাজত্ব লাভ করলে আমাকে নিশ্চিন্তে এবাদত-বন্দেগি করবার উদ্দেশ্যে আপনার রাজ্যমধ্যে একটা নির্জন স্থান প্রদান করবেন, তাহলে আমার পরামর্শ এই যে আপনি কালবিলম্ব না করে সুযোগের সদ্ব্যবহার করুন।’

 

আমি চিঠি পড়া শেষ করে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। আলমগীরের মুখে কষ্টের ছাপ। বললেন– মির্জা মুরাদ সত্যিকারের বীর, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। কিন্তু মানুষের কানকথা শুনতে অভ্যস্ত। আমরা দিল্লী দখল করার পরে মুরাদ নিজের দল ভারি করার চেষ্টা শুরু করে। আমি তাকে বারবার বলি যে, সে চাওয়ামাত্র শাসনভার আমি তার হাতে তুলে দেবো। কিন্তু সে নিজের কাজ চালিয়ে যায়। গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন তাকে বন্দি না করে উপায় ছিলো না।

আমি একমত নই। এটা জানার পরে তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন– আমি তোমাকে একমতে আনার জন্য আসিনি। আমি শুধু আমার কথাগুলো বলতে এসেছি।

 

চার.

 

তিনি বিদায় নেবার উদ্যোগ করছেন।

আমি বললাম– আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে।

তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলেন।

আমি বললাম– আপনি কি জানেন যে আপনার পিতা সম্রাট শাজাহান যে বছর তাজমহলের নির্মাণকাজ শেষ করেছিলেন, সেই একই বছর লন্ডনে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল তৈরি হয়েছিলো?

তিনি বললেন– না। আর এটাও জানি না, এই দুটির মধ্যে সম্পর্ক কী।

আমি বলছি। সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল ছিলো ঐসময় ইউরোপের সবচাইতে বড় ইমারত। আর তাজমহলের তুলনায় সেটা ছিলো নিতান্তই নিকৃষ্ট একটি ইমারত।

আলমগীরকে বিমূঢ় দেখায়– তুমি ঠিক কী বলতে চাইছো?

আমি বলতে চাইছি, এই দুই ইমারতের তুলনা করলেই বোঝা যায় যে সেই সময় জ্ঞানে-স্থাপত্যে-শিল্পে-নির্মাণে মোগল-ভারত অনেক এগিয়ে ছিলো ইউরোপের তুলনায়।

তিনি মাথা ঝাঁকালেন– তা হতে পারে।

আমি প্রশ্ন করলাম– আপনি তো ফতোয়ায়ে আলমগীরি প্রণয়ন করেছিলেন?

এবার তাঁর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললেন– খুব শান্তি পেয়েছিলাম এই কাজটি করে। কঠোর পরিশ্রম হয়েছে। মোল্লা নেজামকে দিয়েছিলাম প্রধান দায়িত্ব। সাম্রাজ্যের সব প্রান্ত থেকে আলেম-ওলামাদের ডেকে এনেছিলাম। বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন তারা। প্রত্যেক আলেমের জন্য রোজকার খরচ বরাদ্দ ছিলো তিনটাকা মাত্র। তবু বছরে দুইলক্ষ টাকা খরচ হতো। এই গ্রন্থ আরব এবং রোমে খুব সমাদও পেয়েছিলো। তারা একে বলতো ‘ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া’।

আমি তীব্রকণ্ঠে বললাম– আপনি মোল্লাদের পেছনে টাকা খরচ করে ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরি’ প্রণয়ন করলেন, তা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সেই সময় মোগল সাম্রাজ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চাকারীদের সমস্ত পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে দিয়েছিলেন আপনি। তার বিষময় ফল ভোগ করছে এখন সমস্ত পৃথিবী।

তাঁকে হতবাক দেখায়– আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তোমার কথা।

আপনি যখন ফতোয়ায়ে আলমগীরি প্রকাশ করলেন, তার কয়েক বছরের মধ্যেই ইউরোপে প্রকাশিত হলো নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা’। সেই যে বিজ্ঞান আসন লাভ করল ইউরোপে তার জোরেই সমস্ত পৃথিবী এখনো তাদেরই করায়ত্তে। আপনাদের অবহেলায় বিজ্ঞানকে ধারণ করার মতো বিজ্ঞানসেবক আর জন্ম নিতে পারলো না বাংলায়, ভারতে। আমরা এখনো ধর্ম নিয়েই আছি। ফতোয়া নিয়েই আছি। আর পৃথিবীর সবকিছু দখল করে নিয়েছে নিউটনের উত্তরসূরিরা।

Facebook Comments