শেয়ার করুন:

এলিজা বিনতে এলাহী বাংলাদেশী বিশ্ব পর্যটক। গত বিশ বছর ধরে তিনি ভ্রমণ করছেন।এ পর্যন্ত ভ্রমণ করেছেন ৪৯টি দেশের ২৬৪টি শহর।বাংলাদেশের ৬৪ জেলার সব জেলা তিনি ভ্রমণ করেছেন। দেখেছেন প্রায়সব ঐতিহাসিক ও প্রত্ননিদর্শন। কাজ করছেন ঐতিহ্যভ্রমণ নিয়ে। বাংলাদেশকে দেখতে চান একটি বিশ্বপর্যটনের অনন্য স্থানে।

বর্তমানে তিনি ইউনিভারসিটি অব সাউথ এশিয়া’র সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। “QUEST …a heritage journey of Bangladesh নামে ঐতিহ্যভমণের একটি প্রজেক্ট গড়ে তুলেছেন নিজ উদ্যোগে।এর মাধ্যমে তিনি অনেক ডকুমেন্টারি, ফটোগ্রাফি।লেখালেখি করছেন নিয়মিত।এযাবৎ তার অনেক সাক্ষাৎকার ও ভ্রমণ বিষয়ক লেখা প্রকাশিত ও প্রদর্শিত হয়েছে দেশের খ্যাতনামা পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে।
আড্ডালাপে চুয়াল্লিশ বছরের এই প্রাণোচ্ছল তরুণী পর্যটন, ঐতিহ্যভ্রমণ নিয়ে কথা বলেছেন আড্ডাপত্র সম্পাদক কবি মনসুর আজিজ এর সাথে।

মনসুর আজিজ: ভ্রম‌ণের আগ্রহটা কেমন ক‌রে তৈ‌রি হ‌লো?

এলিজা বিনতে এলাহী: এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা আমার জন্য বরাবরই খুব শক্ত । আমি নিজেকে ঘুরে বেড়াতে দেখছি সেই যখন আমার বয়স ৩ বছর । কিভাবে এরকম হলপ করে বলতে পারছি ! পারিবারিক এলবামের সংগ্রহ করা ছবি গুলো থেকে ।

আসলে ঘুরে বেড়াবার অভ্যাসটা গড়ে উঠেছে পরিবার থেকে । বাংলাদেশে প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছি সেই ছোট বেলা থেকে । আমি কখনোই জীবন, যাপন করতে চাইনি, জীবনকে সব সময় উপভোগ করতে চেয়েছি । জীবনকে আমি প্রকৃতির একটি মূল্যবান উপহার মনে করি । সেখান থেকেই উপভোগ করার চিন্তা মাথায় এসেছে । আর উপভোগ করবার মাধ্যম আমার কাছে ভ্রমণ । এক জীবনে পৃথিবীতে যা কিছু আছে যতটুকু সম্ভব দেখে যেতে চাই ।

মনসুর আজিজ: প্রথম কোথায় ভ্রমণ ক‌রে‌ছেন, তার অভিজ্ঞতা সম্প‌র্কে জান‌তে চাই।

আগেই বলেছি নিজের দেশ পুরোটাই দেখেছি ।

আর বিশ্ব ভ্রমণ শুরু করেছি ১৯৯৯ সালে । দেশ ছিল নেপাল ।অবশ্যই ভিন্নরকম এবং আনন্দময় । সেই সময়ই আমার প্রথম উড়োজাহাজে চড়া । একে তো বিদেশ ভ্রমণ করছি আর তার উপর মেঘ, আকাশ দেখবার অস্থিরতা ।
ভয়, ভালোলাগা, অজানাকে জানা সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল । বয়সও কম ছিল । আর সে সময় গুগল, ইন্টারনেট সচল ছিল না । কী দেখবো, না দেখবো সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করছিল ।

মনসুর আজিজ: আপ‌নি তো অর্ধশতাধিক ‌দেশ ভ্রমণ ক‌রে‌ছেন, সব‌চে‌য়ে কষ্টকর ও সব‌চে‌য়ে আন‌ন্দের ভ্রম‌ণের কথা বলুন।

এলিজা: প্রতিটি নতুন শহর আমার কাছে এক একটি নতুন প্রেমের মত সুন্দর । আমি যে কোন নতুন শহরের প্রেমে পরে যাই । এই ব্যাপারে আমার এক চাইনিজ বন্ধু বনির কথা মনে পরে – নেদারল্যান্ডসে থাকা অবস্থায় বনির সাথে আমি নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন শহর ঘুরেছি । ট্রেন থেকে নামার পর আমি এতই খুশি থাকতাম যে, সেটা আমার চোখে মুখে অথবা চলাফেরায় বোঝা যেত হয়তো । সে সবসময় বলতো— Eliza what so great about the city? You are in Netherlands. For me its look alike. Why are you so happy?
শুধু যে বিদেশের শহর গুলোকেই এমন মনে হয় তা নয় । বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা শহর আমাকে একই অনুভুতি দেয় ।
প্রতিটি দেশ ও সেসব দেশের শহরগুলোর প্রতিটিরই স্বাতন্ত্র্য আছে তাই বলা মুশকিল আলাদা করে কোনটা সেরা ছিল । যেহেতু ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের প্রতি আমার আলাদা একটা দুর্বলতা আছে তাই গ্রিসের শহরগুলো, ইতালি, চেক প্রজাতন্ত্র, লিথুনিয়ার বিভিন্ন শহর আমার কাছে ভাল লেগেছে । আর বিশেষ করে বলতে গেলে আমি নেদারল্যান্ডের প্রতিটি প্রদেশ ঘুরেছি । সেটি একটি ভালো অভিজ্ঞতা ছিল । যদিও দেশটি ছোট ।

মনসুর আজিজ: বি‌দে‌শের মা‌টি‌তে যখন দে‌শের পাস‌পোর্ট ও প‌রিচয় বহন ক‌রেন, তখন কেমন লা‌গে? বাংলা‌দেশ সম্প‌র্কে বি‌দেশী‌দের বি‌শেষ ক‌রে প্রশাসন ও পর্যটক‌দের দৃ‌ষ্টিভঙ্গী কেমন?

এলিজা: বাংলাদেশী হিসেবে অবশ্যই গর্ব বোধ করি ।
সবুজ পাসপোর্টের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে বৈ কি !

কিছু কিছু দেশে ভিসার ক্ষেত্রে জটিলতা আছে । এশিয়ার দেশগুলোতে হয়তো ভিসা নিয়ে প্রবলেমে পরতে হয় না কিন্তু ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা প্রভৃতি দেশে টুরিস্টদের জন্যও এখনো ভিসা অতটা সহজ হয়নি ।

ভিসা পাওয়া গেলেও ইমিগ্রেশন পার হতেও অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় । আমি যেহেতু বেশির ভাগ সময় সলো ট্রাভেল করি সেটার জন্যও প্রশ্নের সন্মুখিন হতে হয় । বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে একজন নারী ট্রাভেলার, শুধুমাত্র পর্যটনের জন্য যাচ্ছে, এটা অনেক ইমিগ্রেশন অফিসার শুনলে অবাক হয়!

একজন বাংলাদেশি ট্রাভেলার সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করা আর একজন বাংলাদেশী ট্রাভেলারের ডাবল পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করার মাঝে বিস্তর ফারাক রয়েছে । ফারাকটা ভিসার জটিলতা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বিষয় ও সামর্থ্যের ব্যাপারও রয়েছে ।

পর্যটকরা ভারত পর্যন্ত ভ্রমণ করতে চায়, কিন্তু এশিয়া ইউরোপের পর্যটকরা এখনো বাংলাদেশকে তাদের হলিডে ডেস্টিনেশন হিসেবে মনে করে না । আমি নেদারল্যান্ডস থাকা অবস্থায়, আমার গবেষণার জন্য একটি জরিপ করেছিলাম, সেই জরিপের অভিজ্ঞতা থেকেই বিশ্ব পর্যটকদের অনুভবের কথা বলছি ।

মনসুর আজিজ: আপ‌নি হ্যা‌রি‌টেজ ট্যু‌রিজম‌কে ভ্রম‌ণের অনুসঙ্গ কখন থে‌কে কর‌লেন। অভিজ্ঞতা কেমন?

এলিজা: আমি ছোট বেলা থেকে ইতিহাস প্রেমী, প্রত্নতত্ত্ব অনুরাগী । প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো তৈরির পেছনের মানুষের ভাবনা ও কারিগরদের দক্ষতা-কুশলতা আমাকে শুধু মানুষের সীমাহীন ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয় । এক ধরনের শক্তি অনুভব করি আমি । আমার মনে হয় মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই, শুধু স্বপ্ন দেখতে হবে ।
আমার পড়াশুনার বিষয় কখনো ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্ব ছিল না । নিজের ইচ্ছার তাগিদে আমি আমার প্রফেসরদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আমার শখের বিষয়কে পড়াশুনার সাথে সম্পৃক্ত করেছি ।
আমি আমার কাজের সাথে সবসময় বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করার চেস্টা করেছি । শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে আমি এযাবৎ ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালেয়াশিয়া, ভিয়েতনাম ও জাপানে ৮টি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে যোগ দিয়েছি । সেখানে বক্তা হিসেবে আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছি যেমন – বাংলাদেশের ট্যুরিজম এবং বেগম রোকেয়ার অবদান ।
বাংলাদেশের খুব কম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আছে যেগুলো সাধারণের কাছে পরিচিত । দেখার উপযোগী বিভিন্ন জেলায় অল্প কিছু সংখ্যক স্থাপনা আছে যা বহুল পরিচিত । আমি মুলত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রকাশিত বই, বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ারের বই এবং আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়ার ( যিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ নিয়ে গবেষণা করেছেন ) বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জেলাগুলো ঘুরছি । এমন কিছু স্থাপনার তথ্য আমি পেয়েছি যা লোকচক্ষুর অন্তরালে আছে । এমনকি সেই জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেই স্থাপনা সম্পর্কে অয়াকিবহাল নন । সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায়ে তুলে ধরবার পরও একই ধরনের ফিডব্যাক পেয়েছি “আল্লাহ! আপু এটা আমার জেলায় আমি জানি না!” উদাহরন স্বরূপ– ঠাকুরগাঁ জেলার গোরকুই কুপ (যা বাংলাদেশের একমাত্র বেলে পাথরের কূপ), নওগাঁ জেলায় জগদ্দল বিহার, দিনাজপুরের সীতাকোট বিহার (সেটি খনন করেছেন আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া), পঞ্চগড়ের ভিতর গড় (বাংলাদেশের একমাত্র দুর্গনগরী), গাইবান্ধা জেলার প্রাচীন বোগদহ বিহার, জয়পুরহাট পাথরঘাটা প্রাচীন নগরী, নওগাঁ জেলার দিবর দিঘি স্তম্ভ, ভীমের পান্টি, নীলফামারি জেলার ধর্ম পালের গড়, পটুয়াখালির মসজিদবাড়ি, সৈয়দপুরের ফিদা আলি ইন্সটিটিউট, সিলেটের মেগালিথ স্তম্ভ, চাঁপাই নবাবগঞ্জের নওদা বুরুজ প্রভৃতি ।
বিভিন্ন জেলার প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে । জেলার প্রাচীন ইতিহাস অনেকেই জানতেন না । ৫ হাজার বছরের পুরানো গাইবান্ধার রাজা বিরাট নগর, বরিশাল অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠ গঠিত হয়েছিল ৫০,০০০ হাজার বছর আগে আর মানুষ বসতি স্থাপন করে ৩,০০০ হাজার বছর আগে, বিক্রমপুর জেলার নগর কসবা, ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা ৩,০০০ বছর আগের প্রাচীন শহর, হবিগঞ্জের বানিয়াচং গ্রাম এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ গ্রাম । এই তথ্য গুলো অনেকে জানেন না আবার কেউ কেউ আবার ভুল তথ্য জানেন । বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোও আমাদের হেরিটেজের অংশ । চাপাইনবাবগঞ্জের কোল সম্প্রদায় সবচেয়ে ছোট সম্প্রদায় বাংলাদেশে এখন । তাছাড়া ঈশ্বরদী রয়েছে গুড়িয়া সম্প্রদায় যারা আমাদের ঐতিয্যের অংশ ।
বেশির ভাগ স্থাপনার অবস্থা খুবই শোচনীয় । তথ্য নেই, সংরক্ষণের অভাব রয়েছে । যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না । কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পর্যটন মন্ত্রনালয় স্মমিলিত ভাবে নেয়া দরকার বলে আমি মনে করি । সংরক্ষণের জন্য নিম্নের পদক্ষেপ গুলো নেয়া জরুরী-
• যেগুলো বেদখলে আছে সেগুলো দখল মুক্ত করা দরকার
• প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঠিক গবেষণার মাধ্যমে সংস্কার করা প্রয়োজন ।
• পর্যটন কর্পোরেশন সেগুলোকে দেখার উপযোগী করবে ।
• দক্ষ লোকবলের মাধ্যমে নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন।
• স্থাপনা সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রচার- প্রসারনা প্রয়োজন (অনলাইন ও অফ লাইন দুই পদ্ধতিতে )

মনসুর আজিজ: আপ‌নি তো দে‌শের ৬৪ জেলা ভ্রমণ ক‌রে‌ছেন, নারী হি‌সে‌বে কোন বিড়ম্বনার শিকার হ‌য়ে‌ছেন কিনা?

এলিজা: সত্যি কথা বলতে, নিজের দেশে ভ্রমণ করার সময় উল্লেখ করবার মত তিক্ত অভিজ্ঞতা নেই আমার ।

তবে নারী ট্রাভেলার হিসেবে পরিবারের অন্য সদস্যরা, বন্ধুরা, আত্নীয়স্বজনরা কিছু কটু কথা অবশ্য বলেছেন । সেটা বেশি হতো প্রথম দিকে এখন যেহেতু বেশ অনেক সময় অতিবাহিত করেছি ট্রাভেলার হিসেবে এখন আর তেমনটি শুনি না । মনে মনে অনেকেই নাখোশ, কারণ অনেকের কাছেই কাজটি অযথা মনে হয় । আমি আমার ফুল টাইম জবটা ছেড়ে পুরোপুরি ট্রাভেলে মনোনিবেশ করেছি যেই জন্য অনেকেই এটিকে সময় অপচয় বলে থাকেন ।

আমার ট্রাভেলে বাজে অভিজ্ঞতা না থাকবার আর একটি কারণ হচ্ছে, আমি যে কোন জায়গায় যাবার আগে ভালো করে রিসার্চ করে নেই, কোথায় থাকবো, খাবো, কী কী দেখবো, কোন বাহনে যাতায়াত করবো ( আমি পাবলিক পরিবহণ ব্যবহার করি )।
সব খুব ভালো করে জেনে নেই । নিজের জার্নিটা কনফার্ম করার চেস্টা করি, সেটা নিজের দেশ হোক আর বিদেশ হোক । কোন রকম বাজে অবস্থায় না পড়বার এটি একটি বড় কারণ বলে আমি মনে করি ।

মনসুর আজিজ: আমা‌দের পর্যটন শিল্প বিকা‌শের প‌থে কী কী বাঁধা আ‌ছে ব‌লে ম‌নে ক‌রেন?

এলিজা: বাংলাদেশ ট্যুরিজম নিয়ে আমি গবেষণা করছি ২০০৮ সাল থেকে । প্রথম একটি গবেষণা পত্র তৈরি করি “ Publicizing Tourism : opportunity and challenges in the context of Bangladesh “ . আর দ্বিতীয়টি ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডে “ A communication plan for Bangladesh Govt. to promote Bangladesh as a Global Tourist Destination” . দুটি গবেষণা পত্রেই আমি উল্লেখ করেছি কী কী পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে বাংলাদেশকে একটি বিশ্ব পর্যটনের দেশ বানানোর জন্য । সল্প পরিসরে পুরো গবেষণা তুলে ধরা সম্ভব নয় । শুধু মুল বিষয় গুলো তুলে ধরছি ।
• বর্তমান সময়ে বিশ্ব পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য ডিজিটালাইজেশনের সর্বোচ্চ ব্যবহার প্রয়োজন, তার মধ্যে পরছে কার্যকরি ওয়েব সাইট তৈরি (যেখানে পজেটিভ কন্টেন্ট থাকবে, ভিডিও, ছবির মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে, সঠিক তথ্য থাকবে, দ্রুত প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য লোক নিয়োগ করতে হবে )
• সোশ্যাল মিডিয়া যেমন – ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্টারনেট টিভির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থাপনা গুলোর ইতিহাস তুলে ধরতে হবে । সেখানে কিভাবে যাওয়া যায়, থাকার ব্যবস্থা, গাইডের তথ্য থাকতে হবে ।
• বিভিন্ন ধরনের প্রমোশনাল অফার দিতে হবে এয়ারলাইন কোম্পানিগুলোর সাথে যোগাযোগ করে ।
• বাংলাদেশে বিভিন্ন দুতাবাসগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও নিয়মিত তথ্য প্রদান করা ।
• এয়ারপোর্ট, বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে ষ্টেশনে ট্যুরিজম সম্পর্কিত তথ্য ও বিলবোর্ড স্থাপন ।
• সরকারিভাবে বিভিন্ন ট্যুরিজম ইভেন্টের আয়োজন করা এবং অন্য দেশের ট্যুরিজম কোম্পানিগুলোকে ইভেন্টে অংশগ্রহনের জন্য দাওয়াত দেয়া ।
• বিদেশে ট্যুরিজম ইভেন্টে অংশগ্রহণ ।
• সমস্ত দেশের এয়ারলাইনে বাংলাদেশের ট্যুরিজম সম্পর্কিত বই প্রদানের ব্যবস্থা করা ।

মনসুর আজিজ: বি‌দেশী পর্যটক‌দের ভ্রম‌ণে আকৃষ্ট করার জন্য সরকার কী কী পদ‌ক্ষেপ গ্রহণ কর‌তে পা‌রে?

এলিজা: দেশীয় পর্যটক যদিও আকর্ষিত হচ্ছে দর্শনীয় স্থানগুলোতে কিন্তু বিশ্ব পর্যটকদের আমার এখনও পুরোপুরি আকর্ষণ করতে পারিনি । প্রথমে গবেষণা প্রয়োজন – আমরা বাংলাদেশের কোন কোন দিকটা তুলে ধরতে চাই, আমাদের টার্গেট মার্কেট ঠিক করতে হবে তারপর টার্গেট মার্কেটের সাথে যথাযত কমিউনিকেশন করতে হবে । দেশের আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। হোটেল, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল দরকার, টুরিস্ট গাইড পেশাটি আমাদের দেশে এখনও গড়ে উঠেন। রেল পথ, নদী পথ ও সড়ক পথকে পর্যটনের আওতায় নিয়ে একটি সামগ্রিক পরিবর্তন দরকার ।
আমাদের দেশে এখনও ‘হেরিটেজ ট্যুরিজম’, ‘রিভার ট্যুরিজম’, ‘ইকো ট্যুরিজম ’ নতুন বিষয় । এগুলোর জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন । যদিও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কিছু কাজ হচ্ছে কিন্তু তা যথেস্ট নয় ।

মনসুর আজিজ: কক্সবাজার, রাঙ্গামা‌টি, কুয়াকাটা, সি‌লেট, সা‌জেক এসব অঞ্চল‌কে ঘি‌রে ট্যু‌রিজম জোন ও স্পোর্টস ট্যু‌রিজম গ‌ড়ে তোলা যায় কিনা? এ ব্যাপা‌রে আপনার অভিমত জান‌তে চাই।

এলিজা: অবশ্যই এই জোনগুলো ধরে স্পোর্টস ট্যুরিজম গড়ে তোলা যায় । শুধু স্পোর্টস ট্যুরিজম কেন এই অঞ্চল গুলো ধরে এডভেঞ্চার ট্যুরিজম, কমুউনিটি ট্যুরিজম, গ্রাম পর্যটন, হেরিটেজ ট্যুরিজম নিয়ে কাজ করবার অনেক সূযোগ আছে ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ সমুদ্র সৈকত নিয়ে নানা ধরনের এক্টিভিটি চালিয়ে থাকে । আমরা কক্সবাজারকে আইকনিক শহর হিসেবে তুলে ধরছি পর্যটন খাতে কিন্তু সেই হিসেবে অনেক অপরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে উঠছে কক্সবাজার ।

সেখানে পাহাড় সাগর ছাড়াও ঐতিহাসিক অনেক জায়গা আছে কিন্তু সেগুলো নিয়ে আলাপ অনেক কম হয় । রামু, টেকনাফ শহরগুলো ইতিহাস সমৃদ্ধ । দ্বীপ রয়েছে প্রায় ৯টি । কিন্তু আমরা ৩/৪টির কথাই জানি । সেগুলোতে ভিড় করছি আর সেই স্থানগুলো ধীরে ধীরে পর্যটন ক্ষমতা হারাচ্ছে ।

মনসুর আজিজ: আপ‌নি তো বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের পড়া‌চ্ছেন, সংসার কর‌ছেন। এত‌কিছুর পর পেশাদার ভ্রাম‌ণিক হি‌সে‌বে সময় বের ক‌রেন বিভা‌বে?

এলিজা: আমি ট্রাভেল করছি ২১ বছর । ট্রাভেল আমার জীবনের একটি অংশ, আমার শরীরে, রক্তে মিশে আছে । ভ্রমণ আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা । আমার শরীরের অন্যান্য অংশের মতই একটি প্রয়োজনীয় আর গুরুত্বপুর্ণ অংশ এই ট্রাভেল । আগে পুর্ণকালীন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলাম। গত ২ বছর খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করছি । সেজন্য এখন একটু সহজ হচ্ছে সব কিছু চালিয়ে নেয়া ।

মনসুর আজিজ: নতুন ভ্রাম‌ণিক‌দের জন্য আপনার পরামর্শ কী হ‌তে পা‌রে?

এলিজা: • ৩০ দিন আগে থেকে ভ্রমণের প্রস্তুতি নেয়া ( দেশটি সম্পর্কে জানা, দর্শনীয় স্থান কী কী আছে, থাকার ব্যবস্থা )
• আনুমানিক একটা বাজেট করে ফেলা
• যতদূর সম্ভব ভ্রমণের ব্যাগটি কম ওজনের রাখা
• সময়জ্ঞান থাকা খুবই বাঞ্ছণীয়
• শারীরিক সুস্থতার প্রতি খেয়াল রাখা
• ভিন্ন দেশে ভ্রমনের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সবসময় সঙ্গে রাখা
• ভ্রমনের সময় অন্য দেশের সংস্কৃতি ও নিয়ম কানুন মেনে চলা
• আরামদায়ক পোশাক পরা
• একটি দেশকে ভালভাবে জানবার জন্য সে দেশের সাধারন মানুষের সাথে কথা বলা এবং সম্ভব হলে তাদের খাবাবের স্বাদ নেয়া ।
• সব শেষ কথা হল, যখন যেখানে ভ্রমণ করবেন– আনন্দ নিয়ে ঘুরবেন, সেই দেশকে জানার চেষ্টা করবেন এবং পুরোপুরি উপভোগ করবেন, আপনার মূল্যবান সময়কে কাজে লাগাবেন ।

মনসুর আজিজ: আড্ডাপ‌ত্রের পাঠক‌দের উ‌দ্দে‌শ্যে কিছু বলুন।

এলিজা: বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ট্রাভেল করার মূল ভিশন হলো, আমি বাংলাদেশকে দেখতে চাই “একটি গ্লোবাল হেরিটেজ ট্যুরিজম ডেসটিনেশন হিসেবে” । আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, এটি একদিন না একদিন হবেই । পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে ও দেশের তরুণরা পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত হবে । দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের আমি দেখাতে চাই, আমার মত একজন সাধারণ নারী যেহেতু নিরাপদে ভ্রমণ করছে, তাহলে বাংলাদেশে নিরাপদে যে কেউ ভ্রমণ করতে পারে । বাংলাদেশ ভ্রমণের জন্য একটি নিরাপদ স্থান ।

 

Facebook Comments