২৪ মাঘ, ১৪২৯; ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩;রাত ১:২৪

প্রাণের প্রাণন: রমণীয় মাছ, মাতৃদুগ্ধ বাছুর ও অমৃত মানুষ | পলিয়ার ওয়াহিদ

আড্ডাপত্র

জুন ২১, ২০২২ | চিত্রকলা

সোহেল প্রাণন [জ. ১৭ জুন ১৯৭৮- মৃ. ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২] বাংলাদেশের ভিন্নধারার চিত্রশিল্পী। তাকে নিয়ে লিখেছেন কবি ও সাংবাদিক পলিয়ার ওয়াহিদ।

শুভ জন্মদিন Artist Sohel Pranon । যেখানেই থাকুন আমি আপনাকে কখনো ভুলব না। খোদা আপনাকে একটা আত্মার স্বর্গ দান করেছিলেন। আপনি সেখানে ভালো থাকুন। আর ছবি আঁকুন। আপনার মৃত্যু নেই। আপনার জন্মদিনই পৃথিবীর জন্মদিন। তবু দেহদানের দিনে আপনাকে, আপনাকে নিবেদন করে এই সামান্য লেখা আবারও তুলে ধরা হল।

কাকে বলে স্বজন? দিব্যি বেঁচে আছেন আমার বাবা-মা। তাদের দিব্যি দিয়ে বলতে পারি তারা চলে গেলে এতো ব্যথা পাবো কী না জানি না! তবে সোহেল ভাই আপনি আমার মনের জমিনে নকশি কাঁথার মতো ফুল-ফুল রঙিন সুতাই সেলাই হয়ে আছেন। আপনার বিদায়ে সেই কাঁথা আমার ছিঁড়ে যাচ্ছে! কে সেলাই করবে এসব অরূপ? আপনার ছবি আমাকে অন্য জগতের সন্ধান দেয়। আমি অতীতের রুহ আর পরকালের তাবৎ জোছনা দেখতে পাই আপনার ছবিতে। এতো রূপ-রস-প্রাণ আপনি হরণ করতেন কীভাবে? কোথায় সঞ্চায় করতেন এসব অমূল্য দরদি পালক? তবে হ্যাঁ যদি আপনার মতো চট করে চলে না যাই। যদি যতি চিহ্ন সহজে ধরা না দেয় আমি আপনার প্রতিটি ছবি নিয়ে আলাদা আলাদা গল্প লিখবো। এ আমার কবি জীবনের একমাত্র সংকল্প।

আপনার আঁকা মিয়্রমান গাঢ়নীল কালিক জীবনের বাঁক আর শীতের গোধুলিতে পুরো পরিবারের রঙিন খোশগল্পের নতুন আকাশতুতে পরম্পরা আর কারো ছবিতে আমি কখনো পাবো না! আহ কী জীবন্ত মাতৃদুগ্ধ ক্ষুদার্ত বাছুর! ছাগল কাঁথে রাখালিয়া ঘনসন্ধ্যা, রিকশায় আষ্টেপৃষ্টে সাজানো যুগল, গৃহপালিত গোয়ালঘর, রমণীয় বলিষ্ঠ মাছ, ঘরে ফেরা অমৃত মানুষ, সংসারে থেকেও বিশ্বভবঘুরে, লাঙল নিয়ে হাঁটা গর্বিত কৃষক, পানশালা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী তুখোড় মাতালের সুর, বিশুদ্ধ মাতৃমায়া, শিশু লালনপালন করা আঁচলের আঙিনা, সাদা ছাগলের মতো জীবন ও কালো এঁড়ে গরুর মতো মরণ! এসব কই পাবো সোহেল ভাই?

শিল্পীর বিদায়ে আরেকজন শিল্পী কীভাবে শুরু করেন লেখা? অক্ষর কীভাবে আসে আঙুলে? যদি ছবির মতো হৃদয়টাকে দেখাতে পারতাম প্রাণন ভাই, তাহলে বুঝতে পারতেন ক্ষরণের মুহূর্ত আসলে কতটা শৈল্পিক-আদিম! বলা যেতে পারে অনেক পরে। আপনি যখন আট-দশ বছরের দূরন্ত বালক তখন আমি রক্তের পৃথিবী দাপিয়ে ধুলোর ময়দানে এলাম। এদিকে তার বছর খানিক পর ১৯৮৭ সালে ঢাকার গ্যেটে ইনস্টিটিউটে (লাল মিয়া) এস এম সুলতানের একটি প্রদর্শনী হবে! আপনি বর্ষার ঋতু কোলে নিয়ে জন্মেছিলেন সোহেল ভাই। আর আমি নিয়ে এলাম বসন্ত। জলকে আপনি তাই জলরঙে রূপ দিলেন আর আমি রূপকে নিলাম শব্দে। আপনার রঙতুলিতে মা-বউ-বেটাদের হাতে বড় বড় মাছ দেখে আমি তা অনুভব করতে পারি। আপনি কখনো দোপাটি ফুল এঁকেছিলেন? আমি জানি না। কিন্তু দোলনচাঁপা আপনার প্রিয় ছিল নিশ্চয়? তাও আমি ঠিক জানি না। এতো ঘন-মসৃণ ওয়াটার কালার আপনি কীভাবে তৈরি করতেন সোহেল ভাই?

২০১৭ সালের জুন মাসে যশোর থেকে হঠাৎ মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ভাই ফোন করলেন। কাকতালীয় কী না জানি না তখনও বর্ষাকাল। ঘাসফুলেরা জোর কদমে তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শনীতে উঠেপড়ে লেগেছে। জিয়া উদ্যানের দুর্বাঘাস ফুলেরা আকাশের টলটলে জল পেয়ে আরও স্বগর্বে মেতেছে বাহারী ডাগর ডাগর সাজে। তারা যেন শাড়ি পরে খুলে দিয়েছে মাথার ঘোমটা। কোমরটা দুলিয়ে বাতাস খাচ্ছে হেলেদুলে। বিজয় সরণি থেকে আমি দ্রুত রওনা দিলাম পিজির উদ্দেশ্যে। পৌঁছে নিনি ভাবিকে ফোন দিলাম। জানতে পারলাম সোহেল ভাইকে ধানমন্ডি বাংলাদেশ মেডিকেলে নেয়া হয়েছে। পরদিন গেলাম শিল্পী সোহেল প্রাণনকে দেখতে। এই প্রথম মহিউদ্দীন ভাইয়ের বদৌলতে প্রাণনের সঙ্গে মিলছে পলিয়ার। এভাবে প্রথম দেখা। তারপর…

তারপর পরদিন আমরা হাসপাতালের সাদা বেডে বসে রঙিন গল্প করলাম। অনেক অনেক কথা। প্রথম তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ মনেই হলো না। ফেসবুকে এড হলাম। তার তুলি আর রঙের ভুবনে ঢুকে আমি থ বনে গেলাম। এত বড় শিল্পীকে আমার চিনতে এতো বছর সময় চলে গেল! তার প্রত্যেকটা ছবির নিজস্ব ঢং আমাকে মাতাল করে রাখলো। তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা বাড়তে লাগলো। দিন রাতের মতো কবে বছর কি বছর হাওয়া হয়ে গেল। ঢাকা-দিল্লি চিকিৎসা নিয়ে বেশ সুস্থ হয়ে আবারও ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন। ২০১৮ সালে আমার কবিতার বই ‘সময়গুলো ঘুমন্ত সিংহের’ কিছু মনিষীকে উৎসর্গ করি। তার মধ্যে সোহেল প্রাণন ছিলেন। সেই বই ২০১৯ সালে মোহাম্মদপুরের বাসায় দিতে গিয়ে আরেক দফা খিলখিল করা দুপুরে আমরা আড্ডা দিলাম। বইটা তার হাতে তুলে দিলে বিনীতভাবে নিয়ে বললেন, আমাকেও উৎসর্গ করলে? আমি প্রাণনকে চিনতে ভুল করিনি। এমনভাবে বলার পর মৃদু হেসে লাজুক ভঙ্গিতে নতুন ছবি দেখালেন। Nawaz Marjan এর সম্পাদনায় চৌহাট্টা ছোটকাগজে অনেক আগের তার ছবি ও লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ছবি আর লেখা আমাকে টেনে রেখেছিল বহুদিন। পরে জানতে পারি উনিই সেই প্রাণন। সেই সংখ্যাটাও উনাকে দিয়ে আসি। খুব খুশি হন। নেত্রকোনায় একদিন আমাকে নিয়ে যাবেন দীপক দার ছবির স্কুলে সেও কথা জানালেন। কিন্তু আমাদের আর যাওয়া হল না। ভাই তড়িঘড়ি করে যশোরে চলে গেলেন। এরপর…

এরপর আমাদের আর দেখা হয়নি। কতদিন হবে? তিন বছর হয়ে গেছে! আমার ‘দোআঁশ মাটির কোকিল’এর প্রচ্ছদ আল নোমান খুব ভালো করেছে জানিয়েছিলেন মহিউদ্দীন ভাইকে। শিল্পী আল নোমান সোহেল ভাইয়ের কাজ খুব পছন্দ করত। সে মাঝে মাঝে ভাইয়ের কথা বলব। মোজাই জীবন সফরির কথা বলত। আমি তাদের ছবি দেখে কবিতার রেখা ভুলে যেতাম। যশোর যতবার গেছি বাড়িতে, ততবার বর্ণিকায় যাবার কথা ভেবেছি। কিন্তু সময় যে ‘কাল’ তা ঢের ঠেকে ঠেকে শিখছি! দেখা আর হল না! কখনো আর হবে না! এ কথা ভাবতে গেলে ভাষা আসে না। মন হু হু করে উঠছে। লিখতে পারছি না। স্পাইডার লিলি ফুলের মতো জাল বুনে যাচ্ছি। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হলো না।

Artist Sohel Pranon ভাই আপনি নেই! এটা আমি মানি না। মানব না। সোমবার রাত থেকেই বিষণ্ণ আছি আপনার বিদায়ে! বর্ণিকায় আমাদের একত্রে ছায়া-রোদ পানের কথা ছিল। হলো না! কত পাতাল-হাসপাতাল ঘুরে আপনি সুস্থ হলেন। আর সুস্থ হয়ে কীনা দৌঁড় দিলেন? জাত শিল্পীর মতো দুনিয়ার কোনো কিছুই আপনাকে ব্যস্ত করে তুলতে পারেনি অথচ কী না মৃত্যু কাছে এতো দ্রুত চলে গেলেন? নিনি ভাবির সামনে আমি কীভাবে যাবো? আমি কিচ্ছু জানি না ভাই। আপনার কাছে আমার একটা আস্ত হেলানো দুপুর প্রাপ্তি ছিল। ছিলে ঝুলে থাকা আয়নার মতো একটুকরো সন্ধ্যে! আমি সেই স্মৃতি কুড়িয়ে আপনার মুখ বাঁধাই করে রাখবো। আপনার দরদ আমাকে আপ্লুত করেছিল। আমার দ্বিতীয় সুলতান আপনি। পরিচয়টা আপনি কী ভাবেন নিতেন জানি না। কিন্তু আজ সুলতান বেঁচে থাকলে আপনাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরত। আপনার বিশ্ব দেখবার ও আঁকবার কাছে দুনিয়া নতজানু হবে আমি তা জানি। অনেক বড় আর অনেক শব্দের কথামাথা কাল থেকে থেমে ছিল। একটি বাক্য এমনকি একটি সংবাদও আপনার নামে ছাপাতে সাহসে কুলায়নি। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না আপনি নাই। আপনার এমন বিদায়ে আমি নির্বাক প্রাণন ভাই । আগামীকাল আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবেই। সেই আশায় এখানে আপনার কিছু ছবি রেখে দিলাম। খুব তীব্র অভিমান আপনার নিভৃতচারিতার দিকে ছুঁড়ে দিলাম প্রিয় শিল্পী আমার। আপনার কালিতে আমি ঢুকে যেতে চাই। তারপর আপনার নামে বুনে দিবো সমূহ আলাপ। আর কখনো কী আমাদের ত্রিবেণী বাঁধা হবে না !

Facebook Comments

আড্ডাপত্রে লাইক দিন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮