শেয়ার করুন:

রক্তের মৌসুম

কৈশোরে তারুণ্যে ভাবতাম
একদিন কেটে যাবে এইসব ভয়াবহ দিন
ইতিহাসে রক্তের যে প্রবাহ তাও থেমে যাবে সময়ের এই বাঁকে

আমার ভাবনা অলীক স্বপ্নের মতো
দিনের আলোয় সূর্যতাপে মরে হারিয়েছে মৃত্তিকায়
যে মৃত্তিকায় এখন ছয় ঋতু মিলেমিশে একাকার
আদিগন্ত হাহাকার করে ওঠে শুধু রক্তঋতু!

রক্তের ফাগুন জীবনের অরণ্যে আগুন জ্বালতে জ্বালতে
ফোটায় আগ্রাসী ভয়ের কুসুম
পায়ের নিচের দূর্বাঘাস থেকে সাতটি তারার আকাশ পর্যন্ত
ভেসে যায় রক্তের মৌসুম!

হে নদী, তোমার ধারা একদিন থেমে যায় শুষ্ক নিসর্গ মরুতে
কিন্তু স্বদেশের রক্তস্রোত একটি দিনও
একটি ক্ষণও থেমে নেই

আমি কিছুতেই মানতে পারিনা
মানতে চাই না এইসব রক্তের আখ্যান

বঙ্গজননীর বোবা কান্নায় তেরোশ নদী
হয়ে ওঠে ফোরাতের ঢেউ
হে জননী, তোমার মাটিতে বাঁচার বাতি জ্বালতে
আর একবার আসবে কি কেউ?


ভোরের প্রসব বেদনায়

একটি প্রাণজ ভোরের প্রসব বেদনায় দেখো
আকাশ কেমন রক্তিম হয়ে ওঠে
যেভাবে আমার মা আমাকে নিয়ে আসেন আলোয়
আমি সেই ভোরে আকাশের দিকে
তাকিয়ে একটি পূর্ণ দিনের আশায় ছিলাম
আমার বয়স সময়ের সিঁড়ি বেয়ে জাগ্রত ও লুপ্ত
সব সভ্যতা ছেড়ে আগামীর পথে গতিমান
গ্রিক, পারস্য, মেসোপটেমিয়া, মিশর, ভারত–
সব সভ্যতা পেয়েছিলো আলোকিত ভোর
কেবল আমার গ্রাম জনপদ গঞ্জ শহর
পেলো না একটি প্রার্থিত প্রাণময়
সকালের সাক্ষাৎ!

আমি ছটফট করছি মরছি অন্ধকারের গহীন গর্ভে
ধল প্রহরের অপেক্ষা কবে শেষ হবে জানি না কেউ

জানি না আরও কতোটা শতক অনন্ত রাত্রির গহ্বরে
ভাসতে থাকবো একটি ভোরের জন্য
আলোহীন প্রাণ দেখবে কি কখনও
বিপুলা পৃথিবী?

নীল যমুনার ঢেউয়ের মতো বহমান মহাকাল
একটি ভোরের কুসুম ফোটাতে আমরাই চলো তুলে দিই
সাহসের পাল।


তবুও দোয়েলের শিস

তবুও একটি দোয়েলের শিস
প্রতিদিন ভোরে সূর্য আর স্বপ্ন ডেকে আনে
আমাকে বাজায় জীবনের গানে।

প্রতিটি সকালে আমি শিশির মাখানো সবুজাভ দূর্বাঘাসে
পা ডুবিয়ে পুবের আকাশে অনেক আলোর আশায় তাকিয়ে থাকি
মর্মাহত জীবনের মাটিতে স্বপ্ন দেখার প্রতীক্ষা সফলতা পায় না কখনো।

কেবল কাকের কণ্ঠস্বর, হতাশার মতো কালো ডানার বিস্তার
কুয়াশায় আচ্ছন্ন দিগন্তে আঁকে জয়নুলী ক্যানভাস
চল্লিশ বছরে আজো পেলাম না সম্পূর্ণ আকাশ।

আজকাল বিষণ্ন বিকেলে ধূমায়িত আকাশ মাথায় নিয়ে
আমার নির্জন ছাদে শুধুই দেখতে থাকি সূর্যাস্তের দৃশ্য
চোখের ভূগোলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে যায় যেন এই ছবি
আমার শিরায় মস্তিষ্কের কোষে কোষে স্মৃতি হয়ে
প্রদর্শন হতে থাকে কেবল একটি দৃশ্য–
সূর্য ডুবে যাচ্ছে
সূর্য ডুবে যাচ্ছে।

তবুও একটি দোয়েলের শিস
পৃথিবীর পথে আমাকে বাজায়অহর্নিশ।


এই কুয়াশার দিনে

কুয়াশার দিনে মাগো-এনেছিলে কোলে
পরম স্নেহ ও মমতায় নতুন কপালে
চুমু দিয়ে ছিলে জানি; আমার কান্নায়
আকুল ব্যাকুল হয়ে উষ্ণ ভালোবাসা
দিয়ে জড়িয়ে ধরেছো কথার গুঞ্জনে;
তোমার মুখের ভাষা হয়ে উঠেছিলো
ছোট্ট প্রাণের খোরাক; তোমার বুকের
ধারা আমার জীবন তৃষ্ণার আধার;
আমার পৃথিবী মানে তোমারই কোল
পরম আশ্রয় উৎস মানি আজীবন;
আজো কুয়াশার দিনে তোমাকেই ভাবি
মাগো- শীতের সকালে মৃত্যুময় গন্ধে
জেগে আছি বেঁচে আছি তোমার কপালে
একটি প্রার্থিত চুমু দেবার আশায় ।


পৃথিবী ২০২০


সূর্যের সংসারে বাঁচার আশ্রয় কেবল এই পৃথিবী নামের গ্রহ
অথচ এ-আমার পাপের পাথর পাহাড় হয়ে ছুঁয়েছে আকাশ
সমস্ত নির্মল বায়ু বিষময় করে নিশ্বাসের করেছি অযোগ্য
নদী সমুদ্রের ঢেউ, জলতরঙ্গের ধ্বনি দূষণে দূষণে জীবনের শত্রু
বিস্তীর্ণ জমিন বীজের বিপক্ষে
বিনাশের রসায়নে অঙ্কুরের অবসান
আমরা এখন ক্রমাগত মরণরেখার কাছাকাছি!

অগণন পণ্যভোগে ডুবতে ডুবতে আমি আজ
অনিশ্চিত অতল গহ্বরে নিমজ্জিত
বস্তুর ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আমি সেচ্ছায় গর্বিত বস্তুবন্দি
মানবিক সবকিছু এখন আমার কাছে আবর্জনা
আমি সজ্জিত বর্ণিল সভ্যতার উদ্ধত সন্তান
আমি তাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একাকী ফেনিল।

অদৃশ্য ঘাতক মানুষের ফুসফুসে– মরণের বিষযাত্রা
আমার আত্মায় ঘর বেঁধেছে আরব্য রজনীর ভূতের মতন
আমাদের শরীরে শহরে গাঁয়েগঞ্জে জনপদে সবখানে
ঘামের মতন লেপ্টে আছে ভয়ঙ্কর ভাইরাস–
বিক্ষত গ্লোবের বুকে বিষাক্ত দাঁতের মরণ কামড়
অনন্ত বাঁচার ইচ্ছা আজ ডুকরে ডুকরে কাঁদে রাত্রিদিন
নূহের প্লাবনে যেনো নিঃসহায় নিরুপায়
লূতের শহরে আসন্ন মৃত্যুর অপূর্ব মহড়া!

সভ্যতার সমরাস্ত্র, পুঁজির প্রতাপ, ভোগের বিলাসী সরঞ্জাম
প্রযুক্তির অহঙ্কার- সবই এখন বড্ড হাস্যকর
অর্থহীন
মূল্যহীন
মৃত্যুগন্ধময়
বিনাশের পথে ধাবমান এক করুণ কোরাস!

কবি জানে না সত্যিই কী হতে চলেছে আগামীর পৃথিবীতে
কতো প্রাণদীপ নিভে যাবে এই মহামারী মৃত্যুর মিছিলে
আসন্ন দুর্ভিক্ষ পথে প্রান্তরে সড়কে কতো সহস্র কবর রচনা করবে
তখন আমিও আর চিৎকার করে জ্বলে উঠতে পারবো না এই বলে-
হে জড় সভ্যতা
মৃত-সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ।
মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ।
তারপর আসিলে সময়
বিশ্বময়
তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিণ্ডে পদাঘাত হানি
নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বার-প্রান্তে টানি;
আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও;
ধ্বংস হও
তুমি ধ্বংস হও।


অজ্ঞতা

আমার অজ্ঞতা আমি আবিষ্কার করলাম সেদিন দুপুরে; বকুলের ডালে একটি দোয়েল শিস দিয়ে সুরে সুরে নিজস্ব ভঙ্গিতে প্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছিলো; অন্যদিকে একদল কাক হাঁক ডাক দিয়ে হৈচৈ ফেলে ছিলো বটের পাতায়। পথিক, ফকির, হকারের কণ্ঠস্বরে আমি জীবনের অন্য স্বাদ উপভোগ করলাম। এ-সময় এ-সবের মাঝে আমারই জন্য মহামান্য কর্তৃপক্ষ কী আদেশ নিয়ে হাজির হবেন সে-সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও বেখবর!

হায় কতো বই পড়লাম, দেশ ঘুরলাম, অভিজ্ঞতাও অর্জন করলাম। কিন্তু আমার আগামী আমি জানতে পারিনি। এক মিনিট আগেও বুঝতে পারিনি নিয়তি কী হতে যাচ্ছে। কোন্ কোন্ আলো অন্ধকার বাঁকে ভাগ্যলিপি আমাকে টানছে; হায় অধীত বিদ্যা ও জ্ঞান আমাকে সাহায্য করছে না; প্রজ্ঞা আমাকে আগাম সতর্ক সংকেত দিচ্ছে না; আমার পেছনে বা দৃষ্টির ওপারে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে তাও জানি না; হে পথিক, হে বন্ধু, হে সুহৃদ, হে প্রিয়তমা-তুমি জানো তোমার আগামী? ভবিষ্যৎ প্রশ্নে ঘুরপাক খেতে খেতে আমি আমার অজ্ঞতা আবিষ্কারে সফল হলাম।


ফাগুনের পথে

ফাগুনের পথে আমি হেঁটে যাই– দুপাশে আমের মুকুলে মুকুলে ছেয়ে গেছে; বাতাসের বুকে মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে মাতাল করে ছাড়ে আমার হৃদয়; কড়া সুবাসে রোদের মন আত্মহারা হতে হতে পুব থেকে পশ্চিমে গড়িয়ে যায়; আমি হাঁটতে হাঁটতে ডুবে যাই গন্ধের ঢেউয়ে; সড়কের শেষে থমকে দাঁড়াই পলাশের মুখোমুখি হতেই; আকাশে যেনো আগুন জ¦লছে; অন্যবার মনে হচ্ছে রক্ত জমাট বাঁধছে ক্রমাগত; আমি ভয় পেয়ে গেলাম সহসা; বারবার মনে হচ্ছে আমারই হৃদয় পলাশ হয়ে ডালে ডালে ফুটে আছে; এদিকে আবার গুচ্ছ গুচ্ছ পলাশের পাপড়িতে ছেয়ে গেছে সবুজ ঘাসের জমিন; রক্তাক্ত পলাশে আচ্ছন্ন এ-জমিন আমারই মানচিত্র।


নীরবতার দিনলিপি ২০২০

মৃত্যুর আতঙ্কে নীরবতা ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে নিস্তব্ধতা এসে গ্রাস করেছে পৃথিবী; সূর্যের আলোয় কেবল শূন্যতা, তবু ধলপ্রহরের ডাকে পাখিদের কলরব-জীবনস্পন্দন; জমিনে বীজের উল্লাস, শস্যের ঢেউ ঢেউ সজীবতা; লতাগুল্মে প্রাণের আনন্দ; পোকা-মাকড়ের নীরব রাজত্ব; শিশিরের গানে জাগ্রত স্নিগ্ধতা; মাটির উঠোনে জোছনার সাঙ্গীতিক বিচ্ছুরণ; বৃক্ষের ঐশ্বর্যে সবুজের জাগরণ; নদী-সমুদ্রের জোয়ার ভাটায় কল্লেলিত আনন্দের বার্তা পৌঁছে যায় মেঘের অরণ্যে; এখন বৃষ্টির সৃজনধারায় বিপুলা পৃথিবী আদিম শৈলীতে আশ্চর্য নতুন!

এদিকে সরব রাজপথ, মেঠোপথ, গলিপথ, জনপদ জনশূন্য ভূতুড়ে ভাগাড়; ক্ষুধায় ব্যাকুল অন্নহীন মানুষের মিছিলে মুখর বিক্ষত ভূগোল ; মাঝেমধ্যে দু’একটা লাশবাহী এম্বুলেন্স সাইরেন দিয়ে ছুটে যায় লাশঘরে; গোরস্থানে ভয় ভয় দাফনের সারি শেষ হয় না কখনো; অদৃশ্য ঘাতক মানুষের ফুসফুস খেতে খেতে প্রাণহীন পরিত্যক্ত সভ্যতায় পৌঁছে দেয় এই আমাদের; একটি বিশুদ্ধ নিঃশ্বাসের জন্য আমরা এখন কোন্ গ্রহে বাসা বেঁধে গড়ে তুলবো আরেক সজীব পৃথিবী? হায়! মানুষের ভবিষ্যৎ কেউ কি জানে কী হতে চলেছে কালের চক্রে? আমি তাই আজ দেমনপ্রাণ সমর্পণ করলাম সেই সত্তার আশ্রয়ে যিনি সবকিছুর নিয়ন্তা \

Facebook Comments