শেয়ার করুন:

আলথুসার
লেখক : মাসরুর আরেফিন


ধরন : উপন্যাস
প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন
প্রচ্ছদ : সেলিম আহমেদ
প্রকাশকাল : ২০২০
মূল্য : ৬৫০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৪৪

পাঠ মূল্যায়ন: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান ও মাসরুর আরেফিন

এক.

গত বছর “আগস্ট আবছায়া” প্রকাশের পরপরই কথাসাহিত্যের জগতে একটা হৈচৈ ফেলে দেন মাসরুর আরেফিন। অনেকেই তার আগমনকে তুলনা করেন ধূমকেতুর সাথে, যদিও বোদ্ধারা জানেন মাসরুর আরেফিন কোনো নবাগত নন। বহুকাল আগে তার কাব্য ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ প্রকাশের পরই প্রকাশিত হয় চেনাশোনা পথে তিনি হাঁটবেন না। হয় স্বতন্ত্র পথে হাঁটবেন, নয় হাঁটবেন না। মাঝে একটা দীর্ঘ সময় তার কেটেছে ক্যারিয়ার নির্মাণে। সেখানেও সফল তিনি, হয়ে উঠেছেন শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার। ইংরেজি সাহিত্যের এই মেধাবী ছাত্রটি গোড়া থেকেই বিশ্বসাহিত্যের পাড় পাঠক। তার প্রতিফলন “ফ্রানৎস কাফকা রচনাবলী” ও হোমারের “ইলিয়াড” অনুবাদ। এরপরেই এলো ওই বিস্ময়—পনেরই আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখা ধ্রুপদী উপন্যাস “আগস্ট আবছায়া”। বইটি বইমেলায় সিরিয়াস উপন্যাস বিক্রিতে বোধকরি একটি নতুন রেকর্ড করলো। একে জাতির পিতার সপরিবারে নিহত হবার হৃদয়বিদারক ও আবেগসঘন ঘটনা, তার সাথে মাসরুরের তীব্র গতিময় গদ্য ও অভিনব লিখনরীতি বোদ্ধাদের মুগ্ধ করলো। তাকে নিয়ে লিখলেন প্রথিতযশ কথাসাহিত্যিকগণ।
এবছর মাসরুর যখন তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘আলথুসার’ নিয়ে হাজির তখন সকলে বুঝল, মাসরুর একটি মিশনে নেমেছে আর তার প্রতিভাসম্পৃক্ত কলমখানি সচল। বছরে একটি সিরিয়াস উপন্যাস মন্দ নয় আর ঐ ট্রেন যদি সচল থাকে, তবে দশ বছরে দশটি ধ্রুপদী রীতির উপন্যাস নিয়ে মাসরুর আরেফিন এক মহীরুহ হয়ে উঠবেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যে।
আলথুসার হলেন ফরাসী দার্শনিক; বিখ্যাত মার্ক্সবাদী। রাষ্ট্র যে একটি দমন-পীড়নমূলক যন্ত্র, এই তত্ত্বের উদগাতা তিনি। বাংলার বেশিরভাগ পাঠক তাকে চেনে না। ফলে এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য নিয়েই সে যায় বইটি সংগ্রহ করতে। মাসরুরের ব্যাপক পঠনপাঠন ছায়া ফেলে যায় তার ফিকশনে, ফলে কখনো সেগুলো হয়ে ওঠে একধরণের কোলাজ, বিশেষ করে সে টেনে নিয়ে আসে কবিতাকে। কাহিনীর সাথে মিশে যায় প্রবন্ধ, ধারাভাষ্যের পাশে বসে থাকে কবিতার একটি স্তবক।
আলথুসার পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে আমি হোর্হে লুইস বোর্হেস পড়ছি, কখনো মনে হয়েছে প্রবন্ধ পড়ছি, কখনো উপন্যাস। এটি মাসরুরের শক্তি হতে পারে, হতে পারে তার অন্যতম দুর্বলতা। আর এই যে একটি দিনের ভিতর এত ঘটনার ঘনঘটা, তা তো মনে পড়িয়ে দেয় গত শতাব্দীর অনেকের মতেই শ্রেষ্ঠ উপন্যাস জেমস জয়েসের Ulysses-এর কথা। মাসরুরকে আমি বলবো ডিটেলিং-এর মাস্টার। কল্পনার অকল্পনীয় বিস্তার তার লেখায়, আর ফিকশন তো কল্পনাই। উত্তম পুরুষে লিখিত বলে তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্য।
“আলথুসার”কে আমি বলবো একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করে, তার হার্ডওয়্যার সেনাবাহিনী, পুলিশ, কর্মচারী দিয়ে, আবার তার সফটওয়্যার প্রপাগান্ডা, মগজধোলাই, সুক্ষ্ম প্রচারণা দিয়ে, মাসরুর তাকে উন্মোচিত করেন এ উপন্যাসে। একদল পরিবেশবাদীর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসে রাষ্ট্রের নিপীড়ন, ভেতরকার কলকব্জা আর এমনকি এইসব পরিবেশবাদী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতিও। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পৌরনীতি, সমাজবিজ্ঞান আর সংস্কৃতি, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি নিয়ে মাসরুরের ব্যাপক পড়াশোনার প্রতিফলন ঘটতে থাকে পাতায় পাতায়। মাসরুর যে আধুনিক, পাশ্চাত্য ঢঙের আধুনিক তা বুঝতে সময় লাগে না। তার চরিত্রগুলো ছুৎমার্গ বিবর্জিত। এই আন্তর্জাতিক চারিত্র বোঝা যায় যৌনতার বর্ণনায়, যা প্রোভোকেটিভ হয়েও সীমান্ত মেনে চলে, কোনোরূপ ভণিতা করে না।
ঘটনার সূত্রপাত উপন্যাসের নায়ক তরুণ ব্যাংকারের এক ট্রেনিং নিতে লণ্ডন যাওয়া আর তার আলথুসার প্রীতিউদ্ভুত আগ্রহ থেকে অক্সফোর্ড স্ট্রীটের কোথাও আলথুসারের লন্ডনে অবস্থানকালীন বাড়িটিকে খুঁজে বের করা ও স্বচক্ষে দেখা। স্টেশন নামতেই তাকে পাকড়াও করে লন্ডনের পুলিশ, ভাবে সে ওই পরিবেশবাদীদের আন্দোলনে যোগ দিতে এসেছে। বস্তুত নায়ক ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন’ (XR) নামের পরিবেশবাদীদের সম্পর্কে ওই পুলিশের মুখেই প্রথম শুনল, আর সে জানতোই না সমুখে অক্সফোর্ড স্ট্রিটে তারা এক বিশাল গণজমায়েত বসিয়েছে। পুলিশের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সে ও তার দুই আত্মীয় গিয়ে পড়ে পরিবেশবাদীদের ভেতরে, আর লেখক জড়িয়ে পড়ে সে আন্দোলনের সাথে। সেখানে মেগান নামের এক মেয়ে তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে ঠেকে, তবে তার মূল আগ্রহ এই কৌতূহলোদ্দীপক পরিবেশবাদীদের আন্দোলনে প্রফেসর স্যামুয়েল ও উইলিয়াম স্কিপিং নামের কিছু ব্যতিক্রমী চরিত্র। পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের বিপক্ষে এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে গিয়েই সে ফেঁসে যায়, প্রফেসর স্যামুয়েল তাকে টানতে টানতে নিয়ে আসে এক প্রত্নঘরে, যেখানে এক বিরাট টেবিলের উপর শায়িত এক তিমি—সেটাই ঐ প্রজাতির সর্বশেষ তিমি, সেটা আবার কথা বলে।
এই পরাবাস্তবতা ছড়িয়ে আছে মাসরুরের লেখায়, বিশেষ করে তার সিগনেচার গদ্যে। মাঝে মাঝেই সে নস্টালজিক হয়ে ওঠে, তখন ভেসে ওঠে শৈশবের ধানসিড়ি নদী, বরিশাল আর ঝালকাঠি। ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন‘-এর সদস্য ফর্মপূরণ করতে গিয়ে সে যে সবিস্তার বর্ণনা লেখে কৈশোরকালের স্মৃতির, তা তো পরাবাস্তবতার ছোঁয়া লাগানো।
বস্তুত মাসরুরের গদ্য গতিশীল ও এলোমেলো। এক ধরণের মাতাল গদ্য বলা যায়, যা পা ফেলছে এলোমেলো, কিন্তু সঠিক পথেই হাঁটছে, যাচ্ছে সঠিক গন্তব্যেই। মাঝে মাঝে সে তার কল্পনার বল্গাঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দেয় আর তারা এসে পড়ে অধীত জ্ঞানের এক জগতে। ফলে যে গদ্যের জন্ম হয় তা অধিবিদ্যক। কখনো টাইম মেশিনে চড়ে সে লন্ডনের হাইড পার্ক থেকে চলে আসে বরিশালের মিশন রোডে, তার শৈশবে, জীবনানন্দের বাড়িতে।
এই উপন্যাসের একটি অন্যতম দিক হলো ‘সত্যকথন‘, গ্রীকরা যাকে ‘পারহেসিয়া’ বলে। এই পারহেসিয়া বা সত্যকথন লেখককে বারবার বিপদগ্রস্থ করেছে, করেছে অজনপ্রিয়, কিন্তু সে সত্য উদঘাটনে ও সত্যকথনে পিছপা হয়নি। বস্তুত পারহেসিয়া হলো দমননিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। রাষ্ট্র ভয় পায় সত্যকে। সে লুকিয়ে রাখে সত্য আর প্রচারণা করে মিথ্যা।
প্রথম উপন্যাস থেকেই বোঝা গেছে কোন প্রথাগত বিষয় নিয়ে তিনি লিখবেন না। ছিঁচকাঁদুনে গল্প লিখবেন না, হাঁটবেন না কোনো চেনা পথে। “আলথুসা” তার বিষয় বৈচিত্রে খুবই আলাদা। এমন বিষয় নিয়ে বাংলায় কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি। “আগস্ট আবছায়া” নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছিল, পনেরই আগস্ট নিয়ে সেটাই প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস কি না, আলথুসার নিয়ে তেমন বিতর্ক ওঠার সুদূরতম কোনো সম্ভাবনা নেই। এই উপন্যাসের মঞ্চ লণ্ডন শহর, তা আমাদের চেনাশোনা গণ্ডির এতটাই বাইরে যে মনে হয় বিদেশি কোনো উপন্যাস পড়ছি। ব্রিটিশ চরিত্রগুলো এতো নিঁখুত যে তা একমাত্র পশ্চিমা লেখকদের পক্ষেই জানা সম্ভব। এভাবে মাসরুর কি উপন্যাসের বিশ্বায়ন ঘটানোর সম্ভাবনা জাগানোর সাথে সাথে বাঙালি পাঠক থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন তার বিষয়কে? উপন্যাসের ভেতর পোস্টারের বাণী, চুক্তিপত্রের ধারা ছাপানো অভিনব, প্রবহমান গদ্যের ভেতর তারা কঠিন সব প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়, তবে বৈচিত্র্য আনে নিঃসন্দেহে। পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে তার পঠনপাঠন বিস্ময়কর। “এক্সটিংশন রেবেলিয়ন”-এর মঞ্চে তার পরিবেশ সংক্রান্ত বক্তৃতা কেবল কৌতুহোদ্দীপক নয়, জ্ঞানগর্ভ। ব্রিটিশ চরিত্রদের বেশ ভালোই অধ্যয়ন করেছেন তিনি, তার লেখায় প্রবলভাবে ফুটে থাকে যৌন অবদমন, ফ্রয়েড আছেন আলথুসারের সমান্তরাল। এসব ক্ষেত্রে মাসরুর খুবই আধুনিক, বলা যায় পাশ্চাত্যের ঘরাণার। ভাবি, এসব তাকে বিযুক্ত করে নিয়ে যায় কিনা উপন্যাসের এমন এক জগতে যে জগৎটি বাংলার পাঠকের কাছে অচেনা, অচেনা বলেই ভিনদেশ।মাসরুর আরেফিনকে সাধুবাদ জানাই।

দুই.

আগেই বলেছি মাসরুর আরেফিন ডিটেলিংয়ের মাস্টার। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে লুই আলথুসার লন্ডনের যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেই বাড়ির প্লাম্বিং সিস্টেম নিয়ে বুড়ো ক্লেইজের বর্ণনা, যিনি আলথুসারকে শেষাবধি এক পানির পাইপের মিস্ত্রি বানিয়ে ছাড়েন।
বস্তুত এই উপন্যাসের একটি অসামান্য চরিত্র হলো বুড়ো ক্লেইজ। এক প্রাচীন বাড়িতে নিঃসঙ্গ এই বৃদ্ধ বাস করছেন পঞ্চাশ বছর ধরে, যার বুকে জমেছে দুর্গন্ধযুক্ত কফ, যার স্ত্রীও মারা গেছেন অনেক বছর আগে। আজ যে করোনা ভাইরাসে শত শত অশীতিপর বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করছেন ইউরোপে, বুড়ো ক্লেইজ যেন তাদেরই একজন প্রতিনিধি। এক বিপুল জীবনের শেষ প্রান্তে, দেখবার কেউ নেই পাশে, তার বুকে বেঁধেছে অমোচনীয় রোগ। গোটা ইউরোপ জুড়ে এমনি সত্তরোর্ধ্ব, আশি অতিক্রান্ত, নব্বই ছাড়ানো বুড়ো বুড়িদের ভীড়।
আরেক আকর্ষণীয় চরিত্র আমেরিকার মাকাহ উপজাতির নেতা স্পেনসার সভেক। এই রেড ইন্ডিয়ান উপজাতি তিমি শিকার করেই জীবনধারণ করে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র প্রফেসর স্যামুয়েল, যিনি স্কটল্যান্ডের এক ইউনিভার্সিটিতে রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ে পড়ান। তিনি আলথুসারের একজন কট্টর সমালোচক। বস্তুত আলথুসারের বিপক্ষের সমস্ত কথা, তীব্র সমালোচনাগুলো লেখক আমাদের প্রফেসর স্যামুয়েলের মুখ দিয়েই শোনান। তাদের ওই তীব্র বাদানুবাদ কখনো ভারী ঠেকবে পাঠকের কাছে, তার মনে হতে পারে সে কোন প্রবন্ধ পাঠ করছে কিনা।
আগেই বলেছি যৌন অবদমন ও ফ্রয়েডীয় মনঃস্তত্ত্ব মাসরুরের লেখার ভেতরে পাশ্চাত্যের উপন্যাসের মতোই আড়ালহীন, কিন্তু শিল্পসম্মত। লেখকের দুর্বলতা যে নারীকে ঘিরে, সেই মেগানের দ্বিতীয় রাতেই নারীশরীরলোভী পুলিশ কনস্টেবল মার্কের শয্যাসঙ্গিনী হওয়া এন্টিরোমান্টিক—আধুনিক মননের লেখক কিন্তু নির্বিকার। কারণ তার কাছে চরিত্রচিত্রণই জরুরি, আর তিনিই তো তৈরি করেন চরিত্র, তিলকে তাল বানান আর কল্পনার পরীদের ছেড়ে দেন শব্দের বাগানে।
এক প্রতিভাবান মার্ক্সবাদী ফরাসী দার্শনিকের দর্শন যেমন এ উপন্যাসের বিষয়, তেমনি তার জীবনের এক ভয়ঙ্কর ট্রাজেডি এ উপন্যাসে বিধৃত। আলথুসার ছিলেন ঘুমের ভেতর হেঁটে বেড়ানো (sleep walker) একজন মানুষ, যিনি বিশ্বাস করতেন পরিবার হলো নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রথম ইউনিট। মানসিক অবসাদে ভোগা এই বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ঘুমের ভেতরে গলা টিপে হত্যা করেন তার স্ত্রী, যিনি নিজেও ছিলেন বামপন্থী, হেলেনকে। অর্থাৎ আলথুসার একজন উন্মাদমস্তিস্কের খুনী। আলথুসারের পক্ষে-বিপক্ষে লেখকের তাত্ত্বিক ডিসকোর্সটি খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানসঞ্চারী নিঃসন্দেহে। কিন্তু সেসব বিশুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্ব উপন্যাসের পাঠকদের মন ও পঠনকে ভারী করে তুলতে পারে।
আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এই উপন্যাসের লেখক এত বেশি আলথুসার দ্বারা অবসেসড, বিশেষ করে তার ওই ঘুমের ঘোরে হেঁটে বেড়ানো আর আদর করতে করতে প্রিয়তমা স্ত্রীকে গলা টিপে মেরে ফেলা লেখকের ভেতরে যে সিমপ্যাথেটিক রিঅ্যাকশন তৈরি করে যে, সে নিজেই কখনো হয়ে ওঠে লুই আলথুসার। উপন্যাসের শেষে তার স্ত্রী এই ভয়ে স্বামীর কাছ থেকে সরে যায়। এক্সটিংশন রেবেলিয়নের মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস করে সে তার লোভনীয় ব্যাংকিং ক্যারিয়ার ছেড়ে অফিস খুলেছে ঢাকায় আর লন্ডনের কোনোরূপ সমর্থন না পাওয়ায় ঢাকার XR অফিসের নাম বদলে রাখে ‘ধানসিড়ি বাঁচাও’।
এক্সটিংশন রেবেলিয়ন আন্দোলন যে এক বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খেলার অংশ—এ সন্দেহ লেখক আগেই করেছেন, তাদের নেতাদের কারও কারও নৈতিক স্খলন ও শেষাবধি লেখককে দেওয়া প্রতিশ্রুতি না রাখাতে তা প্রমাণিত।
বস্তুত জীবনানন্দ দাশ আর তার প্রিয় নদী ধানসিড়ি, পরিবেশ বিনষ্ট আর নদী দখলের প্রক্রিয়ায় যে নদী এখন খালও নয়, সরু নালায় পরিণত, সেই নদী এবং তার চেয়েও বেশি রূপসী বাংলার কবি লেখকের দ্বিতীয় অবসেসন। তিনি প্লেনে আসতে আসতে কলকাতায় গড়িয়াহাঁট মোড়ে ট্রামের সাথে সংঘর্ষে রক্তাক্ত ধানসিড়ি নদীর কবিকে নিয়ে এক দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলেন। এই দুই অবসেসন ঘিরে এই উপন্যাস, যাতে মূলত বিস্তার ঘটেছে কিছু ব্রিটিশ চরিত্রের। পরিবেশবাদী আন্দোলনকে ঘিরে নিপীড়নবাদী রাষ্ট্রের চরিত্র, হুমকির মুখে পড়া বিশ্ব প্রকৃতি, পরিসংখ্যান আর বিশ্লেষণ বোঝাই এই উপন্যাস, যেখানে প্রথাগত উপন্যাসের মতো অহেতুক সংলাপের পর সংলাপ সাজিয়ে পাতা ভরানোর জোচ্চুরি নেই।
চরিত্রসমূহের মিথস্ক্রিয়ার মাঝে মধ্যেই মাসরুরের কলমে ঝর্ণাধারার মতোই (যদিও এখন আর ঝর্ণা কলমে কেউ লেখে না) বেরিয়ে আসে প্রকৃতি বর্ণনার অনুপম সিগনেচার গদ্য। মনে হয় এও এক অবসেসন মাসরুরের, তিনি তখন সে গদ্যের মোহে উপন্যাসের কনটেক্সটকেও ভুলে থাকেন। তাকে উদ্ধার করে পরাবাস্তবতা। টাইম মেশিনে চড়ে এক লহমায় লন্ডনের হাইড পার্কের ভেতরকার সার্পেন্টাইন হ্রদের বৃক্ষাবলীর জগৎ ছেড়ে চলে আসেন বরিশালের মিশন রোডে, জীবনানন্দ দাশের বাড়িতে। তার উপন্যাসে কেবল বিলুপ্তপ্রায় ধূষররঙা তিমি নয়, কথা বলে ওঠে বেড়াল (চেশায়ার ক্যাট?) ও কুকুর।
মাত্র দুদিনের ঘটনা নিয়ে ৩৮৪ পৃষ্ঠা লিখে ফেলার পর ঔপন্যাসিক শেষ অধ্যায়টি রেখে দেন তার বাড়ি ফেরার কাহিনী বর্ণনের জন্য। বস্তুত আমি ভাবছিলাম তিনি কীভাবে এই পরিবেশবাদী আন্দোলনকে ঘিরে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের ডিসকোর্স উদঘাটিত উপন্যাসটি শেষ করবেন। লেখককে এখানে এসে মনে হলো তিনিও যেন পথ হারানো পথিক। দুবাই এয়ারপোর্টে দেখা হওয়া এক বর্ণবাদী জার্মান জেনারেল, এক নদীখোর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদখোর সন্ত্রাসী এম পি, লেখকের স্ত্রী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী কিছু তরুণ ছাড়া এখানে উল্লেখযোগ্য কোন চরিত্র নেই।

আলথুসার উপন্যাসটির বিষয়বস্তু, ভাষা, ট্রিটমেন্ট সবই জটিল। উপন্যাসের ভেতর যারা প্রেমপরিণয়বিরহ খোঁজেন, তারা হতাশ হবেন, যারা তরল ও সরল গদ্য পড়ে পড়ে ভেবেছেন উপন্যাস বুঝি কিছু খুচরো সংলাপ আর পরিচিত চরিত্রের হাসিঠাট্টামশকরা, তারা মাসরুরের চৌকাঠে এসে হোঁচট খাবেন। মাসরুরের গদ্য এক স্লিপ ওয়াকারের মতো মাতাল ঘুরে বেড়ায়, এক প্রবল যুক্তিবাদীর মতো তত্ত্বের দুনিয়ায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে যায়। তার গদ্য জটিল ও প্রবহমান, নেশাজাগানিয়া ও নস্টালজিক। বস্তুত মাসরুরের এই উপন্যাস ঘোষণা করলো বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে লুতুপুতু উপন্যাসের দিন শেষ!

তিন.

আসলে “আলথুসার” নিয়ে আলোচনা শেষ হবার নয়। হয়তো একটি আস্ত বই লেখা সম্ভব এ উপন্যাস নিয়ে। সমকালীন বাংলা উপন্যাসে এমন বই আগে আসেনি। এর বিষয়বস্তু অভিনব ও বৈশ্বিক, এর ভাষা কাব্যিক ও গতিময়, এর প্লট জটিল, এর ডিসকোর্স বুদ্ধিবৃত্তিক। সুতরাং “আলথুসার”কে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলা যায়।
আগেই বলেছি এ উপন্যাসের একটি মৌলিক উপাদান বা বলা যায় এর নির্যাস হলো “পারহেসিয়া” বা সত্যকথন। পারহেসিয়ার চূড়ান্ত উদাহরণ লুই আলথুসারের আত্মজীবনী ‘দ্য ফিউচার লাস্টস ফরএভার’-এ, যেখানে আলথুসার তার জীবনের কোন কিছুই লুকাননি, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা দিয়েছেন কী করে প্রিয়তমা স্ত্রীকে তিনি গলাটিপে হত্যা করলেন। এই হত্যাকে তিনি জাস্টিফাই করতে চেয়েছেন এই বলে—পরিবার হলো নিপীড়নবাদী রাষ্ট্রের প্রথম যন্ত্র, যা মানুষকে দাস হতে শেখায়, আর এই দাসমনোবৃত্তিকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতেন কার্ল মার্ক্স। আলথুসার তার আত্মজীবনীতে নিজেকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি, নিজের পঠনপাঠনের গভীরতা, যোগ্যতা নিয়ে নিজেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ যা আমরা লুকাই, আলথুসার তা বলে দিয়েছেন। নিপীড়নবাদী রাষ্ট্র ও এর শাসকরা পারহেসিয়াকে ভয় পায়, তারা লালন করে আনুগত্য।
পারহেসিয়ার পরিচয় পাই বইটির সর্বত্র, যেমন এক্সটিংশন রেবেলিয়নের একদল সদস্যের সমুখে আত্মপরিচয় দেওয়া লেখকের বক্তৃতায়। পরিচয় পাই কার্বন নিঃসরণ নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলা প্রফেসর স্যামুয়েলের ম্যাগডোনাল্ডস বার্গার খেতে চাওয়ার ইচ্ছাকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়ায়, পরিবেশবাদী আন্দোলনের অসারত্ব XR নেতার মুখের উপর বলে দেওয়ায়।

আলথুসারের কট্টর সমালোচক প্রফেসর স্যামুয়েলের ভাষ্য হলো, আলথুসারিয়ান মার্ক্সিজমের দিন শেষ। এ নিয়ে কেউ আর, এমনকি একাডেমিসিয়ানরাও কথা বলে না। গ্রামসির কালচারাল হেজেমনি নিয়ে বরঞ্চ কথা হয়, কেননা শাসকের নির্দিষ্ট করে দেওয়া সংস্কৃতি কী করে মানুষকে অনুগত হতে শেখায়—গ্রামসি তা বলে গেছেন। আর ফুকো যখন বললেন, রাষ্ট্রই ক্ষমতার একমাত্র আবাস নয়, ক্ষমতা সর্বত্র বিরাজমান, তখন, প্রফেসর স্যামুয়েলের মতে, ছাত্র ফুকোর হাতেই গুরু আলথুসারের মতাদর্শ শেষ হয়ে গেছে।

প্রফেসর স্যামুয়েল এটাও বিশ্বাস করেন যে মার্ক্সবাদও শেষ, কারণ তার ভুল ব্যাখ্যা, ভুল প্রয়োগ। মার্ক্সবাদকে আত্মস্থ না করেই বিপ্লবীরা গেছে তাকে প্রয়োগ করতে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার মধ্য দিয়েই আসলে মার্ক্সবাদ শেষ। চীনে যা আছে তা হলো সোসালিজমের মোড়কে একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতি। মার্ক্স যেটা চেয়েছিলেন বিশ্বের প্রলেতারিয়েত শ্রেণির জাগরণ, ঐক্য ও উৎপাদন ব্যবস্থা দখলে নেওয়ায় জন্য প্রস্তুত হওয়া—তা ঘটেনি। আলথুসার যে সমাজের নানা কাঠামোর ভেতরেই দ্বন্দ্ব দেখেছিলেন আর বলেছিলেন সকল দ্বন্দ্ব ও পরস্পর বিরোধিতার মাঝেই লুকিয়ে আছে পরিবর্তন, সেটা মার্ক্সের “The base determines the superstructure” প্রতিপাদ্যকে চ্যালেঞ্জ করে। প্রফেসর স্যামুয়েলের মতে আলথুসারের কথা স্রেফ স্লোগান, তার কাজগুলোর মূল প্রতিপাদ্য হলো ভায়োলেন্স, যে ভায়োলেন্স প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে রাষ্ট্র ও তার নানা প্রতিষ্ঠান, পরিবার যার একটি।

ওই যে বলেছিলাম মাসরুরের সিগনেচার গদ্য, তার কিছু নমুনা দেই :

১। ‘…শুধু পুতিনের মতো মানবের বিশ্বই নয়, তারটা মানুষের পাশাপাশি থানকুনি পাতা, পপলার, কালিজিরা, ঘোড়ানিম, আর সেই সঙ্গে নদীর ঢেউয়ের না থাকা ফেনা, তারার হারিয়ে যাওয়া আলো, তিমি মাছদের সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে ছোড়া দ্রুত নিম্নগামী ফোয়ারা ও কালোবাউশ মাছ ও উগান্ডার হিপোপটেমাসদেরও বিশ্ব।’
২। ‘এতগুলো হাতের মধ্যে থেকে অবশ্য একটা হাতের তালিই আলাদা করে কানে বাজল আমার—কোনো লর্ড-ব্যারনের শুভ্রতা ও সুবাসনায় ভরা রবিন বোর্ডম্যান নামের ছেলেটার হাত। আমি খেয়াল করলাম, অন্য সবার তালি যেখানে ঠাক-ঠাক, তারটা কেমন নরম নরম, কেমন বৃষ্টির
টিপ টিপ বা বিড়ালের ক্ষীণ মিউ মিউ শব্দ করা এক তালি।’
৩। ‘সুউন্নত, সুগোল বুক, তাতে খয়েরি রঙের বুলবুল পাখির ছানার মতো দুটো উঁচু নিপল, তারপর কোনো আন্দালুসিয়ার অলিভ বাগানের গাছে ধরা, রোদে ঝিকমিক করা অলিভের গায়ের মতো তার পেট, স্বচ্ছ, ঝকঝকে, তারপর তীব্র লাল রং একটা অতি ছোট প্যান্টি… সেই সঙ্গে তার পুরো মুখ লাল, অরেঞ্জ-হানি-স্কারলেট ও কোরাল মেশানো লাল, …’

এবার আসি খুঁটিনাটি বর্ণনার (ডিটেইলস) উদাহরণে:

১। ‘একটা বড় টেবিল, দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে পঞ্চাশ ফুট হবে। একটা সাদাসিধা, বৈচিত্র্যহীন, পরিপুষ্ট টেবিল, রং গাঢ় খয়েরি, না, খাকি রং, পীত ধূসর, কিংবা আরেকটু পরে আমার চোখ এই আলোতে অভ্যস্ত হয়ে এলে যা হয়ে যাবে পাটকিলে, ইটে রং, হতে পারে। তো, একটা বড় টেবিল, তার দৈর্ঘ্য কমপক্ষে বায়ান্ন ফুট, আর প্রস্থ আমি দেখতে পাচ্ছি তবে মাপ বুঝতে পারছি না, কিন্তু এটা পরিষ্কার যে টেবিলটা নিশ্চিত চল্লিশ-পঞ্চাশ টন ওজন নিতে পারে, এত শক্তপোক্ত তার গড়ন, এত পৃথূদর, তাগড়াই তার ভাব।’
২। ‘…বলে দিল ফিটিংসের কী সমস্যা, মেকানিকাল কানেকশনের, পাইপ এ-র সঙ্গে পাইপ বি-র ইউনিয়নের কী সমস্যা, সিঙ্কের সঙ্গে ওয়েস্ট ডিসপোজাল ইউনিটের বিরোধ কোথায় ঘটেছে, সাপ্লাই পাইপ কোথায় বেঁকে গেছে লাগানোর ভুলে, কোথায় শাওয়ার হোজ নষ্ট বা ফুটো, টয়লেট বোলের ট্র্যাপ কিছু পানি কেন তার ওখানে ধরে রাখতে পারছে না, আর তা পারছে না বলেই সিউয়েজ গ্যাস ড্রেনিং সার্কিট দিয়ে কীভাবে বেরিয়ে যাচ্ছে…’
৩। ‘…এ হোয়াইট মালবেরি। নিশ্চয়ই জানেন এটার পাতা খেয়েই বাঁচত সিল্কওয়ার্মেরা, সেই সিল্ক ট্রেডের দিনগুলোর কী বিখ্যাত এই গাছ!… স্লাইটলি অ্যাসিডিক, স্লাইটলি ওয়েল-ড্রেইনড সয়েল হলে ভালো হয়, আর আইডিয়াল PH ছয় থেকে সাড়ে ছয়, তারপর সারা বছর আর কিছুই করা লাগবে না। ওতেই কীরকম রাজসিকভাবে, এলিগ্যান্ট চেহারা নিয়ে, অদ্ভুত কাটা কাটা পাতা নিয়ে বেড়ে উঠবে ওরা। আর ওদের ফল…’

এই উপন্যাসের ভেতর কিছু ছোট ছোট ঘটনা আছে যেগুলো রাজনীতি আর পরিবেশ, দর্শন ও অর্থনীতি নিয়ে মগ্ন উপন্যাসটির ভেতর সিনেমেটিক রিলিফ এনেছে। এগুলোর মাঝে আছে মেগান ও মেলিন্ডার সাথে তাদের বাবার সাক্ষাৎ, দুই বোনের পুনর্মিলনী, পুলিশ কনস্টেবল মার্কের অপরিসীম সুন্দরী বৌয়ের পুরোনো প্রেমের জন্য স্বামীগৃহত্যাগ, রেবেলিয়ন নেতা উইলিয়াম স্কিপিংয়ের মেয়ের বয়সী নেলির প্রতি অপ্রতিরোধ্য কামনাজড়িত টান। আছে বিবিধ বিস্তারের ভেতর ধরে রাখা একদল বন্ধু নিয়ে যৌবনে ধানসিড়ি নদী দেখতে যাওয়া, সেখানে লেখকের এক বাল্যবন্ধুর পানিতে ডুবতে ডুবতে বেঁচে গিয়েও সারাজীবনের জন্য প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়া, জীবনানন্দ দাশের ট্রাম দুর্ঘটনা ইত্যাদি।

এই যে লক্ষ লক্ষ কলকারখানার ধোয়া উড়িয়ে, কোটি কোটি যানবাহনের তেল পুড়িয়ে আমরা বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছি লক্ষ লক্ষ টন কার্বন, যা উষ্ণ করে তুলছে পৃথিবীর তাপমাত্রা, যার প্রভাবে গলছে মেরুঅঞ্চলের বরফ, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, যাকে আমরা বলি গ্রিন হাউস ইফেক্ট, বনজঙ্গল ধ্বংস আর জীববৈচিত্র্যকে হুমকীর মুখে ফেলা সেই বিপন্ন পৃথিবীকে রক্ষা করতে সচেতন হচ্ছে মানুষ। “আলথুসার” উপন্যাসে এই পরিবেশ বিপর্যয়ের তথ্যগত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও মেলে, সেখানে আটলান্টিকে তিমি শিকার থেকে সুন্দরবন—সবই চলে আসে। রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি, পরিবেশ নিয়ে মাসরুরের বিস্তৃত পড়াশোনার সাক্ষর পাওয়া যায় প্রতি পৃষ্ঠায়। বিশেষ করে তার গাছের প্রতি ভালোবাসা, তাদের নাম মনে রাখা ও যুদ্ধাস্ত্র বিষয়ে কৌতূহল বেশ মজার। এ বইয়ে কেবল এইসব ভারী বিষয়ের প্রাচীর নয়, পাঠককে ডিঙ্গাতে হবে প্রচুর ইংরেজি শব্দের বাধা, উপন্যাসের প্রেক্ষাপটের কারণেই যা এসেছে। মাসরুর মূলত উদ্দীপ্ত করতে চান পাঠকের মস্তিষ্ককে, আবেগ বা হৃদয় তার লক্ষ্য নয়, আমাদের ignorance is bliss দুনিয়াটি তিনি ভাঙ্গতে চান।

এই উপন্যাস আমাকে মুগ্ধ করেছে এর অভিনব বিষয়ের জন্য। একজন ফরাসী মার্ক্সবাদী দার্শনিকের জীবন ও দর্শন, তার সাথে সমান্তরাল গড়ে ওঠা এক্সটিংশন রেবেলিয়ন নামের পরিবেশবাদী আন্দোলনের সম্পৃক্তি দারুণ। আমাকে মুগ্ধ করেছে মাসরুরের মাতাল ও গতিময় গদ্য, যা কখনো প্রবন্ধের মতো কঠিন, কখনো কবিতার মতো নরম। আমাকে মুগ্ধ করেছে কাহিনীর ঠাঁস বুনুনি, বর্ণনার বিস্তার, অপরিমেয় কল্পনাশক্তি ও লেখকের খুঁটিনাটি দেখবার চোখ। মাসরুরের সিগনেচার গদ্য ও ডিটেইলিং, যার কিছু উদাহরণ উপরে দিয়েছি, তা। ঔপন্যাসিকের নিরাসক্তি ও আধুনিক মনন, হৃদয় নয় মস্তিষ্ককে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া আকর্ষণীয়।
সব মিলিয়ে আলথুসার এক নতুন অভিজ্ঞতা, এক বিরল রচনা। সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে এর তুলনা আছে কি না জানি না, থাকলেও স্বল্প। আলথুসার, এককথায়, একটি মাস্টারপীস!।

Facebook Comments