১৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯; ২ ডিসেম্বর, ২০২২;ভোর ৫:৩৫

রম্যগল্প | সেলফি | জয়ন্ত বাগচী

আড্ডাপত্র

নভে ১২, ২০২২ | গল্প

চলতে ফিরতে রাস্তা ঘাটে, খবরের কাগজে, টিভিতে এমন কি বড় রাস্তার ধারে ঢাউস ঢাউস বিজ্ঞাপনে শুধু একটা জিনিষের ছবির রমরমা —তা হল মোবাইল ফোন । দিনরাত রাতদিন চলছে কে কাকে টেক্কা দিতে পারে তার প্রতিযোগিতা । কে পাঁচটা সুবিধা দিল তো সঙ্গে সঙ্গে আর একজন ঝাঁপিয়ে পড়লো ছ’ছটা সুযোগ দিচ্ছে বলে । বাপরে বাপ ! কি উন্মাদনা গোটা দেশটা তা থৈ থৈ নৃত্য করতে শুরু করেছে ঐ একটা পুঁচকে যন্ত্র নিয়ে । আগে শুধু মনের কথা শোনার জন্যই ছিল আকুলি বিকুলি আর এখন ছবি… ছবিতে ছবিতে একেবারে সয়লাব । পোজ দিতে গিয়ে ত বেশ কটা শহীদ হয়ে গেল । স্বাধীনতার জন্যে নয়, রাজনীতির জন্যেও নয়… হয়ে গেল সেলফি শহীদ! তারি মধ্যে আবার কে কাকে একদম এলোমেলো করে দিলো তাই নিয়ে প্রবল আইনি লড়াই । এর মুণ্ডুতে ওর শরীর জুড়ে দিয়ে যাচ্ছেতাই কেচ্ছা ছড়িয়ে দিয়েছে জগতময় ।

রিক্সায় প্যাডেল মারছে আর কানে লাগানো ছিপিতে গান শুনছে । বাবু আমার বড়ে গোলাম আলি খান ! কি মগ্নতা ! যাবার কথা আমড়াতলা আর নিয়ে এলো বেলপুকুরে ! কি ঝামেলা, কিছুতেই মানতে চায় না সে ভুল করেছে !

বাজারে আনাজওয়ালা ছিপি কানে এঁটে পটলের জায়গায় উচ্ছে মাপছে কেজি ভরে ।আরে আরে করিস কি? কি দিচ্ছিস? চাইছি দু’কেজি পটল আর তুই দিচ্ছিস উচ্ছে ? অতো উচ্ছে দিয়ে কি আমার শ্রাদ্ধের শুক্তো রান্না হবে ? কথা শুনে ঝাঁঝিয়ে ওঠে– আপনি তো এটাই চাইলেন ! সকাল থেকে এতো মাল বেচলুম কোন ভুল হয়নি আর আপনি বলছেন…

বাসে চলেছি রাতের বেলা । কোথায় এলো জানলা দিয়ে দেখে কিছুই বুঝতে পারছি না । কন্ডাকটরকে জিজ্ঞেস করতেই পাশ থেকে একজন জ্যাকশন জ্যাকশন বলতে বলতে হুড় হুড় করে নেমে গেল

আমি তো অবাক ! জ্যাকশন বলে আবার এই দিকে কোন জায়গা ! আগে তো কোনদিন শুনিনি ! তবে কি ভুল বাসে উঠলাম? আবার কন্ডাকটরকে জিজ্ঞেস করতেই ঝাঁঝিয়ে ওঠে – শুনেছি শুনেছি, চুপচাপ বসুন ঠিক জায়গা এলেই নামিয়ে দেব ।

বাড়ি ফিরে দেখি আমার গৃহিণীও কানে ছিপি লাগিয়ে বিছানাতে বসে পা দোলাচ্ছেন আর চোখ বন্ধ করে টুক টুক করে ঘাড়টাও নাড়াচ্ছেন ! জিজ্ঞেস করলাম , হ্যাঁগো এটা আবার………

সন্তু এনে দিয়েছে । সারাদিন এফ এম শুনবো । আমি বললাম , কি শুনছো দেখি আমি একটু শুনি … একটা ছিপি আমার কানে দাও …

শুনেই তিনি রে রে করে উঠলেন । ঐ তো তোমার দোষ । আমার কোন কিছুই কি তোমার সহ্য হয় না ? শুনছি একটা গান, সেটাকে দুখানা করে শুনলে আর কিছু থাকবে না বুঝবো ? আর কি বললে, ছিপি ? তোমাকে নিয়ে আর ভদ্র সমাজে চলাই যাবে না । কেন হেড ফোন বলতে পারো না ?

— সে কি ! গান দুভাগ হয়ে যাবে? দুকানের দুটো ছিপিতে কি আধখানা করে গান হচ্ছে?

— আবার বলে ছিপি … ও তুমি বুঝবে না । তুমি বসে বসে খবরের কাগজটা পড়… বলতে বলতে ঘরের বাইরে চলে গেল ।

সেদিন সকালে ছাদে হঠাৎ দুম করে শব্দ হল । কি পড়লো, কে পড়লো করতে করতে ছাদে গিয়ে দেখি নাতনি পায়েল পা চেপে বসে আছে, গলগল করে রক্তও বের হচ্ছে। কি রে কি হল , কি করে হল ?

— দাদু আমার পা টা মনে হয় ভেঙেই গেল …উফ মাগো…কেঁদে কেঁদে বলে পায়েল ।
— তা হল কি করে ?
পাশ থেকে ছোট নাতি টুটুল বলে, কি হয়েছে জানতো দাদু , দিদি না টবের ঐ গোলাপ ফুলটার সঙ্গে সেলফি তুলবে বলে টবটা সরাচ্ছিল আর সেটা পায়ে পড়েছে ।

— সেলফি টবের গাছ নিয়ে?
কাঁদতে কাঁদতে মিনমিনে গলায় পায়েল বলে, আজ ফ্লাওয়ার্স –ডে , তাই ভাবলাম ফুলের সঙ্গে … উফ মাগো…

— ব্যস ! এখন চল ডাক্তারখানায়, সেখানে গিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে সেলফি তুলবি…

— না দাদু , আগে ছবিটা নিতেই হবে না হলে পোস্ট করতে পারবো না ! প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যাবে! তুমি টবটা একটু তুলে দাও না প্লীজ…দাদু…

— এখনো সখ মেটেনি ? ঐ ভাঙা টব তুলব কি করে?

— প্লীজ…দাদু , যা হোক একটু ম্যানেজ করো । নাতনির আবদারে তুললাম টব । গোলাপের কাঁটায় হাত রক্তারক্তি কিন্তু উপায় নেই ।এমন সময় ছাদে বৌমার প্রবেশ । কি রে পায়েল কিসের যেন শব্দ হল ? ওওওওওমা…… তুই গোলাপের সঙ্গে সেলফি তুলছিস ! বাবা প্লীজ… আর একটু ধরে থাকুন না … আমি একটা শট নিয়ে নি …

কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম টব ধরে । মা মেয়ে কিচ কিচ করে সেলফি তুলছে মত্ত হয়ে ।

— বৌমা হাত যে ব্যথা হয়ে গেল, এবার থামো !

— আর একটা বাবা …প্লীজ আর একটা ! পায়েল তোর ঠাকুমা এসেছে … ও মা, তাড়াতাড়ি আসুন । বাবা আজ কি দারুণ পোজ দিয়েছেন দেখুন…।
থপ থপ করে আমার বাষট্টি বছরের গিন্নিও আসছেন পোজ দিতে ! হায়রে …সেলফি …

এখন নিজেকে মনে হচ্ছে আলিপুর চিড়িয়াখানার সেই শিম্পাঞ্জি “বাবু:” …। সবাই দেখছে আর ছবি নিচ্ছে………সেলফি !!

Facebook Comments

আড্ডাপত্রে লাইক দিন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১