শেয়ার করুন:

স্নোড্রপ চুম্বনেরা


লেখক : মিলটন রহমান
ধরন: কবিতা
প্রকাশক: আগামী প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
মূল্য: ১৫০ টাকা

পাঠমূল্যায়ন: মোস্তফা হায়দার

আর হতে পারে ধর্মের লাইসেন্স পরে দুর্বিনীত
ব্রক্ষাণ্ডের এটিই এখন বড় হাতিয়ার
সবাই ধার্মিক হয়ে যেতে পারে, তারা এতটাই অক্ষম
পারে না কেবল মানুষ হতে।
(কতটুকু মানুষ)

কাদামাটির এ শহরে কবিতাকে যারা পথের ধুলো মনে করে সামনের দিকে হাঁটতে চান তারা পাথেয় খুঁজে বের করেন জীবনের পলিমাটি।কবিতার মসৃণ মাঠে পলিমাটির মিশ্রণশিল্পের হাত ধরে শব্দের বুননশৈলী কবিতার বাগান । বাক্যের বাগানশৈলীতে শব্দের চাষ এবং বুনন শক্তিই কবিকে দান করে এক নির্মল পরিবেশ। পরিবেশের উদ্দামতায় আবহাওয়ার নির্মলতা কাজ করে টনিকের মতো। কবিতা চাষে উপমা আর অনুপ্রাস যদি ভালই মিশ্রণ ঘটানো যায় তাহলে দ্রবণ কবিতাকে দান করে যথাযথ রসায়ন।

কবিতা আসলে কারো কোনো সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ হতে পারেনি বলে আজো কবিতাকে আমরা বিভিন্ন রসদে সৃষ্টি করতে পারি। কবিতা নাও হতে পারে! তবু কেউ সাহস করে বলে না– এটা কবিতা হয় নি। বলা হয় দূর্বল আঙ্গিকের কবিতা। তারপরও কথা থেকে যায়।

উপরের লাইনগুলো যার তিনি হলেন সময়ের এক প্রেমিক পুরুষ কবি মিলটন রহমান। কবিকে দেখতে হলে কবিতার ভেতরে ঢুকতে হবে। যদিও এটা চূড়ান্ত কথা নয় বলে অনেকে বোদ্ধাপাঠক মত প্রকাশ করবেন। তবে এটি সত্য ; কবির কবিতার পর্দা ওল্টালে বুজতে সহজ হয় কবি কি বলতে চেয়েছেন অথবা কবির ভেতর শক্তির দৌড় কতটুকু! কবিরা প্রেম পুজারী। প্রেমের আদল যদিও অনেকে ভিন্নতার আশ্রয় নেয়। কারো কারো কবিতা হয়ে ওঠে সময়ের দ্রবণক্রিয়ার এক রসদ।যে রসদে কবিতাকে পাঠকরে সামনের গতিপথ নির্মান করা যায় অনায়াসে। কবির মিশ্রদ্রবণে একটু হাত বাড়াই-
কেউ পারে না দিতে জীবনের শেষ চুম্বন
অন্তহীন অন্তেই মধ্যরেখা মিলায়ে যায়
আত্মহননের পর দৃশ্যমান চুম্বনগুলো
উল্কাপিণ্ডের মতো মিশে যায় জল ও মৃত্তিকায়।
(অমিয়)

কবিরা আসলে এভাবে বেঁচে থাকতে চান বলে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কবিতাটি সিলভিয়া প্লাথকে মনে করে নস্টালজিয়ায় প্রবেশ করে কবিও হয়ে ওঠেন চুম্বনরেখার এক প্রেমের সারথি। কবির সুখ খোঁজেন তার প্রেয়সীর বুকে। যেখানে লুকানো থাকে বরফের আজল ভরা এক সুমিষ্ট পানি।
কবি মিলটন রহমান তার প্রেমকে শেকড়ের শব্দের আঁচল দিয়ে জড়াতে পছন্দ করেন। তাই কবি নিজের আবেগ প্রকাশ করেন ঠিক অন্তর্জলা শব্দের দ্যুতি পরিধান করে। তোমার নাম’ কবিতায় কবি বলেন—

আমিতো তোমারে জ্যোৎস্নার আলোর লাহান
গতরে জড়াইতে চাই
অমাবস্যার গুটগুইট্টা আন্ধার রাইতে আমার রতিলতি মন
তোমারে পূর্ণিমার চাঁদ ভেবে রাইত কাবার করে
তুমি আর কি খুঁজো গো এই বুকের ভিতর

চমৎকার উপমায় কবি প্রেমের বলিদান দিতে চান। ভেতর খোলে খোঁজেন তার প্রিয়কে। যে প্রিয় চিরসত্যের মায়াজালে আঁটকে রাখেন কবিকে। আসলে কবিরা দৈহিক অথবা চৈনিক প্রেমের চেয়ে খুঁজে ফেরেন শ্বাশত প্রেমের বলিদান। কবির একই কবিতায় কবি বলেন মনের দরোজা খোলে ঠিক এভাবে–

ভাদ্রের ফাটা জমির লাহান হা করে আছে বুক
কলিজার ভিতর কি যেনো দেয় টান, হায়
আমিতো তোমারে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু শিখি নাই

একজন প্রেমিক কবি এমন করে প্রেমকে তুলে ধরতে না পারলে প্রেমের সার্থকতা কিভাবে দাঁড়াবে সবুজের সীমানায়। কবির বইটির ভেতরগালিচা পুরোটাই নিটোল প্রেমের বয়ান বলা যায়। কবি তার প্রেয়সীকে উপমার রসদে সাজাতে সাজাতে কাব্যগ্রন্থটি আমার কাছে একটি প্রেমের উপাখ্যান হিসেবে ধরা দিয়েছে। তবে ভিন্নতায় কবি স্থান নির্ণয় করতে সক্ষম বলা যায়। কবি উত্তরাধুনিক কবিতায় বলেন—

তোমার আমার চাঁদ দেখার চোখ এক নয়
চাঁদের আলো দেখার জন্য
মাছের চোখের মতো জ্বলছে আমার চোখ
তোমার চোখে উড়ছে সোনালি পারদ

আসলে তাই। কবিরা ভাঙতে যেমন জানেন তেমনি বাঁধতেও জানেন। কবিদের প্রেমের চোখের সাদৃশ্য তাই ভিন্ন। চোখের হিসেব আর পাঠকের ক্ষমতার হিসেব কোন কালে মিলেনি। কবিরা প্রেম করেন স্রষ্টার নিবেদনে, সৃষ্টির খোঁজে। আবার রসের পেয়ালায় বসে নির্মাণ করেন বেঁচে থাকা জাগতিক প্রেমের সিঁড়ি। যে সিঁড়ির আকাশ বেয়ে বেড়িয়ে আসে সুন্দরের চর্চা।

কবি মিলটন রহমান নস্টালজিয়ার সাথে সময়ের ফেলে আসা বিরুদ্ধতায় খোঁজেন আগামীর স্বপ্ন। শেকড়ের নাড়ি টেনে সামনে তুলে আনেন প্রজন্মের ইতিহাস। ইতিহাসের আয়নায় ফেলে আসা স্মৃতিরা বুনতে থাকে স্বপ্নের চারাগাছ। কবি তাই বিজ্ঞাপন কবিতায় খুঁজে চলেছেন পেছনের কথা। শব্দের ছোঁয়ায় এঁকেছেন এক নিটোলপ্রেমের সামিয়ানা। কবির ভাষায়–
একটি দুধেল বরফের মতো শীতল গ্রাম
রমণীর খোঁপার মতো থোকা থোকা বৃক্ষ
উরুর মতো বাদামি রঙের পাহাড়, আর
টংকা স্তনের মতো উঁচুনিচু মায়াবী পথ
সবকিছুই আমার ফেরত চাই।

তাইতো বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশের ভারসাম্যে কবির উদয় চিন্তা কম কিসে। আধুনিকতার যাঁতাকলে প্রকৃতির পিষ্টতা কবিকে ভাবতে বসিয়েছে। সময়ের দ্রষ্টা হয়ে কবি বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। এটাই মানবতা। এটাই শিল্পের চরিতার্থ বিনোদন। কবির চিন্তার বিকাশায়ন পাঠকের হৃদয়ে বাসা বাঁধে বিশ্বাসের। আস্থা ও বিশ্বাসের সমন্বয় কবিতার রাজস্থান বলা যায়।

কবি মিলটন রহমান প্রেমের উপাখ্যান খ্যাত গ্রন্থটিতে রাষ্ট্টীয় অনাচারের কথাও বলেছেন চিকন হাতে।যে হাতে কবি শিল্পের চর্চা করলেও বলতে দ্বিধা করেননি অযাচিত সময়ের কথা! যে সময় ইতিহাসের স্বাক্ষীও বটে। কবি বলেন–
স্বৈরাচার পতন, ছিয়ানব্বইয়ের অসহযোগ আন্দোলন
মাথায় হুলিয়া, কোমরে ককটেল, সাতমুখী ছুরি
সুঠামদেহী মধ্যবয়সী মায়ের মুখ
মায়াবী পর্দার মতো সম্মুখে ঝুলে থাকা প্রেমিকার ছবি
এর সবকিছু আমি ফেরত চাইতেই পারি

হাঁ কবি ফেরত চাইতেই পারেন। তখন রাজনীতির যাঁতাকল মাঠের খেলোয়্ড়গণ এখনকার সময়ে ঘুম, ক্রসফায়ার অথবা কন্ট্রাকচুয়ালে হত্যার বড়ি খেতে অভ্যস্ত হতেন না। কবি সে সময় ফেরত চাইতেই পারেন। তবু ভালো সময়ের বিবেচনায়। একটু পেছন ফেরাতে যদি সুন্দরোর ছোঁয়া পাওয়া যায় মন্দ কিসে!

কবির আরেকটি কবিতা হলো – অক্ষমতার মাত্রা বিয়োগ। েখানেও কবি প্রতীকি প্রতিবাদে চড়াতে চেয়েছেন। কবি বলেন–
আমরা ক্রমশ বর্বর হয়ে উঠছি
এমনকি বিচারের প্রাগৌতিহাসিক স্মারক
সবই এখন অন্ধকারের গান হয়ে উঠছে

কবি ঠিক জায়গায় হাত দিতে চেয়েছেন। যেখানে মানুষ ও মানবতার কথা ঝিঁয়ে রাখা সম্ভব। আমরা আধুনিকতার নামে চৈনিক বর্বরতার দেয়াল টপকাতে চলেছি। যেটাতে ভালোবাসা মার খায়; হিংসার জন্ম হয়। ক্রোধের পেয়ালা তৈরি হয় নিশ্চিত। কবি তাই ‘কতটুকু মানুষ’ কবিতায় সবাইকে মানুষ হতে বলেছেন।
কবির দেশপ্রেম নিসর্গের মতো। কেউ প্রেম করে প্রেয়সীর পোষাকে। কেউ প্রেম করে দেশের মাটি ও প্রকৃতির হাত ধরে। কবি মিলটন রহমান বাংলাদেশ কবিতায় বলেন—

সন্তান জন্মানো পাঁজরে সহস্র ক্ষত নিয়ে
বেদনা প্রকাশ হয় না
বাংলাদেশ হেঁটে যাচ্ছে
বিলেতের কাঁকড় বিছানো পথে
একখণ্ড বাংলাদেশ কেবল কাঁদছে
অনুযোগহীন, অভিযোগহীন

কবি ময়ুখ চৌধুরির ভাষায়– প্রত্যেক মানুষই ভেতরে ভেতরে কবিতা বাইরে প্রবন্ধ” এ জায়গায় কবি সফলভাবে শেষ হইয়াও হইল না শেষ এর মতো করে পাঠককে বসিয়ে রেখেছেন কবিতার কাছে। যে কবিতায় আশ্বাসের বাণী আছে দুখের শাড়ি হাতে। এটাই বেঁচে থাকার কর্মশালা।

কবিকে বিদেশের সংস্কৃতি আচ্ছাদন করতে না পারলেও বিদেশী শব্দ কবিকে আঁকড়ে ধরেছে। বেশ কয়েকটি কবিতায় ইংরেজি শব্দের বাহুল্য ব্যবহার চোখে পড়েছে। গ্রন্থের নাম শিরোনাম কবিতা সহ বেশ কয়েকটি কবিতায় ইংরেজি শব্দের অযাচিত ব্যবহার যেমন লক্ষণীয় তেমনি অসুন্দর এবং অর্থহীনও মনে হয়েছে। কবি নিশ্চিত অচেতন ভাবে ইংরেজি শব্দকে বাক্যহীনভাবে ব্যবহার করে জন্মদেয়া নিজ সন্তানকে যেন খোঁড়া করে ছাড়লেন। কবি চাইলে আরো সুন্দর ঢঙে বাংলা শব্দে সে উপমাগুলো সাজাতে পারতেন। হয়ত বিলেতের মাটিতে বেশীদিনে বসবাস কবিকে এমনটি করতে অব্যস্ত করেছে। তাই সামনের সময়গুলোতে কবিকে ভাবতে হবে। তবে বেশ কিছু ভালো কবিতা আছে গ্রন্থটিতে। যদি ভুল না হয় – প্রথম গ্রন্থের বিবেচনায় কিছুটা অপরিপক্কতাও ছিল। যেমন কিছু কিছু উপমার ব্যবহার এবং সংমিশ্রণহীন শব্দের ব্যবহার। তবে কবির ভবিষ্যৎ উজ্জল বলা যায়। –

Facebook Comments