আড্ডাপত্র

৯ বৈশাখ, ১৪৩১; ২২ এপ্রিল, ২০২৪;রাত ২:০৮

রোকসানা রহমান এর কাব্যগ্রন্থ ‘বসন্ত রেখে আসবো’ : একাকীত্বের শব্দবুনন

আড্ডাপত্র

মার্চ ২৭, ২০২৪ | কাব্যগ্রন্থ, রিভিউ

কবিতার আলাদা একটা সৌন্দর্য আছে। সেই সৌন্দর্য কম বেশি হয় কবির হাতের কাজের উপর নির্ভর করে। কবি তার কবিতার কপালে মাঝ বরাবর টিপ পরাতে পারে। চুলগুলো আঁচড়ে দিতে পারে। কবিতার ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিতে পারে। কবিতাকে কামনাময়ী করে তুলতে পারে। এতে করে কবিতার সৌন্দর্য বাড়বে। এত এত কবিতা থাকতে আপনার কবিতা পাঠক কেন পড়বে? সেটা আপনাকে তৈরি করে দিতে হবে। কবি রোকসানা রহমান এর গতবছর প্রকাশিত নতুন কবিতার বই ‘বসন্ত রেখে আসবো’ হাতে নেওয়ার পর মনে হয়েছে কবি তার বইটার সেই জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন। এটা কবির সার্থকতা।

আপনি খুব ভালো লেখেন। কিন্তু আপনার লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না? এর অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। কিন্তু আমার মতো একজন পাঠকের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তিনটা কারণ আছে। প্রথমত তা হলো- বইয়ের প্রচ্ছদ। এটা খুব স্বাভাবিকভাবেই লেখকেরা গ্রহণ করে। প্রচ্ছদ হলেই হলো। কিন্তু না। পাঠককে আপনার বইটার প্রচ্ছদ প্রথম টানবে। পাঠক কাছে যাবে। তারপর বইটার নাম দেখবে। সুতরাং একটা বই লিখতে যতটা সময় ব্যয় হয়, বইটার নাম নিয়েও ততটা সময় ভাবা উচিৎ। তৃতীয়ত বইটার লেখকের নাম। এই তিনটা বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তিনটা পথ অতিক্রম করে পাঠক বইটার ভিতরে প্রবেশ করবে। আর এই কথাটা বলার প্রধান কারণ হলো কবি রোকসানা রহমান এর কবিতার বই ‘বসন্ত রেখে আসবো’ পাঠককে টানতে বাধ্য করবে। আর পাঠক যখন বইটা খুলে চোখের সামনে ধরবে তখন হারিয়ে যাবো রোকসানা রহমানের কাল্পনিক ক্ষমতার কাছে-

‘রাতভর বৃষ্টির পাতায় লিখতে চেয়েও পারিনি
বারবার ভিজে অস্পষ্ট হয়ে যায়
কতবার গ্রীষ্মের শাখায় লিখতে যেয়ে
সব ছাই হয়ে উত্তরা বাতাসে উড়ে যায়।’

প্রথা বিরোধী কবি রোকসানা রহমান তার কবিতার মাধ্যমে পাঠককে জয় করবেন। পাঠকের শক্তি ও মনবল বাড়াবেন। তিনি কবিতাকে জীবনমুখী করেছেন। কবিতায় জীবন দিতে চেয়েছেন। তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী একজন কবি। রোকসানা রহমানের লেখার ধাঁচ অনেকটা সেই সত্তর-আশির দশকের। তবে এটা যেমন ভালো, ঠিক তেমনি আমার কাছে একটু অন্যরকমও লেগেছে। বর্তমান প্রজন্ম রোকসানা রহমানকে পড়তে চাইবে না। কারণ তিনি সেই নব্বই দশকের আগের কবিতার শব্দ কাঠামোতে পড়ে রয়েছেন। যদিও কবিতার পরিবেশ চরিত্র ভাবনা সময়োপযোগী। রোকসানা রহমানের কবিতার যে গভীরতা আমার চোখে পড়েছে ‘বসন্ত রেখে আসবো’ গ্রন্থে তা অবশ্যই আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু তিনি শব্দগুলোকে আরও সহজ করে উপস্থাপন করতে পারতেন। যতটা সহজ করে উপস্থাপন করেছে কবিতার ভিতরের প্রেক্ষাপট, পরিবেশ, চরিত্রগুলো। কবি বড্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে একটা কবিতায় দু’টো লাইন বলেছেন যেটা লিখতে গিয়ে আমার বার বার মনে পড়ছে-

‘যে মাটিকে ভালোবাসি সেইতো হবে ভরসার ছাদ
রাখবে সেদিন যতনে আমায় ছোট্ট মাটির নির্জন নিবাসে।’

কবি বিশ্বাস করেন ভালোবাসার বিনিময় ভালোবাসা দিয়েই হয়। তাই হয়তো উপরের দুইটা লাইন কবি বলে গেছেন। ভালোবাসায় বিশ্বাসী একজন কবি রোকসানা রহমান। কলম প্রকাশনী হতে গতবছর বইমেলা ২০২৩ শে প্রকাশিত এই ‘বসন্ত রেখে আসবো’ গ্রন্থ না পড়লে হয়তো অজানাতেই রয়ে যেত কবির হৃয়য়ের গভীর আকাঙ্ক্ষাগুলো-

‘যদি একটা তুমি থাকতে কাছে
অনাড়ম্বর এই নির্বাসনের নির্জনতায়,
বইয়ে দিতে অম্লজানে সৌরতাপে আবেগবিহীন রাত্রিগুলো
উন্মাতালে উষ্ণতারই মগ্নশ্বাসে…!
তৃষ্ণাতুর এই খণ্ড প্রহর যেতাম ভুলে
একটা তুমি থাকলে কাছে।’

একটা প্রহর বড় তৃষ্ণার্ত, বড় কষ্টের। কবি সেই তৃষ্ণাকেও ভুলে যেত যদি একটা ভালোবাসার মানুষ থাকতো কাছে। একটা তুমি থাকতো কাছে। যে কিনা অম্লজানে সৌরতাপে আবেগবিহীন রাত্রিগুলো উন্মাতালে উষ্ণতার মগ্নশ্বাসে বইয়ে দিত অনাড়ম্বর সেই নির্বাসনের নির্জনে। একটুখানি ভালোবাসার জন্য কবির মন মন্দিরে যে হাহাকার যে আতর্নাদ ফুটে উঠেছে তা পাঠককে ভালো লাগাবে। পাঠক এখানে এসে রোকসানা রহমানের জায়গায় নিজেকে ভাবাবে, ভাসাবে। এটা কবির সফলতা। ‘আমার ভিতর একটা তুমি’ কবিতায় কবি আরও বলেছেন-

‘একটা তুমি দীর্ঘশ্বাসে আমি এখন রৌদ্রবিহীন
আনত এক অভিমানী সূর্যমুখী তপন বিহীন
তুমিও কি আমার মতন, বৃষ্টিবিহীন মরু…?’

নারীদের ব্রাকেটবন্দী জীবনের বাহিরে এসে পৃথিবীকে দেখেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্মাননা-২০২২ প্রাপ্ত কবি রোকসানা রহমান। পারিবারিকভাবেই সেই সুন্দর একটা পরিবেশ ছোট থেকেই পেয়েছেন তিনি। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ও মা মহিলা ক্লাবের সম্মানিত সদস্য ছিলেন। লেখালেখি বা এই সংস্কৃতিমনা মনমানসিকতার পিছনে তার পরিবারের বড় একটা অবদান আছে বলে মনে হয়েছে। কবির দেখার চোখ দু’টো বড্ড সবুজ। সতেজ মস্তিষ্কের কবি রোকসানা রহমান নারীদের প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি তার কবিতার মাধ্যমে নারীদের সাহস জোগাবে বলে আমি আশাবাদী। ‘বসন্ত রেখে আসবো’ বইয়ের একটা কবিতা ‘সতী দাহ’, এই কবিতা লিখতে গিয়ে সেখানে কবি একটা কথা বলেছেন যা আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে তা হলো-
‘হয়তো সেদিন ঈশ্বরের চোখে ছিল জল।
তাইতো নির্মম-নির্দয় আর নিষ্ঠুর প্রথার অবসান করতে ঈশ্বর
পাঠালেন এক মানব দূত।’

কবি ‘উদীয়মান সূর্য’ কবিতায় বলেছেন-

‘ঈশ্বর আপনিও কি চান…?
প্রাচীন নারীর মতো ব্রাকেট
বন্দি হয়ে, জানতে হবে লাউ, চিংড়ি, রুই-ইলিশের
জটিল সমীকরণ!’

কবি এখানে ঈশ্বরকে প্রশ্ন করেছেন। সত্যিই কী ঈশ্বর চায়? ঈশ্বর নারী পুরুষ বানিয়েছেন এ কথা সত্য। এর থেকেও যে বড় সত্য নারী পুরুষ অভয়ই মানুষ। তাদেরকে মানুষ করে বানানো হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে সুন্দর সমৃদ্ধ একটা জীবন দিয়েছেন, মস্তিষ্ক দিয়েছেন। ভাবনা চিন্তার ক্ষমতা দিয়েছেন। তাহলে কেনো একজন নারী শুধু লাউ চিংড়ি, রুই ইলিশে আটকে থাকবে? কেনো একজন নারী চোখ মেলে দুনিয়া দেখবে না? তাহলে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘নারী’ এর দুইটা লাইনেই আটকে থাকবে কি নারী জাতি-

‘আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!’

না থাকবে না। রোকসানা রহমানদের মতো কবিদের কলম চলতে থাকলে সেই দিন আর থাকবে না। সেই জন্যেই হয়তো একই কবিতায় রোকসানা রহমানদের সাহজ জোগাতে, কলম চালাতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন-

‘সেদিন সুদূর নয়-
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাইবে নারীরও জয়।’

‘বসন্ত রেখে আসবো’ কবিতা গ্রন্থে কবি তার একাকীত্বকে বেশ ফুটিয়ে তুলেছেন। একাকীত্ব কবিকে পুড়িয়ে কবি বানায়। কবিতা লেখায়। একাকীত্বের মতো যন্ত্রণা কবিরা বারবার পেতে চায়। একাকীত্ব কবিকে ভাবিয়ে তোলে, জাগিয়ে তোলে। যেমনতা জাগিয়ে তুলেছিল কবি রোকসানা রহমানকে-

‘পঁচিশ বছর পর আবার ফিরে আসতে হলো
না পাবার বেদনার্ত আঁকাবাঁকা মেঠো পথের শেষে
মধুমতি নদীর পাশে হিজল গাছে মুখোমুখি বসে কত
অনুরাগের ফেলে যাওয়া কল্পতীরে।’

আমার জানা নেই, কতটা একা হলে কতটা একাকীত্ব গ্রাস করলে পঁচিশ বছর পর আবার কবি ফিরে আসতে পারে মধুমতি নদীর পাশে হিজল গাছের কাছে। তবে কবি ভালো আছে তার একাকীত্বে। যেটা আমরা জানতে পারবো ‘শাড়ির জমিনে ক্লান্তি ঝিমায়’ কবিতা পড়ে-

‘যে যৌবন তুষার প্লাবিত শাড়ির জমিনে
ক্লান্তি ঝিমায় কি নিবে, কি দিবে?
কিছুই নেই অবশিষ্ট।
ফিরে যাও, আমার আমিতে বেশ আছি
এই সুবিন্যাস্ত নীলিমার বুকে
সান্ধ্য সেঁজুতির মৌন প্রার্থনার
অলীক দর্পনে দেখি আর দেখি
মুগ্ধতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে আগামী জন্মান্তর…।’

‘বসন্ত রেখে আসবো’ কবি রোকসানা রহমানের প্রকাশিত নতুন কবিতার বইটির মনকাড়া প্রচ্ছদ এঁকেছেন আইয়ুব আল আমীন। পাঁচ ফর্মার এই বইটিতে মোট আশিটা কবিতা স্থান পেয়েছে। বইটির বাঁধাই উন্নত মানের। ভিতরের কাগজগুলোও বেশ মানসম্মত। দুইশত পঞ্চাশ টাকা প্রচ্ছদ মূল্যের এই বইটা কিনে পাঠক ঠকবে না। বইটা দীর্ঘ বছর সংগ্রহে রাখা যাবে। পুরো বইটার মধ্যে যে কবিতা পাঠক হিসেবে আমাকে আটকে রেখেছেন তা হলো- ‘চাঁদকে নিমন্ত্রণ’

‘সামন্ত- এই জন্য আমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছ।
এতটা দূরে ঠেলে দিলে এই দুঃসময়ে।
শ্রাবণী- আমি পালাতে চাইনি, এই ব্যাধি তোমার জীবন
দুর্বিষহ করে তুলুক তা আমি চাইনি, তোমার কাঁধে
বোঝা চাপাতে। এ কষ্ট তুমি বহন কর।’

নারী কখনোয় চায় না কারো বোঝা হয়ে বেঁচে থাকতে। শুধু চায় আলতো একটা ভালোবাসা তাকে ঘিরে রাখুক। প্রেমময় করে তুলুক একটি নারীর জীবন। পুরুষ কি তা পারে? পেরে উঠে? হয়তো সামন্তরা পারে। যদি না-ই পারতো তাহলে শ্রাবণীর এই দুঃসময়ে, এত কঠিন সময়ে তার পাশে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করতো না। পুরো কবিতাটা মন কেড়েছে। নারী আসলে একটা ভালোবাসার নাম। তবে এই কবিতায় কয়েকটা জায়গায় টাইপ মিস্টেকের কারনে বেশ বেমানান হয়ে উঠেছে। কয়েকটা জায়গায় শ্রাবণী বদলে শ্রাবণ টাইপ হয়েছে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একটা ঈ-কারের জন্য লিঙ্গ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বইটার প্রুফরিড অনেক ভালো হয়েছে। বইটার কবিতাগুলো পাঠককে টানবে বলে আমি আশাবাদী। বইটা রকমারি সহ বিভিন্ন অনলাইন বুকশপে পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

আড্ডাপত্রে লাইক দিন

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০