শেয়ার করুন:

মাগরিবের নামাজের পর কাঁথা গায়ে শুয়েছিল মনিরা। তার শরীর, মন বিশেষ ভালো না। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, কেমন শীত শীত করছিল। মিলির আব্বা আজ সঙ্গে ছাতা নিতে ভুলে গেছে। নির্ঘাত ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরবে। বৃষ্টি-বাদলায় কোথাও দাঁড়িয়ে যে দু'মিনিট অপেক্ষা করবে; তা না। কেমন যেন ইলিশ মাছের মতো স্বভাব মানুষটার। বৃষ্টির ফোঁটা দেখলেই উতলা হয়ে পড়ে। ভাবতে ভাবতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। গা থেকে কাঁথা সরিয়ে উঠে বসল মনিরা। বুকের আঁচল ঠিক করে টেনে  দরজা খুলে দ্যাখে, যা ভেবেছে ঠিক তাই। ভেজা গায়ে মিলির আব্বা দাঁড়িয়ে। মনিরা স্বামীর ভেজা মাথার দিকে চেয়ে কিছু বলে উঠবার আগেই সে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এইটা একটু ধরোতো আগে।’ তার হাতে মাঝারি সাইজের একটা ইলিশ মাছ, দেখে মনিরা অবাক! আজ কেবল মাসের আঠারো তারিখ। সকালে মনিরা পাঁচ’শ টাকার একটা নোট বের করে দেবার পর স্টিলের ড্রয়ারে মাত্র হাজার খানেক টাকা পড়ে আছে। ঘরে ডাল, চিনি, চাপাতা প্রায় শেষ। মাছটা হাতে নিয়ে মনিরা বলল, ‘শুধু মাছ আনলে যে, বাজারের যে ফর্দ দিয়েছিলাম ?

‘এক মাছেই নোটটা গিলে ফেলেছে, ওসব কামালের দোকান থেকে কাল বাকিতে আনা যাবে। সেদিন তুমি ইলিশ মাছের কথা বললে, ভাবলাম তোমার হয়ত খেতে মন চাইছে। এসময় যা মন চায়, খেতে হয়। নইলে বাচ্চার মুখ দিয়ে নাকি লোল পড়ে সবসময়।’

এ কথায় সচকিত হয়ে ওঠে মনিরা; ফিসফিস করে বলে, ‘আস্তে কথা বলো, ঘরে বড়ো বড়ো দুটো ছেলে মেয়ে আছে, মুখে কোনো লাগাম নেই! বয়সের সাথে সাথে তোমার রস যেন বাড়ছে দিনদিন। বুড়ো বয়সে ঝামেলা বাঁধিয়ে এখন আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে আহ্লাদ করা হচ্ছে। মিলি বুঝতে পারার পর থেকে আমার সাথে ভালো করে কথা বলে না। ’

মনিরার কথায় আজিজের হাসি খুশি মুখটা চুপসে যায় । মনিরা নরম গলায় বলে, ‘যাও, বাথরুমে গিয়ে ভেজা কাপড় বদলে নাও আগে। সিজন চেঞ্জের সময়, জ্বরজারি বাঁধিয়ে বসবে আবার।’

মাছটার ওজন আন্দাজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে যায় মনিরা। উপরে উপরে রাগ দেখালেও তার ভার ভার মনটা হঠাৎই হালকা হয়ে যায়। ইদানিং মনিরার ইচ্ছে-অনিচ্ছের কথা খুব মনে রাখে মানুষটা। সত্যিই মনিরার ঘুরেফিরে ইলিশ মাছের কথা মনে হচ্ছিল ক’দিন। গত পরশু রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। মনিরা কথায় কথায় বলেছিল, ‘বাজারে এ সময় খুব ইলিশ উঠছে না গো?’

 ‘হ্যাঁ, তা তো ওঠেই, কিন্তু এত দাম! আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে’ বলে নিজের অপারগতায় যেন লজ্জা পেল মানুষটা।

আগের দু’বার মনিরা ছিল শ্বশুরবাড়িতে। মিলির আব্বা মাসে দু’একবার যেত ফরিদপুর। বাড়িতে এত মানুষজন, আলাদা করে স্ত্রীর শখ আহ্লাদ পূরণ করার অবকাশ ছিল না। মাসুককে ঢাকায় ভালো স্কুলে পড়াতেই বছর দুয়েক আগে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় এসেছে তারা। মিলির আব্বা একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। সবমিলিয়ে বেতন পায় পঁচিশ হাজার টাকা। মহাখালি বাসস্ট্যান্ডের বিপরীত দিকে, নাখালপাড়ার প্রথম গলি দিয়ে ঢুকে মিনিট পাঁচেক হেঁটে বাঁ দিকের সরু গলি ধরে পশ্চিমে এগিয়ে গেলে খাল পাড়ের নীল রঙের চারতলা বিল্ডিং এর নীচতলায় দুই কামরার ভাড়াবাসা। টানা বারান্দার এক কোণে রান্নার ব্যবস্থা, আর এক কোণে বাথরুম। এর জন্যই মাসে দশ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়। প্রতিমাসে বাড়িতে পাঠাতে হয় হাজার তিনেক। বাকি টাকায় পুরো মাসের সংসার, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা!

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে এবার সেভেনে উঠল ছেলেটা। বাবার মতো ছেলেরও অংকে মাথা খুব ভালো। বরাবর পরীক্ষায় দশের মধ্যে প্লেস করে। মাসুকের আব্বার খুব ইচ্ছে ছেলে বুয়েটে পড়বে। মেয়েটা একদম মায়ের ব্রেন পেয়েছে, গতবছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় ইংরেজিতে ফেল করেছে । রেজাল্ট পাওয়ার পর মনিরা রাগের মাথায় একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিল মেয়ের গালে। সারাবছর ইংরেজি স্যারের কাছে ব্যাচে প্রাইভেট পড়িয়ে তবে লাভ কী হলো? পরের দিন সকালে মিলি উধাও। সারাটা দিন পাগলের মতো খোঁজাখুঁজির পর রাত এগারোটার দিকে খোঁজ মিলল মেয়ের। নাখালপাড়া মার্কেটে যে দোকান থেকে কসমেটিক্স কেনে মনিরা, সেই দোকানদারের সাথে পালিয়ে গেছে মিলি। মেয়েটা খুব সাজতে পছন্দ করে। বায়না করলে মনিরাই মাঝে মাঝে মেয়েকে নিয়ে যেত ঐ দোকানে। স্নো, পাউডার, লিপস্টিক নেইলপলিশ কিনে দিতে। দু’জনের হাবেভাবে মনিরার একটু সন্দেহও হয়েছিল। কিন্তু ঘটনা এতদূর গড়াবে ভাবতে পারেনি। একটু সাজগোজের পাগল মেয়ে, তাই বলে কসমেটিক্সের দোকানদারের সাথে প্রেম করে ভেগে যাবে! ঘটে যদি একটু বুদ্ধি থাকে মেয়েটার! ছেলের পরিবার নাখালপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা । মেয়েকে ফেরত আনার ইচ্ছে থাকলেও আইনি ঝামেলায় যাওয়ার সাহস হলো না মিলির আব্বার। খুব কষ্ট পেয়েছে মানুষটা, মেয়েটা ছিল তার দু’চোখের মণি। ছ’মাস মেয়ের নাম আর মুখে আনল না সে।

এবার রোজার ঈদের সপ্তাহ খানেক আগে হঠাৎ মিলি জামাই নিয়ে হাজির । এতদিন পরে মেয়েকে দেখে মনিরা আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। মেয়েটা শুকিয়ে একবারে কাঠি হয়ে গেছে। বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল মনিরা। জামাই দেখতে শুনতে নায়কের মতো হলে কী হবে? ভবঘুরে ছেলে, কোনোমতে উচ্চমাধ্যমিক উতরে গিয়ে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে কলেজের দিকে আর পা মাড়ায়নি। মন চাইলে বাপের কসমেটিক্সের দোকানে বসে, নয় সারাদিন বাইক নিয়ে টোটো ঘুরে বেড়ায়। নতুন জামাই ঈদে কিছু দিতে হয়। মনিরা মিলির আব্বাকে বলল, জামাইয়ের জন্য শার্টপ্যান্টের কাপড় কিনে এনে দিতে। মিলি ইনিয়ে বিনিয়ে মাকে ধরল, ‘কাপড়-চোপড় কিছু দিতে হবে না, জামাইকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিতে হবে।’

শেষে ঈদের দু’দিন আগে মিলির আব্বা বোনাসের পুরো টাকাটা দিয়ে জামাইকে আঠারো হাজার টাকায় একটা মোবাইল কিনে দিল। এবার প্রায় দু’সপ্তাহ হলো মিলি এসেছে। এসে বলল ‘শরীরটা কেমন যেন ভালো লাগছে না আম্মা! তাই ক’টা দিন তোমার কাছে থাকতে মন খুব চাইল।’

দু’দিন যাবার পর মনিরা টের পেল, মেয়ে তার অন্তঃসত্তা। কী সর্বনেশে কান্ড! মিলির বয়স সতেরো পার হয়নি এখনও। এই মেয়েকে নিয়ে কী যে করে মনিরা ! জামাই প্রথম ক’দিন ঘন ঘন এসে থাকল এখানে, ক’দিন হলো তার পাত্তা নেই। প্রতিদিন এসে থাকলেও অবশ্য অসুবিধে হয় খুব। দুই ঘরে দুইটা খাট। ও ঘরের বিছানায় মাশুক আর মিলি শুতো আগে, এঘরে তারা স্বামী স্ত্রী দু’জন। জামাই এলে মাশুককে এঘরে এসে শুতে হয়। অনেক রাত পর্যন্ত বাতি জ্বালিয়ে পড়ে ছেলেটা। ঘরে বাতি জ্বললে আবার ঘুমাতে পারে না মিলির আব্বা। সকাল সাতটার মধ্যে তাকে বেরিয়ে পড়তে হয়, বেশি রাত জাগলে সকালে উঠতে তার কষ্ট হয়ে যায়।

গতকাল থেকে মায়ের সাথে কথা বলছে না মিলি, ঘরে শুয়ে থাকে চুপচাপ। তার আবার ভাই বোন আসছে বুঝতে পেরে খুব ক্ষেপে গেছে। মনিরারও কী এ বয়সে বাচ্চা নেবার ইচ্ছে ছিল? মিলির আব্বার ইদানিং কী যে হয়েছে, দিন তারিখ মানতে চায় না। মানুষটা আগে এমন ছিল না। বয়স চল্লিশ পার হলে কি মানুষের ধৈর্য, সংযম কমে যায়? বিয়ের পর থেকে এত বছর তো তারা আলাদা আলাদাই থেকেছে। মাসে দু’বার কি তিনবার বাড়ি যেত সে। ক’দিনই বা কাছে পেয়েছে মনিরাকে। নাকি এতবছর পর স্ত্রীকে কাছে পেয়ে তার এতদিনকার সংযমের বাঁধ ভেসে গেছে? বিয়ের প্রায় কুড়ি বছর পর সত্যিকার অর্থে তাদের নিজেদের একটা সংসার হলো এতদিনে।

বিয়ের পর তিন বছর পার হয়ে যায়, মনিরার বাচ্চাকাচ্চা হবার কোনো লক্ষণ নেই। সাড়ে তিন বছর পর কতো সাধ্য সাধনার পর মিলি এল পেটে। মিলি হওয়ার পর বছর ঘুরতেই শাশুড়ি নাতির মুখ দেখতে পাগল হয়ে উঠলেন। তারপর চার বছর আর কোনো খবর নেই। খবর হবেই বা কী করে, মিলির আব্বা কী দিনক্ষণ মিলিয়ে বাড়ি যেত? কতো ঔষধপত্র, ঝাড়ফুঁক, গাছন্ত খেয়ে চার বছরের মাথায় মাশুক এল গর্ভে। ডাক্তার বলেছিল, মনিরার নাকি ফার্টিলিটি কম। এবার যে কী হলো, বুড়ো বয়সে মনিরার ফার্টিলিটি কি বেড়ে গেল হঠাৎ! মনিরার খুব পেট ব্যথা হচ্ছিল কিছুদিন। কিন্তু গর্ভধারণের কোনো লক্ষণই টের পায়নি। মাসিক হচ্ছিল নিয়মমতো। মনিরার অসহ্য ব্যথা দেখে গাইনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল মিলির আব্বা। ডাক্তার বলল, মনিরা কনসিভ করেছে। ছেলে মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে,  বাচ্চাটা রাখতে চায়নি মনিরা। ডাক্তারকে আপাকে বলেছিল, এ্যাবরশন করিয়ে ফেলতে চায়। চেক আপের পর ডাক্তার বলল, ছোট একটা টিউমার হয়েছে মনিরার জরায়ুতে। বাচ্চা ডেলিভারির সময় টিউমারটা বের করে ফেলা যাবে। আলাদা অপারেশনের দরকার হবে না।

বিষয়টা মেয়েকে বুঝিয়ে বলতে চাইল মনিরা, ‘টিউমারের কারণে ডাক্তারের পরামর্শেই বাচ্চাটা নিতে হলো।’ মিলি তার কোনো কথা শুনলই না। কেঁদেকেটে অস্থির। শ্বশুরবাড়িতে এখন সে মুখ দেখাবে কী করে? কাল থেকে ও ঘরে বিছানায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে মেয়ে।

হালকা হালকা বৃষ্টির ছাঁট আসছে, তার মধ্যেই বারান্দায় বটি ফেলে মাছ কাটতে বসল মনিরা। পদ্মাপাড়ের মানুষ তারা, ইলিশ চিনতে ভুল হয় না। মাছের পেটটা সরু, মাথাটা একটু ছোটখাটো, গোলগাল। মাছটার পেটে ডিমের ছড় পড়েছে কেবল। আকারে খুব বড়ো না হলেও স্বাদ হবে বোঝা যাচ্ছে। কাপড় বদলে লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি পরে মিলির ঘরে একবার উঁকি দিয়ে এসে মোড়া পেতে স্ত্রীর কাছাকাছি বসল আজিজুল। ‘মাছটা কেমন হবে মনে হচ্ছে?

‘ভালো, মনে হচ্ছে পদ্মার ইলিশ; কত নিল?’

‘চার‘শ আশি টাকা, আটশ গ্রামের একটু বেশি আছে।’

 ‘এতগুলো টাকা দিয়ে একটা মাছ আনলে, মাসের বাকি দিনগুলো কী করে চলবে?’

‘বছরে দু’একটা দিন খেতে হয়, সবসময় এত হিসেব করলে চলে? গাদা পেটি আলাদা কোরো না আজ। পুরোই থাক। ছেলে মেয়ে দুটো মন ভরে খাবে একটাদিন।’ কথাটা বলে আজিজ মনোযোগ দিয়ে মাছ কাটা দ্যাখে।

মাথা, লেজ আলাদা করে মেপে মেপে পাঁচটা পিস বের করল মনিরা। মোট চারজন মানুষ তারা, এক টুকরো বাড়তি থাক। মিলিটা যা খাচ্ছে, সব বমি করে ফেলে দিচ্ছে। যদি দুই টুকরো খেতে মন চায়, খাবে। মাথা আর লেজটা প্যাকেট করে তুলে রাখল ফ্রিজে। চাল কুমড়ো বা কচু দিয়ে রান্না করে আরেক বেলা বেশ চালিয়ে দেয়া যাবে।

‘সর্ষে দিয়ে রান্না করবে নাকি?’

‘তাই করি, মাশুক ভাজা পছন্দ করে ওকে এক টুকরো ভেজে দেই তাহলে।’

চুলা থেকে সর্ষে ইলিশের সাথে খিচুড়ি নামাতে ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। মনিরার এখন মাদুরে বসতে কষ্ট হয়, টুলে বসে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল। আজিজুল মেয়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে ঘর থেকে বের করে নিয়ে এল খেতে। শরীরের কী যে হাল হয়েছে মেয়েটার। দু’পাশে ছেলে মেয়েকে নিয়ে বসে আজিজুল মনিরার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমিও বসে পড়ো একসাথে।’

সবার পাতে মাছ উঠিয়ে দিতে দিতে মনিরা সায় দেয় ‘হ্যাঁ, বসছি’। নিজের প্লেটটা হাতে নিয়েছে কেবলই, দরজায় কড়া নড়ে উঠল। ‘এত রাতে আবার কে এল?’ আজিজুল চিন্তিত চোখে তাকায় মনিরার দিকে। ‘তোমরা খাও, আমি দেখছি ’ বলে প্লেট রেখে আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়াল মনিরা। বেশিক্ষণ বসলেই এখন কোমড়টা ধরে যায় তার।  দরজা খুলে উঁকি দিলো বাইরে, কলাপসিবল গেটের বাইরে সিঁড়িঘরের কমলা রঙের টিমটিমে আলোয় অন্ধকার ছায়া ফেলে বড়ো একটা ব্যাগ হাতে তার ননদ দাঁড়িয়ে, পেছনে তার সাত বছরের ছেলে।

‘আমি কিন্তু আর ফিরে যাব না ভাবি, এই বলে রাখছি।’ সালমা আঁচলে নাক চোখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল। কিছুদিন পরপরই তুচ্ছ সব কারণে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে বড়ো ভাইয়ের বাসায় চলে আসে সে। আজিজুলই ঘটকালি করে অফিসের জুনিয়র এক কলিগের সাথে বিয়ে দিয়েছিল তার একমাত্র ছোটো বোনের। বেশ ভদ্র, সভ্য জামাই।কিন্তু জামাই নিয়ে সালমার অভিযোগের শেষ নেই। ঘরে ঢুকে মেঝেতে ব্যাগটা ঠাস করে ফেলে বিছানায় পা উঠিয়ে বসে গুনগুনিয়ে কাঁদতে শুরু করল । আলিফ ঘুম ঘুম চোখে হাঁ করে চেয়ে আছে মায়ের দিকে। মনিরা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘খিদে পেয়েছে বাবা?’ উপর নীচ মাথা দোলায় আলিফ। মনিরা সালমাকে শান্ত করে, এ ঘরে নিয়ে এসে দু’জনকে খেতে বসালো। এক ফাঁকে আধপট চাল ধুয়ে দিয়ে এল চুলায়। সবার খেয়ে উঠে গেলে সর্ষে ইলিশের ঝোলে ভাত মাখে মনিরা। মাসখানেক হলো কোনোকিছু দিয়েই ভাত মুখে রুচে না তার। পাতে মাছ না থাকলেও বেশ কিছুদিন পর আজ ইলিসের ঘ্রাণ মেখে তৃপ্তি করে গরম গরম চারটে ভাত খেল  সে। তার কথা মনে করেই তো ইলিশটা কিনে এনেছিল মানুষটা।

 খেয়ে এসে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়েছিল আজিজুল। ঘরের ভিতর ভাদ্র মাসের গুমোট গরম। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে জানালার পাল্লাটা আর একটু ফাঁক করে খুলে দিল। বৃষ্টিটা ধরে এসেছিল। আবার শুরু হলো। বৃষ্টির ঝিরিঝিরি ছন্দের ফাঁকে ফাঁকে ও ঘর থেকে মনিরা, সালমার টুকরো টুকরো কথা, হাসির আওয়াজ ভেসে আসে। ইলিশ মাছ দেখে মনিরার মুখটা কী উজ্বল হয়ে উঠেছিল আজ, খেয়াল করেছে আজিজুল।

বই খাতা নিয়ে মাশুক ঢুকল ঘরে। কোনার টেবিলটাতে পড়তে বসে গেল চুপচাপ। মাশুককে নিয়ে মনিরাকে আজ মেঝেতে বিছানা করে শুতে হবে। আজিজুলের মনটা খারাপ হয়ে যায়। জানালা দিয়ে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি দেখতে দেখতে বিছানায় শুয়ে উশখুশ করতে থাকে আজিজুল।

Facebook Comments