শেয়ার করুন:

কীর্তনখোলা

আমাদের ছোট বাড়ি নদীটার ধারে,
পাখি ডাকে সারাদিন নারকেল ঝাড়ে।
গাঙচিল করে গান,
শুনে মন আনচান,
সুপোরির গাছগুলো দূরে অইপারে,
বাতাসের ঝাঁপটায় মাথা শুধু নাড়ে ।
নদীপারে বসে আমি হই মনভোলা,
ছুটে চলে ভরা নদী কীর্তনখোলা।

দুপুরের কড়া রোদ বড়ো কাঠফাটা,
ছুটে আসি নদীপারে, জুড়োয় কী গা-টা!
অই দূরে বালুচর,
জেলেদের কুড়েঘর,
বালুচরে দিনগুলো কাটে সাদামাটা,
জোয়ারের পালা শেষে ফিরে আসে ভাটা।
জেলে নায়ে ঢেউ এসে দিয়ে যায় দোলা,
ছুটে চলে ভরা নদী কীর্তনখোলা।

নীলাকাশে এঁকে দিয়ে মেঘেদের ছাপ,
নদীজলে বিষ্টিরা নামে টুপটাপ।
ঘোলা জলে ভেসে ভেসে,
ঢেউ কেটে অবশেষে,
সন্ধ্যায় আকাশের নিভে গেলে তাপ,
নদীপারে নাওগুলো ভেড়ে চুপচাপ।
ভোর হয়, নৌকোরা ছোটে পালতোলা,
ছুটে চলে ভরা নদী কীর্তনখোলা।

ছেলেবেলার বন্ধুরা সব

ছেলেবেলার বন্ধুরা সব কোথায় তোরা কোন সে দূরে?
আয় ফিরে আয়, তোদের নিয়ে পাড়ার মাঠে বেড়াই ঘুরে।
আয় না তোরা আবার খেলি তোদের সাথে বৈচি খেলা,
আয় না আবার ভরদুপুরে নদীর জলে ভাসাই ভেলা।
তোদের নিয়ে শীত সকালে আবার খাবো চিতই পিঠা,
বোশেখ মাসের মেলায় গিয়ে কিনবো আবার হাওয়াই মিঠা।
আনবো কিনে খেলনা গাড়ি, পাতার বাঁশি, মাটির ঘোড়া,
ছেলেবেলার বন্ধুরা সব, কোথায় তোরা, কোথায় তোরা?

নদীর ধারে শান্ত মাঠে ওইযে দূরে বটের ঝুরি,
সেখানটাতে আয়রে সবাই নীল আকাশে ওড়াই ঘুড়ি।
আয় না আবার শাপলা তুলি বিলের জলে নৌকো বেয়ে,
পুকুর জলে আয় না সবাই লাফিয়ে পড়ি গোত্তা খেয়ে।
মা যতোই বলুক আমায় ওরে বাঁদর, দুষ্ট পাজি,
তোদের নিয়ে আবার আমি ডুব সাঁতারে নামতে রাজি।
ভুলেই গেছি তোদের সাথে আম বাগানে গুলতি ছোড়া,
ছেলেবেলার বন্ধুরা সব, কোথায় তোরা, কোথায় তোরা?

দুপুর বেলায় যখন আমি ব্যস্ত ভূগোল, ধারাপাতে,
মুষলধারে বৃষ্টি হঠাৎ টিনের চালে খেলায় মাতে।
আয় না তখন নৌকো বানাই অঙ্ক খাতার পিষ্ঠা ছিঁড়ে,
নৌকোগুলো ভাসবে কেমন মেঘের জলে ধীরে ধীরে।
মেঘলা দিনে চুপি চুপি বন্ধ করে বইয়ের পাতা,
আয়রে ভিজি মাথায় দিয়ে কচু পাতার সবুজ ছাতা।
আয় না দেখি রঙধনুটা উঠলো কোথায় আকাশ জোড়া,
ছেলেবেলার বন্ধুরা সব, কোথায় তোরা, কোথায় তোরা?

বন্ধুরা সব আয় দেখে যা কেমন আছি, কোথায় আছি,
আমার ভীষণ ইচ্ছে করে যেতে তোদের কাছাকাছি।
যখন আমি বন্ধ ঘরে পড়ার ফাঁকে একলা থাকি,
মনের খাতায় তোদের নিয়ে হিজিবিজি ছবি আঁকি।
তোদের কাছে না বলা সব আমার অনেক কথা আছে,
মনের যত কথাগুলো বলবো খুলে তোদের কাছে।
বলবো আমার সুখের দুখের অনেক কথা হৃদয়খোঁড়া,
ছেলেবেলার বন্ধুরা সব, কোথায় তোরা, কোথায় তোরা?

আমাদের দাদুবাড়ি

ইস্কুল ছুটি হলে দল বেঁধে চলো সবে যাই বহুদূর,
চলো যাই চলো যাই আমাদের দাদুবাড়ি গুরুদাসপুর।

দাদুবাড়ি যেতে যেতে পথে পড়ে কী বিশাল চলনের বিল,
দুপুরের রোদ লেগে ছুটে চলা ঢেউ তার করে ঝিলমিল।
আমাদের দেখে তাই দল বেঁধে বেলেহাঁস করে শুধু খেলা,
একটানা ডেকে যায় আকাশের চিলগুলো দূরে ডানামেলা।
শ্যাওলার পাশ থেকে ডাহুকের ছানাদুটো দিয়ে যায় ডাক,
শাদা ডানা ঝাপটিয়ে ওইপারে উড়ে যায় সারসের ঝাঁক।
চলনের বিল থেকে বাতাসের ছোঁয়া লাগে কী যে ফুরফুর,
চলো যাই চলো যাই আমাদের দাদুবাড়ি গুরুদাসপুর।

গুরুদাসপুরে আছে ছোট এক বাঁকা নদী, নাম আতরাই,
আতরাই নদী তীরে সবে মিলে গান গেয়ে চলো হেঁটে যাই।
নদীটার একধারে যেইখানে আছে এক ধুধু বালিয়াড়ি,
বালিয়াড়ি পার হয়ে কিছুদূর এগোলেই ছোট এক বাড়ি।
এই সেই দাদুবাড়ি চারপাশে মুলিবাঁশে গড়া তার বেড়া,
বাড়িটা কী ছিমছাম অড়হড় গাছ দিয়ে একপাশ ঘেরা।
বাড়িটার ওইপাশে বাঁশবনে শোনা যায় ঝিঁঝিঁদের সুর,
চলো যাই চলো যাই আমাদের দাদুবাড়ি গুরুদাসপুর।

ভিনদেশী ছেলে

ওইতো দাঁড়িয়ে পাখনা ছড়ানো মস্ত হাওয়াই গাড়ি,
তোর ছেলে মাগো হাওয়াই গাড়িতে বহুদূর দেবে পাড়ি।
তোকে ছেড়ে আমি কোথায় যাচ্ছি, কোন দূরে, ভিনদেশে,
পাখিদের মতো আকাশের পারে উড়ে উড়ে ভেসে ভেসে।
ভিনদেশে নেই মায়ের আদর স্নেহের আঁচলে মাখা,
মাকে ছেড়ে আজ দূরদেশে যেতে বুক করে কীযে খাঁখাঁ!

ভিনদেশে গিয়ে তোর কাছে মাগো মন প্রাণ থাকে বাঁধা,
এখানে নেইতো ধবলীর দুধ, ঘন দই হিম সাদা।
আমি যদি সেই ভিনদেশে যাই মাগো তোকে একা ছেড়ে,
কে তবে এখানে শীতের সকালে ভাপা পিঠা দেবে বেড়ে?
তোর মতো মাগো মমতা ভরানো আদর মাখানো হাতে,
কে দেবে মাখিয়ে মাগুরের ঝোল গরম গরম ভাতে?

দূরদেশে গিয়ে মাগো তোর বুকে কি করে লুকোবো মাথা?
শীতশীত রাতে আমার শরীরে কে দেবে জড়িয়ে কাঁথা?
কাল বোশেখির দামাল বাতাস জানালায় দিলে টোকা-
বুকে টেনে নিয়ে বলেছিলি মাগো ‘ভয় পেয়েছিস খোকা’?
পরবাসে যদি তুষারের ঝড়ে কনকনে বায়ু বয়,
মা আমি তখন কার কাছে যাবো, ফের যদি পাই ভয়?

বিদায়ের বেলা আকাশে যখন মেঘ হয়ে আসে ভার,
হঠাৎ নামলে তুমুল বৃষ্টি, চারপাশ তোলপাড়।
জানি আমি জানি বৃষ্টির পানি মা তোর চোখের জল,
আদুরে ছেলেকে বিদায় জানাতে কাঁদছিস অবিরল।
দূর ভিনদেশ কাজের ছুতোয় আমাকে আটকে রাখে,
কাঁদিসনে মাগো আসবোই ফিরে কোনো এক বৈশাখে।

রজনীকান্ত লেন

ওই যে দেখেছ কেমন বিশাল পুরোনো একটা বাড়ি,
বাড়ির কিনারে দেয়ালের পাশে সুপারি গাছের সারি।
জানিনা বাড়ির কতোটা বয়স, বানিয়েছে এটি কারা?
খসে পড়ে তার ইটের গাঁথুনি, ধূসর পলেস্তারা।
বাড়িটা বানানো মোগল আমলে টকটকে লাল ইটে,
শুনেছি এ বাড়ি আমার দাদুর তিন পুরুষের ভিটে।
নিরিবিলি এই দোতলা বাড়িটা পাড়ার সকলে চেনে,
এই আমাদের পুরাতন বাড়ি, রজনীকান্ত লেনে।

তুমি যদি আসো এই বাড়িটিতে রাস্তার ওই মোড়ে,
বাড়িটার গেটে খুব সাবধানে টোকা দিও জোরে জোরে।
তোমাকে দেখলে আসবেই ছুটে আমার কুকুর লালু,
সারা গায়ে তার ঘন পশমেরা হয়ে থাকে আলুথালু।
এ বাড়িতে আছে একটা মোরগ, মোরগের নাম তিতি,
কাউকে দেখলে পায়না সে ভয়, নেই তার ভয়ভীতি।
তোমাকে দেখেই ছুটে আসবে সে, নিও তাকে কাছে টেনে,
এই আমাদের পুরাতন বাড়ি, রজনীকান্ত লেনে।

কাক বসে থাকে বাড়ির কিনারে বিজলি বাতির তারে,
দুপুরবেলায় কাকগুলো ডাকে একটানা বারে বারে।
দেখে যাও তুমি বাড়িটার ছাদে বানরেরা বসে আছে,
তোমাকে দেখেই ভেংচি কাটবে, দুহাতে ডাকবে কাছে।
একটা বাদুড় সুপারির ডালে, কেমন বাদুড়ঝোলা!
হালকা বাতাসে ডানে আর বামে আলগোছে খায় দোলা।
এরা আমাদের অনেক আপন, অবাক হয়েছো জেনে?
এই আমাদের পুরাতন বাড়ি, রজনীকান্ত লেনে।

আমাদের ছাদে হাস্নাহেনার ফুলগুলো ফোটে টবে,
রাত্তিরে তুমি ফুলের গন্ধে ভীষণ মাতাল হবে।
তুমি কি তখন জোছনার আলো মেখে নেবে সারা গায়ে?
ছাদের ওপরে বেড়াবে কি তুমি আনমনে খালি পায়ে?
তুমি যদি আসো,আমাদের বাড়ি ভাল লাগবেই জানি,
খেতে দেবো আমি বালুসাই আর মজার বাখরখানি।
এ বাড়িতে এলে হাওয়াই মিঠা তোমাকে খাওয়াবো এনে,
এই আমাদের পুরাতন বাড়ি, রজনীকান্ত লেনে।

Facebook Comments