শেয়ার করুন:

কত স্মৃতির ভিতর ধুলোর আস্তর জমে। একটু ফুঁ দিলে ভেসে ওঠে স্মৃতির পর্দায়। শার্সি টেনে  দেখা যায় ঝলমলে রোদের ভিতর হাসছে আনন্দ-বেদনার রোদবৃষ্টি। দুঃখ-কষ্টের জমানো ব্যথা। বেড়ে উঠবার টানটান ঘটনা। আবার মিষ্টি ফুলের সুবাসও আসে জানালার ফাঁক গলে। ড. সরকার আবদুল মান্নান নিজের জীবনের সেইসব গল্পই ধুলোর চাদর সরিয়ে পাঠকের সামনে হাজির করছেন। নিজের জীবনের সাথেও তো মিলে যায় কত কিছু!

১৯৬৪ সালের ২১শে জুলাই আমি জন্মগ্রহণ করি। জন্ম-তারিখের সত্যতা যাচাই করার কোনো উপায় এখন আর নেই। বাবা আবদুল হাকিম সরকার কৃষি ব্যাংকের একটি ডায়েরিতে সব ছেলে-মেয়ের জন্ম তারিখ ও দিনক্ষণ লিখে রেখেছিলেন। ১৯৮৭-৮৮ সালে মেঘনার ভাঙ্গনে ভিটেমাটি ছেড়ে আসার সময় ওই ডায়েরিটিও কোন সময় হারিয়ে যায় তা আর কেউ বলতে পারেনি। শত শত বছরের একটি পুরনো বাড়ি, পাকা মসজিদ, তিন-চারটি পুকুর, কয়েক বিঘা জমি নিয়ে বিশাল বাগান, শত শত বৃক্ষ এবং দশ-বারোটি ঘর দিনের মধ্যে নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যাওয়ার সময় কে মনে রাখে ওইসব ডায়েরিটি-ফাইরির কথা। তখন কেউই কারো দিকে তাকানোর সুযোগ পায়নি। কারণ সবারই তো বাড়ি-ঘর আছে এবং সবারই তো উদ্বাস্তু হওয়ার প্রাণান্তকর ব্যস্ততা। কে কার দিকে তাকায়! যেখানেই গিয়ে উঠুক না কেন মাথার উপর তো একটা ছাউনি থাকা দরকার। তাই প্রত্যেকেই ঘরের চালটা নৌকায় উঠাতে ব্যস্ত। আর একটু সময় পেলে দরজা-জানালা এবং ঘরের বেড়া। আর তৈজসপত্র, ধান-চাল, হাস-মুরগি, গরু-ছাগল নৌকায় উঠানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা। তারপর একটি ঘরে বছরের পর বছর প্রয়েজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কত জিনিস যে জমতে থাকে তার কি কোনো ইয়ত্তা থাকে! আমাদের গরু-ছাগল, হাস-মুরগি ছিল না। তাই কিছুটা হলেও বাঁচা গেছে। খা খা ভিটির উপর ও আশপাশের বিপুল আবর্জনার স্তুপের মধ্যে সেই মহামূল্যবান ডায়েরিটি পড়ে ছিল হয়তো, সে সময় তার খোঁজ নেওয়ার সময় পায়নি কেউই। শুধু ডায়েরিটি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধ যুগে সংগৃহিত প্রচুর বইপুস্তক, পত্রপত্রিকা, জার্নাল ওই আবর্জনার মধ্যে পড়েছিল শুনেছি। কিন্তু এ সবের কী  ‍মূল্য আছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষ করে যখন তারা সর্বস্ব হারানোর মধ্যে আছে।

চিত্র: নদীভাঙ্গন

অষ্টাশির ওই বন্যার সময় আমি ছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বন্যার কোনো এক সময় আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চে করে এখলাসপুর এসে বিস্মিত হয়েছিলাম। আজন্মের পরিচিত জনপদটি একেবারেই অপরিচিত মনে হচ্ছিল। কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কোনটি এখলাসপুর, কোনটি সানকিভাঙ্গ, কোনটি জহিরাবাদ এবং কোথায় গেল নাওভাঙ্গ এবং জয়পুর নামক গ্রামগুলো। শুধু বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে উদ্বাস্তু মানুষের সর্বস্ব হারানোর হাহাকার যেন বাতাসের শোঁশোঁ ধ্বনির মধ্যে প্রবাতি হচ্ছিল। লঞ্চ ইস্টেশনের লোকজন কেউই জানত না যে আমাদের পরিবারটি কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। দূর সম্পর্কের এক চাচা তার নৌকায় করে ভুল ঠিকানায় আমাকে নিয়ে গেল। শেষপর্যন্ত বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে তথ্যতালাশ নিয়ে আমার পরিবারটির খোঁজ পেলাম। সেখানে গিয়ে আমি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম তার পরিচয় অন্যত্র দেওয়া যাবে। শুধু এইটুকু বলি, ওই পরিস্থিতিতে ডায়েরি কিংবা বইপুস্তক কিংবা পত্রপত্রিকা ও জার্নালের খোঁজ নেওয়া খুবই বেমানান দেখাত।

আমার জন্মের সময় থেকে মা খুব অসুস্থ ছিলেন। আমি কখনোই মায়ের বুকের দুধ পান করতে পারিনি। আমাকে লালন-পালন করেছে বড় বোন মাহমুদা। তার ভাষ্য মতে, আমার জন্ম ১৯৬৪ সালের পৌষ মাসে। ৬৪ সালটা তার মনে আছে এই জন্য যে ওই সময় রায়ট হয়েছিল- হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। খুলনায় অনেক লোক মারা গিয়েছিল। তার মানে জুলাইয়ের ২১ তারিখ নয় নিশ্চয়ই।

আমাদের সময় জন্ম নিবন্ধন ছিল না। জন্মতারিখ লিখে রাখার কোনো প্রয়োজনও কেউ বোধ করত না। যারা স্কুলে যেত, পড়াশোনা করত, নাইনে উঠলে একটা সময় এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের রেজিস্ট্রেশন করতে হতো। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ বয়স হিসাব করে শিক্ষকগণ দু-এক মাস এদিক-সেদিক করে সব শিক্ষার্থীর জন্মতারিখ লিখে দিতেন। ফলে সত্যিকারের জন্মতারিখটা চিরতরে হারিয়ে যেত। আমার জন্মতারিখটার নিয়তিও ওই একই সূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। আর এই বাংলাদেশের মতো তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের একজন গ্রামীণ শিশুর জন্মতারিখ না থাকলে কিইবা আসে যায়!

শিশুর যত্নের জন্য মায়ের কোনো বিকল্প হতে পারে না। কেননা, মা ও সন্তানের সম্পর্কের বিষয়টি শুধু বস্তুগত নয়। এর সঙ্গে সন্তান ও মায়ের এতসব আত্মিক বন্ধন ও যোগাযোগের বিষয় জড়িত থাকে যে মানবীয় ভাষায় যার কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। জন্মের পর থেকে মায়ের সঙ্গে আমার এই সম্পর্ক তৈরি হয়নি। কিশোরী বড় বোনের যতের আমি বড় হয়েছি, কিন্তু আমার শারীরিক ও মানসিক পুষ্টি সাধিত হয়নি। বরং শারীরিকভাবে আমি চরম অপুষ্টিতে ভুগেছি এবং বিচিত্র রোগশোক ও অসুখবিসুখ আমার সঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। আমাকে সারাক্ষণ কোলে করে রাখতে রাখতে আমার বড় বোন মাহমুদার কাঁখে মাইছাতা পড়ে গিয়েছিল। এমন যখন অবস্থা তখন কে যেন বাবাকে পরামর্শ দেন যে, খৎনা করিয়ে দিলে অসুখবিসুখ চলে যেতে পারে। সুতরাং মাত্র চার বছর বয়সে আমাকে মুসলমানি করিয়ে দেওয়া হয়। আমার বড় ভাই শাহজাহান। সে শুধু আমারই বড় নয়, আমার বড় বোন তাহমিদারও বড়। সেই শাহজাহান এবং আমাকে একই সঙ্গে এবং বাড়ির আরও কয়েকজনকে খৎনা করানো হয়।

হাজম বাড়িতে আসার পরই চারদিকে রটে গেছে যে সরকার বাড়িতে মুসলমানি হবে। আমাদের ঘরে পান-তামাকের প্রচলন ছিল না। আমার বাবা দিনে বিশ থেকে পঁচিশ কাপ চা খেতেন। কিন্তু কখনোই পান-তামাক স্পর্শ করেননি। আমার মাও পান খেতেন না। ফলে হাজম ছোট কাকার ঘরে পান-তামক খেয়ে এবং বাঁশের চল্ডা বা নেইল বা বাকল সংগ্রহ করলেন।

উঠোনে শীতল পাটির উপর একটি জলচকি পাতা আছে। তার উপর প্রথম বসানো হলো আমাকে। দুই দিক থেকে দুইজন আমার দুই পা শক্ত করে ধরল। পিছন থেকে আমার চাচা আমার দুই হাত ও শরীরসমেত টাইট করে ধরল। দুই পায়ের মাঝে বসলেন হাজম। তাকে দেখতে আমাদের বাড়ির কারো মতো লাগছিল না। কাউটা বা বিটলে প্রকৃতির লোক মনে হচ্ছিল। বুকপকেট ওয়ালা পাঞ্জামির মতো নোংড়া সার্ট ছিল তার পরনে। কাঁধে গামছা। পরনে সাদা লুঙ্গি। তাও নোংড়া। কালো বর্ণের লোকটির গাল মুখের ভিতরে ঢুকে যাওয়া। দুই গালে রীতিমতো দুটি গর্ত। ছুড়ি চাকু কিছুই বের করলেন না হাজম। তিনি বের করল বাঁশের নেইল বা বাকল। একটি ছোট ও নতুন কুলার মধ্যে রাখা ছিল গামছা থেকে ছিড়ে আলাদা করা পরিষ্কার কাপড় আর মাটির চুলা থেকে সংগ্রহ করা পোড়া মাটি।

 

সবাই খুব বিস্মিত হয়েছিল। আমি একটুও ভয় পাচ্ছিলাম না। কাঁদছিলাম না। চিৎকার-চেচামিচি করছিলাম না। আমার কালো ও শুকনো মুখটা আরও একটু কালো ও বিকৃত করা ছাড়া আমি টু শব্দটি করার শক্তিও পাইনি। অযথাই আমাকে টাইট করে ধরে রাখা হয়েছিল। এই অবস্থা দেখে আমার কোনো এক চাচাতো বোন বলেছিল, “কালকুইট্টা ডাহাইত অইব। ভয়ডর কিচ্ছু নাই।” আমাকে ঘিরে গ্রামের এক কুড়ি লোক ভিড় করেছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের সংখ্যাই বেশি। হাজমের কিছু একটা দেখানোর বাওতাবাজিতে আমি যখন অন্য দিকে তাকিয়েছি, ঠিক সে সময় মুসলমানির কাজ শেষ। আমি খুব সামান্য ব্যথা পেয়েছিলাম। প্রচণ্ড ধারালো কিছু দিয়ে শরীর কাটলে যেমন টের পাওয়া যায় না, ঠিক তেমনি। চুলার পোড়ামাটি দিয়ে মুড়িয়ে আমাকে বিদায় করা হলো। হাজম বলল, “শাবাস বেটা”। কিন্তু শাহজাহান ভাই যে দৃশ্যের অবতারণা করেছিল তা কিছুতেই ভুলে যাওয়ার নয়। গরু জবাই করার সময় যে অবস্থার সৃষ্টি হয় শাহজাহান সে রকম পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ভীষণ ভয় আর প্রাণান্তকর চিৎকার ও প্রতিরোধ করা মিলেয়ে ও সত্যি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। আজও মনে আছে, আমাদের জন্য সেলাই ছাড়া লাল রঙের লুঙ্গি কেনা হয়েছিল। ওই লুঙ্গি পড়ে আমরা লুঙ্গির সামনে ধরে একটু কুজো হয়ে পা ফাঁক করে হাঁটতাম। শাহজাহান ভাই ও মানিক ভাইয়ের দেখদেখি আমিও ওরকম করে হাঁটতাম। আমার মনে হতো লুঙ্গি ধরে, কুজো হয়ে, পা ফাঁক করে হাঁটাই বুঝি রেওয়াজ। পরে শুনেছি ঘষা লাগা থেকে বাঁচার জন্য এই ব্যবস্থা। বড় বোন মাহমুদা এখনো বলে, ওই ঘটনার পর আমি নাকি সুস্থ হয়ে যাই।

কিন্তু আসলে আমি কখনোই স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলাম না। আমার খেলার সঙ্গী যারা ছিল ওদের সঙ্গে লেগে কখনোই আমি পারতাম না। বরং সবসময় আমি মার খেতাম এবং কাঁদতে কাঁদতে মার কাছে গিয়ে নালিশ দিতাম। অধিকাংশ সময় তাতে ফল বেশি সুবিধার হতো না। বরং হিতে বিপরীতই হতো। “পারছ না তয় লাগতে যাস কিলিগা” বলে মা উলটো আমাকেই দৌড়ানি দিতেন। এতে যে আমার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হতো, তা নয়। বরং বার বার মায়ের বকা খেতাম এবং মার কাছে গিয়ে নালিশ দিতাম। আমার পক্ষ হয়ে বড় বোন কখনো কখনো প্রতিপক্ষের লোকজনদের সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে দিত এবং ছোট বিষয়কে জটিল করে ফেলত।

অসুস্থতার কিছু দেহতত্ত্ব আছে। অসুস্থ মানুষের ভাবনা প্রখর হয়। নিজেকে রক্ষা করার ভেতরগত কিছু কৌশল তৈরি হয়। আমার মধ্যেও সে ধরনের কিছু কৌশল আপনা থেকেই তৈরি হয়েছিল। ফলে ধীরে ধীরে আমি সঙ্গীদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার ভেতরগত কিছু কৌশল আয়ত্ত করে ফেললাম এবং শান্তি  ‍পূর্ণ সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। এখন আর ওদের সঙ্গে গ্রামময় ঘুরে বেড়াতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। এক সময় দুরন্ত বালক-বালিকাদের প্রায় নেতৃস্থানীয় হয়ে উঠেছিলাম। অবশ্য এর পেছনে গায়ের জোর মুখ্য ছিল না- ছিল আমার ভালো-মন্দ বুদ্ধি।

                                                                                                                                                                চলবে
Facebook Comments