শেয়ার করুন:

ভূমিকা ও মূল হিন্দি থেকে অনুবাদ : স্বপন নাগ

কবি হূবনাথ পান্ডের জন্ম ভারতের বেনারস শহরে ১৯৬৫ সালের ১৩ই এপ্রিল। আধুনিক হিন্দি কবিতার জগতে হূবনাথ পান্ডে পরিচিত নাম। বহুলপঠিত তাঁর কবিতা। সামাজিক বৈষম্য, রাজনীতিকদের নীতিহীনতা, জাতপাতে দীর্ণ ভারতীয় সমাজ– প্রভৃতি তাঁর কবিতার বিষয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ ‘কৌয়ে’ ‘লোয়ার প‍্যারল’ ‘মিট্টী’ ‘অকাল’ । বর্তমানে কবি হূবনাথ পান্ডে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগে অধ্যাপনায় যুক্ত।

বাল্মীকি

কী জাত তোমার
বাল্মীকি?
জনতা জানতে চায়।

জাত ছাড়া এই দেশে
মূল্যায়ন করা হয় না
ঈশ্বরকেও,
আর এ জন্যেই
সব ঈশ্বরও
বেছে বেছে উঁচু জাতে জন্মেছে।
অছ্যুত হয়ে জন্মাবার হিম্মত
ঈশ্বরও দেখাতে পারেনি,
এমনকি
মেয়ে হয়ে জন্মানোরও
প্রবল অনীহা ঈশ্বরের।

তোমার রামায়ণে
বেশ ভালোই করেছো–
সবারই জাত ঠিক করা আছে!
রাক্ষসকে বানিয়েছো ব্রাহ্মণ,
তাতে রাক্ষসের কিছু যায় আসেনি,
ব্রাহ্মণেরও কিছু ক্ষতি হয়নি তেমন।

রাবণ, সে তো জাতে ছোট!
যে-দেশে ছোটজাত হলে
নিঃশ্বাস নেওয়াও দুষ্কর,
সেখানে প্রতি বছর দশেরায়
কুশপুতুল কম,
সশরীরে তাদেরই জ্বালানো হয় বেশি।

হাজার বছর ধরে
তুমি চেনা আমাদের শিরা-উপশিরায়।
তুমি আদি কবি
তুমি স্রষ্টা,
প্রতিষ্ঠিত ছিল তোমার সত্য–
কবির কোনো জাত হয় না।
সাধারণ লোকের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে
কবি হন অন্যকিছু, অন্যরকম।
তবুও তোমার জাত জানতে চেয়ে
পাপ করছি আমি ;
কেননা লোকেরা জিজ্ঞেস না করেই
নিজের নিজের সুবিধেমতো
ঠিক করে নিয়েছে তোমার জাত।
একটি অক্ষরও পড়ি আর না-ই পড়ি
সযত্নে গুছিয়ে রেখেছি
ব্যাস কালিদাস ভাসের জাত প্রমাণপত্র!
আর না পড়েও শুধু জাত আর বর্ণ দেখে
মূল্যায়ন করি তোমাদের, কবিদের।

তুমি কি জানো বাল্মীকি
অহল্যা আর ইন্দ্রের যে প্রেমকাহিনী
তুমি বর্ণনা করেছিলে,
তোমার পরবর্তী কবিরা তাকে বলেছিল পাপ ?
কারণ, অহল্যা ছিল উঁচু জাতের,
আর যতই প্রেমী হোক ইন্দ্র,
উঁচু জাতের বিবাহিতা মহিলার
অধিকারই ছিল না প্রেম নিবেদনের।

তোমার রাম ছিল মানুষ,
একজন মানুষের যে সব দোষত্রুটি থাকে
সেই সব নিয়ে একজন রক্তমাংসের মানুষ।
পরবর্তী ভক্ত কবির দল
রামকে ঈশ্বর বানিয়ে দিয়েছে–
বেজায় দুর্বল আর অসহায় এক ঈশ্বর।
এই ঈশ্বর পাপীদের হাতের খেলনা হয়ে উঠছে
আর তাই নিয়ে
খেলা শুরু করেছে ধান্দাবাজ রাজনীতি।
যে-রাজনীতির কোনো জাত হয় না,
জাত ছাড়া সেই রাজনীতি আজ অচল,
জাতই আজ পরিচয়!

জাতের প্রশ্ন আজ অস্তিত্বের প্রশ্ন বাল্মীকি,
ঘুণধরা কাঠের মত
মানুষেরও ভিতর আজ শূন্য, ফাঁপা।
জাতকে বাদ দিয়ে ওরা তাই
উঠতে পারে না, বসতে পারে না,
নিজে নিজে চলতে পারে না এক কদমও।

এই সব দেখে প্রশ্ন জাগলো মনে–
জিজ্ঞেস করেই দেখি তোমার জাত!
তোমাকে মূল্যায়ন করতে সুবিধে হবে হয়তো, তাই।

আমি জানি,
আমার এ পাপ
তুমি ক্ষমা করে দেবে।
তুমি তো পূর্বজ আমারই,
আর আমি
তোমারই নিতান্ত অযোগ্য বংশজ!

সুশাসন

টিকি বাঁধতে বাঁধতে
মহাপন্ডিত বললেন–
উৎকৃষ্ট শাসনের জন্য
প্রজাদের মধ্যে
কিছু না কিছু ভয় থাকা
অতি আবশ্যক।
প্রজা যদি নির্ভীক হয়ে ওঠে
রাজার কর্তব্য
এমন ভয় সৃষ্টি করার
যা সর্বকালীন, শাশ্বত
যা সহজেই মেনে নেওয়া যায়।
প্রজার বুদ্ধিমান হয়ে ওঠা
রাজার কাছে বড়ই বিপজ্জনক,
আর এ জন্যেই
প্রবল মূর্খতা অনিবার্য!
বুদ্ধিকে অপ্রাসঙ্গিক করে রাখতে
ভীষণই জরুরি
বিবেকহীনদের সম্মান করা;
বৌদ্ধিক জড়তা শেষ করে দেয়
ভাবনা আর বিবেককে।
এমনিতেই
শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে মহামূর্খও
নাজেহাল করতে পারে
মহামহিমকে।

অতিএব হে রাজন!
ভয় সৃজন করুন।
এমন ভয়–
যা টুকরো টুকরো করে
ভাগ করে দেবে প্রজাদের,
খন্ডিত প্রজাদেরই
ত্রস্ত হবার সম্ভাবনা বেশি।

ভীতু প্রজাদের খিদে থাকে না,
থাকে না পিপাসার আর্তি,
তারা তোয়াক্কাও করে না
জমি, চাষ এমনকি রোজগারেরও।
এমন প্রশ্নও করে না তারা
তারই জমিতে ফলানো আলু
বিক্রি করেছে যা
দু’টাকা কিলো দরে,
কেন বিক্রি হচ্ছে পঞ্চাশ টাকায়?

সব শেষে
বিদ্যান বিচারক
বললেন মধুর স্বরে–
‘ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ’
ধর্মকে রক্ষা করো,
ধর্ম তোমাকে রক্ষা করবে।

জমে উঠল ধর্মপ্রাণ রাজার কথা,
ধর্মেরই ছত্রছায়ায়
মিটে গেল সমস্ত সমস্যা!

রাজা
সুখে শান্তিতে
রাজ্য শাসন করতে লাগলেন।
তাঁর রাজ্যে মূর্খ আর ধার্মিকদের
কোনো কষ্টই থাকল না আর!

নববর্ষের শুভেচ্ছা

নববর্ষের শুভেচ্ছা তাদেরকে–
যাদের চাষের জমিতে
গড়ে উঠবে উন্নয়নের বিশাল মহল,
নদীকে পুকুর বানানো হবে,
হবে রিসর্ট, ওয়াটার পার্ক।
যাদের জমি, তাদেরই বাচ্চারা
ঝাড়ু লাগাবে গজিয়ে ওঠা হোটেলে,
মেয়েরা বিকোবে চড়া দামে,
জি.ডি.পি. ছোঁবে আকাশ …

নববর্ষের শুভেচ্ছা তাদেরকেও–
থার্টি ফার্স্টের রাত্রে যারা
ঠান্ডায় কুঁকড়ে বেচবে রঙিন বেলুন,
নোংরা নালা থেকে যারা কুড়োবে
বিয়ারের বোতল, রমের ক্যান,
ফুটপাতে শুয়ে থাকে যারা,
যারা মাঝরাতে চাপা পড়ে
দামী গাড়ির চাকায়
আর তারপরেও
বেঁচে থেকে যারা পায় ক্ষতিপূরণ…

নববর্ষের শুভেচ্ছা তাদেরকে–
ধর্ষণ করে মারা হয়েছে যাদের মেয়েদের,
বিচারের অপেক্ষায় পথ চেয়ে চেয়ে
দীর্ঘ অসুখে যাদের কেটে যায় জীবন,
যাদের সংসারে থার্টি ফার্স্ট
থমকে আছে ষাট বছর ধরে …

নববর্ষের শুভেচ্ছা তাদেরকেও–
দাঙ্গার ভয়ে যারা সিঁটিয়ে মারা যায় বন্যায়
কাজের খোঁজে
ভিনদেশী সন্দেহে মারা যায় যারা,
বিস্ফোরণে বাঁচলেও
মারা যায় যারা ভিড়ে–
মরার আগে
আর মরার পরেও
তাদের সবাইকে আমার
নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা!

Facebook Comments