কাজী জহিরুল ইসলাম আপাদমস্তক কবি। তিনি ঔপন্যাসিক, গল্পকার, অনুবাদক, ভ্রামণিক।প্রবাসে থেকে যে কয়জন কবি-লেখক মূলধারায় লেখালেখি করেন তিনি তাদের অন্যতম। ‘আড্ডাপত্র’ ওয়েবজিনে গত ১৫ জানুয়ারি ২০২১ “পুনর্পাঠ” বিভাগে প্রকাশ করা হয় প্রখ্যাত কবি অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত’র ‘কুটির’ কবিতাটি।কুটিরের আদলে কাজী জহিরুল ইসলাম নির্মাণ করেন আরেকটি মৌলিক কবিতা ‘জন্মগ্রাম’।তারই সাতকাহন তুলে ধরা হলো কবিতাটির সাথে। সেইসাথে প্রকাশ করা হলো ভারতের অন্যতম চিত্রশিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ এর আঁকা দুটি চিত্র।
–সম্পাদক।
‘জন্মগ্রাম’ কবিতার জন্মকথা
কাজী জহিরুল ইসলাম
কোনো কবিই নিজের কবিতার ব্যাখ্যা দিতে চান না কিন্তু কেউ কেউ কবিতার জন্মকথা লিখেছেন। একদিন এক আড্ডায় একজন ভক্ত কবি শহীদ কাদরীর কাছে তার সঙ্গতি কবিতার অর্থ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কবির কাছে কবিতার ব্যাখ্যা চাইতে নেই। আমাকেও তিনি একাধিকবার বলেছেন, কবিতার ব্যাখ্যা দিতে নেই। আমিও তাই মনে করি। কবিতো তার কবিতার মূল কথাটি লুকিয়ে রাখতেই পছন্দ করেন। তিনি চান পাঠক তা খুঁজে বের করুক। আধুনিক কবিতা মূলত কবি এবং পাঠকের মধ্যে লুকোচুরি খেলা।
তবে আমি আমার অনেক কবিতার পটভূমি ব্যাখ্যা করেছি। কেন এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে কবিতাটি লিখেছি তা পাঠকদের জানিয়েছি। কবি মনসুর আজিজ সম্পাদিত ওয়েবজিন ‘‘আড্ডাপত্র’’ প্রথম থেকেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বাংলা ভাষার প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতার একটি সংকলনের কাজ করে চলেছেন যেটি ‘‘আড্ডাপত্রে’’ প্রকাশ করছেন গ্রন্থের প্রচ্ছদ এবং অন্যান্য তথ্যসহ। এটি গ্রন্থাকারে বেরুবে বলে জানতে পেরেছি। এটি একটি উল্লেখযোগ্য কাজ বলে আমার মনে হয়েছে। কিছুদিন ধরে পূনর্পাঠ নামে তিনি ক্লাসিক সাহিত্য প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। এই সিরিজের লেখাগুলো আমি মন দিয়ে পড়ছি। আব্দুল গণি হাজারীর একটি কবিতা পড়ে আমি মন্তব্যে অনুরোধ করেছিলাম কাজটি যেন অব্যাহত রাখেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রকাশ করেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের বিখ্যাত কবিতা “কুটির”। ছেলেবেলায় এই কবিতাটি আমি পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি। অন্তরে গেঁথে ছিল কবিতাটি। আড্ডাপত্রে নতুন করে আবার যখন পাঠ করি, শৈশবের সেই অনুভূতিটি একটি জ্যান্ত বেড়ালের মতো লাফিয়ে পড়ে চৈতন্যের বিছানায়। কিছুতেই সে আমাকে ঘুমুতে দেয় না। বারবার মনে হচ্ছিল এইরকম একটি গ্রাম আমারও আছে, আমি কেন আমার সেই জন্মগ্রামের কথা লিখবো না। ঠিক এই ফর্মেই, মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ৮/৬, ৮/৬, ৮, ৮, ৮/৬, ৮/৬ ছয় পঙক্তির স্তবক নির্মাণ করে লিখতে থাকি। এক টানেই দশটি স্তবক লিখে ফেলি।
পার্সি বি শেলি বলেছেন, কবিতা হচ্ছে কবির স্বর্গীয় অনুভূতির প্রকাশ। কখনো কখনো সেই স্বর্গীয় অনুভূতি নির্মম ঘটনা দর্শন থেকেও হয়। মৈথুনরত ক্রৌঞ্চ-দম্পতিকে ব্যাধ শর নিক্ষেপ করেছিল, যা পুরুষ ক্রৌঞ্চকে আঘাত করে। ঘটনাটি নির্মম কিন্তু এই নির্মম দৃশ্য দেখেই মুনি বাল্মিকী লিখে ফেলেন উপমহাদেশের প্রথম কবিতা। যদিও সেটি ছিল অভিশাপ, ” মা নিষাদ প্রতীষ্ঠাং ত্বমগমঃ শ্বাশতী সমাঃ” কিন্তু সেই অভিশাপের স্লোক থেকেই জন্ম নিলো সুপ্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ। আমি নিজেও বিশ্বাস করি, চাইলেই কবিতা লেখা যায় না। ঘন্টার পর ঘন্টা কলম নিয়ে বসে থেকেছি, একটি পঙক্তিও আসেনি। আবার গাড়ি চালাতে চালাতে মাথার ভেতরে তৈরি হয়ে গেছে ২৫/৩০ লাইনের কবিতা। এমনও হয়েছে, যে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম শেষ পর্যন্ত সেই কবিতা আর হয়নি, হয়ে গেছে অন্য একটি কবিতা। কবি নিজেও প্রায়শই কবিতার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। আমি এক কবিতায় লিখেছি, “কবিতা আমাকে লিখে রাখে কালের খাতায়”। প্রকৃত অর্থে কবিতাই কবিকে লেখে, কবি কবিতাকে লেখে না।
আমি ” কুটির” এর মতো মায়াবী একটি কবিতা লিখতে চেয়েছি কিন্তু আমি জানি আমার চাওয়ার কোনো মূল্য নেই কবিতার কাছে। সে ধরা দিতে পারে, নাও দিতে পারে। শেষমেশ কবিতা আমার কাছে ধরা দিয়েছে বা বলা যায় আমাকে সে গ্রহন করেছে। করেছে এজন্য যে “কুটির” কবিতা পাঠ করে আমার স্বর্গীয় অনুভূতি প্রকৃত অর্থেই জেগে উঠেছিল।
কবিতাটি লেখার পর ছোট্ট একটি ভূমিকা দিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট করি। একজন কবিকে তার নিজের কবিতা লিখতে হয়। তবু মাঝে মাঝে প্রাচীন ফর্মে লিখতে প্রলুব্ধ হই এবং খুব ভয়ে ভয়ে লিখে ফেলি। আমি জানি সমালোচকেরা আমাকে ক্ষমা করবেন না। কিন্তু আমি এও জানি পাঠকের নির্মল ভালোবাসা আমি পাবো, এটিই আমার বড় শক্তি। এই কবিতাটি ফেইসবুকে পোস্ট করার সাথে সাথে পাঠকের বিপুল ভালোবাসা পেয়েছি। আড্ডাপত্রের সম্পাদক মনসুর আজিজ কবিতাটি ভূমিকাসহ আড্ডাপত্রে প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, এর সঙ্গে আমি নিজেই যেন একটি ছবি এঁকে দিই। নিজের আঁকার ওপর আমার কোনো আস্থা নেই। আমি মনসুরকে বলি, পশ্চিমবঙ্গের খুব প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদকে অনুরোধ করতে পারি ছবি এঁকে দেবার জন্য। তিনি এতে বেশ উৎসাহিত হন। শিল্পি সারফুদ্দিন আমার অনুরোধ রেখেছেন। তিনি দুটি ছবি পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন পছন্দ না হলে আরো এঁকে পাঠাবেন। আমি ছবি দুটি এবং “জন্মগ্রাম” কবিতাটির পটভূমি লিখে আড্ডাপত্রের সম্পাদককে পাঠালাম।
জন্মগ্রাম
উৎসর্গ: [অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত]
কুয়াশা-নেকাবে ঢাকা আম্মার মুখ
ঘরের রোয়াকে দাদী কাশে খুক খুক
বড় বুবু কাকভোরে
ঢুলুঢুলু ঘুম-ঘোরে
আঁতালের মুখ খুলে অবাক তাকায়
ছাড়া পেয়ে রাতা-নড়ি ডানা ঝাপ্টায়।
উঠানে হাঁসের ঝাঁক ডাকে প্যাঁকপ্যাঁক
আঁধার কুয়াশা ফুঁড়ে কে এসেছে দ্যাখ
আলপথে এঁকেবেকে
ভোররাতে লঞ্চ থেকে
নেমে এলো পায়ে হেঁটে বড় কাকাবাবু
শীতের দাপটে তার দেহখানি কাবু।
পূবের আকাশ থেকে চোখ মেলে নামে
ঢাকা ছিল লাল ভোর রাত্রির খামে
মেঠো গোপাটের পথে
কত কত দূর হতে
কুয়াশার জল কাদা দুই পায়ে মেখে
কালের কুটুম যায় পদছাপ রেখে।
উঠানের ধান খুঁটে খাচ্ছে শালিক
পুকুরে হাঁসের ঝাঁক দক্ষ নাবিক
দুই পায়ে দাঁড় টানে
টুনটুনিদের গানে
সুর তোলে হরিয়াল মগডালে বসে
সকাল মধুর হয় খেজুরের রসে।
শিমের মাচায় নাচে চড়ুইয়ের ঝাঁক
হাত থেকে ভাপা পিঠা কেড়ে নেয় কাক
শাদা গরুটির শিঙে
বসে আছে কালো ফিঙে
বিড়াল-কুকুর হাঁটে খুব চুপি চুপি
বাঁশঝাড় থেকে ডাকে জোড়া-তিলাঢুপি।
দেলুতি নদীর নাম বুঝি শোনো নাই
ছোটো নদী বয়ে চলে প্রেমে আইঢাঁই
বুক তার ছায়া ছায়া
এ-গাঁয়ের সব মায়া
বেদনা ও সুখ দুখ দেলুতির জলে
হাজার বছর ধরে ধীরে বয়ে চলে।
সন্ধ্যায় শাঁখ বাজে মিনারে আজান
মিলেমিশে শান্তির অনুসন্ধান
ভালোবাসা কী অসীম
হিন্দু ও মুসলিম
ভেদাভেদ নেই কোনো সকলে সমান
মাথার ওপরে নীল একই আসমান।
আঁকাবাঁকা মেঠো পথ সারা গাঁও জুড়ে
ছুটে গেছে দূর থেকে আরো বহু দূরে
সেই পথে চোখ রেখে
কার লাগি চেয়ে থেকে
জোহর, আসর শেষ, মাগরিবও পাড়?
এই বুঝি এলো কেউ ভালোবাসবার।
আম, জাম, লিচু, কলা, ঔষধি গাছ
ডোবা, নালা পুকুরের জল ভরা মাছ
হাজার গানের পাখি
দেলুতির কালো আঁখি
মাথার ওপর খাড়া ঘোড়ানিম, বট
যান্ত্রিক গাড়ি নেই, নেই যানজট।
জন্মের গাঁওখানি থেকে থেকে ডাকে
জীবনের সব পথ রাস্তার বাঁকে
সেই ডাক শুধু শুনি
স্বপ্নের বীজ বুনি
রোজ রাতে ঘরে ঘরে ভালোবাসা নামে
ফিরে যাবো আমি সেই জন্মের গ্রামে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১৫ জানুয়ারি ২০২১।