এপ্রিল, ১৯৭২, বরিশাল।
পৃথিবী তখন চাঁদ আর সূর্যের মাঝামাঝি। পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান চাঁদ। সন্ধ্যারাতেই সূর্যের আলো মেখে রূপালী হয়ে উঠেছে। মৃদু আলো ছড়িয়েছে চরাচরে। আম গাছের ডালে প্যাঁচা বড় বড় চোখ মেলে তাকায়। মাথা ঘোরালে শুনতে পায় ইঁদুরের দুসারি দাঁতের মাঝখানে শস্যদানা গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার শব্দ।
-তোমার জন্যই হয়তো বেঁচে আছি। অনুচ্চ কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলে মেয়েটা।
-আর আমি? আমারও কি বেঁচে থাকার কথা ছিল? মৃদু স্বরে বলে যুবক।
তখন নীরবতা। দক্ষিণ দিকের উঠানে দুজন দাঁড়িয়ে। আপাত শান্ত চুপচাপ দুটো মুখের ওপর চাঁদের আলো খেলছে। বাকি তিন দিকে ধানের জমি। উঠানের ওদিকে জংলা আর গাছগাছালি। আনত মুখ মেয়েটির। ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে সে আঁকিবুঁকি কাটছে উঠানের আলগা মাটির পরতে। ঢোঁক গিলল মেয়েটা। এক নাগাড়ে কথা বলে ওর গলা শুকিয়ে এসেছে। আরেকটা মুখ যুবকের। তার দৃষ্টি একটু দূরে গাছের ওপর স্থির। পাতার আড়ালে বসে থাকা হুতুমের ডাক শোনা যায়। যুবকের চোখ প্যাঁচার দেখা পায় না। মেয়েটা এবার তাকায় যুবকের দিকে।
-সেটাই। বরিশালে আসলে।
-হয়তো সব কথা শুনব বলেই ভাগ্য টেনে এনেছে।
-তোমার সেদিনের প্রশ্নের উত্তর আজকে দিতে চাই।
এক টুকরো মেঘ এসে চাঁদ ঢেকে দিলে সেই অন্ধকারে যুবকের মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যায় না। তবে এইটুকু বলা যায় যুবক নিশ্চুপ। মেয়েটার এমন একটি কথার পর, চেহারা শান্ত হলেও মনে হয় দুজনে উদ্বিগ্নতায় এলোমেলো। অসংখ্য কথা জমে আছে দুজনের। যুবক এখনো চুপচাপ। হতে পারে সে যা বলতে চায়, গুছিয়ে দুএকটি বাক্যে বলতে পারছে না। এমনও হতে পারে যুবকের এ ব্যাপারে আসলে কোনো বক্তব্যই নেই।
এক বছর আগে যুবকের প্রশ্নের উত্তরে বেশ কিছুক্ষণ এমনই নীরব ছিল মেয়েটি। এক বছরে বদলে গেছে জীবন। যেন সহস্র বছরের যাপন শেষে জীবন এই উঠানে একটু অবসর পেয়েছে। ততদিনে বদলে গেছে রাজনৈতিক মানচিত্র। পুর্ব পাকিস্তান এখন এক সদ্যজাত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। স্বাধীন দেশের বাতাসে এক সাথে শ্বাস নেয়ার কথা ওরা ভাবেনি। এই হঠাৎ দেখা হওয়াটাও অপ্রত্যাশিত। মনোরমা মাসীর বাড়িতে তখন ধুম আড্ডা। ওরা বাম রাজনীতির সাথে জড়িত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। মেয়েটিকে এখানে দেখে অবাক হয় যুবক। সেদিনের মতোই ওকে স্নিগ্ধ মনে হয়। উঠানে একটু হাওয়া বয়ে গেলে এপ্রিলের ভ্যাপসা গুমোট উড়ে যায়।
এপ্রিল, ১৯৭১, কুয়াকাটা।
যুবকের নাম সাইদ। বাম রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছে কয়েক বছর হলো। গণসঙ্গীত লেখে। দারুণ গান গাইতে পারে। মঞ্চ নাটক করে। গানে-নাটকে উদ্দীপ্ত করছে দেশের মানুষদের। রক্ত টগবগ করে ফুটছে বুলু, তোফাজ্জলের মতো উঠতি বয়সী ছেলেদের। প্রতিবাদী যুবকদের সংগঠিত করছেন মেজর জলিল। গড়ে তুলেছেন সংগ্রাম পরিষদ। বুলু’র বাড়িতে জরুরী আলোচনা শেষ করে আত্মঘাতী দল তৈরি করলেন। আট জন যুবক শপথ নিল। রক্তে তাদের প্রতিশোধের দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন। সাইদও যুক্ত হলো সুইসাইড স্কোয়াডে। এই দলের নেতৃত্ব দেবে আরেক যুবক নুরুল হুদা।
বরিশালে তখনও পাকিস্তান আর্মির অ্যাকশান শুরু হয়নি। স্থানীয় মানুষ ফুঁসে উঠছে বিক্ষোভে। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড। মেজর জলিলের নির্দেশে সাইদদের আত্মঘাতী গেরিলা দল অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় গোলাবারুদসহ তৈরি হলো। একটা জাহাজের কুয়াকাটা আসার কথা। সেখানে থাকবে গোলাবারুদ আর অস্ত্রসরঞ্জাম। সেই জাহাজের সাথে যোগাযোগ করে খবর আনবে ওরা। মেজর জলিল নিরাপত্তার জন্য গোপন ওদের আসল নামধাম গোপন রাখতে বলে দিলেন। এম ভি শাহারুন্নেছায় কুয়াকাটার দিকে ওরা রওনা হয়ে গেল। ঢাকা-বরিশাল নৌপথে এম ভি শাহারুন্নেছা সবচেয়ে আধুনিক আর দ্রুতগামী লঞ্চ।
পরিকল্পনা মতো নুরুল হুদা আস্তানা গেড়েছে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে। একতলা বাড়ির দেড় রুমে আট জন কোনো রকমে এঁটে গেছে। তখনও ঠিক সকাল হয়নি। মাত্রই জানলা খুলেছে সাইদ। ভোরের হাওয়া গরমকে সহনীয় করে ঠাণ্ডা ছড়িয়েছে। ঘরের সাথে লাগোয়া হরীতকী গাছটার পাতা কাঁপছে। গাছের তলা দিয়ে এদিকেই আসছে দুজন মানুষ। এই গরমেও চাদরে মাথা ঢাকা। আধফোটা আলোয় পা ফেলছে ক্ষিপ্রতায়।
ওরা মুক্তিযোদ্ধা। ঘরে ঢুকতেই দলের সবাই দুজনকে ঘিরে ধরল। কথাবার্তায় দুজনই বেশ সতর্ক কিন্তু চটপটে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা অনুভব করছে সবাই। জানা গেল, এপ্রিলের আট তারিখ সেই জাহাজ কুয়াকাটার ঘাটে ভিড়বে। কথা শেষ করেই বেরিয়ে গেল ওরা।
সেই কথা মতো জাহাজের খোঁজে সাইদরা এখন কুয়াকাটার উপকূলবর্তী এলাকায়। সতর্ক অবস্থানে আছে সাইদরা। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তেমন কোনো জাহাজের খবর পাওয়া গেল না। সাময়িক হতাশায় ওদের টান টান স্নায়ু শিথিল হয়ে এলো।
হাঁটতে হাঁটতে সিগারেট ধরিয়ে সাইদ বলে- এলাম যখন, চল আশপাশটা ঘুরে দেখি। দেশলাইয়ের নীলচে হয়ে আসা আগুন ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল সে।
-কিন্তু বেশি দূরে যাওয়া ঠিক হবে না। সাইদের কাছ থেকে জ্বলন্ত সিগারেট নিল কামাল। সিগারেটে আগুন ধরিয়ে ফিরিয়ে দিল। তামাকের গন্ধ ভরা বাতাসে তখন ধোঁয়ার রিং উড়ছে।
রোগীর বাঁ হাতের শিরায় স্যালাইনের সুঁই ঢুকিয়ে দিল সে। থার্মোমিটারের পারদ স্বাভাবিক তাপমাত্রা দেখায়। জ্বর সেরে গেছে। এবার স্যালাইনের স্বচ্ছ নল ঠিক করে দেয় সে। নল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানির বিন্দু ঝরে। একটা মেডিকেল টিমে নার্সের কাজ করে এই রাখাইন কন্যা। প্রিন্ছা খেঁ। আঠারো বছর ধরে নাফ নদীর জল আর হাওয়া মেখেই বেড়ে উঠেছে। আদিবাস টেকনাফ।
সত্তরের নভেম্বারের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস টেকনাফ থেকে ওকে এনে ঠেকিয়েছে এই কুয়াকাটায়। সেদিন সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। রাতে কী শোঁ শোঁ হাওয়া ছুটল। ঘূর্ণিঝড়ে বসত বাড়ির সাথে প্রিন্ছার বাবা-মাও ধুলো মেশানো হাওয়ায় হারিয়ে গেল। ঘরের ভেতর বানের জল ঢুকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ওকে। প্রথমে এলো এক বিশাল ঢেউ। খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল সে। ঢেউয়ে ফিরে যেতেই দেখল গায়ে একটা সুতোও নেই। প্রবল ঢেউয়ে শাড়ি সায়া খুলে ভেসে গেছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ে ঘর ভেঙ্গেচুরে ওকে কোথায় যে ভাসিয়ে নিয়ে গেল! মাথার ওপর খোলা আকাশ। ঘর-বাড়ির চিহ্ন দেখা যায় না। চারদিকে অথৈ জল। যতদূর চোখ যায় কোথাও কেউ নেই। এমন কি একটা মৃতদেহও প্রিন্ছার শূন্য চোখে ধরা পড়ে না। খুঁটি তখন হাতছাড়া। হাতের নাগালে ভেসে আসা একটা ঘরের চালা। সেটা ধরেই ভেসে রইল সে।
চোখ বুজেই চারপাশে অপরিচিত শব্দ শোনে প্রিন্ছা। কখনও হট্টগোল, কখনও কান্না। দূরে সেই শব্দ হারিয়ে যায়। অতলে ডুবে যায় সে। আবার ভাসতে থাকে নাফের প্লাবনে। তলিয়ে যায় পরক্ষণেই। এবার চোখ মেলে প্রিন্ছা। অচেনা জায়গা, অচেনা দৃশ্য। ডাক্তাররা ছুটোছুটি করে রোগী দেখছে। চারদিকে ব্যথার গোঙ্গানি আর কান্নার আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছে চারপাশ।
সেই প্রবল জলোচ্ছ্বাসে তিন দিন ধরে ভাসতে ভাসতে প্রিন্ছা চলে গিয়েছিল বঙ্গপোসাগরে। একটা উদ্ধারকারী জাহাজ ওকে দেখতে পেয়ে সাগর থেকে তুলে নেয়। নামিয়ে দেয় এই আশ্রয় কেন্দ্রে। প্রিন্ছা এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে বিছানা থেকে মাথা তুলতেই কষ্ট হতো। ফ্যাকাশে মুখে চোখ দুটো শুধু জ্বলজ্বল করত। সম্পূর্ণ সেরে উঠতে এক মাস সময় লেগে গেল এই আশ্রয় কেন্দ্রেই।
সহায় সম্বলহীন প্রিন্ছা এই মেডিকেল টিমের সাথে কাজ শুরু করল। নার্স হিসেবে যোগ দিয়ে দ্রুত কাজ শিখে নিল। জলোচ্ছ্বাসে আহত হাজার হাজার মানুষ। ডাক্তার-ওষুধ-পথ্যের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। সাধ্য মতো কাজ করতে লাগল প্রিন্ছা। টিমের জাপানী দম্পতির সাথে খুব ভাব হয়ে গেল ওর। আরও আছে এক ব্রিটিশ তরুণী। এই মেডিকেল টিমের সাথেই সে চলে এলো কুয়াকাটা।
বাইরে কথাবার্তা শোনা যায়। ভেতরে খকর-খকর কাশে রোগী। একটা বাচ্চা কেঁদে ওঠে। থার্মোমিটার পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে আসে প্রিন্ছা।
খানিকটা হেঁটে গিয়ে দেখে এক দল যুবক। যা বোঝার বুঝে নেয় সে। গোলাপি আপেলরঙা গালে টোল ফেলে বলে- আপনারা মুক্তিযোদ্ধা? ওর চোখে রাজ্যের বিস্ময়!
-সন্দেহ আছে নাকি?
-না। মানে… সলজ্জ হাসিতে বাকি কথাটুকু মিশে যায়।
-রাইফেল দেখলে বিশ্বাস করবেন তো?
-কি জানি? রাইফেলের দিকে তাকিয়ে এবার হেসে ফেলে প্রিন্ছা। বিশ্বাস? নাও তো করতে পারি।
-শুনলাম এদিকে একটা মেডিকেল টিম আছে। দেখতে চলে এলাম।
-খুব ভালো করেছেন।
-আমি সাইদ।
-আসেন আপনারা আমার সাথে।
দুপুরে মেডিকেল টিমই খাবারের ব্যবস্থা করল। আয়োজন সামান্য। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, ডাল, ভেটকি মাছ আর বেগুন ভাজা। খেতে খেতে গল্প করল সবাই। বিদেশীদের সমর্থন আর আতিথেয়তায় মুগ্ধ মুক্তিযোদ্ধারা। এদিকে মেডিকেল টিমের দুই সদস্য যুদ্ধে যেতে চায়। নুরুল হুদা ওদের নিরুৎসাহিত করে। প্ল্যান অনুযায়ী এখন আর কাউকে দলে নেয়ার সুযোগ নেই।
চার কোপে নিখুঁতভাবে একেকটা ডাব কাটছে প্রিন্ছা। প্রিন্ছাকে প্রথম দেখা থেকেই একটু অসুবিধা হচ্ছে সাইদের। অসুবিধাটার সাথে সে ঠিক পরিচিত নয়। সারাক্ষণ তার চোখ প্রিন্ছার দিকে। কোনো মেয়ের দিকে এভাবে সে কখনও তাকিয়ে থাকেনি। প্রিন্ছা ডাব এগিয়ে দিলে চমক ভাঙ্গল সাইদের।
-এখানে একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়, জানেন?
-হুঁ। অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দেয় সাইদ।
-এসব দেখার সময় আর সুযোগ তো আপনাদের হবে না।
-হুঁ। যেন কিছু শুনতে পায়নি সে। ডান হাত দিয়ে শার্টের বোতাম ডানে-বামে ঘোরায় সাইদ।
প্রিন্ছা ঘড়ি দেখে। সন্ধ্যা ৬টা বাজে। রোগীকে ওষুধ খাওয়ানোর সময় হয়েছে। সাইদের মন বিষণ্ণ। কাল দুপুরবেলা ওরা কুয়াকাটা থেকে বরিশাল চলে যাবে। ফেরার সময় হয়ে গেছে। বোতাম থেকে আঙুল সরায় সাইদ। পাশে রাখা রাইফেল হাতে তুলে নেয়। ইতস্তত করে বলেই ফেলে কথাটা।
-তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি প্রিন্ছা।
মুহূর্তেই প্রিন্ছা অপ্রস্তুত। ঠোঁটের ওপর লেগে থাকা হাসিটা সামান্য ম্লান হয়ে আসে। সাইদকে ওরও ভালো লেগেছে কিন্তু এভাবে বলা, এ সময়ে কেমন যেন লাগছে।
সাইদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করে- তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?
এ সময় বেনারসী আর গাঁদা-চন্দ্রমল্লিকার নয়। সে বোধ প্রিন্ছার আছে। রাইফেলের দিকে একবার তাকায় সে। বলে- ভালোবাসার বিপরীতে থাকে যুদ্ধ। সময়টা এমন, এখন যুদ্ধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
-যুদ্ধকে আমি অবহেলা করছি না।
কথার তীব্রতা অনুভব করতে পারে প্রিন্ছা। গভীরতাটুকুও। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকে সে। দীর্ঘশ্বাসে এক ফুসফুস হাওয়া ভরে নেয়। তারপর বলে- এই রাইফেল এখন তোমার সঙ্গী। যেদিন যুদ্ধ জয় করে ফিরবে, সেদিন উত্তর দেব। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকব।
-আর যদি ফিরে না আসি?
-দেখোই না কী হয়!
সাইদের দুটো ঠোঁট শক্ত হয়ে এঁটে থাকে। যেন লোহার চাড় দিয়ে ধাক্কা না দিলে ও দুটি ঠোঁট আর কখনও খুলবে না। মন খারাপ হয়ে যায় প্রিন্ছার। সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারে, সাইদকে ছাড়া আর কোনো পুরুষকে ভাবা ওর পক্ষে সম্ভব না।
মাথা তুললেই বালিশ থেকে গরম ভাপ বেরোয়। এমন ভ্যাপসা গরম। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে উঠে বসে প্রিন্ছা। ঘরের আলো জ্বালে। গরম নিঃশ্বাসে বোঝা যায় গায়ে বেশ জ্বর। তেতো মুখে ঢালা পানি গলা দিয়ে নেমে গেলে একটু আরাম লাগে। শাড়ি কেমন সোঁদা হয়ে আছে ঘামে। ভ্যাপসা গন্ধ ছড়াচ্ছে।
একটা ধোয়া শাড়ির ভাঁজ খোলে প্রিন্ছা। কোমরের বাম থেকে ডানে পেঁচিয়ে বাঁ কাঁধের ওপর থেকে আঁচলটুকু ঝুলিয়ে দেয়। হঠাৎ হাত আলগা হয়ে কুচি ফসকে যায়। তার মনে হয়- জীবনটাই হয়তো এভাবে ফসকে গেল। সাইদ কি বেঁচে থাকবে? বেঁচে থাকলেও কি ফিরবে? এত দূরে কোনো খবর পায় না প্রিন্ছা। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির নাগাল না পেয়ে ট্রানজিস্টার কোঁকায়। চিঠিপত্র আসে না উপকূলে।
নিঃশব্দে সে কাঁদে কিছুক্ষণ। আবার শুতে আসার সময় জানলা বন্ধ করে দেয়।
বন্ধ জানলার ওপাশে প্যাঁচা ডাকে। বুদ… বুদ… বুদুম… শব্দে চারপাশটা যেন আরও হয়ে গম্ভীর হয়ে ওঠে। প্যাঁচার মতিগতি দেখে মনে হয় ইঁদুর শিকারের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
জুলাই, ১৯৭১, বরিশাল।
খেপুপাড়া বাজারের ওদিকটায় এমন বনজ গন্ধ ভাসে হাওয়ায়। সুরেন বাবুর ঘরেও শিকড়-বাকড়, ছাল-বাকল আর পাতার বুনো ঘ্রাণ। আয়ুর্বেদ চিকিৎসা করেন সুরেন বাবু। এখন বসে আছেন বাজারে। সাধনা ঔষধালয়ের বেঞ্চির ওপর। রোগী নেই। রোগীরা এসে এই বেঞ্চিতে বসে।
রোদের তাপ তেমন কড়া না হলেও স্বেদবিন্দু জাগে সুরেন বাবুর নাকের ওপর আর বুকের শাদা পশমের ভেতর। যোগেশ চন্দ্র ঘোষ প্রায় বছর দশেক আগে সুরেন বাবুকে সাধনা ঔষধালয়ের স্থানীয় এজেন্সি দিয়েছেন। কবিরাজী করে রোজগারের প্রায় সবটুকুই সুরেন বাবু খরচ করেন সমাজ সেবায়।
কয়েক মাস হলো অনাথ এক মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছেন। এক মেডিকেল টিমে মেয়েটা নার্সের কাজ করত। যুদ্ধের তাড়া খেয়ে ছিটকে এসে পড়েছে। তিনি পিতৃস্নেহে ঠাঁই দিয়েছেন অসহায় মেয়েটিকে। তাড়া খাওয়া মেয়েটার চোখে অসহায়ত্ব নয়, অদ্ভুত এক আলোর ঝিলিক দেখেছেন তিনি। সে আলো বুদ্ধির আর ব্যক্তিত্বের।
আজ বিকেলেই বাড়ি ফিরলেন সুরেন বাবু। রোগী নেই। ডাক্তারের আর কী কাজ। শরীরটা ভালো নেই কদিন ধরে। পুরনো কাশিটাও বেড়েছে। ফেরার সময় হাতে করে দশমূলারিষ্টের একটা বোতল নিয়ে ফিরলেন।
শ্রাবণ মাসের সন্ধ্যা। চারপাশটা ঘিরে আছে গুমোট বাতাসহীনতা। দুএকদিনের মধ্যেই বৃষ্টি হবে। সুরেন বাবু আলমারির ভেতর টাকা গুছিয়ে রাখেন। রাত গভীর হলে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা আসবে। কিছু ওষুধপাতিও পুঁটলিতে সরিয়ে রাখেন। হঠাৎ ঘরের আলো কমে যায়। হারিকেন নিবু নিবু করে দিয়েছে প্রিন্ছা। হাতের বাটিতে আদা কুচি দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে এনেছে। ওর ধারণা সুরেন বাবুর পেট ফেঁপেছে। আদা কুচি খেলে একটু আরাম লাগবে।
হারিকেনের পাশে বাটি নামিয়ে রাখে প্রিন্ছা।
-বাবু, কেরোসিন শেষ।
-কেরোসিনের চালান নাই। বাজারে ধান নাই, চাল নাই।
-আর একদিন দিন যায় কি না যায়…
-সময়টা ভালো না রে, মা। মিলিটারিরা যে কোনো সময় হামলা চালাবে। আজ শুনলাম পাথরঘাটা থানা পর্যন্ত চলে আসছে।
-আমরা কই যাবো, বাবু?
-এতো বড় দুনিয়ায় যাওয়ার জায়গার অভাব? দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সুরেন বাবু।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার মামলার সবচেয়ে কম বয়সী আসামী ছিলেন তিনি। ইংরেজরা কয়েক মাস তাঁকে জেলে রেখে তারপর নির্বাসন দিয়েছিল এই উপকূল এলাকায়।
কিন্তু এমন দুর্দিন তিনি আগে দেখেন নাই। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে পাকহানাদার বাহিনী। গুলি করে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্বিচারে মানুষ মারছে। মেয়েদের দেখলেই তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কী ভয়াবহ দুর্যোগের সময় এখন। এই খেপুপাড়াতেই সুরেন বাবু স্থানীয় থানার নজরদারিতে ছিলেন বহু বছর। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পরও ফিরে গেলেন না। এখানেই থেকে গেলেন। এলাকার মাটি আর মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছেন। ওই কুমড়া ফুল, গাই-গরু, এই মানুষজন তার কাছে বড় আপন। কই আর যাবেন ওদের ছেড়ে?
কিন্তু চন্দ্রকলার হিসাবে এমনও তো হয়, যখন চাঁদ থাকে সূর্য আর পৃথিবীর মাঝামাঝি। সেই হিসাবে ঘোর অমাবস্যা। পৃথিবী থেকে তখন চাঁদ দেখা যায় না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উঠানে কারো ছায়া পড়ে না। শুধু ভারী বুটের শব্দ শোনা যায়। নিবু নিবু আলোয় শুধু দেখা যায় সুরেনের বুকের বিশাল গহ্বর থেকে রক্তের ধারা শরীর উপচে বেরিয়ে এসেছে। সেই রক্তে ভিজে গেছে প্রিন্ছার শাড়ি। নিজের বুক চেরা আর্তনাদ ওর কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। প্রিন্ছা কোনো শব্দ শুনতে পায় না। হতে পারে রাইফেলের ঠাঠা ঠাঠা শব্দে ওর কানে তালা লেগে গেছে।
দূরে কোথাও হাওয়ায় ডানা ভাসিয়ে প্যাঁচা নেমে আসে। মুহূর্তে ছোঁ মেরে ইঁদুরের ঘাড় কামড়ে ধরে। বাঁকানো ঠোঁটে আর নখে থ্যাঁতলানো ইঁদুর নিয়ে উড়ে যায়।
অক্টোবর, ১৯৭১, ঝালকাঠি।
পিচ্ছিল সরপুঁটির ঘাড় চেপে লেজে ছাই মাখায় সে। ধারালো বটিতে ঘচাঘচ মাছের পেট আর পটকা আলাদা করে ফেলে। আচমকা হাতের মাছ ফেলে দেয় সে। ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল চেপে ধরে। নাহ, কাটেনি, আরেকটু হলেই কেটে যেত। ইদানীং খুব আনমনা সে। আনমনে মাছ-সবজী কুটে, মাখা-মাখা ঝোলের তরকারী রাঁধে। লবন-হলুদ মেখে গরম তেলে মাছ ছাড়ে। অন্যমনস্ক হয়েই মেনির দিকে এক টুকরো ছুঁড়ে দেয়। লেজ নাড়িয়ে মেনি এসে মাছের ওপর জিভ বুলায়।
গাবখান খালের পাশে বাউকাঠি গ্রামে পাকিস্তানীদের ক্যাম্প। দুজন বাবুর্চি থাকলেও রান্নার মূল কাজটা এখন সে-ই করে। প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ জনের রান্না। তার হাতের রান্নার মহাভক্ত হয়ে উঠেছে মিলিটারিরা। ঝাল-ঝোল খেতে শিখেছে চেটেপুটে। কখনও শেখ মুজীব আর ইয়াহিয়ার কথা বললে কান খাড়া করে শোনে প্রিন্ছা।
শয্যায় এবং শয্যার বাইরে তার সান্নিধ্য উপভোগ করে সৈন্যরা। অবসরে রাইফেলে গুলি ঢোকানো, অস্ত্র খোলা-বন্ধ শেখায়। কত রকমের যে অস্ত্র। সব নাম শিখে ফেলেছে প্রিন্ছা। বাউকাঠি ক্যাম্পে সবার আপনজন সে। মিলিটারিদের পরম বিশ্বাসভাজন। তবু কেন যেন আনমনা হয়ে যায় সে। রাত হলেই শুয়োরদের ঘোঁত ঘোঁত শব্দ শুরু হয়। ঘন নিঃশ্বাসের হলকা বাড়ি দেয় ঘাড়ে-মুখে। গলার ভেতরকার আর্দ্রতা শুকিয়ে আসে। শাড়ি লেপটে থাকে চটচটে উরুর সাথে। সকালে চামড়ায় টান-ধরানো শাড়ি চড়চড় করে।
বিকেল বেলা উনুন ধরায় প্রিন্ছা। আলগোছে উনুনের মুখে পাঠখড়ি ঠেলে দেয়। ধোঁয়ার ঝাঁঝ নাকে মুখে পৌঁছলে মাথাটা ঝাঁকি খায়। মনে পড়ে বাবুলের সাথে দেখা করার কথা। বাবুল বাউকাঠির ছেলে। গরু চরায়, যত্নআত্তি করে আর ঘাস কাটে। এখন ক্যাম্পে লাকড়ির যোগান দেয়। প্রতিদিন সকালে গাছের গুঁড়ি বা শুকনা ডালপালা কেটে লাকড়ি দিয়ে যায়। প্রিন্ছা বাবুলকে বলেছে তেঁতুলগাছের লাকড়ি এনে দিতে। তেঁতুল গাছের লাকড়িতে আগুন বেশি হয়। জ্বলেও অনেক সময় ধরে।
খাল থেকে পানি আনার ছলে ক্যাম্প থেকে বের হয় প্রিন্ছা। পশ্চিমের আকাশটায় গাঢ় লাল রঙ ঢালতে শুরু করেছে সূর্য। সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে। খালের পাশে বাঁশঝাড়ে কিছুক্ষণ কথা বলে দুজন। তারপর দ্রুত হেঁটে দুদিকে চলে যায়।
খুলনা থেকে ঝালকাঠির পথে এই গাবখান খাল। অপ্রশস্ত হলেও খুলনা-বরিশালের জলপথের দূরত্ব কমিয়েছে। আসলে দূরুত্ব কমানোর জন্যই এই খাল কাটা হয়েছিল। যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ন রুট। বাউকাঠি ক্যাম্পের দায়িত্ব এই খাল পাহারা দেয়া। ভরা কলসী নিয়ে খালপাড় ধরে ক্যাম্পের দিকে হাঁটে প্রিন্ছা। পায়ে কাঁটা ফুটে গেলে চলার গতি সামান্য কমে। মিলিটারীদের কোনো রকম সন্দেহ হলেই বীভৎসতম মৃত্যু। হাঁটার গতি বাড়ায় সে।
পর দিন সকালে বিলাপ করে কান্নার আওয়াজ শোনে মিলিটারিরা। পেট ব্যথায় কাতর প্রিন্ছা। অবস্থা বেগতিক দেখে উশখুশ করে ক্যাম্পের অধিনায়ক সুবেদার। প্রিন্ছাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য ঝালকাঠি পাঠানোর কথা ভাবে।
কিছু পথ হেঁটে বাকীটা নৌকায় করে যেতে হয় ঝালকাঠি। কতক্ষণ লাগবে পৌঁছতে কে জানে? নৌকার ছইয়ে মাথা রেখে ঢেউ দেখে প্রিন্ছা। কচুরী পানা ঠেলে ঠেলে নৌকা আগায়। কর্তিকের সকালে পাতলা কুয়াশার পরত। চারদিক শুনশান। এই যুদ্ধের ভয়াবহতায় খেজুর গাছের বুকে যেন রস জমেনি। অগ্রহায়ণে কী হয় কে জানে? প্রিন্ছাকে পাহারা দিয়ে ঝালকাঠি নিয়ে এলো এক হাবিলদার, সিপাহি আর বাবুল। ডাক্তারখানায় পৌঁছতেই ওষুধের গন্ধ ঝাপট মারল প্রিন্ছার নাকে। গা গুলিয়ে উঠল প্রিন্ছার। ডাক্তার সাহেবকে দেখে সোজা হয়ে বসল সে।
-কোথায় সমস্যা?
-আমার বাচ্চা হবে।
এটা শুনে ডাক্তার সবাইকে ঘরের বাইরে যেতে বলে। ঘর ফাঁকা হলে প্রিন্ছা এক লাফে দাঁড়িয়ে যায়।
ঠাণ্ডা গলায় বলে- আমার পেটে কোনো বাচ্চা নেই। আপনি হাবিলদারকে বলে দেন আমি অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু এখন গর্ভপাত করানো যাবে না। সেজন্য আমাকে আরও কয়েকদিন আপনার কাছে আসতে হবে।
-অ্যাঁ! কী বলছেন আপনি?
-দেশের জন্য আপনাকে এই কাজটা করতে হবে। গলা কঠোর হয় প্রিন্ছার।
ডাক্তার সাহেব সম্মত হলে ক্যাম্পে ফিরে আসে প্রিন্ছা। প্রতিদিনের অভ্যস্ততায় কাজ করে যায়। কাটা-বাছা, রান্না, বাসন মাজা। এরপর পাহারা শিথিল হয়ে আসে। হাবিলদার আর সেপাই ছাড়াই প্রিন্ছা ডাক্তারের কাছে যায়। মিলিটারিদের কাছে এতটাই বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে সে।
সেদিন বিকেলেও বাবুর্চি দুজনের সাথে হাত লাগালো প্রিন্ছা। ধু ধু ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। ভাত, রুটি, রুই মাছ দিয়ে পটলের ঝোল রাঁধল সে। ভাজা আলু ঢেলে দিল মুরগির মাংসে। বাঁ হাতের তালুতে ঝোল নিয়ে জিভ ছোঁয়াল। লবন আর ঝাল ঠিক আছে। উনুন থেকে হাঁড়ি নামিয়ে ঢাকনি চাপা দিল।
প্রতিদিন রান্না শেষ হলেই খাবারের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। সব এক হাতেই সামলায় প্রিন্ছা। রান্নাঘরে বাবুর্চি দুজনকে ভাত খাইয়ে আসে। যত্ন করে ক্যাম্পের ৪২ জন সৈনিকদের খাবার পাতে তুলে দেয়। রাতে খাওয়ার পর সবার চোখের পাতা ভারি হয়ে জড়িয়ে আসে। কিছু ঠাহর করার আগেই অচেতন হয়ে যায় সৈনিকরা।
আসলে খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে প্রিন্ছা। এই বিষের যোগানদার ডাক্তার সাহেব। প্রিন্ছা তাঁর কাছে রঙ আর গন্ধহীন তীব্র বিষ চেয়েছিল। ওনার কাছে এমন বিষ ছিল না। কিন্তু অসাধ্য সাধন করলেন ডাক্তার। একটা দিন ঠিক করে বরিশাল সদর থেকে বিষ আনিয়ে দিলেন।
ঘর থেকে বের হলো প্রিন্ছা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাবুল হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে।
ফিসফিস করে প্রিন্ছা বলে- কাজ শেষ।
কথাটা শোনার পর বাবুল টের পায় ভয়ে ওর শিশ্নের মাথা দিয়ে কয়েক ফোঁটা প্রস্রাব বেরিয়ে গেল।
দুজন পথে নেমে যায়। বাঁশঝাড় থেকে খেঁকশিয়াল ডাকে। এইবার গ্রামবাসীর শিয়াল মারার মনমানসিকতা নেই। পথে ঘাটে কি খালে পুকুরে মানুষ মরে পড়ে আছে কুকুরবিড়ালের মতো। পথে কারো সাথে তাদের দেখা হয় না। বাউকাঠি গ্রামে ক্যাম্প হবার পর থেকেই সন্ধ্যার পর কেউ ঘর থেকে বের হয় না।
প্রিন্ছা আর বাবুল কোনো কথা বলে না। যেন ফিসফিস করে কথা বললেই হাওয়ায় ভেসে সেই শব্দ ক্যাম্পে চলে যাবে। মিলিটারিদের ঘুম ভাঙিয়ে দেবে। মস্ত শিমুল গাছটা বামে ফেলে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় ওরা। গন্তব্য নাজিরপুর।
ডিসেম্বর, ১৯৭১, ঢাকা।
প্রবারণা পূর্ণিমা ছাড়াও এবার আরও একটি দিন বিহারে প্রার্থনা করে রাখাইন কন্যা। দুটো হাতের করতল জুড়ে কপাল ছোঁয়। তারপর বুকের কাছে হাত জড়ো করে রাখে।
বৌদ্ধমন্দির তছনছ করে দিয়েছে মিলিটারিরা। তবু প্রার্থনার জন্য বিহার উন্মুক্ত। প্রদীপ জ্বালিয়ে বন্দনা পাঠ করে প্রিন্ছা। স্মৃতিকোলাজে কত যে ঘটনা ভেসে উঠছে। আনন্দ-বেদনার মিশেলে আচ্ছন্ন সে। দেশজুড়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই মহোৎসব যাপিত হচ্ছে। মুক্তির সূর্য ছিনিয়ে আনার এই তো মাহেন্দ্রক্ষণ। ক্যালেন্ডারের পাতা যাকে বলছে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১।
চূড়ান্ত বিজয়ের সে আনন্দক্ষণে চোখ বুজে প্রার্থনা করছে প্রিন্ছা। এদেশের মঙ্গলের জন্য। বিদেহী বাবা মায়ের জন্য। ওই তো পতাকা হাওয়ায় লিখছে বাংলাদেশের নাম। লাল সবুজ ব্যানার ফেস্টুনে সয়লাব চারদিক। খোলা জীপগাড়িগুলো হাওয়ার বেগে ছুটছে। জীপ বোঝাই মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র উঁচিয়ে শ্লোগান দিচ্ছে- জয় বাংলা! সমারোহে উল্লাসে প্রিন্ছা বোঝে বাঙালি কতটা আবেগপ্রবণ জাতি। তাই বলে ওর রাখাইন রক্তে আবেগ কিছু কম দেননি ঈশ্বর। মুক্তাঞ্চলের মাটি কপালে ছুঁইয়েছে প্রিন্ছা। বাঙালি-পাহাড়ি-আদি নৃগোষ্ঠীর মুক্তিপাগল মানুষদের মতো এই যুদ্ধ, এই উৎসব তারও।
নয় মাসের ভয়ানক যুদ্ধে প্রতি মুহূর্তের তীব্র উদ্বেগ আর আতঙ্ক সংবেদী করে তুলেছে প্রিন্ছাকে। আরেকটু টান লাগলেই যেন ছিঁড়ে যাবে ইস্পাতের মতো স্নায়ু। এবার সতর্ক স্নায়ুগুলো যেন একটু নিস্তেজ হতে চায়। হঠাৎ লতাপাতার ভেষজ গন্ধ ভেসে আসে। খুব চেনা এই গন্ধ। সুরেন বাবুর কথা ভেবে চোখ মোছে প্রিন্ছা। প্রার্থনা করে ওর বাবুর জন্য। মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে গড় করে।
বাউকাঠি থেকে নাজিরপুর গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দেয়ার কথা ছিল বাবুল আর প্রিন্ছার। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা আগেই বরিশাল চলে গেছে। নাজিরপুর থেকে লঞ্চে বরিশাল চলে এলো দুজন। বাবুল খবর আনল ৪২ জনের মধ্যে ১৪ জন পাকিস্তানী সৈন্য অচেতন অবস্থায় মারা গেছে। বাকিদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠানো হয়েছে। বরিশাল একদমই নিরাপদ না। প্রিন্ছাকে খুঁজছে মিলিটারিরা। বোরকা পরে লুকিয়ে লঞ্চ ঘাটে এলো সে। ঢাকা চলে যাবে।
বাবুলের সাথে অনেকদিন যোগাযোগহীন। ওকে সাথে নিয়েই নিজের মতো করে লড়াই করেছে প্রিন্ছা। আজ প্রিয় সাইদের জন্যও প্রার্থনা করে সে। ‘বহুজনের হিতায়া, বহুজনের সুখায়া।’ সাইদ বেঁচে আছে কি নেই, সে জানে না। শুধু মনে পড়ে, কারো হাতে নিজের হাত নয়, অস্ত্র তুলে দিয়েছিল সে। দেশের জন্য যুদ্ধ করতে বলেছিল।
বিজয়ের শুভক্ষণে নিজের শরীর বড় পবিত্র মনে হয় তার। এ দেহটাই মাতৃভূমি। বুটের লাথি খেয়েছে শরীরের জমিন। এই শরীরের ওপর দিয়ে ঘাতকের ট্যাঙ্ক চলে গেছে। এতে সে কিছু মাত্র অপবিত্র হয়নি। একাত্তরের বীরযোদ্ধা সে। সাহসে, বুদ্ধিমত্তায়, ক্ষিপ্রতায় পাকিস্তানী শত্রুদের হত্যা করেছে। পরাজিত করেছে। সে বিজয়ী।
প্রার্থনা শেষ হয়। এমন খুশির দিনেও ওর চোখ থেকে উষ্ণ পানি বেরিয়ে আসে। হয়তো ভুল করেই। তরলের যা ধর্ম, গড়িয়ে নেমে ভিজিয়ে দিল আপেলরঙা গাল আর চিবুক।
ঢাকায় মন বসে না আদিবাসী মেয়ের। জল আর জঙ্গলের জন্য মন কেমন করে। বরিশালে ফিরে গেল প্রিন্ছা।
#এপ্রিল, ১৯৭২, বরিশাল।
চাঁদ তবু পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরতে থাকে। পৃথিবীর আকাশে তাই চাঁদের ক্ষয় আর বেড়ে ওঠা। চাঁদের আকাশে যদি পৃথিবীকে দেখা যায় তবে সমস্ত হিসাব নিকাশ পালটে যায়। এতে অবশ্য চাঁদ-সূর্য-পৃথিবীর কিছুই আসে যায় না। কী নির্মোহ অবিরাম ঘুরপাক খায়। এদিকে বছর ঘুরে যায় আর রাত হাঁটে ভোরের দিকে।
-আমি যুদ্ধ করেছি, সাইদ। তোমার হাতে ছিল রিকয়েললেস রাইফেল। আমার অস্ত্র ছিল এই দেহ।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে প্রিন্ছা। যেন সাইদকে উদ্দেশ্য করে না, নিজেকেই জিজ্ঞেস করে- এখনও কি ভালোবাসো?
আম গাছ থেকে প্যাঁচার ডাক ভেসে আসে। চাঁদের ওপর থেকে মেঘের পরত সরে গেলে সাইদের চেহারা স্পষ্ট হয়। তখন অভিব্যক্তি বোঝা যায়। মোহাবিষ্ট হয়ে সে তাকিয়ে আছে প্রিয় নারীর দিকে।
-সাইদ!
ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে চাঁদের আলো। উঠানের ওপর দুজনের অবয়ব, জংলা, গাছগাছালী, এমন কি ধানী জমি পেরিয়ে যতদূর দেখা যায়, সমস্তই দূরে সরে যায়। ক্রমশ অস্পষ্ট দুটো মুখ মিশে যায় ভোর রাতের অন্ধকারে।
চারদিক শব্দহীন। উত্তরের অপেক্ষায় থাকা প্যাঁচার চোখ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে ততক্ষণে…