ফরিদ ভূঁইয়া প্রথম দশকের অন্যতম কবি। জন্ম ২৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে। পিতা মও. মোবারক হোসাইন ভূঁইয়া, মাতা জিনাতুন নাহার ।পাঁচ বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। জন্ম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামে। মাতুলালয়ে । পৈত্রিক ঠিকুজি মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বারাইশ গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ি। লেখালেখি প্রথম উম্মেষ ৭ম শ্রেণিতে অধ্যয়ন কালে। মূলত ১৯৯৫ থেকে কবিতা লেখায় যাত্রা শুরু। মাঝখানে বার কয়েক থেমে গিয়ে, দম নিয়ে নিয়ে আবার কবিতাতেই থিতু হয়েছেন। দেশের উল্লেখযোগ্য দৈনিক ও লিটলম্যাগে লিখে আসছেন দীর্ঘ দিন ধরে।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: অধিকারের অবাধ্যতায় (২০১৩); সমন্বিত উচ্চতায় সূর্য (২০১৮)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-মণ্ডল এর ঘাস-চাতালের আড্ডা থেকে এখন পর্যন্ত ম্যাজিক লণ্ঠন কবিতা আড্ডার সম্পাদক।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। স্ত্রী ফারজানা ইসলাম, দুই ছেলে ফাইয়াজ ও ফারদিনকে নিয়ে তার কবিতা সংসার। বর্তমানে একটি আবাসন নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় কর্মরত।
যুতসই শব্দের রঙ
যুতসই একটি শব্দের রঙ খুঁজে নিয়ে প্রিয়
বিধিসিদ্ধ উপমায় তোমাকে সাজাবো
ভাবতেই সংকট সময়ের চোখে
চশমার যোগ-বিযোগ মাত্রার ফোকাল গ্লাসের ফাঁকে
ঝলমল ভুবন বেগুনি-নীল রঙ মানে ঘন অন্ধকার
আর
শোকের নিশান কালো
প্রাত্যহিক প্রশান্তির আবির ছড়ায়
জন্মলগ্ন বিশ্বাসের সম্পর্ক সূচকে এভাবে প্রবল বিরোধ বাঁধায়
সংগত কারণে এই এখন এখানে
রক্তবর্ণ, ভালোবাসার না কোনো গোলাপ ফোটায়
রক্তে রক্তে শুধু বিরোধ বিগ্রহ দ্রোহ
অনিবার্য অসমাপ্ত সংগ্রামের …
বিপরীত সংবেদ
ভাবনার বিপরীতে যতো অলৌকিক সংবেদ
আলোড়িত করে, ঘৃণা করে আমার আমিকে !
তুলট তন্তুজ উড়ালি আবহে দিন কাটে
ঘোরের গৌতম।
সর্বসংসারে উড়াল পাখির ঠোঁট থেকে খসে
পড়া বীজে অচেনা ভ্রূণের বেড়ে ওঠা দেখে ছায়ার কল্পনা…।
রাস্তার পাশের কোনো পুরনো দেয়ালে ছাদে
বট রহস্য যদিও, সেই বাসনার বিপরীত।
কোনো মহীরুহ বটতলে বসে গৌতম ধ্যানীর অহিংস আরাধনা—
মূল-কাণ্ড হয়ে দেহের শাখায় প্রশাখায় শান্তিশীতল ছায়াবিস্তারে
একটি জীবন হোক
বাতাসের প্রণয় পাগল সবুজ পাতার।
তবু জেনো, টের পাই, বুঝে যাই আমি
স্বৈরি সূর্য মাঠে-ঘাটে প্রান্তরে প্রান্তরে
খরতাপে…
বিপরীতে বাতাসের কানে মৌনমন্ত্র
জাগিয়ে আমিই ডাকি মেঘ-বজ্র-ঝড় !
একটি অহিংস নিবেদন
কসম, কসম—
মননের ঐশ্বর্যমণ্ডিত কবিতার
মাত্রা জ্ঞানের কসম
অন্তরিক্ষের নিগূঢ় টানে ভীষণ বিমূঢ়— আমি;
হেরে যাই—
যুগ জিজ্ঞাসায় হারছে সবাই…
চেতনার মাঠে ঠক— ঠকাচ্ছে, ঠকছি— চুপি, বলছি নাতো কিছু
শোক দিবসের ভেজা চোখগুলো আজ
জিভের লোলুপ— দেখতে অসুর দেখায়;
নির্যাতন আর নির্মমতায়
হিংস্র প্রকাশ— কার আস্কারায় ;
হায়, দেশ হেরে যায়, দশ হেরে যায়…
বিপুল ভুলের কাল— জমেছে তোমার অধিকারে
আহা
তোমার সাধের বাগান লতায়
ধরছে, পাকছে শুধুই মাকাল…।
স্বাধীন দেশের মা মাতারি সন্তান হারায়—
গুম করে ক্ষোভ-ব্যাথাগুলো
খুব নীরবেই সব সহে যায়…
সেই সেই সেই অভিশাপ
তুমি কি বুঝতে পার, নাই বা পার
বলছি, কসম—
না বুঝলে তো, সেই অভিশাপ— দ্রোহের আগুন…
কোন আনন্দে পুড়বে তুমি— প্রস্তুতি নাও।
উষ্ণতার সাদা ছড়ি
সন্ধ্যা নামে; সচিত্র চাঁদ ও তারা ঝিলমিল
ভালোবাসার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম টেরাকোটা ফোটে ওঠে
তবু কারও কাছে রাতের মর্মার্থ পুড়ে যায় যায়
অমীমাংসিত চুম্বনে যেমন দু’ঠোঁট !
পাথুরে প্রত্যয় নিয়ে এগুনো যায় না
হৃদয়ে রঞ্জন
শিশিরে ভিজে যায় ঘাস
চাঁদ ও তারার দ্যুতিপত্র ছিন্ন চিরকুট পাঠে ব্যর্থ
কারওবা চোখে হয়তো নামলো তখন তুমুল অন্ধকার
তাতে কী ! হৃদয়ে যার সেঁটে থাকে মায়া
মখমল মায়া—উষ্ণতার সাদা ছড়ি
গন্তব্য দেখিয়ে দেয়—ফোটে ঘাসফুল !
প্রথম ছবক
দুনিয়ায় যাপন সফর শেষে
ফিরে যায় মুসাফির
ধর্মশালা শেখালো আমারে
আল্লাহু আকবার—নারায়ে তাকবির
যেতে যেতে পথে পথকলি ফোটে
স্মৃতি মধুময় কথা কয়
যেতে যেতে কতপথ
বিষাদবেদনা সম—কে বা কার হয়
দিনের হিসেবে আসে সূর্যের উদয়…
রাত আসে, অন্ধকার
কালের কালোর কোষে কোষে
চাঁদের ভাষায় জাগতিক অপার বিষ্ময়…
অনন্ত পথের প্রকৃতিতে পথিকের
মান ও হুশের শত গল্প ও কবিতা
মানুষ পাঠের ব্যর্থ সফরে পাঠক
দিগন্তের নীলিমায় খুঁজে ফেরে মুক্তির আরক…
যেতে যেতে পথে মনে কি পড়ে
ও মুসাফির, কী সেই প্রথম ছবক… ?
ইকরা বিস্মে রাব্বিকাল্লাজি খালাক… !
অধপাঃতের দিনগুলো
জ্ঞানের উদ্ধৃতি থেকে প্রাণের সম্প্রীতি
নেই নেই নেই সেই কোনো ভালো স্মৃতি
পুরো দেশ বেদনায়
চিন্তিত খণ্ডিত আহা বিখণ্ডিত আজ;
উন্নতির পথে-ঘাটে শুধু
দেখি পাথরের সমাচার সাজ;
তার পাশে দেখি পাতার আড়ালে দোলে
হাতের আঙুল ফুলে কত কলাগাছ !
বেহিসেবী ব্যয় দেখে
স্বপ্নগুলো বড় আলুথালু ;
তবু ছুরি হেনে ভাগ আর ভোগ করে—
বোঝে ভালোই কসাই কালু !
বিশ্ববিদ্যালয় অভয়ের করিডোরে
ঝিমিয়ে জাবর কাটে যারা
চেতনার শিঙমাথা তীক্ষ্ণ খাড়া
সাম্য, স্থিতি ও সুপ্রীতির দীক্ষায় নেই গুরু
আমাদের অধঃপাত বুঝি
এভাবেই হলো শুরু…
বুক দুরুদুরু … !
জাতিসংঘ : অক্ষমতার জাদুঘর
দিনের খবরে দিন, ঘামছে কপাল—
ইউয়ান ও ইয়েন বাজারেও আগুন আগুন;
লেগেছে গলন
ডলারের অগ্নিতীব্র তাপে;
ঈগলের নিশানায় ডানার কম্পনে
তন্ত্রসাধনায় মার খেতে বসেছে জামান…
আরব জাহান ক্ষত-বিক্ষত আগেই
কৃষ্ণ সাগর তীরেও সর্বগ্রাসী স্বার্থের ছোবল
ধিকিধিকি নিষ্ঠুরতা দিকে দিকে সুতীক্ষ্ণ আঁচড়ে
পারমাণবিক বিকিরণের প্রচ্ছদ আঁকে…
ডলার পোড়ানো আগুন উত্তাপে গলে গলে
ফতুর হওয়ার পথে সুগচ্ছিত হাতের টাকাও
পাশের এদেশ-ওদেশের রুপিয়া ও রুপি
রোগা-সোগা হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন পুষ্টির অভাবে
বিপণ্ণ সময়—মহা মারী আর যুদ্ধে
ডলার-রুবলে দেখি বেঁধেছে বড়াই
সপ্রতিভ সৌরভের গোলাপ এখন
মুঠোভরে ফুটে ওঠে গুরুতর স্বার্থের উল্লাসে…
মানবতাবাজিকর হারে তন্ত্রের বাজিতে
হারে মানুষের সভ্যসভা ঘরে
সংঘ হলে মানবিকঅক্ষমতার শেষ জাদুঘর
নিলামেও নেবে না কোনো ভাগ্যধর !
লাজুক শহর
পাহাড়ি আড়ালে এক লাজুক শহর
কল্পনায় জলপাই রঙের নহর
স্বাগতম সম্ভাষণ প্রবেশ তোরণ
এভাবে কোথাও পাই যান্ত্রিক গড়ন
তথাপি প্রকৃতি হলো এখানে প্রধান
পথগুলো উঁচু-নিচু বাঁকা-ব্যবধান !
পাহাড় চূড়ায় ওড়ে কোনো শঙখচিল
নিকট সমুদ্র দেখে নীল থেকে নীল;
নীলিমায় ভেসে ওঠে ভেঙে নিরবতা—
আউলিয়াদের চেরাগ, চাটিগাঁর কথা;
সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে বিপ্লবী বারতা—
এখানে ঘোষিত হলো প্রিয় স্বাধীনতা…
জলে ও ডাঙায় তবু দস্যুতা বহাল
পাহাড়ে পাহাড়ে দেখি মাটির কঙ্কাল;
যান্ত্রিক জৌলুস হয় ম্রিয়মান প্রায়
সবুজ আবার জাগে পাহাড়ের গায়;
পাহাড়কে মনে হয় সবুজ চারর
সবুজে অবুঝ পায় প্রাণের আদর !
রোধনচিহ্ন শ্রাবণের মাঠেঘাটে
মধ্যদুপুরে রোধনচিহ্ন মাঠেঘাটে
সুর্য যায় গলে গলে আপনা আহ্লাদে
পরমার হিংসুটে সুখ পেতেছে ছায়ায়
বটের পাতার সাথে কথা নেই বাতাসের
দূর মাঠে ঝিমধরা রোদের তাথই
মৌমাছির আছে সংবাদ পাঠের বিপুল
সংবেদন—
আপাতত শ্রাবণের কণ্ঠে উঠছে না বারিধারার সুমিষ্ট গান ঘনবরিষণ…
চোখ টাটিয়ে ঋতুর নিপল চুষে
হারমাদ মেঘ সবটুকু জলীয় নিমেষে নিয়ে চলে যাচ্ছে দূর
শালিকের দল কলঘাটে মিলেছে সমাবেশ ও মিছিলে
এক দফা এক দাবী—
কে জানি কে কখন যাবি
ভীষণ হট্টগোল… !
ক্রিস্টাল সরপুঁটি
ক্রিস্টাল—জলের সরপুঁটি
মেঘে মেঘ ঝরে পরে
খাল-নদী উৎরতে ডানায় অস্থির
উড়াল জোনাকি;
পেটের আলোয় কাটালেও রাত
অবাক দিনের ঠোঁটে ঢেউ ফেলে
লাফ দেয় মেঘে মেঘ—নাদুস নুদুস
হঠাৎ সফেদ—দাপুটে সে ক্রিস্টাল
জলের সরপুঁটি !