বর্তমান সমযে রেজাউদ্দিন স্টালিন বাংলা কবিতার জনপ্রিয় কবি। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলোতে অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা। স্টলিন এর কবিতায় প্রেম, মিথ ,বর্তমান ও বিশ্ব চরাচরের মানবিক ও সামাজিক সঙ্কট এবং সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণের তীব্র আকাঙ্খা দেখতে পাওয়া যায়।পড়ুন তার একগুচ্ছ কবিতা; আড্ডাপত্রে।
সাবানের পাঁচশো বছর
কোলাহলকে ফেনার বুদ্বুদে ডুবিয়ে দেয়া
স্তব্ধতাকে ধুয়ে সাফসুতরো করা
এবং বাতাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা জীবাণুকেও
বাসনকোসনের চেঁচামেচিতে ক্ষারের ফুঁ
শার্ট -প্যান্টের হাত -পায়ের মনোমালিন্যে চর্বির চুমু
মেয়েদের গোপন আলতো করে ছোঁয়া
এসব কাজে পারঙ্গমতা ইতিহাস বিদিত
অভিজ্ঞতার পাঁচশো বছর পূর্তি
নিমন্ত্রিত বিখ্যাত জীবাণুবিদ
ও ভাইরাস গবেষকগণ
কৃতিত্বের বর্ণনা:
দূষিত দানব নির্মূলের কাহিনী
অনুজ্জ্বলকে উজ্জ্বল করার গল্প
এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রভুর আদেশে
রক্তের দাগ ম্লান করে দেয়া
মুহুর্মুহু করতালি -কেঁপে ওঠে সভাকক্ষ
নতুন এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অধ্যবসায়
আত্মা পরিস্কার প্রকল্প
যা করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ
সাবানের পিতা-প্রপিতাগণ
কবির গল্প
কবি লিখলো ভোরের আকাশ
আর সাথে সাথে জানালায় গলা বাড়িয়ে দিলো সূর্য
লিখলো স্রোতস্বিনী নদী
শব্দের ভেতর থেকে বেরিয়ে
নদী ছুটলো সমুদ্রে
এলো রূপালি মাছের কথা
সাথে সাথে লাফিয়ে নদীতে
গিয়ে পড়লো
লিখলো যখন খাঁচায় বন্দি
পাখির দীর্ঘশ্বাস
অমনি খাঁচা খুলে গেলো
আর উড়াল দিলো সে
ঝাঁকড়াচুলো গাছের সৌন্দর্য তুলে ধরতেই-গাছ হেঁটে অরণ্যের দিকে
চলে গেলো
কতই না বিষ্ময়কর গল্প থাকে কবিতায়
চিরচেনা শৈশবের পথের কথা এলে
পথ সোজা নেমে গেলো দিগন্তে
কবি পথে নামলো
আর পিছু নিলো সন্দেহ
কবি লিখলো প্রতিবাদ
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো
জলকামান-টিয়ারগ্যাস
আর একদল রাষ্ট্ররক্ষী
ঘিরে ফেললো তাকে
ফেরা
আমি তাকে ছাড়ি সে আমাকে ধরে রাখে,
সব ঋতুতেই বসন্ত – বৈশাখে।
ফিরিয়ে নেবে সে নদী গাছ মাটি আর
হৃদয়ের যত অতৃপ্ত অঙ্গার।
চিহ্নবিহীন চলে যেতে হবে একা
অপরূপ যত মুখচ্ছবির দেখা-
মিলবে না আর,ডিভাইন কমেদিয়া-
কাঁদবে সেলফে- সুন্দর শারদীয়া।
অনায়াস যত জীবনের ভালোবাসা,
প্রকল্পভরা স্বপ্নের প্রত্যাশা,
ব্যর্থ প্রেমিক আর তার লোনাজল-
থমকে দাঁড়াবে মেঘদূত অঞ্চল।
নগরের যত বিদ্যুৎ গাড়ি -ঘোড়া,
পার্কের ঘাস নরনারী জোড়া জোড়া
থাকবে সে সব বিনোদন বিষ্ময়,
ফিরে গেলে নেই হারানোর কোনো ভয়।
স্পর্ধা
আরেকবার আমাকে দাঁড়াতে হয়েছিলো
সেই সত্যের মুখোমুখি
যেখান থেকে শুরু পারদের পৃথিবী
মানুষের হাড়গোড আর মজ্জা দিয়ে তৈরি
চোখের নুন আর জিহ্বার কান্না দিয়ে
কর্কট আর মকর ক্রান্তির অন্তিমে
দু:খের অনি:শেষ দরোজায়
না মাড়ানো সেই সব গহীন পথ
হৃদয়ের ফাঁক ফোকর
বাতি না জ্বালানো সন্ধ্যার তলদেশ
দেখা যায় না জীবন তা সন্ধিক্ষণে
আরেকবার আমাকে দাঁডাতে হয়েছিলো
নজিরবিহীন দু:খস্তূপের উপর
ভেঙে খান খান হয়ে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা
আর যেখান থেকে ফেরা যায় না
অরব রাত্রির উপর
হতাশার হিংস্রতায় আটকে যাওয়া পদক্ষেপ
শিকার লোলুপ নারকীয়তার মাঝখানে
রক্তচিহ্ন রেখে না যাওয়া তরবারির সামনে
নিকষ কালো বর্ণমালার মুখোমুখি
পাঠ করা যায় না যে সূর্যাস্ত
চিৎকারের প্রতিবিম্ব ঠাসা স্বপ্ন
জানালার দাঁত ভাঙা দৃষ্টির হাতুড়ি
কোনো দেয়াল আঁকড়ে থাকা লতাগুল্ম নয়
হাতের মধ্যে সহজ হয়ে যাওয়া
স্তনের অবাধ্যতা নয়
আকাশের উগরে দেয়া বজ্রের সামনে
আমাকে আরেকবার দাঁড়াতে হয়েছিলো
তুচ্ছ সব সাবধানবাণীর অট্টালিকা
রুটিমোড়া চুল্লির গনগনে শাসনের সামনে
সবুজ আর লালে তৈরি কালোর সংকেত
আর খড়গের এক কোপে বলি দেয়া প্রতিজ্ঞা
ডানা পালক নখ চিবুক আঙুলের
খণ্ড খণ্ড আর্তনাদের সামনে
আরেকবার আমাকে দাঁড়াতে হয়েছিলো
ভেঙে ফেলা সব উল্লম্ফন
ছুঁড়ে ফেলা কণ্ঠস্বর
টুকরো করা অনুভব
আত্মাসন্ধানী কণ্ঠনালীর পরিণাম
যুক্তির শিরোচ্ছদ খ্যাত বধ্যভূমি
আগ্নেয়াস্ত্র আড্ডা দেয়া সড়ক
অন্তহীন অভিযোগের শ্রোতা-সদা প্রভুর সামনে
আরেকবার দাঁড়াতে হয়েছিলো আমাকে
আমার অহংকার হাঁটু মুড়ে বসতে চেয়েছিলো
এবং মনুষ্যত্ব ক্ষমা প্রার্থনায় নত হতে
কোটি কোটি বছরের শ্রমে তৈরি পা
কি করে উবু হবে
হাজার বছরের ভালোবাসায় তৈরি
এই মনুষ্যত্ব কি করে নত হবে
বৈপরীত্য
তুমি জেগে থাকতে বললে বর্গির বিরুদ্ধে
আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম
যেতে বললে মঙ্গলে
আমরা অমঙ্গলে উড়ে বেড়াতে লাগলাম
দেখিয়ে দিলে রণাঙ্গন
পরিয়ে দিলে হিমালয়ের মুকুট
সব ছুঁড়ে ফেলে আমরা নন্দলাল হলাম
চিনিয়ে দিলে অমৃত
আমরা পাতাল সেঁচে নিয়ে বিষ নিয়ে এলাম
তুমি এনে দিলে স্বাধীনতা
আমরা প্রেমে পড়লাম পরাধীনতার
Facebook Comments