প্রত্যেক বড় কবিরই একাধিক উপাধি থাকে, কিন্তু সবার উপরে থাকে একটি স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত উপাধি, যা তার প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, আপামর জনতা কবিকে ওই উপাধিতেই বেশি চেনে, তা হয়ে দাঁড়ায় কবির শনাক্তযোগ্য বিশেষণ। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এ উপাধিটি হচ্ছে ‘বিদ্রোহী কবি’। যদিও নজরুল প্রচুর প্রেমের কবিতা লিখেছেন, বিদ্রোহের কবিতার চেয়ে ঢের বেশি, তবু নজরুল মানেই ‘বিদ্রোহী’, নজরুল মানেই শোষিতের-পক্ষ-নেয়া কবি। রবীন্দ্রনাথ যে অত বড় কবি, সেই তিনিও এই একটি জায়গায় সমালোচনার তীর সহ্য করেছেন। পরাধীন ভারতে সাধারণ মানুষ কবিদের দেখতে চেয়েছে স্বাধীনতার পক্ষে বজ্রকণ্ঠ, যারা ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, অমর-অজর কবিতা লিখে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করবেন। পরাধীন ভারতে মানুষ ছিলো শোষিত, লাঞ্চিত; নজরুল এই শোষিত, লাঞ্চিত মানুষের পক্ষেই কলম ধরেছেন। প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর পৃথিবী সেসময় দেখেছে প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশের উদ্ভব, সাম্যের বাণী ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর দেশে দেশে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্যের দীক্ষায় দীক্ষিত ছিলেন, তাই তাঁর কলমে শোষিত মেহনতি ও সর্বহারা মানুষের জয়গান, শোষকের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশিত।
পরাধীন ভারতে ব্রিটিশরাই ছিলো আপামর জনতার প্রধান শোষক, নজরুলের ঘৃণা তাই ব্রিটিশ রাজের প্রতিই সর্বাধিক। সেই ঘৃণার সবচেয়ে শিল্পিত রূপ দেখি তাঁর অমর কবিতা ‘বিদ্রোহী’-তে, যা বাংলা ভাষার, অনেকের মতেই, শ্রেষ্ঠ কবিতা। হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা জীবনানন্দ দাশের, সংখ্যার বিচারে, অধিকসংখ্যক উত্তীর্ণ কবিতা রয়েছে, কিন্তু ‘বিদ্রোহী’র মতো শিল্পশিখরছোঁয়া কবিতা বিরল। ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে নজরুলের এই শক্ত অবস্থান যেমন পরাধীন ভারতবাসীর মনে ছিলো আশা ও আস্থাসঞ্চয়ের স্থান, তেমনি উপনিবেশিক শাসকদের জন্য অস্বস্তি ও ক্রোধের। সেই ক্রোধের আগুনে নজরুলকেও পুড়তে হয়েছে, তাকে কারাগারের অন্ধকারে নিক্ষেপ করে ব্রিটিশ শাসকেরা। নজরুলের জীবনে সৃষ্টির কালটি বড় নয়, বড়জোর দশ বছর হবে, কিন্তু ওই ক্ষুদ্র সময়েই তিনি যে বিপুল, বিস্ময়কর রচনাসামগ্রী সৃষ্টি করেন- তা অভিভূত করে দেয় পাঠক ও গবেষকদের। জেলের ভেতরে বসেও তিনি নিরন্তর সৃষ্টিশীল ছিলেন, কবিতা ও গান লিখেছেন, রাজবন্দীদের নিয়ে গান গেয়েছেন। সেই প্রতিবাদউত্তাল, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময়ে তিনি লিখেন ‘কারার ঐ লোহ কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’ (অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত) ও ‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল’ (শিকল-পরার গান) এর মতো বঙ্গদেশ-কাঁপানো, ভারত-জাগানো গান, যাদের প্রাথমিক রূপ ছিলো কবিতা, পরে গীত হয়েছে সহ¯্রকণ্ঠে। কবিতাটির শুরুতেই নজরুলীয় ঝংকার,
এই শিকল-পরা ছল মোদের এ
শিকল-পরা ছল।
এই শিকল প’রেই শিকল তোদের
করবে রে বিকল ॥
‘শিকল-পরার গান’ কবিতাটি রূপকধর্মী, যেখানে শিকল-পরা হচ্ছে শিকল বিকল করার পদক্ষেপ মাত্র, বন্ধ কারায় বন্দী হওয়া হলো বন্দী-হবার-ভয় জয় করার মন্ত্র, সেখানে শিকল-বাঁধা পা হচ্ছে শিকল-ভাঙার কল। অনবদ্য পঙ্ক্তিখচিত এ কবিতা কেবল তার বক্তব্যেই অসামান্য নয়, শিল্পিতপ্রকাশেও সে অনন্য।
তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দী হ’তে নয়
ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়।
এ শিকল-বাঁধা পা নয় এ শিকল-ভাঙ্গা কল ॥
তখন বিশ্ব জুড়ে ব্রিটিশ রাজের দাপট, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য ডোবে না- এতটাই প্রকা- সে সাম্রাজ্য! ব্রিটিশরা তাদের বিভিন্ন উপনিবেশসমূহে বিদ্রোহ দমন করছে রক্তাক্ত উপায়ে, নৃশংস কায়দায়। তারই প্রেক্ষিতে অকুতোভয় নজরুল লিখেন নিচের ভয়-ভাঙানো পঙ্ক্তিমালা-
তোমরা বন্ধ ঘরের বন্ধনীতে
করছ বিশ্ব গ্রাস।
আর ত্রাস দেখিয়েই করবে ভাবছো
বিধির শক্তি হ্রাস ॥
বিধাতার বা প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করে কোনো প্রতাপশালী শাসকই কালের প্রবাহে টিঁকে থাকেনি, ব্রিটিশরাও থাকবে না।এরপরেই নজরুল যা লিখেন তা অনবদ্য। তিনি ব্রিটিশ শাসকদের তুলনা করেন ভয়-দেখানো ভূতের সাথে। ভূত ভয় দেখায় সত্যি, কিন্ত অশরীরি সে প্রেতাত্মার সাধ্য নয় শরীরের সাথে, জীবিতের সাথে লড়ে বিজয়ী হওয়ার। ভারতবাসীর বিজয়ের ব্যাপারে নজরুল তাই নিসংশয়।
সেই ভয়-দেখানো ভূতের মোরা করব সর্বনাশ
এবার আনবো মাভৈঃ-বিজয়-মন্ত্র বলহীনের বল ॥
নজরুল ব্রিটিশ শাসকদের উদ্দেশ্যে বলেন যে তারা ভয় দেখিয়েই শাসন করছে, জয় দেখিয়ে নয়। ভারতবাসীর মন তারা জয় করতে ব্যর্থ। এখন ভারতবাসীর প্রয়োজন ভয়ের টুঁটি টিপে ধরা আর তা করতে গিয়ে আত্মোৎসর্গের বিকল্প নেই, কেননা আত্মবলিদানের পথ ধরেই অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ভারতের স্বাধীনতা আসবে। নজরুল স্বচ্ছন্দে লিখেন,
তোমরা ভয় দেখিয়েই করছ শাসন,
জয় দেখিয়ে নয়।
সেই ভয়ের টুঁটি ধরব টিপে
করব পরে লয় ॥
মোরা আপনি ম’রে মরার দেশে আনব বরাভয়,
মোরা আপনি ম’রে মরার দেশে আনব বরাভয়,
দেশমাতৃকার চরণে আত্মোৎসর্গের এই প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গিয়ে উপরের পঙ্ক্তিটি নজরুল দু’বার লিখেন, ভারতের স্বাধীনতার মন্ত্রও যেন তিনি লিখে রাখেন এই পঙ্ক্তির ভেতর। পরাধীন জীবন তো মরার মতোই, সেখানে জীবন নেই, রয়েছে অপশাসনের, অনধিকারের, ঔদ্ধত্যের অন্ধকার। এর বিরুদ্ধেই কবির কলম ও সংগ্রাম।
অত্যন্ত ছন্দোময় এই কবিতার পরতে পরতে রয়েছে ছান্দসিক কবি নজরুলের শব্দ-ছন্দের মুন্সিয়ানা। দুর্দ্দান্ত সুরারোপে তা হয়ে উঠেছে শেকল-ছেঁড়ার এক কালজয়ী গান। কবিতার শিরোনামে নজরুল কবিতাটিকে গানই বলেছেন। গান হতে হলে কবিতাকে আপাদমস্তক ছন্দোবদ্ধ হতে হয়। এ কবিতা ছন্দের নান্দনিক প্রকাশের শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে আছে। অনুপ্রাসের এক বাগান যেন তা। নজরুল লিখেন,
ওরে ক্রন্দন নয় বন্ধন এই
শিকল-ঝঞ্ঝনা।
এ যে মুক্তি-পথের অগ্রদূতের
চরণ-বন্দনা!
এই লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হানছে লাঞ্ছনা,
মোদের অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল ॥
তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীকে বলেছেন `মুক্তি-পথের অগ্রদূত’। সেই তো নমস্য যে দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তির জন্য নিজের জীবনবাজি রাখে। তাই তার চরণ-বন্দনা করতে আহবান জানিয়েছেন দেশবাসীকে। কবিতাটির শেষ পঙ্ক্তিটি অসাধারণ। নজরুল লিখেছেন, স্বাধীনতা প্রত্যাশী মানুষের অস্থি দিয়েই দেশে বজ্রানল জ্বলবে। গোটা কবিতাটি বারুদভরা, এর পরতে পরতে উচ্চারিত মুক্তির আকাক্সক্ষা। কবিতা হিসেবে অনন্য, যে কারণে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’য় গ্রথিত নজরুলের তিনটি কবিতার একটি এই ‘শিকল-পরার গান’।
নজরুলের এই সাহসী, প্রতিবাদী ও সংগ্রামী ভূমিকা শিক্ষিত পাঠকের গ-ি ছাড়িয়ে তাঁর কবিখ্যাতিকে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের অন্দরে, নজরুল হয়ে উঠেছেন গণমানুষের কবি। নজরুল তাই এত শক্তিশালী, এত উচ্চারিত, এত প্রভাববিস্তারী। শিল্পবোদ্ধাদের যতই সংশয় থাকুক না কেন, বাংলা কবিতায় নজরুল সকল সংশয়ের ঊর্ধ্বে এক চিরস্মরণীয় নাম। তাই নজরুল চিরপ্রণম্য, চিরভাস্বর!