আজ কবি কামরুল হাসান এর জন্মদিন। কামরুল হাসান বহুপ্রজ কবি ও লেখক, ভ্রমণগদ্য লেখক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। লেখালেখিতে সতর্ক, সিরিয়াস ও কিছুটা আড়াল পছন্দ তার। আশির দশকের উজ্জল কবিদের একজন তিনি। ছাত্রজীবনে মেধাবী ছিলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মেধাতালিকায় স্থানলাভ করেছিলেন। পড়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে, আইআইটি খড়গপুরে অধ্যয়ন করেন এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে । পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ। কর্মজীবনের শুরুতে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ বিমানে, প্রকৌশল প্রশিক্ষক হিসেবে। এরপরে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেছেন প্রথমে প্রশিক্ষক ও পরে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক হিসেবে। থিতু হয়েছেন শিক্ষকতায়। পড়িয়েছেন দেশের বেশ ক’টি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ষোলো বছর ধরে অধ্যাপনা করছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে।
গত পঁচিশ বছরে প্রকাশিত হয়েছে ১২টি কাব্যগ্রন্থ। গত কয়েক বছর ধরে লিখছেন চতুর্পদী। কবিতার পাশাপাশি লিখছেন ছোটগল্প, প্রবন্ধ। অনুবাদও করছেন সমানতালে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় কলামগ্রন্থ ‘প্রহরের প্রস্তাবনা’। ভ্রমণপিপাসু কামরুল হাসানের প্রথম ভ্রমণকথা ‘বিলেতের দিনলিপি’। উজবেকিস্তান ভ্রমণের উপর লিখিত ‘আমির তিমুরের দেশে’ বের হয় ২০১৮ সালে। অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের উপর লেখেন ‘মহাদেশের মতো এক দেশে’ এবং ভারত ভ্রমণের উপর লিখেছেন ‘সিমলা মানালির পথে’। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : সহস্র কোকিলের গ্রীবা (১৯৯১); প্রান্তসীমা অনন্তদূর (১৯৯২); ছুঁলে বিদ্যুল্লতা, না ছুঁলে পাথর (১৯৯৩); পাখি নই আশ্চর্য মানুষ (১৯৯৪); দশদিকে উৎসব (১৯৯৭); বৃক্ষদের শোভা দেখে যাব (২০০০); রূপচৈত্রের অরণ্যটিলায় (২০০৪); পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি আমার গ্রামে (২০০৭); ঈশ্বরের নিজ গ্রহ (২০০৯); ঘুমপ্রহরের মোমকূহক (২০১০); নির্বাচিত কবিতা (২০১২); খিলানের নিচে আলো (২০১৪); সহস্র চরণের ধ্বনি (২০১৬); বাছাই ১০০ কবিতা (২০১৭); ছোটগল্প : মধ্যবিত্ত বারান্দা ও অন্যান্য গল্প (২০০৫)। প্রবন্ধ : প্রহরের প্রস্তাবনা (২০১৫)। ভ্রমণকাহিনী : বিলেতের দিনলিপি (২০১৭); আমির তিমুরের দেশে (২০১৮); মহাদেশের মতো এক দেশে (২০১৯); সিমলা মানালির পথে (২০২০)। অনুবাদ : Poems of Mujib Erom (2014); The Blind God (2020); সম্পাদনা : Postmodern Bangla Poetry 2003 (2003); (with Tushar Gayen and Samir Roychowdhury).আড্ডাপত্রে আজ প্রকাশিত হলো বহুমাত্রিক লেখক ও কবি কামরুল হাসান এর চারটি কবিতা। পাঠের আমন্ত্রণ।
দাম্পত্য
তুমি কি সঙ্গে ছিলে, মৈনাক চূড়ায় কবে গিয়েছি একা,
সমুদ্র কল্লোলের পাশে সে অবয়ব অন্তরঙ্গ চেনা
ঢেউয়ের ফ্রীজশট, এলোচুলে বর্ণায়িত হাওয়া
অশোকবনে নিপাখি পালকের তাপে পুড়েছিল?
বর্ষণ ফুল্ল রাতে বিপন্ন কেঁদেছিল রাধা
তোমারই ভেতর সখী অন্যতর স্বাদ ভালবেসে
বুকের বিদ্যুৎ হতে মেঘদের আলোকিত স্বরে
যুদ্ধ যুদ্ধ সাজ আকাশের ভেতর ভঙ্গিমা
বসন্ত গ্রীবার নীচে তুমি বুঝি বৈশাখের দুরন্ত উড়াল?
নতমুখী, দয়ার্দ্র ভূমির কাছে অতিতর সহসা দাঁড়াল
প্রিয় দেহ, অসহ পর্বত মালা, স্মৃতিময় জল
পাথর খণ্ডের কানে, তুমি তার খুব চেনা, তুমি তার সখী।
শয্যায় তোমাকে লাগে অন্য কেউ, অনন্ত অচেনা।
আত্মজা দূরবাসী দ্বীপ
নবীন দর্পণে থির ভাঙ্গামুখ বয়সী ডাহুক
এ দর্পণ দর্পিতের জানুসন্ধি হুবহু চিবুক
বাহুলতা, তুমি দেখি লুপ্ত মায়েরই নকল
বিস্তাারিত রূপফিতা অবিনাশী রূপের বল্কল।
পৃথক শয্যায় কাঁদ ক্রদসী চাঁদেরই পরাগে
উপবাসী রাত্রি ঘোরে দাহ্যমান চতুর্পাশ শিকে
গেঁথে আনে ব্যতিহার, নিদ্রাহীন তাপিত শয্যায়
অনঙ্গে অঙ্গ কার, সাদা দুধ তিমির ফোটায়।
নিভৃতে নিভৃতে হারে প্রকাশ্যের মাত্রাভুক আড়ি
লাবণ্যের ক্ষণপ্রভা উদয়াস্ত দিল তার পাড়ি
ঊরুর উত্তাল রাশে, মিহিঠাসা সবুক সাহসে
তরুণ তরুর কানে প্রতিভার প্রগলভ শ্বাসে।
নিদ্রিত মাংসের ঘরে ঈর্ষা আর পরভুক রূপে
আত্মা ফোটে আত্মজায়, দূরবাসী দূরদেহী দ্বীপে।
বালিকার শবযাত্রা
ঊরু থেকে শুরু, বল গুরু, কি খাই কীর্তন?
উদোম নিতম্ব তলে টাঙ্গানো আকাশ দেখ
মেঘের কেত্তন দেখ, পেত্ত জ্বলে, বেহায়া ঘূর্ণন
সোমত্ত্বে মত্ত হল, পর্যাপ্ত রাত্রি দিল পাড়ি।
ভোরের কাঁচুলী মুখে আঁধারের নিগূঢ় উত্থান
হৃদজলে পড়ে ছিল রূপালী আধুলী
রূপের সঙ্ঘ ছেড়ে অরূপের নগরে হেঁটেছে।
জঘনে সঘন রাত দিগ্বিদিক ছুটে গেছে বাহু
রাহু চাঁদে অমাময়ী বিবিধ প্রান্তরে, মর্মের কলা
বসন পিরিতি, তুমি তার বাল্যশিক্ষা, তুমি তার গুরু
উদোম গাত্রতলে মর্মরের নিপুন ক্রুরতা।
বালিকা চলেছে আজ গঙ্গাস্নানে ভেসে যাবে বলে।
বাসা বদল
যা কিছু আমাদের নয়, তাদের বাঁধা-ছাঁদা শেষ।
ফাঁকা ঘরগুলো জুড়ে হাওযা যেন গোঙ্গানো ড্রাগন
ডাইনোসর বাড়িয়ে আনে গ্রীবা।
যা কিছু পোড়ান হবে তারা আগুনের পাশে সজ্জিত
পুরাতন বৃক্ষের নীচে ছায়া যেন ম্লানমুখী জায়া
কলতলা জুড়ে জলের সিক্ত কান্না।
যা কিছু সঙ্গে যাবে তাদেরও জুড়নে জুড়েছে ভয়
চেনা গ্রন্থি খুলে যাবে প্রাণ আয়ু।
ঝুলে থাকা সাদা বারান্দায় এসে একবার দাঁড়াই
শেষ বার দেখে নিউ দৃশ্যবস্তুর ঢেউ
কাছের এই উদভ্রান্ত দৌড়, দূরের ঐ জলের ঝিকিমিকি
নীল সমুদ্র জুড়ে মেঘপালে ঈশ্বরীর জলযান
দিগন্তে ভাসিয়া যায়, হু হু দীর্ঘশ্বাস ওঠে শীতপাখির ডানায়…
এই কি শেষ বাসা বদল, এই কি শেষ দাঁড়ানো বারান্দায়?