শেয়ার করুন:

মোস্তফা হায়দার

এই শহরে নেই কেন ভাই ঘুমপাড়ানি ছড়া,
এই শহরে ভোর থেকে রাত পড়া শুধু পড়া।

এতো চমৎকার সহজ সরল শব্দের মালা গেঁথে বাক্যের ডালি সাজিয়ে পাঠকের হৃদয় জয় করার এক চমৎকার বালক জনি হোসেন কাব্য। তার কবিতার ভেতরে বসবাস করে এক শিশুতোষ নষ্টালজিক। শিশুদের মতো করে কথোপকথন করতে জানা, বুঝা আর প্রয়োগবিধিটা হচ্ছে পুরাই ব্যতিক্রম এক মাদকতার নাম। ভাষার নান্দনিকতার চেয়ে ভাষার সহজিয়া শিল্পের কাছে পাঠক মাত্রই নতজানু। আর কবিরা শিল্পের পূজারি। একেকজনের কাছে একেকটা বিষয় ভাবনার উদয় হয়। তবে জনি হোসেন কাব্য ভাবেন সমাজের কিছু সাদা মনের মানুষের মতো করে।

কবিতার কোনো সংজ্ঞা আজো নির্দিষ্ট করা যায়নি বলে কবিতা যে কারো হাত ধরে একদম নিজস্ব গতি ধরে গড়গড় করে সামনের দিকে চলতে থাকে। কবিতার এ নান্দনিকতায় যে কেউ নিজের মতো করে মনের ভাবে নিজস্বতা ফুটিয়ে তুলে একটা শৈল্পিকতায় রুপ দেয়। যা অটো হয়ে যায়। আর সে কবিতা যদি হয় শিশুকিশোরদের উপযোগী তা হলে আরো পরিশ্রমলব্দও বলা যায়। কারণ তাদের মনন ধরে তাদের মতো করে ভাষার যোগান দিতে পারলেই পরে কবিতাটি হয়ে ওঠে সার্বজনীন।

জনি হোসেন কাব্য শিশুকিশোর উপযোগী ভাষার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে বাধ্যতা মেনে নিয়ে চমৎকার করে সব ছড়া কবিতার উপস্থাপনে চেষ্টা চালিয়েছেন। শিশুকিশোরদের একটা বয়স আছে। যে বয়সে মন চাইবে পড়ালেখা না করে ঘুরতে, মা-দাদী-খালার সাথে ঘুরে বেড়াতে। সে বয়সে বাইন্ডিংটাও মানতে নারাজ। যেমন কবির ভাষায়-

টেবিলটাতে গিয়ে আমার
মন বসে না পাঠে
কল্পনাতেই যাই হারিয়ে
জল থৈ থৈ মাঠে।

খানিকপরেই মায়ের হাতে
বসিয়ে দেয়া চড়ে,
বই নিয়ে যে বসেছিলাম
হঠাৎ মনে পড়ে।
(হঠাৎ মনে পড়ে)

জনি হোসেন কাব্য নিজের সব লেখায় এক ধরণের দায় নিয়ে লিখতে চেষ্টা করেন। জনির ভাবনায় সে দায় বারবার ধরা পড়ে। পড়ালেখা নিয়ে তার কড়া শাসনের অবসান ঘটান ‘বই’ শিরোনামের ছড়াটিতে। এতো চমৎকার উপমায় ছড়াটি উপস্থাপন করা হলো, যাতে করে সবার মন ছূঁয়ে গেছে –
ভেবো নাকো শত্রু তাকে
বন্ধু বানাও বই,
বই যে হলো উপকারী
মানুষ হবার মই।

বই নামীয় ছড়ার এ চারলাইনে যে ইঙ্গিতটা দেয়া হয়েছে তা শুধু শিশুকিশোরদের দিকে ইঙ্গিত নয়! তা যে কোনো বয়সের পাঠককে ভাবাবে নিশ্চিত। যে উপমায় বইকে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সেরা একটি উপমা। মানুষ হতে হলে বই এর কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষ হবার মন্ত্র শেখায়।

জনি হোসেন কাব্য একজন নির্মাতার ভূমিকায় বসতে চলেছেন। যে নির্মাণশৈলিতে সকল আইটেম দেয়ার সময় যত্নশীল হতে চেষ্টা করেছে। তার ‘আমার গাঁ ‘ কবিতাটির শুরুটা যে কাউকে ভাবিয়ে তুলবে। কারণ জনিরা এ সমাজ থেকে বেড়ে উঠা মানুষ। তাদেরও একটা গ্রাম ছিল। যাদের আজকের গ্রাম বলার বা গ্রাম্-প্রকৃতি বর্ণনা করাও দুঃসাধ্য। জনি সে ক্ষেত্রে তার শেকড়ের টানকে অনুভবে রেখেই সম্মুখে হাটার চেষ্টা করেছেন। তার ভাষায়–

রোজ সকালে মিনার হতে আযান আসে ভেসে
ধরার মাঝে আলো ছড়ায় সূর্যিমামা হেসে।

সকালটা ঠিক এভাবেই শুরু হয় গ্রামের কোল ঘেষে। দুটো লাইনেই ঐতিহ্য ফুটে উঠে। কোনো ধরনের নেকামোর আশ্রয় তাকে পায়নি। পুরো কবিতাটি ছিলো গ্রাম বাংলার দৈনিক চিত্রের বর্ণনায়। তবে অসচেতন ভাবে হয়ত একটি বাক্যে থমকে যেতে হয়েছে। বাক্যটি যে উপমায় গড়েছে সেটি কোন্ সমাজের তা হয়ত আমারও অগোচর হতে পারে! তবে মক্তবে যাওয়ার সময়টুকুতে সাধারণত শিশুদের পান্তাভাত দেয়ার সময় যেমন নয় তেমনি খাওয়ার সময় নয়! বাক্যটি হলো—

ফু্লবাগিচায় ফুলের মেলা কতো যে ফুল ফোটে
দস্যি ছেলে মক্তবেতে পান্তা খেয়েই ছোটে।
(আমার গাঁ)

তবে পুরো কবিতাটি নদীর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ জাগানিয়া সুর ও গতি তুলেছে। পাঠে নেই কোনো কাঠিন্য দেখা যায় না।

একটা শিশুর পুরো দিনের চিত্রে কবি যেনো নিজেই বসে পড়লেন। অল্পগথায় গল্প আঁকার একটা চিত্র যেনো তার ছড়াকবিতাগুলোতে ধরা পড়ে। এটাও তার এক বিশেষত্ব। ঠিক সে রকম একটি কবিতা হলো –

সারাটাদিন ছুটে বেড়ায় মাটির বুকে পা তুলে
সকাল হলে বনবাদাড়ে
দুপুর হলে নদীন পাড়ে
বিকেল হলে খেলার মাঠে
সন্ধ্যে হলে বসে পাঠে
চেনো তাকে? ঠিক ধরেছো, গ্রামের ছেলে রাতুলে।
(গ্রামের ছেলে- বর পালালো)

কবি জনি হোসেন কাব্যে র কবিতায় চমৎকারভাবে দেশ প্রেমের রেখাচিত্র টেনেছেন। জনি এও শিখতে ভুল করে নি যে, দেশপ্রেমহীন জাতি লাকড়িহীন আগুনের মতো। দেশ, মা-মাটি ও মানুষের স্বপ্নের চাষাবাদে যোগান দেয়াই কবিদের কাজ। জনিও তার ব্যতিক্রম হয়নি।যেমন—

ভালোবাসি দেশ
লালসবুজের পতাকাতে
দেখতে লাগে বেশ।
(ভালেবাসি দেশ)
অথবা
এই দেশ চাষীদের
এই দেশ রোদেপোড়া
মা,খালা ও মাসিদের।

এই দেশ জেলেদের,
এই দেশ দূরে থাকা
মেসে পড়া ছেলেদের।

এই দেশ পাখিদের
এই দেশ চেনাজানা
তুমি,আমি, বাকীদের।
(এই দেশ)

দেশ প্রেম ও দেশ নিয়ে এতো প্রাউড করে আর কেউ বলতে পেরেছে কিনা আমার সন্দেহ! তবে জনি খুব সচেতনতার সহিত মেধার চাল খেলেছেন। খেলার মাঝে কোনো খুঁৎ চোখে পড়েনি।

কবি জনি হোসেন কাব্য শিশুকিশোরদের মনোরঞ্জন করেননি শুধু। চেষ্টা করেছেন প্রাণের বিচরণ ঘটাতে। যে বিষয়প্রাণগুলো পাঠককে ভাবিয়ে তুলেছে। ছোটোদের নিয়ে অনেক লেখার ফাঁকে ছোটোদের শিক্ষার ছলে দীক্ষা দেয়ার কৌশলটাই আলাদা। ছোটোদের মাঝে দেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ের তথ্যও তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কবির ভাষায়-

ন’মাস ধরে তিরিশ লক্ষ
প্রাণ হারানোর পর
আমরা পেলাম বিজয় দিবস
ষোলোই ডিসেম্বর।

(ষোলোই ডিসেম্বর- বর পালালো)

জনি হোসেন কাব্য ছোটোদের মনোরঞ্জনের সব জায়গায় বিচরণের চেষ্টা করেছেন। কোনো জায়গায় তার কোনে কমতি ছিল না। তবে খুব সচেতন ভাবে শিশুকিশোরদেকে কাজী নজরুল ইসলামের মতো করে ব্যঙ্গাত্বক ছড়ার আদলে কিছুটা সময়কে ধারণ অথবা অসঙ্গতির দিকে ইঙ্গিত করতে সচেষ্ট ছি্ল। তার একটি পুরস্কার পাওয়া বই ‘বর পালালো’ র নাম শিরোনাম ছড়াটি পুরোটাই এডালদের দিকে ইঙ্গিত করা ছোটোদের পাঠ্য। যেমন –

বোয়াল এলো পুঁটি এলো
আরে এলো কৈ
খেতে দিলো কোর্মা পোলাউ
বাটিভরা দই।

হঠাৎ এলো সাপ
বিয়ে রেখে বর পালালো
বললো,বাপরে বাপ!

বর সাধারণত দুকারণে পালাতে বাধ্য হয়। উল্লেখিত প্রথম চার লাইনের কল্যাণে বুঝা যায় এটি একটি রাজনৈতিক ইঙ্গিত! ভুল না হলে এটি একটি বাল্য বরের ইঙ্গিত। অথবা হতে পারে বরের দ্বিতীয় বিয়ের মজমায় এসে প্রথম স্ত্রী কর্তৃক হানা অথবা সময়ের অযাচিত প্রেমিকার জটিকা হানা! তবে সব যেন ছদ্মের ভেতর আরেক পর্দার উম্মোচন। ভেতরের পাঠ পাঠকের।

জনির আর একটি কবিতার পাঠে পাঠক হিসেবে ভেবেছি। ‘ভূতের ছানা লাইভে’ নামক ছড়াকবিতাটির অন্তরাড়ালে বর্তমান সময়ের কতো কথাই না কবি বলতে চেষ্টা করেছেন। কবির ভাষায়—

ইচ্ছেমতো নেট ইউজে নেই তো কারো মানা
হঠাৎ একী! লাইভে এলো মামদোভূতের ছানা।
চোখ রাঙিয়ে ভেংচি কাটে পেট দুলিয়ে নাচে,
সময় তখন রাতের শুরু ঠিক বারোটা পাঁচ-এ।

পুরো কবিতাটি পাঠ করার পর ভেতর নাড়া দিয়েছে আমার। কত সচেতনভাবে সে রোবটনামীয় এক পাজলামির কান্ডকে স্মৃতির জায়গায় স্থান দিয়ে সময়কে ধারণ করার চেষ্টা করেছে। অভিনন্দন জানাতেই হয়। ছড়াকবিতার ব্যঙ্গাত্বক শক্তির কাছে সব কিছু অসহায়। যেমন – ‘‘খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল/বর্গি এল দেশে,/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/খাজনা দেব কিসে?’’ এ ছড়াটিও ঠিক পাঠের ভেতরাত্মায় আঘাত হেনেছে।
তেমনি জনি হোসেন কাব্য সমাজ ও সময়ের অনেক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সচেতনভাবে নাড়া দিতে চেষ্টা করেছে। তেমনি কয়েকটি ছড়া হলো, শাপলার কষ্ট, বাঘের কান, কাকের গান, মাছির চোখ, হাতির ছিলো জ্বর ইত্যাদি। তার বেড়ে উঠা সময়ে এতো সব চমৎকার চিন্তাকে অসাধারণভাবে তুলে ধরে একটি মাইলফলকের দিকে দ্রূত হাঁটছে। তার গতিশীলতাকে এগিয়ে নিতে কিছু পুরস্কার তার মনোবলকে চাঙ্গা করে তুলেছে। এগিয়ে যাও মা, মাটি ও মানুষের বিশ্বাসের সাথে। যে বিশ্বাসে বেঁচে থাকবে একজন জনি হোসেন কাব্যের সৃষ্টি।

Facebook Comments