অনিরুদ্ধ আলম (Anirudha Alam) মূলত একজন কবি। তিনি এ পর্যন্ত পঞ্চাশটিরও অধিক বই লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: প্রেম-অপ্রেমের পদাবলি (কবিতা), সোনালি নৈঃশব্দ্যের হরিণাবলি (কবিতা), প্রেম কি কেবলি পাখিপ্রবণ (কবিতা), ভালবাসা প্রিয়তমাসু (কবিতা), অনেকটা পথ হাঁটতে হবে ঘুমিয়ে পড়ার আগে (কিশোর কবিতা), এইসব রাতদিন (কিশোর কবিতা), দূরের ডাক (ছড়াকবিতা), তারপর তারপর (ছড়া), সকলের জন্যে পরিবেশ পরিবেশের জন্যে সকলে (ছড়ানাটিকা), ২৪ অক্টোবর ১৯৭১ (উপন্যাসিকা), পিঁপড়ে (সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস), অপারেশন ক্যালপি বত্রিশ (সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস), এবং ক্রিনোর অপেক্ষায় (সায়েন্স ফিকশন), তেইশ শত দুই সালের এক জানুয়ারি (ছোটো গল্প), দু’শ’বছরের সেরা বাংলা কিশোর গল্প (সম্পাদিত গল্পের সংকলন), তোমাদের জন্যে বাংলা বানান (বাংলা বানান বিষযক প্রবন্ধ), আমাদের কালো মানিক: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (জীবনী)। কিংবদন্তিতুল্য নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন অনিরুদ্ধ আলমের ছোটোগল্প ‘দোয়েলের সংসার’ নাট্যরূপ দিয়েছিলেন এবং তারই পরিচালনায় তা বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছে। ‘এক-চিলতে জল’ (En Epic Drop of Water) নামের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন যা ২০২৪ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে লস এঞ্জেলেস ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড জয়ী হয়েছে। তিনি বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের লেখক।
শিক্ষাগত জীবনে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য এবং কমপিউটার-প্রযুক্তি বিষয়ে দেশেবিদেশে পড়াশুনা করেছেন। বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় বসবাসরত।
প্রতিবেশী
‘পদ্মাবতী’র প্রকরণে পিঁপড়েদের মতো ক’রে কবিতা লিখব দীপান্বিত সর্ষেক্ষেতের অভ্যাসে।
বুকে হাত রেখে বলতে পারো নি– বৃষ্টি এলেই তুমি আসবে। জোছনাতে-ভাঙা জানালার পাশে বসে মেঘগুলোকে পর্বত, পর্বতকে বাড়ি, আর বাড়িকে তেপান্তর ভাবতে গিয়ে লালনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করি।
সারসের ন্যায় সাহসী শুকতারাকেও তুলোট হাঁসের ছানার সুরে সবিনয় গান গাইতে শুনেছি। কষ্টের কেশরে ঔজ্জ্বল্য বাড়লে ভুলে যাই জলপাই পাতাদের ছবি আকঁতে।
দুপুররঙা জামার ছায়াময় বোতামের স্থিরতা নিয়ে আনমনে কত কিছু যে আঁকিবুকি কাটি!
একবার পাহাড় কাটতে যাব ব’লে আমার সব লাটিম আর গুলতি বন্ধুদের মাঝে বিলিয়ে দিলাম। সারারাত যাত্রাপালা দেখে ঘুম কাজা ক’রে বাসায় ফিরলে সোনালি সকালকে দুমড়ানোমুচড়ানো টিনের কৌটার মতো বিস্বাদ লাগে। ছেঁড়া ত্রিপলের রুগ্ণতাতে কী নির্বিকার রোদ্রের জল্লাদ-বিলাসিতা!
আবারো রাত এলে আয়নায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে-থাকা আমার দস্যি অশ্রুদেরকে ঘুমপাড়ানি গান শোনায় প্রতিবেশী ছয়টি টিকটিকি।
চন্দ্রমুখী
সান্ধ্যভাষার ইঙ্গিতে ছিল পঞ্চডালের কথা। সে ডালে কি জোছনাবরণ কোনো পাখি বসে?
চঞ্চল চিত্তে চন্দ্রমুখীর পরাঙ্মুখ উঁকি অমাবস্যার লতাগুল্মে জর্জরিত।
আমার করার কিছুই থাকে না। হ্যারিকেনের অদ্বৈত সলতেটা একটু উস্কে দিই। এবার ঘরজুড়ে আলো আরো সহজ-নিঃসঙ্কোচ হল। অঙ্ক-আপার কথাগুলো কানে ভাসে, ‘শুধু দেখতে-শুনতে ভালো হলেই চলবে না। পড়াশুনাতেও ভালো হতে হবে!’
অঙ্ক কষে যাচ্ছি খাতাভরে। একটা বানর তৈলাক্ত বাঁশের ছয়ফুট উপরে উঠেই আবার পাঁচফুট নিচে! তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্বাপদ ঘুম আসা-যাওয়া করছে চোখের পাতায়-পাতায়।
শঙ্খের মতো সুন্দর অঙ্ক-আপার শাড়ির লাবণ্য আমি কোন গাণিতিক সূত্রে মাপব? নিদ্রার সংক্রমণে বারবার গুবলেট বেঁধে গেল সকল গাণিতিক হিসেবে।
ইশতেহার
শেখ সাদির নিতল পদাবলি কে আমাকে পাঠাল সবুজ নদীর মোড়কে ভরদুপুরে?
ভুলে গেছি– কীভাবে কলাপাতার করতলে বিছিয়ে রাখতে হয় নদী।
কতটা পুঁথিতে গড়া একটি পরমাত্মীয় মালা শঙ্খমালার কণ্ঠ থেকে শুকতারার মতো প্রচ্ছন্ন হয় না? পর্যটনপ্রিয় এই আমি তো একদিন তোমার অঙ্গুরির মতো তোমার মাঝে নিত্য লীন হতে চেয়েছিলাম।
নদীমাত্রিক জমিনে মৃত দৈত্যদের দ্বিত্ব আত্মা মাপতে গিয়ে আনুবিস কখনো ভুল ক’রে বসে না তো?
বালির চাকচিক্যে বোনা নদীর নির্ভুল করিডোরে বেগুনি আভা কচুরি ফুল হয়ে ফোটে।
হৃদয়-কর্তৃক শোণিতে উচ্চারিত ইশতিহারের একান্ত শব্দগুলো হায়ারোগ্লফিক্স হতে পারে না। যেমন ধানফুলের প্রফুল্লতা নিয়ে অচেনা আতরের সুগন্ধে মুখরিত মহুয়ার বন।
সমাজ
কে ওই দ্রাবিড় দেবদূতী সারাবেলা চোখের চৌকাঠে ঘুরেফিরে দাঁড়িয়ে থাকে?
কার মুখ জুলেখার কমনীয়তা বিলায়?
নমনীয় তৃষ্ণার ফসকা জালে ধরা দেয় না জল। লাবণ্য-ধনুকের ছিলাতে ভর ক’রে কারো ছলনাময় দৃষ্টির তীর করুক-না বিদ্ধ এই আমাকে। বিক্ষত হই গরল প্রশান্তিতে। তোমার আঙুলের ডগায় ঝুলে-থাকা বৃষ্টির ফুল বড়ো ভালবাসি। প্রার্থনা পেতে রাখি– আমার আঁজলাতে জমুক-না অমন কিছু আত্মবিশ্বাস।
মধুকূপী দিগন্তে ফুটে-থাকা টুকটুকে ঘাসফুলটাই কি একান্তে বেড়ে-ওঠা ঋতুহীন রঙদের আত্মসমালোচনা?
শীলভদ্রের কল্লোলিত লিপিতে ছেয়ে আছে তেমন প্রান্তরে কে রাখে মেলে ধ্যানের দুয়ার? নৌকোর গলুইয়ের মতো একটি গোলার্ধে তোমাকে নিয়ে সমাজ গড়ব জলপিপি আর পড়ন্ত দুপুরের পরামর্শে।
রাত ও রবীন্দ্রনাথ
হাতের আঙুলে গুণে-রাখা নামহীন নানা পৃথিবীর হিসেবে গরমিল দেখা দিলে, আমি পদ্মদিঘির পাশে একলা বসে থাকি। অমাবস্যার রাতে আকাশে নিরবিচ্ছিন্ন গীতবিতানের পাঠ নিই নীলনীল ধারাপাত পড়ার সুরেসুরে।
তরল নক্ষত্রের জামাট-বাঁধা আলো জ্বলে উঠলেই, এখানে রাত্রি নামে। অঘোষিত জিরাফের আলোকিত গ্রীবার আতিথ্য গ্রহণ করে রবীন্দ্রনাথের মতো ঋষিজ ভঙ্গিমায় পূর্ণিমা-চাঁদ।
কালো রঙের অবিরল জংয়ে নিষ্পেষিত হবে না বুঝি জাঁদরেল ঝোপঝাড়গুলো? কৃষ্ণগহ্বরে-জর্জরিত পাঁচটি মাতাল তারা আত্মপ্রকাশের মতলবে জ্বলজ্বলে।
গিটারের সুরেলা ধ্বনিতে বাজছে কি নৈঃশব্দ্য? পাতাদের আলমিরা কপাট খুলে দিলে, ঝাঁকেঝাঁকে উছলে পড়ে আঁধারভুখ সম্মিলিত জোনাকিসমাজ।
ঝিঁঝিঁপোকাদের ঝিঁঝিঁ ডাকের করিডোর পেরিয়ে লক্ষ্মীপেঁচা চকচকে ড্রাগস্টোরের মতো চোখ মেলে শুনতে থাকে জোছনার গ্রেনেড-বর্ষণ।
প্রদীপের নিচে জমে-ওঠা মিশমিশে কালির স্তূপ যেন মাঠেঘাটে ছড়িয়ে আছে বিষণ্ণতার ধ্বংসযজ্ঞ হয়ে। শিকারি বেড়ালের অভিনয়ে বাতাস সিঁধকাটা চোরের অভিলাষে কার দোরে বারবার কড়া নাড়ে নিঃশব্দে?
গুপ্তচরের শালীনতা রপ্ত-করা শুকনো পাতা ঝরে পড়ল লীলাবতীর ঘরের দোরে। লীলাবতী তখনো বৃষ্টি-ভেজা চোখ মেলে নিভু-নিভু হ্যারিকেনের আলোতে চিঠি লিখছে এক-মনে।


