শেয়ার করুন:

আজ আশির  দশকের খ্যাতিমান কবি, সাংবাদিক ও ভ্রমণলেখক  মাহমুদ হাফিজ এর  ৬০তম জন্মদিন।  জীবনের এই বর্ণাঢ্য উদযাপনকে স্মরণীয় করে রাখতে আজ তার ১০টি বাছাই করা কবিতা প্রকাশ করা হলো। সেই সাথে আড্ডাপত্র’র পক্ষ থেকে জানাই ফুলেল শুভেচ্ছা।

অচেনা শহর

এ শহর অলিগলি এভিনিউ অচেনা আমার
রমনার বৃক্ষছায়া, পার্ক লেক বটমূল
ইস্টিশন বন্দর হাতিঝিল শাহবাগ গুলশান
রাতের শরীরজুড়ে রাজপথ সুনসান
‘অচিন পাখি’র মতো উড়ে উড়ে যায়।

সময় এ শহরে আজ ধাবমান ঘোড়ার লাগাম
সন্ধ্যাভূক মানুষেরা নিয়েছে গৃহবাস
মায়াময় নির্জনে এখনো ওড়ে পাখি, জনহীন সবুজের ভিড়ে
নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে সুবাসিত ফুল

এ নগরী আমি দেখিনি কোনদিন, দেখি নাই কোনকালে।।

অভিসার

নির্জন রাতের বাতাসে ঝুলে থাকে চাঁদ
ছাদের কার্ণিশে মিশে থাকে ছায়া
দূরাগত কুকুরের ডাক রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙে
ল্যাম্পপোস্টের নিচে প্রহরী হেঁকে চলে:
হৈ কে যায়… কে যায়…
রাত বলে ওঠে :শ্যাম সনে রাধা

ছায়া বিচ্ছিন্ন হয়
অকস্মাৎ নড়ে ওঠে ভেজানো কপাট।

কতোটা

কতোটা বদল হলে আজানের আহবানশেষে
আবারও উচ্চকিত হয় মুয়াজ্জিনের স্বর-
ভাইসব আইসেন না মসজিদে, হবে না জামাত

কতোটা কঞ্জুস হলে রুদ্ধ হয় স্নেহের পসার
ভালবাসা শ্রদ্ধা ও বোধ
খাঁ খাঁ হয়ে যায় দ্রুত রাজপথ, হাটবাজার, ফ্লাইওভার
স্বপ্নময় সকল উড়াল।

কতোটা বদল হলে হাসপাতালে ঝুলে যায় তালা
পার্লারে বসে সব্জি বাজার…
কনভেনশনের মুকুটপরা বরেরা আসকান ছেড়ে
দ্রুত পড়ে নেয় এ্যাপ্রোন
কনেরা সাজ রূপবতী হয়ে যায় নার্স

কতোটা নিঠুর হলে ফিরে যায় উদ্যত চুম্বন
ফিরে ফিরে যাও তুমি বেড়াল ভালোবেসে
বেড়ালও তো হাসে কাঁদে কাছে শোয়
ভালবাসার চাদরে মোড়ায়।

কতোটা গভীর হলে এই ক্ষত মুছে যায়, মুছে যেতে পারে?

ছায়াবৃক্ষ
(আমার স্যার আনিসুজ্জামান স্মরণে )

মাথার ওপর থেকে বৃক্ষ সরে গেলে
রোদেরা বাড়িয়ে দেয় উত্তাপ
এ শহরে চেনামুখ অচেনা হয়ে ওঠে
চেনা দোয়েল ডাকে অচেনা অদ্ভুত সুরে

মনে করো সেই বিভীষিকাময় সন্ধ্যার কথা
মৃত্যুর হিমবাহ কেড়ে নেয় শহরের সকল সুঘ্রাণ
নি:সঙ্গতার ঝরা পালক পথে পথে হাঁটে
প্রিয়জন অজানায় উড়ে উড়ে যায়
শহরজুড়ে নেমে আসে বৃষ্টির ধারা
উদভ্রান্ত মানুষ তখন, গৃহকোণে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।

এ কেমন দু:সহ দিন
শহুরে পাখিরাও ওড়াওড়ি ভুলে লুকিয়েছে গাছের কোটরে
প্রভাতে প্রশান্তি নেই
গুমোট শহরের দরজায় দরজায় হাঁক দিতে থাকে ক্ষুধার্ত মানুষ
এইসব দেখে শুনে আপনি রওয়ানা হন বাড়ির পথে
অলৌকিক দূরের সড়কে, অনন্ত গৃহবাসে
আমি ভয়ার্তচোখে চওড়া পাজামা পাঞ্জাবির তলে লুকিয়ে পড়ি
খুঁজতে থাকি ছায়া, গুণতে থাকি দূরাগত কান্নার রোল
গুণতে থাকি….. গুণতে থাকি, শুধু গুণতেই থাকি…

তাহাজ্জুদ

খুব কম লোকই রাতের নিবিড়তাকে
নির্মাণ করতে পারে জাগ্রত চেতনায়

শীতের কুহেলিকা ঢাকা রাতের গভীরে
শিশির ঝড়ে টুপটাপ টুপটাপ
ক্লান্ত নগরীর স্কাইলাইন
আলো আঁধারিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে
রাতের দেয়ালে ঠেকিয়ে দু’পিঠ
ঘুম যায় ব্যস্ত সড়ক, জলের ফোয়ারা,পথের কুকুর
খুব কম লোকই তখন শীতল পানি ছুঁয়ে
খেতে পারে ‘কালের কসম’।

স্তব্ধ মিনার তীরের ফলার মতো
আকাশের দিকে উড়ে যায়
রাত জাগা তারা মিটি মিটি জ্বলে
চাঁদ ক্রমাগত দূরে যায় বহুদূরে যায়

যখন থাকে না সান্ধ্য পাখির কুজন।
ব্যস্ত মানুষ জনপদে মানুষ।
একা একা পড়ে থাকে পার্ক, লেক, রমনার বটমূল
খুব কম লোকই তখন অসত্য খোলস ছেড়ে
চিনে নিতে পারে মগ্ন মনের ‘ক্বাসিদা’।

পিতা

পিতার সফেদ পাঞ্জাবী জুড়ে
ফুটে আছে শত রক্তগোলাপ
সন্তানেরা শোকে ভাসে। তিনি অনায়াসে
ঘুমাতে পারেন মেঝে বা সিঁড়ির কঠিন কংক্রীটে

বুলেটের কাজ তো কেবল লক্ষ্যভেদী হওয়া
তাই বলে মৃত্যু কি কেড়ে নিতে পারে
সময় ‌ও জীবনের অবিনাশী গান?

সন্তানের কোন এক জন্মদিনে
পিতা এনে দেন আস্ত একটি দেশ
কাজ শেষে অবশেষে নেতিয়ে পড়েন ঘুমে
ঘুমের মধ্যে হাটতে থাকেন নি:সীম নীলিমার দিকে
মেঝেতে পড়ে থাকে তার সফেদ পাঞ্জাবী
ফুটে থাকে রাশি রাশি রক্তগোলাপ।

বৃষ্টির ছাঁট

টানা বর্ষার মুখরতার মধ্যে
ঘরবন্দী উৎসব-ফেরতা মানুষ
কি রাস্তা কি বারিস্তা কফিশপে মানুষ ও মানুষ!
প্রথাশাসিতের মতো নিয়মের পত্রহাতে
প্রতিদিন কড়া নাড়ি দোর থেকে দোর
দারুণ দাপটে দাবড়ে বেড়াই নগরীর অলিগলি
আহা, উইন্ডস্ক্রিনে মায়াময় বৃষ্টির ছাঁট

ঘনবর্ষায় বড় বাঁচা বাঁচিয়ে দিয়েছে প্রিয় এ ‘প্রবক্স’
উৎসব-কাতর মানুষের এই অনন্ত হাঁসফাঁসের ভেতর
মায়াময় বৃষ্টির এই্ মহামুখরতার ভেতর
আমি ভোর ভোর বেরিয়ে পড়ি পথে
কুয়াশাময় আচ্ছন্নতায় মুগ্ধ করে রাখে ঘুর্ণায়মান স্টেয়ারিং
স্বত: শ্চল ওয়াইপার গেয়ে চলে জীবন-জাগার গান…

মালিকানা

একটি মেয়ের গল্প নিয়ে লিখছি বসে এই কবিতা
তার কিছু নেই
একটি নিরেট গল্প ছাড়া আর কিছু নেই।

দীঘল কালো চুলের বাহার
দুধসাদা গা, পুস্পিত পা
হরিণা চোখ, কন্ঠ মধুর
তার কিছু নেই
আর কিছু নেই একটি নিরেট গল্প ছাড়া।

আটপৌরে জীবন ধারণ
অপূর্ব সুন্দরীর মতোই
তার রয়েছে কান্না, হৃদয়, রক্তক্ষরণ
পরম দুখী চরম দুখী একটি জীবন
একজীবনের গল্পমালিক
সেই মেয়েটি খুব সাধারণ, খুব সাধারণ, খুব সাধারণ…

স্বপ্নবিকেল

তুমি আছো বলে এই নীলজামাপরা বিষন্নদিন. অলস দুপুর
কাগজের ঠোঙায় দু’টাকার কাঠবাদাম
অমূল্য স্মৃতি হয়ে গেল
ধাঁধানো বিষয়আশয় মুঠো ভ’রে
দরজায় অপেক্ষমান আকুলআগ্রহীগণ
অথচ কার্তিকের গান গেয়ে
আমার জন্য বসে আছো তুমি সারাটা দুপুর

জানি আমি জানি, কখনো কখনো ডেলিকেসির চেয়ে
আরাধ্য হয়ে ওঠে শুকনো কাঠবাদাম
এই ডামাডোল, জানাজানি,কানাকানির মধ্যে
দিনশেষে টিকে থাকে শুধু ভাবালুতাময় স্বপ্নবিকেল-
পানিতে পড়া দীর্ঘছায়া, হৃদয়ে জমা রাখা অগুণতি ছবি
সন্ধ্যার আবছা আঁধার

কাগজের ঠোঙা হাতে মুদুপায়ে সামনে দাঁড়াই
তোমার হাতে তুলে দিই ঠোঙাভরা আবেগের গুচ্ছ ভালবাসা
সূর্যের রঙ ফিকে হলে দিনান্তে আমিই টিকে থাকি
আমিই টিকে থাকি।

টেগোর টেরাসে রবীন্দ্রনাথ

টেগোর টেরাসে কাল এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
আলিশান আলখেল্লায় মুড়িয়ে শরীর
দীপ্ত পায়ে হেঁটে। যোগ দেন ভ্রামণিক প্রাত:রাশে।

বাদল বরিষণে আজ আবছা আঁধার
মেঘের ডাকে আটকেছে রোদ কাঁচের টেরাসে
ভেতরে পলাশ গাইছেন ধীরলয়ে
‘পথিক সবাই পেরিয়ে গেল ঘাটের কিনারাতে
আমি সে কোন আকুল আলোয় দিশাহারা রাতে….’
রবি কন খানিকটা হেসে, আহা জমিয়েছো বেশ

বৃষ্টিমুখর এ ভোরে আনন্দে হাসেন কবি এই ভেবে-
রয়েছেন তিনি আড্ডা গান ভাস্কর্যে ভাস্বর
বনানীর টেগোর টেরাসে।

Facebook Comments