রোবট
কাজের এখন লোক লাগে না রোবট হলো বুয়া
রাইস কুকারে ভাত রাঁধে আর চেনে জলের কূয়া
হাত-পা নাকি টিপতে পারে টিপতে পারে মাথা
শীতের সময় দেয় বিছিয়ে গায়ে গরম কাঁথা।
রোবট নাকি মায়ের মতো ঘর সামলায় ভালো
সাঁঝ আঁধারে দেয় জ্বালিয়ে হাজার তারার আলো
ঘর ঝাড়ু দেয় কাপড় কাচে চা করে দেয় আরও
আসলে ঘরে অতিথি কেউ দেয় খুলে সে দ্বারও।
রোবট এখন খেলার সাথি ঝগড়া ছাড়াই খেলে
মেয়ের রূপে পুতুল সাজায় ফুটবলে হয় ছেলে
দাবার বোর্ডে চতুর রোবট চালগুলো তার কড়া
খেলতে লুডু ছক্কা ফেলে কানায় কাটে ছড়া।
রোবট এখন নয়কো জড় প্রাণীর মতো চলে
সঙ্গ সে দেয় নিঃসঙ্গকে দিনের প্রতি পলে
রোবট টানায় জাল মশারী রোবট ছাড়ে টিভি
যন্ত্রযুগে মানুষ এখন পুরাই রোবটজীবী।
রোবট মেপে খাওয়ায় অষুধ ঠিক সে মাপে জ্বরও
কপালে দেয় জলের পটি কাঁপলে থরো থরো
রোবট কেবল হৃদয় বিহীন শৃঙ্খলা তার কড়া
আধুনিক এই যুগের জন্যে রোবট ডাক হরকরা।
আমার গ্রাম
আমার গ্রামের নামখানি খুব হৃদয়কাড়া জেনো
দ্বীপের মতো চরণশোভা নদীর বুকে যেনো
পূর্বদিকে সবুজ পাহাড় পেয়ারা তার গায়ে
এমনভাবে ঝোলে যেনো শিশু মায়ের পায়ে।
পাহাড়জুড়ে সবুজ গাছের শ্যামল কোমল ছায়া
দাদীর মতো হাত বুলিয়ে বাড়ায় স্নেহের মায়া
সেই পাহাড়ে অরুণ ফোটে জবার মতো রূপে
নদীর জলে দেখতে যেনো ডিমের কুসুম স্যুপে।
পশ্চিমে তার আছে সাঁকো লাল রঙের এক দেহ
বৃটিশরাজের হাতে গড়া রানির অপার স্নেহ
কালুরঘাটের এই সাঁকোতে সেদিন একাত্তরে
পাক সেনারা টহল দিতো গভীর রাতে ভোরে।
মুক্তিযোদ্ধা সাঁকোর নিচে ডুব সাঁতারে যেতো
বুদ্ধু বোকা পাকিস্তানি সৈন্য ধোঁকা খেতো
এই সাঁকোতে যুদ্ধকালে জীবন নিয়ে হাতে
পার হয়েছে আমার নানী ছোট্টমামা সাথে।
দক্ষিণে তার ফসল ভরা বিস্তৃত এক খেতে
লাঙল নিয়ে কৃষকেরা থাকেন কাজে মেতে
এই জমিতে ফসল ফলে বৎসরে তিন বারে
কাউকে কভু তাই দেখিনি হাত পেতেছে দ্বারে।
শীতের সময় এই জমিতে নাড়ার কথা ভেবে
চুরি করা শিমের বিচি থাকতো ভরা জেবে
এই জমিরই দখিন পাশে নাপিতখালী খালে
টেংরা পুঁটি ধরেছি সেই মা’র কাপড়ের জালে।
উত্তরে তার কর্ণফুলি লুসাই হতে নেমে
আমার গাঁয়ের পাশ দিয়ে যায় একটুও না থেমে
তার বুকে যায় বাঁশের ভেলা সাম্পান মাঝির গানে
নায়রীর হয় মন উতলা বাপের ভিটার ঘ্রাণে।
এই নদীতে জেলের জালে হলইগুড়া মাছে
নিজের গায়ে রূপো মেখে রোদের রঙে নাচে
কলার নৌকা পাহাড় হতে এই গাঁ দিয়ে গেলে
আমার মতো দুষ্টু কিশোর তাদের নিয়ে খেলে।
ছবির মতো নিটোল গ্রামের এমন পরিবেশে
নদীর জলে রূপকথারা যায় অজানার দেশে
এই গাঁয়েরই মা-বধূরা দূরদেশে কেউ গেলে
তীর ধরে সব চেয়েই থাকে অপলক চোখ মেলে।
আমার এ গাঁ সবুজ শ্যামল সহজ সরল প্রাণে
পর্যটকের মনের ভেতর প্রশান্তি সে আনে
সবার চোখে এই গ্রামখানি নদীর কপালে টিপ
যেইখানে যাই সেইখানে তাই থাকবে চরণদ্বীপ।
চাঁদ-সূর্য
সন্ধ্যাবেলায় চাঁদ আকাশে যখন মারে উঁকি
সূর্য তখন যায় লুকিয়ে মনখানা তার দুখি
সারাটা দিন সে আলো দেয় মানুষ রাতে ভোলে
চাঁদটাকে সে পারলে নিয়ে আদর করে কোলে।
সূর্য হতে রক্ষা পেতে মানুষ রাখে ছাতা
চাঁদ উঠলে উল্লাসে হায় সবাই ডাকে ভ্রাতা
চাঁদকে দেখে মা-মাসীরা আহ্লাদে আটখানা
দুপুর রোদে সূর্যটাকে দেখলে হয় ঘাট মানা।
চাঁদেরও কলঙ্ক আছে চাঁদ তবু পায় আদর
সূর্য কতো ঝকঝকে তাও পাচ্ছে না তার যা দর
চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে সূর্য কিন্তু তরুণ
তবু চাঁদের দাম আছে খুব সূর্য বেহাল করুণ।
চাঁদ বাড়লে পূর্ণিমা হয় মানুষ তখন সুখে
হয় নিশাচর, অরণ্যে যায়, যায় সাগরের বুকে
চাঁদ বরণে রয় মুখিয়ে জাগলে অরুণ রাগে
সূর্য মামা তাই বিকেলে নিজেই বিদায় মাগে।
রাতের চাঁদে কী মোহ হায় সূর্য না পায় ভেবে
তার অভিমান রয় গোপনে কে তার জবাব দেবে?
তাইতো সূর্য হঠাৎ করে গ্রহণ লাগায় নিজে
আপন মনে কাঁদতে থাকে চোখের জলে ভিজে।
সাগর দেখা
রাতের ট্রেনে মেঘনা ছোটে সাগর যাওয়ার তালে
চাঁদ ছুটে যায় পথ পেরিয়ে গাছের ডালে ডালে।
মেঘনা ছোটে রেলের ওপর চাঁদ ছুটে যায় হাওয়ায়
ঠিক যেন এক ঘি-পরোটা ভাজছে আকাশ তাওয়ায়।
মেঘনা হলো সাপের মতো চাঁদ যেন এক গোলক
যাত্রাপথে দুয়ের মাঝে হয় দেখা কয় পলক।
মেঘনা মারে বাঁশিতে ফুঁ চাঁদ শুনে দেয় গড়ান
এমন দৃশ্যে হৃদয় নাচে আকুল করে পরাণ।
ছুটতে ছুটতে মেঘনা এসে থেমেছে লাকসামে
চাঁদ ধরেছে বায়না এবার মিটাবে চা’র দামে।
ইঞ্জিনে তার টান পড়েছে পা হয়ে যায় মাথা
চাঁদ হেসে কয় মেঘনা তুমি উল্টে দিলে পাতা।
মেঘনা এসে দম নিয়েছে একটুখানি ফেনী
চাঁদ নিয়েছে ভাবটা এমন সে যেন খুব জ্ঞানী।
সীতাকুণ্ডে পাহাড় এসে আটকে দিলো পথে
চাঁদখানা হায় বাঁকিয়ে ঘাড় কাটায় কোনোমতে।
মেঘনা এলে পাহাড়তলী চাঁদ গিয়েছে ঘুমে
অরুণ এসে তার কপালে দেয় রাঙা এক চুমে।
বটতলীতে মেঘনা নিথর চাঁদ হয়েছে হাওয়া
আর হলো না দুয়ের কারুর সাগর দেখতে যাওয়া।
আমার বন্ধু
প্রতিদিনের সঙ্গী আমার বন্ধু আমার খাঁটি
কখনও তার পিঠে চড়ি আর কখনও হাঁটি
বন্ধু আমার দুপেয়ে সে পা দুটো তার চাকা
দেখতে যদি না পাই তাকে মনটা লাগে ফাঁকা।
ঘন্টি বাজে টিং টিঙা টিং প্যাডেল দুটো বেজায়
পথ দিয়ে সে গেলেই সবাই বুঝতে পারে কে যায়
তার পেছনে আসন আছে সে আসনে সওয়ার
হয় অনেকেই লজ্জাবিহীন ধার ধারে না কওয়ার।
আমার সঙ্গী কয় না কথা কেবল টানে পিঠে
মাঝে মাঝে মবিল সে খায় তার প্রতিটি গিঁটে
ইস্কুলে নেয় বাজারে যায় রাত-বিরেতে সহায়
দুচাকার এই সাইকেলটা হাজার ধকল পোহায়।
আমার বন্ধু চক্রযানের নাম আছে এক ভারী
তার দেহে তা সিল মারা ভাই দেখতে বাড়াবাড়ি
রাত্রি হলে শেকল বেঁধে নিরাপদেই রাখি
আমার বন্ধু হিরোর সাথে এক দশক আজ থাকি।
[পীযূষ কান্তি বড়ুয়া বহুমাত্রিক লেখক। কবি, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমধিক পরিচিত। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে চলা গিরিতটিনী কর্ণফুলির উর্বর দক্ষিণ তীরে বোয়ালখালি উপজেলার চরণদ্বীপ গ্রামে তার জন্ম। ১৯৭৩ সালের ১০ অক্টোবর । তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি (১৯৯০), চট্টগ্রাম কলেজ থেকে (১৯৯২) এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এমবিবিএস পাশ করেন। এমবিবিএস পাশ করে জীবনের প্রয়োজনে জীবিকায় মনোনিবেশ করেছেন। কর্মজীবিতার কারণে মেঘনা পাড়ে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে স্ত্রী মুক্তা পীযুষ, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও নারী নেত্রী এবং দুই পুত্র প্রত্ন পীযূষ ও প্রখর পীযূষকে নিয়ে বসবাস করছেন।
সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ সেই শৈশব থেকে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন ছড়া দিয়ে খেলাঘর সাহিত্য বাসরে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ কুড়ির অধিক । ‘তোমার নিবীতে অন্য কেউ’ (২০০৫) তার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ, বের হয় শৈলী প্রকাশন, চট্টগ্রাম থেকে। প্রথম উপন্যাস ‘সায়নালোকে এক জীবনের সন্ধ্যায়’ (২০১৩, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস)। ছড়াগ্রন্থ : ‘ইলিশের বাড়ি’ (২০১৭), ব-দ্বীপ হতে বাংলাদেশ। কিশোরকবিতা : ফুল ফোটাবার কাব্য । প্রবন্ধ সংকলন : ‘প্রজ্ঞা-প্রসূন। ছোটগল্প সংকলন : ‘ ‘কল্পকুসুম’ (২০১৮) ।
শিশুতোষ গ্রন্থ : লুই পা’র কলম, প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স। গল্পগ্রন্থ : ভূতুড়ে পাখা, ঐ
মুক্তিবীর। গল্পগ্রন্থ : তারা মাসী চাঁদ মামা।
সনাতনী বিতর্ক নিয়ে তার দুটো গ্রন্থ ‘বিতর্ক বিধান’ ও ‘বিতর্ক বীক্ষণ’ প্রকাশিত হয়েছে। ‘বিতর্ক বিধান’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন টিআইবি-সনাক, চাঁদপুর এবং ‘বিতর্ক বীক্ষণ’ বইটি প্রকাশ করেছেন সিকেডিএফ, চাঁদপুর।
পুরস্কার ও সম্মাননা :
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’ প্রতিযেগিতায় গীতি কবিতায় বিজয়ী,২০০৯; চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার (প্রবন্ধ ), জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা (লোক-সংস্কৃতি গবেষণা), চাঁদপুর জেলা ব্র্যান্ডিং প্রকাশনার গ্রন্থিত ছড়াকার; বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য সম্মাননা, কলকাতা চতুরঙ্গ সাহিত্য সম্মাননা; দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ লেখক সম্মাননা; ইনার হুইল ক্লাব সব্যসাচী লেখক সম্মাননা ইত্যাদি।


