ঝিনুকের মাড়
আমারে দে একখান পুরনো কাবারদানি-
তার ভিত্রে থকথকা নুনভেজা সময়
তোরা সব ওলটরস খা-
না গোধূলির আগুনঠেলাঠেলি নয়,
গেরস্তবাড়ির মাচায় যেই সব অর্ধমরা স্মৃতি ঝুলে
তারাই আমার গর্ভদংশা বেদনার খয়রা বালিশ।
ওহে পাটকলের ভাঙা সাইরেন, বাজ-
দে একখান অন্ধকারে চুবোনো বালতি
আমি চুপ থাহি আর শ্বাস ছাড়ি নীলচে আখরোটভেজা বাতাসে।
আহ্, কী গোবরেসময়!
বড় স্বপ্নকাঁটা প্রেমিকেরা
জীবনের পাটালি গুড় মুখে ধইরা বলে-
আবুর’মা তোরে ভুইলা থাহন যায় না!
ছিঃ কি মিছা বয়ান!
ওলো মিতুদি, আমারে একখান ঢেউভর্তি ঝিনুক খুলি দে, থেঁতো করি, গিলে ফেলি
ঘুমাই
তারপর ডুইবে মরি প্রেমের জলমগ্ন পক্ষাঘাতে।
বেন্নাবেলা মড়ার মতন শান্ত এক বাক্য আওড়াই ;
বিষ না-
মাটি খাই।
পিইষে মরি ঝিনুকের মাড়পুরা মোহনার গায়ে!
হাফউড়া কঙ্কাল
বেইন্নার কুয়াশায় হাপরের শ্বাসে লাল হয়ে ওঠে লোহার শরীর
হাতুড়ির ঘায়ে তাগো জীবনটা ধাতুর মতোই শক্ত
পথের ধারে বসে দিনের ছেঁড়া জুতোর অংক কষে তালিতবনে মুছে একান্ন বছরি ঘাম!
পাতলা ভাতের থালায় লবণটা ছোট্ট চাঁদ,
ডাইলের জলে ডুইবে থাকে আস্তো একটা খেপসাদিন।
ওলো মনুর মা, আর কত মরিচ দুপুর!
আর কত ভাঙা বিকেল সেলাই করে বেঁচে থাকা!
আর কত কামারের ঘরে জন্মায় নয়া সিলসিলা!
ওয়াফেদের বয়ানে এরাই ত হাফউড়া কঙ্কাল!
তারপর সন্ধ্যার অন্ধকারে হাপর থেমে গেলে
সবাই ফিরা যায় ঘরে
চুলার ধোঁয়ার ভিত্রে
আগুনের মোয়া খেয়ে শিশুরা ঘুমায়।
আমি দেহি, কেউ পুরানা দা শান দেয়
কেউ ভাঙা কাস্তে জোড়া লাগায়
আর ভেতরে ভেতরে ভাটির কাছে বসে
নিজেদের ভাগ্য ধাতুর মত পিটিয়ে সোজা করবার চায়!
দিগন্তবাহা নৌকা
নিস্তব্ধ বিলের ঢেউয়ে থমকায় চাঁদের নোনা শ্বাস,
কোথাও নাই নয়াসুরুজের ছায়া, নাই কোমর ভাঙা সারসও!
খালি ভাঙা বাঁশির গর্তে আজ গোধূলি লুকায়–
বারিখাঁ নিজের বুক ফুইলা খোঁজে পুরনো ঝড়ের স্বর।
হ, এই দেহটা ছিনতাই হইছে বহুদিন— কেউ ফেরত দেয় নাই!
তারাগুলা পাগলের মতো লাফাইয়া লাফাইয়া গালি ছোঁড়ে,
রাত গভীর হলেই নাকি আত্মার রুগ্নতা বাড়ে।
চম্পাবনের শিশুরা ঘুমায় আগুনের মাথায়-
তাগো দাগগুলা মুছা দেয়া জরুরি
না হইলে পুরনো ক্ষত বাইন্ধা মইরা যাইব শেফালিরমা!
পৃথিবী যদি পুরা স্বপ্ন হইয়া যায়,
তহন কবিতার সিন্দুকও হোগলার পাটির মতো ভাসে জলে।
সাহসী মন ভবিষ্যতের ধুলায় হাঁপাইয়া ফিইরা আহে-
হাতে কিছু নাই, শুধু লবণের রোইদ
আর দূরত্বের নুইরা পড়া কান্না।
দেখ বাজান, চোখ তুইলা দেখ-
সাঁঝবুড়িরা ডাইন হাতে ধইরা নত্তুর গান ধরছে
‘হেই, শুন, তোরা কই যাইতেছিস?
হামার আর রক্তে মুক্তি নাই রে পোলাপাইন,
তোগো স্বপ্নের দেহটা ঠাসা ফাটলে।
আর ওই যে দিগন্তবাহা নৌকা-
তোরা ভাবস না, ওটা তো তোরাই ভাসাইছস উঠানের ডুবো স্রোতে।
অনুমোদনহীন
রাষ্ট্রীয় অনুমোদনহীন একটা প্রেম করছিলাম
ভাবছিলাম সফল শাসনযন্ত্র দিয়া বেবাকরে পোষ মানাইমু—
পল্টিবাজ বেয়াইনে বেগড়া দিছে
দিছে নিরীহ জনতাও!
গতকাইল মাইজ্জামিয়ার একাডেমিত গেছিলাম ওয়ালীরে পড়তে—
বাংলায় ঢুইক্কা শুনি শিক্কিত বাক্যরা পুলিশ হইয়া গেছে
ব্যাকরণ হইছে লাঠি
মুষ্টিবদ্ধ হাতে ঘোষণা করলাম, যে শব্দ শোষণের পক্ষে দাঁড়ায় তাকে ছিঁড়া ফেলো-
আমি নির্দোষ হন্তাকারী কেননা শব্দ হত্যা কোনো অপরাধ নয়।
ঈশ্বরকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় তুলব। যদি তিনি নির্দোষ হন, তবে প্রমাণ দিক
না পারলে
নীরবতাও অপরাধ।
দূরপাল্লার ট্রেন
উলঙ্গ দিঘীর লাহান খাইল্লা আকাশ
বকপক্ষী নাই, নাই উড়ুক্কু সাপও
দিনকানা জোনাকিরা মরুভূমির মইদ্যে বন খুঁজে
মৃদু সুরের গানে বসিরখাঁ হাত্তালী কুড়াইতে চায়
না, আমার ছাপান্ন হাজার গিরা দেহার কেউ নাই!
নক্ষত্রেরা একে অপরকে গালাগালে ব্যস্ত
বুকে যহন অশব্দ আগুন, তহন সমাধির পেরেক শক্ত করন জরুরি!
বিশ্ব যদি কবিতা হয়, কবি’র হোগলাঘরও একটা শিল্প
সাহসী আত্মারা জ্বরে আর উন্মাদনায় নামে পথে
শূন্য হাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরা আহে ভবিষ্যতের ভেতর__ তারা জানে না তার নিচে স্বাধীনতা
কষ্ট, দূরত্ব আর মৃত্যুর প্রতিধ্বনিতে নেয় পদক্ষেপ —
আয়, সীতাঠাম্মারে কই একখান গীত ধরতে…
‘তোরা অন্ধ
রক্তেই মুক্তি ভাইবা মরিস
অথচ দূরপাল্লার ট্রেনটা তোগো উঠান হইয়াই ছোটে’।
কবি পরিচিত:
কবি ও কথাসাহিত্যিক রেশম লতার জন্ম ১৯৯৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার বুধি গ্রামে। পিতার নাম আছকর আলী, মাতার নাম আসমা বেগম। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তিনি ২০১৩ সালে পূর্বধলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ২০১৫ সালে পূর্বধলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি, ২০১৯ সালে গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স ও ২০২০ সালে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া থেকে একই বিষয়ে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধীনে এম.ফিল গবেষক হিসেবে অধ্যয়নরত। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি গাজীপুর অগ্রণী মডেল কলেজের বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গাজীপুর সাইফুদ্দিন মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। রেশম লতার লেখা ভূমিকা সম্বলিত প্রকাশিত দুটি গ্রন্থ হলো- মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘অহিংসা’ ও ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’।
তাঁর রচিত শতাধিক সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ, অনুবাদ, কবিতা ও গল্প দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ‘নতুন ধারা’র একজন অগ্রণী লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। একজন বিপ্লবী লেখক হিসেবে তাঁর সাহিত্যে নতুনত্বের ছাপ বিশেষভাবে পরিদৃষ্ট। রেশম লতার প্রথম কবিতার বই ‘ঘোলাদ্বীপ’ ২০২৭-এর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হচ্ছে।

