আড্ডাপত্র

; ;

জ্ন্মদিনে নয়ন আহমেদ এর দশ কবিতা

আড্ডাপত্র

লেখা

হিংসার পরিবর্তে লিখলাম- হংস।
নাদ ও নিনাদ কেটে লিখলাম– নদী।
হাঁস তখন সাঁতার কাটতে বেরিয়ে পড়লো ডানা বিস্তার করে।
মানুষের কোনও প্রতিধ্বনি শুনলাম না।

গর্জন করে উঠছিলো ঈর্ষা।
আমি লিখলাম– গন্তব্য।
লিখলাম সন্ত্রস্ত শব্দের পরিবর্তে– শান্তি।
যাবতীয় ক্রোধ মুছে লিখলাম– কান্না।
আর্তনাদ,ঈর্ষা আর সন্দেহ কাটলাম;
সেখানে লিখলাম–ফুল।
শেষে লিখলাম–ভালোবাসা।

ভালোবাসতে কি পেরেছো,মানুষ?

অধ্যাপনা

অনূঢ়া বিস্ময়গুলো জড়াবো
শাড়ির মতোন।
এই পৃথিবীর জন্য এ আমার প্রীতি-উপহার।

লোকেরা জানুক:
এইসব গোপনীয়তা আমি উজ্জ্বল করি।
দ্যাখো নি,স্বর্ণকার পালিশ করে অলংকার!

আসবাবপূর্ণ ঘরের মতো ঝনঝন হবে?
তবে শুরু করো এই অধ্যাপনা।

কে পরে আহমেদের অলংকার?
কলমা পড়িয়ে তাদের করো কনে-বর!

ইতিহাস

কয়েকটা আর্তনাদকে অভিনন্দন জানিয়ে-
কয়েকটা ঔজ্জ্বল্যকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে-
বাড়ি ফিরছে শীত ও মাফলার।

শীত ঘৃণা করে মাফলারকে;
মাফলার প্রতিরোধ করে শীতকে।
শীত,প্রয়োজনে দাঁতের শুভ্রতা বিকশিত করে।
মাফলার জীবন জীবন বলে গলাগলি করে।
তবু একদিন তারা একে অন্যের সহযোগী হয়।
তখন একটি প্রযোজনা
প্রকৃতি জুড়ে দৃশ্যমান হয়।
এমন করেই প্রতিটি ইতিহাস মিশে যায় জাদুকরী রঙে।
মাফলার তখন অদৃশ্য।
শীত তখন অদৃশ্য।
অথবা,তারা একসাথে আত্মগোপন করে।

একদিন এ সবের মধ্য থেকে আমরা উত্তাপ কুড়িয়ে আনি।
ভোরে, ঠিক ছত্রাকপড়া একটা বনরুটির মধ্যকার মর্মার্থকে ইতিহাস বলে জানি।

প্রতীক

এই দ্রষ্টব্যের ভেতর কে বানিয়েছে বহুরঙা হাহাকার?
দৃষ্টি তবে ছিলো কি বধির?
কেন চাও নি সরল স্থাপত্য? অনিন্দ্য কারুকাজ!

জড়ত্ব ঘুচে যাবে আজ।

চাও।
অমরত্ব পাবে।

কে বলেছে-কোনো চিন্তনই প্রসবের যোগ্য নয় আজ!
কার মরে গিয়েছিলো অযুত ভ্রূণ?
লুকোচুরি ও সূর্য চুরি গেছে কার?
কার হারানো গিয়েছে টুটাফাটা জীবন-যাপন?
কে থাকে ঘোর হতাশায় ডুবে?
তাকে কি স্পর্শ করে না শিশুর সারল্য
কিংবা সকাল-দুপুর?

তার কি ছিলো না ডান হাত?

গ্রীবা উঁচু করো।
ঝুঁকে থাকো বাড়িয়ে দুহাত।

নিশ্চয়ই,আমি তোমাকে দেবো গেবের রাজহাঁস।
…..
টীকা:মিশরীয় পুরাণে গেব হচ্ছেন পৃথিবীদেবতা,তার প্রতীক রাজহাঁস।

কবিতা

পাখির সাথে শিস দিচ্ছিলো একটি কবিতা —

ঝিমিয়ে-পড়া দুপুরে লুকিয়ে ছিলো হন্তারক ‌।
কেটে নিলো তার ঠোঁট,

জিহ্বা।
আর ডান হাতের আঙুল।

রক্ত ঝরলো ঘন রোদের প্রকরণে।

কী সুন্দর দ্রবণ!

কবিতাকে পাখি মনেকরা হন্তারক এবার একটু নিশ্চিত হলো‌।
যাক! ও আর শিস দিতে পারবে না!
লিখতে পারবে না কোনও বাক্য বা পদবন্ধ।

তার ভাষাকে তো থামিয়ে দেয়া গেলো।
আর সমাহিত করা গেলো পঞ্চাশটি লাল-নীল বর্ণ।

কবিতা কিন্তু পায়ের আঙুল দিয়ে লিখে চললো কতো ধরনের শব্দ!
অপূর্ব এবং ঢেউ- রঙা।
বাঁকা। নারীর মতো উচ্চাঙ্গ।
রাগী। অহংকারী।
বদমেজাজি।
সভ্য- অসভ্য।
শান্ত-অশান্ত।
নম্র – বিদ্রোহী।
কিন্তু অনুচ্চারিত থেকে গেলো সব।

একদিন ক্যানো যে গোঁৎগোঁৎ করে উঠলো কবিতা!

কেঁপে উঠলো চরাচর।।

ভোরে, বোবার মতো সেই ধ্বনি বেরিয়ে পড়লো সব প্রাচীর ভেদ করে।

আঙুল ছাপিয়ে
কলম অতিক্রম করে
পাহাড় বিদীর্ণ করে
জনপদে জনপদে বসতি গড়লো তার বর্ণমালা।

সেই থেকে কবিতাই রাষ্টের ভাষা।

বিগত

সূর্যের ছায়া মুছে গেছে কিছু আগে।
ছিলো সেখানেই স্থির দুটো কথা।
থেমে গিয়ে তার রঙিন সন্ধ্যারাগে-
বাজলো বিপুল, স্মৃতি কি কমল-লতা?

সূর্যের ছায়া ধ্রুব নেই আজ। ছিলো?
হারাবো কেবলই, পৃথিবীর রীতি জানি।
তবু ছায়া ধরি, ফাঁদ পাতি আর কতটুকু প্রীতি নিলো
মিলাবো তবুও। ছুটছে তো দ্যাখ্যো গোপন কী কানাকানি!

নামলো তো আজ হীরের মতোনই সন্ধ্যা সন্ধ্যা ঘোর।
থাকবে না সেও। দীপ্তি কিংবা শীতল-সরব ধার।
জিলেটের মতো দু’ধারী দ্যুতি তীব্র ব্যাকুল ভোর
চমকাবে তবু। হারাতে হারাতে বিকেলি পাথর-এর কার?

সূর্যের ছায়া বিগত শরীরে ভর করে গেছে কাল।
আজ দেখা হবে? শূন্য মানি না। বলে দাও- ব্যথা লাল?

শান্তি

ডান দিকে কাৎ হয়ে শুয়ে আছে
প্রতিবাদমুখর দু’টো, জলপাই রঙের শান্তি।
মনে হচ্ছে- কিছুক্ষণ পরই সে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যাবে।
তখন নিদ্রাকাতুরে ভোর এসে দু’টো তথাকথিত চুমু খাবে
তার আপেল রঙা গালে।
তুমি বিভ্রমবশত দেখতে পাবে- এশিয়া কিংবা ইউরোপের
ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা রোদ দোল খাচ্ছে।
আহ, বিভ্রম!
তোমাকে অন্ধ করে ছিলো কতো আয়ুষ্মর্তী হাহাকার।
প্রতারক শান্তি,
প্রবঞ্চক শান্তি,
ছদ্মবেশী শান্তি
দালাল বেশী শান্তি,
সুবিধাভোগী শান্তি- কাউকেই তুমি আর চিনতে পারলে না।
বাম দিকে কাৎ হয়ে শুয়ে আছে
চেনতারহিত দু’টো লাল জামার মতো বিষণ্নতা।
কোনও দিন তাকে ডেকে তুলতে পারবে না।
কেবল তুমি এ-পাশ ও-পাশ করে
ডেকে আনলে কয়েকটা বুক কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস।
ইতিহাস লিখছো শান্তির।
তোমার পৃষ্ঠায় নেই ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, মিশর, গুজরাট, ইরাক,
নাগাসাকি, হিরোশিমা, আফগান।
জাপানে কি সূর্য ওঠে সবার আগেই?
তবে যাই, পান করি সূর্যের সিরাপ।

সক্রেটিস

কলেজ-পড়ুয়া মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, “বাবা, সক্রেটিসের কথা জেনেছো?”
বলি- ‘হ্যাঁ।’
মেয়েটা বলে, ‘তুমি তো হ্যাঁ বললে। আসলে, তুমি কোন খবরই রাখো না।’
মেয়েটা বিস্ময়চিহ্নের মতো বেণী দোলালো না। তার ভ্রুজোড়া নেচে উঠলো না। লতিয়ে উঠলো না কিশোরীর চঞ্চলতা। একটা কটকটে লাল রৌদ্র কিংবা টকটকে শাদা হাসিরও প্রশ্রয় ছিলো না। বিমর্ষতা কোনও যমজ বোনের মতো তাকে যুগল বানিয়ে দিলো। আর পাতলা একটা কাঁথার মতো সে আ-বদন বেদনাহত অর্ঘ্য দিয়ে আবৃত করলো নিজেকে। ভারি, অথচ খসখসে কান্না জড়িয়ে বললো, ‘সক্রেটিস গুম হয়েছে, বাবা।’
অশ্রুর মতো, রাশি রাশি শিউলী ঝরে পড়লো মেয়েটার কণ্ঠ থেকে।
মনে পড়লো, জন গোমেজের ছেলে সক্রেটিস আমাদেরই পাড়ার ছেলে।

মানুষ

শিশুদের মতো বানান করে করে লিখছি একটি অতি পরিচিত
শব্দ- মানুষ।
তাবৎ রৌদ্র জড়ো হচ্ছে তার দুকূলপ্লাবী ঢেউয়ে।
আমার একটা লাল পক্ষপাত স্বাগত জানাচ্ছে হেসে হেসে।
বললাম :
হে আসঙ্গলিপ্সু ঐশ্বর্য, স্মৃতিনির্ভর ভারবাহী উদ্যম হও।
আমি কোনও অমীমাংসিত ভোর অনুমোদন করবো না।
সে আমার সামনে হাজির করলো কিছু উচ্ছ্বাস, রক্তমিশ্রিত
আবেগ আর ঋজু বিনয়।
যেন একটা পদ্মের মতো ফুটে উঠলো চিরকাল।

তখন শিশুরা নেমে এলো পৃথিবীতে।
তখন জ্বলজ্বলে রোদ ছড়িয়ে পড়লো পৃথিবীতে।
তখন শস্য ও পত্রপল্লবে ছেয়ে গেল এ ভূমন্ডল।
তখন প্রেম, কামনা আর দাম্পত্যের বন্ধনে পূর্ণ হলো এ বসুন্ধরা।

আমি আপ্লুত হলাম। মানুষের প্রেমে বিভোর হলাম।
তবু ওরা আমাকে নিলো না।

কবি পরিচিতি

নয়ন আহমেদ ১৯৭১ সালের ১৫ই অক্টোবর ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর প্রকৃত নাম মোঃ গোলাম কিবরীয়া।তাঁর পিতা আব্দুর রব এবং মাতা আলেয়া বেগম। তিনি ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে এসএসসি পাস করেন এবং পরবর্তীতে কৃতিত্বের সাথে তাঁর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন শিক্ষক। বর্তমানে বরিশাল জেলার হিজলা উপজেলার বাহেরচর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী নয়ন আহমেদ নব্বইয়ের দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সমকালীন সমাজভাবনা, প্রেম, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও গভীর জীবনদর্শন তাঁর কবিতায় উঠে আসে নিজস্ব ভঙ্গিতে। আধ্যাত্মিকতা তাঁর প্রধান উপজীব্য বিষয়। সাহিত্যের সৃজনশীল অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন থেকে সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত ও সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত ১০টি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ইহুদিসমগ্র’ ‘তাঁর নাম আহমাদ (সাঃ)’, ‘কিছু মেরুদণ্ডী উচ্ছ্বাস’, ‘অসম্ভব অহংকার’, ‘নাতিদীর্ঘ দুপুরের ধ্বনি’, ‘এককাপ গণযোগাযোগ’, ‘খনিঘুম’, ‘মারেফত সিরিজ,’ আমার বিবাহিত শব্দরা’,’সবকিছু রোদে দেবো’।

Facebook Comments