আড্ডাপত্র

; ;

গুচ্ছকবিতা । ‎মান্নান নূর

আড্ডাপত্র

সেপ্টে ১২, ২০২৬ | কবিতা, গুচ্ছ কবিতা

ও মেয়ে

‎
‎ও মেয়ে, তোমার যৌবন পড়ি, পড়ি—
‎তোমার হাসির আড়ালে থাকা চমকে ওঠা রোদ।
‎
‎ও মেয়ে, তোমার দ্বিধাগ্রস্ত চোখ পড়ি, পড়ি—
‎চোখের গভীরে টলমল স্বচ্ছ নোনা জল।
‎
‎তোমার রংধনু মন পড়ি, পড়ি—
‎পেকে ওঠা হাতের জাদু।
‎
‎তোমার গোপন শরীর পড়ি, পড়ি—
‎তোমার মেলে থাকা অধরা দু’গাল।
‎
‎ও মেয়ে, তোমাকে পড়ি, পড়ি—
‎আরাধ্য প্রদেয় সেই
‎স্রষ্টার মায়ার প্রপাত।

‎হাবিয়া দোজখ

‎‎একজোড়া পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে
‎মনে হয়, পৃথিবী এখনো আছে।
‎আকাশ আর পাহাড়ের সহাস্য কানাকানি
‎মনে করিয়ে দেয়—
‎পৃথিবী এখনো সুন্দর।
‎
‎একজোড়া শালিক পাশাপাশি উড়ে গেলে
‎মনে হয়, পৃথিবী ভালোবাসার এক প্রশান্ত ঘর।
‎নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে যখন দেখি,
‎এপাড় ওপাড়কে নীরবে ডাকছে,
‎তখন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়—
‎পৃথিবী এখনো মানুষের।
‎
‎কিন্তু যখন দেখি, পাখির বদলে আকাশ চিরে উড়ে যায়
‎মিসাইল আর বোমারু বিমান;
‎যখন দেখি, বহুতল ভবনের ছায়ায়
‎কিছু মানুষ একমুঠো ভাতের অপেক্ষায়;
‎যখন দেখি, ডাস্টবিনে দাঁড়িয়ে একটি শিশু
‎তার পিতার পরিচয় জানতে চায়;
‎যখন দেখি, আমার মা কিংবা বোন
‎নির্ভয়ে রাস্তায় বের হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছে—
‎তখন, তখন মনে হয়,
‎এই পৃথিবীটা আস্ত এক হাবিয়া দোজখ।

শরৎ অতঃপর সেতু কিংবা জাসরিয়া


‎‎
শরৎ আমার প্রিয় ঋতু না, মন খারাপের ঋতু।
‎শরৎ এলেই সবচেয়ে বেশি উদাসীন হই,
‎ঘর ছেড়ে বাউন্ডুলে জীবন বেছে নিতে ইচ্ছে করে।
‎
‎শরৎ এলেই মন ভালো হওয়ার বদলে—
‎অজানা শূন্যতায় হৃদয় হুহু করে ওঠে।
‎
‎কখনো কখনো আমি ঋষি হয়ে যাই, নির্জনে একা।
‎সাদা মেঘ, বিলের ওপারে হাওয়ার মাঠ
‎আমাকে কেবল একা হতে শেখায়—কেবল বিরহে একা।
‎
‎মরে যেতে ইচ্ছে করে, ভীষণভাবে মরে যেতে।
‎
‎আমি কি কাউকে কোনোদিন ভালোবেসেছি?
‎যদি ভালোবেসে থাকি, তবে তারা আজ কোথায়?
‎
‎তাদের বলেছিলাম,
‎যদি মারা যাই, এই শরতেই মরব।
‎তারা খুব কেঁদেছিল।
‎
‎তারা আজ কোথায়,
‎কোন মেঘের পাড়ায়?

রাখছি তোমার কথা

‎
‎আমার কাঁধে তোমার দেওয়া বোঝা,
‎রাগ করিনি, নির্বিবাদে মেনে;
‎হাঁটছি আজও কতটা কাল একা—
‎এতটা নয়, ভাবছ যত সোজা।
‎
‎এরই মাঝে স্বপ্ন কিছু পুড়ে,
‎ভাতের থালায় ছাইয়ের সমারোহ;
‎ভালোবাসার উঠোন ভরা কাদায়,
‎মরীচিকা স্বপ্ন দেখায় দূরে।
‎
‎তাহাজ্জুদের জায়নামাজে থেকে
‎বলতে পারি—রাখছি তোমার কথা;
‎জানে হৃদয়, জানে আমার খোদা,
‎কেমন করে জীবন বাজি রেখে।

তোমার নামে

জীবন কাটাই তোমার নামে আজও,
সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, রাতও।
তোমার নামেই ঘুম থেকে রোজ উঠি,
তোমার নামেই মেলাই এ চোখ দু’টি।

কবি পরিচিতি

‎‎মান্নান নূর ১৯৮১ সালের ৪ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সূফী ক্বারী ইসমাইল মুন্সী ছিলেন সূফী সাধক এবং সনামধন্য পীর সাহেব।
‎আধ্যাত্মিক আবহে বেড়ে ওঠা একটি ধর্মীয় পরিবারে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। চার ভাই ও সাত বোনের বৃহৎ পরিবারে তিনি দশম সন্তান। পারিবারিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সুফি আদর্শ তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাজগত গঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি সাহিত্যাঙ্গনেও তাঁর বিচরণ উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখে চলেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ- কাব্যগ্রন্থ : ১. ‘তবে সমুদ্রেই চল’ ২.‘একদিন পিরামিডের কথা বলেছিলে, ৩. রক্তাক্ত ফিলিস্তিন এবং এক নারীর কান্না । গল্পগ্রন্থ : ‘একটি জায়েজ আত্মহত্যা’, এবং ধর্মীয় গ্রন্থ ‘মেসওয়াকের গুরুত্ব ও ফজিলত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
‎
‎শিক্ষক, ধর্মচিন্তক, আধ্যাত্মিক সাধনা ও সাহিত্যসাধনাকে সমান্তরালভাবে ধারণ করে মান্নান নূর নিরলস পথচলা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর লেখায় যেমন ধর্মীয় অনুভব ও মানবিক বোধের গভীরতা প্রতিফলিত হয়, তেমনি ফুটে ওঠে জীবন, সমাজ ও সময়কে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও মানবকল্যাণের প্রত্যয়ে তিনি আজও অবিচল।

Facebook Comments