ও মেয়ে
ও মেয়ে, তোমার যৌবন পড়ি, পড়ি—
তোমার হাসির আড়ালে থাকা চমকে ওঠা রোদ।
ও মেয়ে, তোমার দ্বিধাগ্রস্ত চোখ পড়ি, পড়ি—
চোখের গভীরে টলমল স্বচ্ছ নোনা জল।
তোমার রংধনু মন পড়ি, পড়ি—
পেকে ওঠা হাতের জাদু।
তোমার গোপন শরীর পড়ি, পড়ি—
তোমার মেলে থাকা অধরা দু’গাল।
ও মেয়ে, তোমাকে পড়ি, পড়ি—
আরাধ্য প্রদেয় সেই
স্রষ্টার মায়ার প্রপাত।
হাবিয়া দোজখ
একজোড়া পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে
মনে হয়, পৃথিবী এখনো আছে।
আকাশ আর পাহাড়ের সহাস্য কানাকানি
মনে করিয়ে দেয়—
পৃথিবী এখনো সুন্দর।
একজোড়া শালিক পাশাপাশি উড়ে গেলে
মনে হয়, পৃথিবী ভালোবাসার এক প্রশান্ত ঘর।
নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে যখন দেখি,
এপাড় ওপাড়কে নীরবে ডাকছে,
তখন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়—
পৃথিবী এখনো মানুষের।
কিন্তু যখন দেখি, পাখির বদলে আকাশ চিরে উড়ে যায়
মিসাইল আর বোমারু বিমান;
যখন দেখি, বহুতল ভবনের ছায়ায়
কিছু মানুষ একমুঠো ভাতের অপেক্ষায়;
যখন দেখি, ডাস্টবিনে দাঁড়িয়ে একটি শিশু
তার পিতার পরিচয় জানতে চায়;
যখন দেখি, আমার মা কিংবা বোন
নির্ভয়ে রাস্তায় বের হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছে—
তখন, তখন মনে হয়,
এই পৃথিবীটা আস্ত এক হাবিয়া দোজখ।
শরৎ অতঃপর সেতু কিংবা জাসরিয়া
শরৎ আমার প্রিয় ঋতু না, মন খারাপের ঋতু।
শরৎ এলেই সবচেয়ে বেশি উদাসীন হই,
ঘর ছেড়ে বাউন্ডুলে জীবন বেছে নিতে ইচ্ছে করে।
শরৎ এলেই মন ভালো হওয়ার বদলে—
অজানা শূন্যতায় হৃদয় হুহু করে ওঠে।
কখনো কখনো আমি ঋষি হয়ে যাই, নির্জনে একা।
সাদা মেঘ, বিলের ওপারে হাওয়ার মাঠ
আমাকে কেবল একা হতে শেখায়—কেবল বিরহে একা।
মরে যেতে ইচ্ছে করে, ভীষণভাবে মরে যেতে।
আমি কি কাউকে কোনোদিন ভালোবেসেছি?
যদি ভালোবেসে থাকি, তবে তারা আজ কোথায়?
তাদের বলেছিলাম,
যদি মারা যাই, এই শরতেই মরব।
তারা খুব কেঁদেছিল।
তারা আজ কোথায়,
কোন মেঘের পাড়ায়?
রাখছি তোমার কথা
আমার কাঁধে তোমার দেওয়া বোঝা,
রাগ করিনি, নির্বিবাদে মেনে;
হাঁটছি আজও কতটা কাল একা—
এতটা নয়, ভাবছ যত সোজা।
এরই মাঝে স্বপ্ন কিছু পুড়ে,
ভাতের থালায় ছাইয়ের সমারোহ;
ভালোবাসার উঠোন ভরা কাদায়,
মরীচিকা স্বপ্ন দেখায় দূরে।
তাহাজ্জুদের জায়নামাজে থেকে
বলতে পারি—রাখছি তোমার কথা;
জানে হৃদয়, জানে আমার খোদা,
কেমন করে জীবন বাজি রেখে।
তোমার নামে
জীবন কাটাই তোমার নামে আজও,
সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, রাতও।
তোমার নামেই ঘুম থেকে রোজ উঠি,
তোমার নামেই মেলাই এ চোখ দু’টি।
কবি পরিচিতি
মান্নান নূর ১৯৮১ সালের ৪ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সূফী ক্বারী ইসমাইল মুন্সী ছিলেন সূফী সাধক এবং সনামধন্য পীর সাহেব।
আধ্যাত্মিক আবহে বেড়ে ওঠা একটি ধর্মীয় পরিবারে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। চার ভাই ও সাত বোনের বৃহৎ পরিবারে তিনি দশম সন্তান। পারিবারিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সুফি আদর্শ তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাজগত গঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি সাহিত্যাঙ্গনেও তাঁর বিচরণ উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখে চলেছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ- কাব্যগ্রন্থ : ১. ‘তবে সমুদ্রেই চল’ ২.‘একদিন পিরামিডের কথা বলেছিলে, ৩. রক্তাক্ত ফিলিস্তিন এবং এক নারীর কান্না । গল্পগ্রন্থ : ‘একটি জায়েজ আত্মহত্যা’, এবং ধর্মীয় গ্রন্থ ‘মেসওয়াকের গুরুত্ব ও ফজিলত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষক, ধর্মচিন্তক, আধ্যাত্মিক সাধনা ও সাহিত্যসাধনাকে সমান্তরালভাবে ধারণ করে মান্নান নূর নিরলস পথচলা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর লেখায় যেমন ধর্মীয় অনুভব ও মানবিক বোধের গভীরতা প্রতিফলিত হয়, তেমনি ফুটে ওঠে জীবন, সমাজ ও সময়কে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও মানবকল্যাণের প্রত্যয়ে তিনি আজও অবিচল।

