আড্ডাপত্র

২৭ আষাঢ়, ১৪৩৩; ১১ জুলাই, ২০২৬;রাত ১:২২

গুচ্ছকবিতা|শাহাবুদ্দীন নাগরী

আড্ডাপত্র

জুলা ১০, ২০২৬ | কবিতা, গুচ্ছ কবিতা

           

চিত্র প্রদর্শনী

আমরা মদ পান করতে করতে শয়তানের ফ্রেমবন্দি
পোর্ট্রটে ঝুলিয়ে দিলাম দেয়ালে, পায়ের নিচে মখমলের
ভারী কার্পেট থেকে উঠতে লাগল গরম বাতাস,
মাথার ওপরের সুদৃশ্য ঝাড়বাতির কাচ ভেদ করে বিচ্ছুরিত
হতে থাকলো আতশবাজি, আমাদের বগলের ঘাম
ঘনীভূত হয়ে মেঘ হলো, আর বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে
লাগল উপস্থিত রমণীদের মাথার ওপর। প্রধান অতিথি
জেল থেকে সদ্য খালাস পাওয়া সন্ত্রাসের গডফাদার নতজানু
হয়ে ফিতে কাটলেন, বুড়িগঙ্গা থেকে হোসপাইপে প্রধান
অতিথির ওপর ছড়িয়ে পড়ল বর্জ্যবৃষ্টি, অসাধারণ
নগ্ননৃত্য পরিবেশন করলেন সাড়াজাগানো মঞ্চসুন্দরী,
মুখোশপরা একদল শিল্পবোদ্ধা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে
প্রদর্শনীর প্রতিটি চিত্রের রসঘন বর্ণনা দিলেন,
মাটিসে’র রমণীদের নাভীমূল বিদ্ধ করলেন তরবারির ভাষায়,
শিল্পরসিক উপস্থাপক আর এক পেগ পান করে অতঃপর
কক্ষের সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে শয়তানের উদ্দেশে পাঠ করলেন
মৃত্যু পরোয়ানা, নারীদের উরু বেয়ে ঝরতে লাগল দ্রাক্ষারস,
আর মাতাল পুরুষেরা কুকুরের মতো জিভ বের করে
তাকিয়ে থাকল অন্ধকারে, ফ্রেমবন্দি শয়তান প্রদর্শনীর দেয়াল
থেকে কাচের মার্বেল হয়ে গড়িয়ে পড়ল কার্পেটের ওপর।

লক্ষ লক্ষ দেবদূত

তুমি আমাকে লিখতে বারণ করেছো, আমি লিখিনি কিছুই, পূর্ণিমার
চাঁদের গহীন থেকে খসে পড়া জ্যোৎস্না দেখে কতোবার বিহ্বল
হয়েছি, পাতাঝরার শব্দ শুনে মনে হয়েছে জনতার মিছিল বুঝি চলে
যাচ্ছে রাজপথ ভেঙে, আমার কান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে হিমশীতল
বুলেটের শব্দ, মনে হয়েছে দানবের হুঙ্কার ট্রিগারে আঙুল দিয়ে উড়িয়ে
দিচ্ছে আবাবিলের ঝাঁক, তবুও লিখিনি কিছুই, না কবিতা, না গল্প,
একছত্র ডায়েরি লেখার চিরন্তন অভ্যাসের গলায় পরিয়ে দিয়েছি
জল্লাদের ফাঁস, তোমার বারণ শুনেছি।

তুমি আমাকে অবজ্ঞায় কলাগাছ হয়ে থাকতে বলেছো, আমি থেকেছি,
একচুল নড়িনি, উৎপাদনের কারুকাজ করে তোমার উন্নয়নের পাল্লায়
যুক্ত করেছি সুস্বাদু কলা, শিল্পকলার নাচ-গানে তোমার অমরত্বের জন্য
স্লোগান দিয়েছি, তুমি যেভাবে বলেছো সেভাবেই করেছি ‘জয়বাংলা’র
কনসার্ট, বন্দনায় ভিজিয়ে দিয়েছি তোমার শুষ্ক জমিন।

তোমার রাজকীয় আয়োজনের অর্থনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তুমি আমার
ব্যাংকের হিসাব পাঠিয়ে দিয়েছো ডিপফ্রিজে, মামলা গুণতে যেন ভুল
না করি তাই আমার হতে তুলে দিয়েছো পাটীগণিত, বলেছো বলদ হও,
আমি দেশি বলদ হয়েছি, লাঙলের ফলা মাটির গভীরে ঠেলে দিয়ে
জাগাতে চেয়েছি মাটি, জানি মাটি জাগলে জেগে ওঠে অগ্নিস্ফূলিঙ্গের
মতো লক্ষ লক্ষ মানুষ, কিন্তু তার আগেই তোমার প্রিয়জনেরা আমার
ঘরকে বানিয়ে দেয় আয়নাঘর, দৃষ্টিকে বেঁধে দেয় কালো মেঘ দিয়ে,
তোমার আশ্চর্য কৌশলের কাছে বিলুপ্ত হয় লোনাজল, চোখের গভীরে
শুনি সেই জলের শব্দ, আমি তাই পাথরে পাথর ঘষে বেহুদা জ্বালাতে
চাইনি আদিম বর্বরতা।

আমি জানতাম তোমার গুণপনার জাবর কাটতে কাটতে আমি
একদিন জেনে যাবো কীভাবে বিশ্বাসী হতে হয়, কোন্ মন্ত্র-ম্যাজিকের
ছোঁয়ায় কীভাবে তোমার পারিষদ দল চাটুকার-লুটেরা থেকে হয়ে ওঠে
ডাকাত সম্প্রদায়, বই বললেই তারা খোঁজে চেকবই, টাকা ছুঁলেই হয়ে
যায় ডলার-পাউন্ড, আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি কীভাবে নির্মিত হয়
বেগম-বিবি’র বাড়ি, কীভাবে ইতিহাস মুছে যায় তোমার সুরম্য গোয়ালের
নব্য রাখালদের ইরেজারে, তোমার বারণ তাই লিখতে পারিনি এই
কূটচালের জমা-খরচ, বেনোজলে ভাসিয়ে দিয়েছি ক্ষতের কফিন, অন্ধ
জ্যোৎস্নায় প্রার্থনা করেছি- লক্ষ লক্ষ দেবদূতের পা একদিন এই মাটি
ছোঁবে, তাদের আলোর মিছিলে ভেসে যাবে রাবণের অন্ধকার যুগ।

কোথাও কিছু একটা ঘটছে

তোমরা কেউ আমাকে কিছু বলছো না, কিন্তু তোমাদের
চলাফেরায় বেড়াল-স্বভাব আমাকে বলে দিচ্ছে কোথাও
কিছু একটা ঘটছে, বেদনাক্লিষ্ট বাতাসের ডানা কিছু শব্দ
আমার কান অবধি পৌঁছে দিচ্ছে, হতে পারে শত হাতুড়ির
নিপুণ আওয়াজ অথবা কোনো ক্ষুব্ধ নদীর চলমান ক্ষোভ,
কিন্তু শব্দ একটা হচ্ছেই, হয়ত কোথাও শুরু হয়েছে নক্ষত্রের
ঠোকাঠুকি, উল্কাপতন, অথবা হতে পারে একদল
ঘোড়সওয়ারের ধুলো উড়িয়ে ছুটে যাওয়া ক্ষুরের হর্ষধ্বনি।

অথচ তোমরা কেউ আমাকে কিছু বলছো না, তোমাদের
আঙুলের শব্দই আমাকে বলে দিচ্ছে তোমরা ডুবসাঁতার
দিতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছ পাপের ডোবায়।
আমি সব শব্দ চিনি, কিন্তু এ কেমন শব্দ যা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে
রাজপথ আর কুড়িয়ে নিচ্ছে সন্ত্রাস ? আাহা ! কেউ নাকে
তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিল পরম শান্তিতে, তার নাসিকার শব্দ
বেহুলার বাঁশি হয়ে মাতিয়ে তুলেছিল পাতকী শহর, যে
শহরে আমি নর্তকীদের কাঁদতে দেখেছি, ওদের পায়ের
নূপুর বেড়ি হয়ে খামচে ধরেছে নাচের মুদ্রা, এই অবেলায়
আমি কি শুনতে পাচ্ছি সেই নর্তকীদের তাল-লয়হীন মুদ্রার
বেখাপ্পা ক্রন্দন ? অরক্ষিত শহরের পাগলা-ঘন্টা বাজাবার
মতো কেউ কি আর অবশিষ্ট নেই ?

তোমরা কেউ আমাকে কিছু বলছো না, এই চার দেয়ালের
ভেতর একজন অন্ধকে একটা ভুল লাঠি ধরিয়ে দিয়ে নিজেরা
কোমরে গুঁজে নিচ্ছ ধাতব অস্ত্র, ফলের বদলে ব্যাগভর্তি
গ্রেনেড নিয়ে মাথায় বেঁধেছো লালশালু, অথচ আমি দিব্যি
শুনতে পাচ্ছি তোমাদের চোখ থেকে আতঙ্কে লাফ দিয়ে উড়ে
যাচ্ছে লাভের মৌমাছি, টাকা ভাগাভাগি হবার আগেই
দরপতনে বিধ্বস্ত হচ্ছে শেয়ারবাজার, ব্যাংকের ভল্ট থেকে
লুটে নেয়া চক্চকে নোট আটকে যাচ্ছে সীমান্তের কাঁটাতারে,
হরিলুটের একটা নিজস্ব শব্দ আছে, লুটেরাদের এটিএম কার্ড
ব্লক হবার শব্দটাও আমি শুনতে পাচ্ছি স্পষ্ট।

তোমরা কেউ আমাকে কিছু বলছো না, কেন থেমে গেছে
চালকলের শব্দ, ইটভাটার চুল্লি থেকে আগুনের শব্দ হয়,
সে আগুন চুরি হয়ে গেছে প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে,
তোমাদের পোষা কুকুরের দল ঢুকে গেছে নিরাপদ আস্তানায়,
তাদের পালানোর শব্দ আমার কানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে
গণকবরের উপর গজিয়ে ওঠা সবুজ ক্যাকটাসের সারি ।

তোমরা কেউ আমাকে একবারও বলছো না, যে শব্দটা আমি
শুনতে পাচ্ছি সেটা কিসের শব্দ, তানপুরায় বাঁধা মিহি স্বরের
টানা তারগুলো এক ধরনের শব্দ তৈরি করে, ইতিহাসের গলায়
ছুরি চালিয়ে দিলে ঠিক যে শব্দটা দমবন্ধ আর্তনাদের মতো
বেরিয়ে আসে অনেকটা সেরকম, আমার কানের পাশে র্ঘুর্ঘুর
করছে। তোমরা কি হত্যা করছো সেইসব ইতিহাসের
জীবন্ত গাভী, যার দুধ এতোকাল পান করে তোমরা নিতে
চেয়েছো অমরত্বের স্বাদ?

আমাকে সত্যি করে বলো, তোমরা কেউ কি শুনতে পাচ্ছো না
কোটি কোটি কণ্ঠস্বর ঘিরে ফেলেছে সাদ্দাদের নতুন জান্নাত ?
শহররক্ষা নদীর মৎস্যশিকারিরা তাদের নৌকার মাছ ফেলে
তুলে নিয়েছে টন টন বারুদ, আর তিরন্দাজের তীরের অগ্রভাগে
ঘাপটি মেরে বসে গেছে এক লক্ষ মৃত্যুদূত, আমি শুনতে পাচ্ছি
তোমাদের পলায়নের শব্দ, সেইসব শব্দ হিমশীতল ছুরির মতো
আমার চোখ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে গাঢ় অন্ধকার।

আমি দেখতে পাচ্ছি ইতিহাসের ছাপাখানা থেকে ধোঁয়ার মতো
উড়ে যাচ্ছে কোটি টাকার বাণিজ্য-বেসাতি, হ্যামিলনের সেই বাঁশি
শুনে আটকে থাকা ঘরভর্তি ইঁদুর নেমে এসেছে রাস্তায়।

ভালোবাসার দরজা

হাত ছোঁয়াতেই হাতে আমার জাগলো ভোরের আলো,
বুকের ভেতর আকাশ-মাটির পূর্ণতা চমকালো।
বন্ধ শরীর খুললো দুয়ার, পিঠের ওপর ডানা,
দেরাজ জুড়ে হাজার চিঠি পড়তে তো নেই মানা।
বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো কালের পাখি,
পালিয়ে থাকা প্রহরগুলো করলো ডাকাডাকি।

চোখের ভেতর স্মৃতির ছবি ছুটছে ট্রেনের বেগে,
অনেক বেলা পেরিয়ে গেছে অমল-ধবল মেঘে।
মরচে পড়া হাতের আঙুল খুঁজছে ইতিউতি,
নতুন পথে হাঁটতে আমার ঘটছে পদচ্যুতি।
এই ভূ-ভাগে যা আছে সব হৃদয় দিয়ে কেনা,
জমার খাতা শূন্য তবু, বাকির খাতায় দেনা।

পুড়িয়ে দিলাম বাকির খাতা, উপরওয়ালা হাসে,
ভালোবাসার দরজা খুলে দিলাম অনায়াসে ।

আমাদের যাওয়া

তুমি যেতে চাচ্ছো, কিন্তু যাচ্ছো না,
আমিও যেতে চাচ্ছি, কিন্তু যাচ্ছি না,
সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি অনেক আগেই,
তোমারও প্রস্তুতি শেষ। এখন যাবার পর্ব।
আমি বললাম, তুমি থাকো আমি যাই,
তুমি বিনয়ী হয়ে জানালে যে তুমিই যাবে।
আমার বারণ উপেক্ষা করে
তুমি ব্যাগটা তুলে নিলে হাতে,
আমিও আমার স্যুটকেসটা হাতে নিলাম।
গেলে দুজনেই যাবো। দু’দিকে।
কিন্তু আমার পা নড়লো না,
তুমিও থেমে আছো ওভাবেই,
নড়ছে না পা।
আসলে আমরা কেউ যেতে পারছি না।

অভিমানের পেরেক দুটো নড়বড়ে হয়ে
বুক থেকে খসে পড়লো।

কষ্টকথা

এখন জীবনে কোনো কষ্টকথা থাকতে নেই,
অথবা গৌরব,
কষ্টকে জয় করে কী হবে ? অথবা গৌরব হারিয়ে ?
একটা সময় ছিলো
সূর্য ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুঠো মুঠো রোদ এনে
সাহসী হবার,
জ্যোৎস্নায় ডুবসাঁতার দিয়ে খেলতে খেলতে
বনে যাওয়া বনের হরিণ,
শরীর দিয়ে শরীরের সাথে লড়াই, যেন মাতাল যুদ্ধ,
কথার পিঠে কথার চাবুক মেরে অট্টহাসি,
তাজা ফুলের সৌরভ উড়ে যেতো বাতাসে বাতাসে।

এখন কষ্ট থাকলে থাক, কী আর আসবে-যাবে ?
গৌরব হারিয়ে ফুলগুলো শুকিয়ে যাক ফ্রিজারে।

Facebook Comments

আড্ডাপত্রে লাইক দিন

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০৩১