আড্ডাপত্র

১২ আষাঢ়, ১৪৩৩; ২৬ জুন, ২০২৬;রাত ১২:০৬

সেলিম এমরাজ এর গুচ্ছ ছড়া

আড্ডাপত্র

জুন ২৫, ২০২৬ | গুচ্ছ ছড়া, ছড়া

খবর

কালুর মেয়ে ভয় পেয়েছে সাপ দেখে
সেইটা আবার লালুর বুড়ো বাপ দেখে-
প্রচার করে পাড়ায় পাড়ায় গাঁয়েতে
আনন্দ আর দারুণ মজা পায় এতে;
এইটা হলো বেতার এবং টিভির খবর।
সাপটা ছিল শুয়ে ঘরে গর্তে নিজে
কালুর মেয়ে সেইখানেতে করতে কী যে-
গিয়েছিল, সেই কথা যে বোঝা দায়
মেয়েটারই দোষ এখানে, সোজা দায়;
এইটা হলো র‌্যাব, পুলিশ আর ডিবির খবর।
কালুর মেয়ে মানুষ থেকে সাপ হয়েছে
লালুর বাপে নতুন করে বাপ হয়েছে
হায়রে একি শুরু হলো, কলি কাল
আরও বলার আছে বুবু বলি কাল;
এইটা হলো ভাবি এবং বিবির খবর।

চোরাকাঁটা

সয়াবিন তেলে এক কেমিক্যাল মিশিয়ে
দোকানিটা ডেকে বলে সরিষার শিশি-এ
মেশিনেতে মোটা চাল ছোট করে কাটিয়ে
সুগন্ধী মেখে বলে চিনিগুড়া খাঁটি-এ।
মেয়াদের কারখানা বসিয়েছে দোকানেই
এতে নাকি কোনো রুপ ক্ষতি নেই, ধোকা নেই
প্রসাধনী, বেভারেজে ভেজালে যে সয়লাব
মানুষের রক্তটা খেয়ে খেয়ে হয় লাভ।
মাঝে মাঝে হাতেনাতে যদি খায় ধরা সে
বিচারকই করবে কী? ভয়ে কাঁপে তরাসে
জরিমানা করে কিছু, করে দেন ক্ষমা দান
ভেজালের এই দেশে মৃত্যুই সমাধান।
মৃত্যুর মিছিলের এই দায় নিবে কে?
কারও নাড়া দেয় নাকো একটুও বিবেকে?
কতদিন বেঁচে রব এই চোর কাঁটাতে
আড়মোড়া ভেঙে জাগো আজ ঘোর কাটাতে।

চাঁদা ভাই

ভাড়ায় চালিত আমি, রোজগার বাড়াতে
হয়ে গেছি চাঁদা ভাই, ট্রিপ দিই পাড়াতে
ট্রিপ দিতে গেলে কেন অযথাই বাধা দাও?
নাও কাঁটা-কম্পাস তুমি, শুধু চাঁদা দাও।
চাঁদা দিলে মিটে যায় ঝামেলাটা আজ যে
মিলে যায় জীবনের গুণ ভাগ ভাজ্যে
চাঁদাটাই বলে দেয় দোকানের গদি কার
চাঁদা হল ব্যবসার অনুমতি, অধিকার।
চাঁদা নিতে বস কত ভাড়া দিয়ে ছা পোষে
রোজ তাই চাঁদা চাই, দাও চাঁদা আপোষে
নইলে যে ঘর- বাড়ি দেব ভেঙে, জ্বালিয়ে
পড়ে রবে ফুটপাতে খালি হাত পা লিয়ে।
চঁ&াদা কেন দিতে হবে? এরকম কতি নাই
চাঁদা দিলে তোমাদেরই লাভ ছাড়া ক্ষতি নাই
চাঁদা হল জীবনের অর্ধেক সমাধান
আজ থেকে নিয়মিত চাঁদা কর জমা দান।

সখিনা

লোকে বলে ‘সখে বানু’ আসলে সে সখিনা
পাড়া জুড়ে সাড়া ছিল, ছিল শত সখি না
ঢাকা এসে হয়ে গেছে ডিজে গানে জকি না
চোখে মুখে শসা মেখে ফিট রাখে তকই না।
ঘরে আনে খাট সোভা, নড়বড়ে চকি না
সাপলুডু রেখে খেলে টেনিস আর হকি না
শহুরে জীবন কত হট কুল রকই না
খ্যাত লাগে গ্রামটাকে করে যত মকই না।
আধুনিকা হতে গিয়ে আঁকে নানা ছকই না
বাধা পেলে রেগে বলে- এমনি তো বকি না।

বন্যা

বাড়ি ঘর ধান চাল যায় ভেসে বন্যায়
যায় ভেসে নানা-নাতি বাপ মা ও কন্যায়
পাতিহাঁস মাথা তুলে দুই ডানা ঝাপটায়
আশ্রয় খুঁজে ফিরে মনি হারা সাপটায়।
গোয়ালের গরুগুলো ভেসে ভেসে চলল
উদ্ধার হল আজও, আরও হবে কল্ল
দুর্যোগযাত্রাটা কারও কাছে পিকনিক
মজা নেয় খুব করে ; বেশ তবে, নিক নিক।
পুত্রের শোকে বাপে কেঁদে ওঠে জানাজায়
বার বার মানুষের সাথে এটা মানা যায়?
বানে ডোবা সবখানে, পাওয়া যাবে গোর কি?
বানভাসি মানুষের আসবে না ভোর কি?
বানভাসি মানুষের আজ বড় দূর্দিন
বন্যার তহবিলে চিড়া মুড়ি গুড় দিন
চারিদিকে আহতের আহবান, আর্ত
সবার আগে মানবতা, মানুষের স্বার্থ।

ভণ্ডামি

ভাবতাম আগে কবি হব রাখব সোজা শির উর্ধ্বে
লিখব আমি অনিয়ম আর অসাধুতার বিরুদ্ধে
লিখতে লিখতে কখন যেন হয়ে গেছি দলকানা
মাথা ভরা ছেঁড়া তারে, কব্জা এবং কল কানা।
এখন আমি লিখে চলি একটা দলের খেয়ালে
ধীরে ধীরে হচ্ছি বড়, পরিণত শেয়ালে
আমার লেখা গান কবিতা সেই দলেরই দর্শনে
সম্মতি পায় দলের লোকে খুন কিংবা ধর্ষণে।
আপত্তি ও বিরক্তিকর অন্য দলে যা করে
তাদের জন্য শব্দ বানও পূর্ণ থাকে কাঁকরে
আমার লোকের সামনে এসব তাই হয়ে যায় তরবারি
উদ্দীপনায় দেয় জ্বালিয়ে প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি।
আমার লেখা সব কবিতার শব্দে থাকে কারসাজি
দেশের পক্ষে বলার নামে হাস্যকর এক ভাঁড় সাজি
এমপি হব যাচ্ছি গাঁয়ে সঙ্গে নিয়ে মণ্ডামিঠাই
জাতির সাথে এইরকমই করে যাব ভণ্ডামিটাই।

কিচ্ছাধারী হুজুর

হুজুর তিনি কিচ্ছাধারী
কিচ্ছা সাপের, ইচ্ছাধারী
তোমরা বল ঘরচিতি আর
আমরা বলি ঘরমনাই
কালকে যেমন চর্ম ছিল
আজকে তেমন চর্ম নাই,
চামড়া বদল করা ছাড়া
অন্য কোনো ধর্ম নাই।

ঘরে বসে বিশ্ব ঘোরে
কিন্তু গায়ে ঘর্ম নাই
মর্ম আছে, মর্ম নাই-
আমার মত সাধারণের
এইটা বোঝার কর্ম নাই
আবার আমি ঠিকই বুঝি
এর উপরে বর্ম নাই।

বুড়োর কথা

বসে বসে বুড়ো খায়
বেকারের মুড়ো খায়
বলে- শোন, তোমরা তো
জড় লোক জড় লোক।
চাকরিটা পেতে হলে
ঠিক করে ঠিক মতো
ধর লোক ধর লোক।
হতে হবে তোমাদের
বড়লোক বড়লোক।
চাকরিটা করে ধনি!
পাবো কি টাকার খনি?
জানার আগে বুড়ো গেল
পরলোক পরলোক।

ডাকাত

লোকটা পরে জামার উপর কটি আর
লুট করে নেয় সবার বাটি ঘটি আর
ব্যাংক বীমা সব এমনই করে হরি লুট
লোক লাগিয়ে কয় – আসো ভাই করি লুট।
আমরা ভাবি সব ঠিক আছে বেড়াগুণে
এইটা ভেবে দিন চলে যায় ভেড়া গুনে
দিন শেষে যে এমন হবে ভাবি নাই
আমার দেশের টাকা, আমার দাবি নাই?
টাকাগুলো পাচার হলো কিভাবে?
কোন ভাবে এই শোকের আগুন নিভাবে
এইভাবে যে লুট হয়, আগে শুনি নাই
বাধা দেওয়ার মতো দেশে গুণী নাই?
দেশের ভিতর আজও দেখি বেশ আঁধার
ডাকাতের ডাকাতিতে পেশাদার
বারে বারে ফণা তুলে ফোঁস করে
দেশের মানুষ সামনে আগাও হুঁশ করে।

টকশো ও বাস্তবতা

ঈদ আসে ঈদ যায়
গ্রীষ্ম ও শীত যায়
বার্গার পিৎজায়
মুরগির ফ্রাই খেয়ে
রাত্তিরে নিদ যায়
খায় না তো লাচ্ছা
আচ্ছা আচ্ছা।
ঈদ এলে টকশোতে
বলে- খায় সবজি
প্রাণী ছাড়া সব খায়
সব হ্যাঁ ও সব জ্বি
আসলে সে ঘরে ফিরে
দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে
খায় বেটা বিফ রোল ও
মাটনের কবজি।

নাইট কোচ

লোকটা যে জব করে ঢাকাতে ঢাকাতে
বিয়ে- শাদি, স্বপ্নটা আঁকাতে আঁকাতে
গাঁয়ে যাবে ব্যাগ কাঁধে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে
বাস খোঁজে গাবতলি শাখাতে শাখাতে।
রাত্তিরে রাস্তায় তাকাতে তাকাতে
খালি বাস পেল কম টাকাতে টাকাতে
হেলপারও হাসিমুখ বাঁকাতে বাঁকাতে
ভাড়া কম নিল দয়া থাকাতে থাকাতে!
ড্রাইভার বাসখানা হাঁকাতে হাঁকাতে
এলো যেই মাঝপথে ফাঁকাতে ফাঁকাতে
দেখা গেল হাওয়া নেই চাকাতে চাকাতে
এরই মাঝে গোঁফটাকে পাকাতে পাকাতে-
লুট করে নেয় সবই ডাকাতে ডাকাতে
বিয়ে-শাদি হবে; তবে, যাকাতে যাকাতে।

নদের চাঁদ

এই আমাদের নদের চাঁদ
দুষ্টু পাজি বদের চাঁদ
সারাদিনে আড্ডাবাজি
দুষ্টুমি শেষ হয়নি রে,
কেমনে ও মন রয় নীড়ে?
বাপ মা বলে- বই নিয়ে তুই
একটুখানি বস নদে
নদে ভাবে- বসব ঠিকই
কিন্তু সেটা মসনদে।
ছোটাছুটির এই বয়সে
পড়তে নদের বয়েই গেছে
না পড়েও বড় হওয়ার
পথটাও তো রয়েই গেছে।
বড় হয়ে এমপি হবে
করবে আইন শর্ত নীতি
বুক পকেটে থাকবে দেশের
মুক্তবাজার অর্থনীতি।

পীর বাবা

পীরের ছেলে পীর বাবা
দই জমে তো ক্ষীর বাবা
ক্ষীর নয় তো ফিরনীই
আস্তে ধিরে পীর নিই
কেউ করো না ভিড় বাবা।
এই পীরেতেই আস্থা মাবুদ।
নসিহত ও দোয়া করে
তারপরে এক পোয়া করে-
কেউ বেটে দেয় খাস্তা মাবুদ
ভিড় ঠেলে কেউ হাতটা পেতে
হচ্ছে কেমন নাস্তানাবুদ।

Facebook Comments

আড্ডাপত্রে লাইক দিন

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০