আড্ডাপত্র

১৭ আষাঢ়, ১৪৩৩; ১ জুলাই, ২০২৬;রাত ১:০১

জন্মদিনে জাকির আবু জাফর- এর দশ কবিতা

আড্ডাপত্র

তুমি জাগলেই জাগবে বাংলাদেশ

আফসোস করে ছেড়ে দাও কেনো সব
প্রতিবাদ আজ কেনো এত দুর্লভ!

চারিদিকে লুট, লুণ্ঠন মহামারি
বেদনা ক্লিষ্ট মানুষের আহাজারি!
সম্বলহীন, জীবনের নেই সুখ
ঘাটে ঘাটে ফেও দুর্জন দুর্মুখ!

অত্যাচারীর নিপীড়ন অহরহ
পৃথিবীতে আজ জীবন দুর্বিষহ!
মানুষের প্রতি এ কেমন পরিহাস
দিকে দিকে দেখো উঠছে নাভিশ্বাস!

ভীরুতা কেবল জোগায় দুঃখ গ্লানি
বিবেক তবুও কেনো নয় সাবধানী!
না সরাও যদি লেজুড়বৃত্তি রোগ
ঘুচবে না কভু এ জাতির দুর্ভোগ

উদ্যত করো মহা বিপ্লবী হাত
এ মাটি তোমার তুমি চির অভিজাত
বুকে রাখো তুমি তোমার মাটির ঘাম
বহাও বন্যা রক্তের উদ্যাম।

নিজস্বতায় ধারবে না কারো ধার
নিঃশ্বাসে তলো বজ্রের হুংকার!
নিঃশেষ করো ষড়যন্ত্রের বুক
তোমার আশায় মজলুম উন্মুখ!

জাগ্রত করো নব সূর্যের রেষ
তুমি জাগলেই জাগবে বাংলাদেশ।

একটি মেরুদণ্ডের গল্প

মর্যাদার রাজমহল প্ররোচিত করলো আমাকে
বললো- দেখো মেরুদণ্ড নির্মাণের লোয়াজিমা বিক্রি হয় কোথাও?
আমি জগতের হাটগুলো খতিয়ে বাজারগুলোর তলপেট ঘাটলাম।
শহরের আনাচ কানাচ চষে খুঁজলাম পৃথিবীর আধুনিক সপিংমল
কর্পোরেট হাউজের বুকও হাতালাম
নাহ্ কোথাও নেই শিরদাঁড়া সোজা রাখার ইট সুরকি
বরং মেরুদণ্ড গুঁড়ো করার হাজারটি উপকরণ একদমই সুলভ
বলুন তো কি করি!

অকস্মাৎ মনে পড়লো জনাব শিক্ষা সাহেবের কথা
হ্যা তাইতো! সবার মুখে মুখে একটই তো বচন –
‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’
সহসাই পৌঁছালাম শিক্ষা সাহেবের দরবারে
বললাম- মেরুদণ্ড সোজা রাখার দাওয়াইটি আমার ভীষণ দরকার!
আমাদের সব আছে শুধু মেরুদণ্ডটি ঋজু নেই।
মলিন হাসলেন তিনি, বললেন- তোমরা দেখছি আচ্ছা বোকা!
দেখছোনা বহুদিন আমার নিজেরই মেরুদণ্ড নেই। বেঁচে আছি বড় কষ্টে শিষ্টে
কেমন করে তোমাদের দণ্ড সোজা রাখার দাওয়াই দেই!

ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রইলাম
মুখ দেখে মনে হলো শিক্ষা সাহেবের ডায়াবেটিস
ভাঙাচোরা গাল, ফ্যাকাসে মুখ! উদাস দৃষ্টি অনেকটা ঘোলা!
সারা দেহে পরদেশী সংস্কৃতির জ্বর! কপালে জাতি বিভক্তির নকশা
চোখের মণিটি কোনোভাবেই দেশীয় নয়
চেনাচেনা হলেও অচেনার অংশ বৃহত্তর
আমি কী করে তার কাছে মেরুদণ্ডের ঔষধ চাই!

আকষ্মিক চোখে পড়লো একটি বিজ্ঞাপন- এখানে আত্মসম্মান বিক্রি হয়
ভাবলাম মেরুদণ্ড সোজা রাখার বিষয়টি তো আত্মসম্মানের সাথেই ওতোপ্রোতো
বললাম- মেরুদণ্ড সোজা রাখার কিছু একটা দিন
পলকেই জবাব – সব আছে ওটি ছাড়া

চোখ ঘোরালাম চতুর্দিকে, দেখলাম-
আত্মসম্মানের মোড়কে সাজানো যাবতীয় সম্মানহানির মশলা!

মেরুদণ্ড খুঁজতে এখন আমি কোথায় যাই!,

কেউ বাড়ি নেই

খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছালাম
বিশ্বাসের বাড়ি
দরোজা খুললেন কেউ
বললেন- বিশ্বাস বাড়ি নেই
কোথায় তিনি?
খুল্লামখোলা জবাব –
বিশ্বাস কোথায় থাকেন জানা নেই
এটি এখন বিশ্বাস ঘাতকের বাড়ি!

গেলাম সততার খোঁজে-
হ্যা এটিই ঠিকানা
সততা কোথায় জিজ্ঞেস করতেই কেউ একজন বললেন-
বহুকাল সততার বসত নেই এখানে
এটি এখন অসৎদের দখলে!

আমানত- এর বাড়ি খুঁজলাম
বাড়িটি ধোপদুরস্ত বেশ
কিন্তু আমানত বাড়ি নেই!

কোথায়?
হারিয়েছে বহুকাল,
এখানে এখন খেয়ানতির বসবাস!

পৌঁছালাম অধিকারের বসতঘরে
নাহ্ অধিকারও থাকেন না তার বাড়ি
বহুকাল ধরে নিখোঁজ কিংবা গুম
এটি এখন অধিকার হরণকারীদের বসতি!

ইনসাফের বাড়ি বড় দুর্গম দুর্লঙ্ঘ পথে
কষ্টে শিষ্টে পৌঁছালাম
নাহ্, বহুকাল থেকে উধাও তিনিও
বাড়িটি এখন বে-ইনসাফের দখলে!

ওয়াদা কোথায় থাকেন?
একদা থাকতেন- মানুষের লেনদেনে কথায় কাজে এবং সম্পর্কের ঘরে
এখন এ ঘরে বসত নেই তার
এ বাড়ির মালিক এখন খেলাপিরা!

আহা! কেউ কারো বাড়ি নেই
কার খোঁজে যাই!

ভাবলাম অন্তত বিবেকের বাড়ি যাওয়া যাক
শেষতক বিবেকের সাথে যদি দেখা হয়
দরোজায় দোর্দণ্ড প্রতাপী একজন বললো-
কে তুমি সন্ধান করো বিবেকের!
সে তো মারা গেছে বহুকাল আগে!

কবরটি কোথায়?
বললেন- তোমার চারপাশে প্রতিটি মানুষই বিবেকের কবর!

চিরন্তন

নতুন দিনের উত্থান যদি বোঝো
স্বাধীন জাতির মর্যাদা তবে খোঁজো।
মাটির গন্ধে বুকে লেখো তার নাম
রক্তের চেয়ে আরও বেশি তার দাম।

সাহস জ্বালিয়ে স্মরণীয় কত বীর
ইতিহাস খ্যাত নেসার আলী তিতুমীর।
সংগ্রামী যারা চিনেছে অগ্নিপথ
বাহাদুর এক সেই হাজী শরীয়ত।

মানুষের পথ এখনও রক্তে লাল
কেনো নেই তবু তেমন শাহজালাল
দুঃখ যাতনা এতো অশ্রুর বান
কোথায় খালিদ কোথায় খান জাহান !

সব অচেতন সকলের চোখে ঘুম
আসবে না বুঝি আর শাহ্ মাখদুম।
লুট হয়ে গেছে মানুষের অধিকার
তবু কেনো আর আসে না বখতিয়ার!

হয় তো আঁধার দীর্ঘ একথা ঠিক
সকল আঁধার পৃথিবীতে সাময়িক।
তারেক মুসারা হয় না কখনো শেষ
ঘটবে নতুন সূর্যের উন্মেষ।

গ্রাফিতি বাংলাদেশ

যখন চারিদিকে মৃত্যু আর মৃত্যু লাশ আর লাশ
যখন দিকে দিকে টগবগে বিক্ষোভ বিস্ময়
প্রতিরোধের উত্তাপে ফুটন্ত বিপ্লব
সেই জুলাই বিপ্লবের আগুনঝরাদিন!
হৃদয় নিংড়ানো রঙের আঁচড়ে
তখনই জন্মালো গ্রাফিতি!
এমন এঁকেছে কি পৃথিবীর কোনো বিপ্লবের তুলি!

দেশেরর প্রতিটি দেয়াল গ্রাফিতির
একেকটি বর্ণিল পৃষ্ঠা
প্রতিবাদ- বিক্ষোভের একেকটি বিশাল ক্যানভাস
হৃদয়গ্রাহী স্লোগান, কবিতার বারুদ যেনো
কোটি কণ্ঠের সমস্বর!
বৈষম্যহীন আন্দোলনের এ এক শিল্পীত রূপ!

শিল্পকর্মে জ্বলে উঠলো একেকটি বাক্য
একেকটি স্লোগান, তীব্র তীক্ষ্ণ বুলেট,
বিঁধে গেলো ফ্যাসিস্ট স্বৈরিনির বুকের শিরায়
আগ্নেয়াস্ত্র পরাজিত এসব গ্রাফিতির
রেখার কাছে!

রাজপথের দেয়াল প্রাসাদের পাঁজর এবং পিচপথের কালো দেহে
গ্রাফিতির সমগ্রতায় জড়ানো সাহসের প্রাণ!
চোখ উল্টিয়ে জগতবাসী দেখলো-
দুনিয়ার গ্রাফিতির রাজধানী বাংলাদেশ!

আমাদের শিশুদের হাতেও মাখামাখি গ্রাফিতি-বুলেটের রঙ
কচিকণ্ঠে মুহূর্মুহু স্লোগান – স্টেপ ডাউন হাসিনা
ক্ষীণহাতে গ্রাফিতির তুলি
যেনো রাঙাবে পৃথিবীর মুখ!

এ এক নতুন গল্প, নতুন পাণ্ডুলিপি
প্রথম দেখা পিচঢালা রাস্তায়, রাজপথে
তারপর দেয়ালে, সর্বত্র!
এমনকি ছাত্র যুবাদের বুকে পিঠে মুখেও
গ্রাফিতি উৎসব
প্রাণের সবটুকু ঢেলে মিটিয়ে দিতে চাইলো স্বৈরাচারীর নৃশংস পদভার!

মানুষের বুক থেকে ক্ষোভ লাফিয়ে উঠলো
দেয়ালে, প্রাসাদের পাঁজরে,পথপ্রান্তের শরীরে, বিপনি বিতানের সাটারে

একেকটি মুখ যেনো একেকটি তিতুমীর
একেকটি বালক যেনো একেকজন বখতিয়ার
একেকজন যুবক একেকজন খান জাহান
শাহ জালালের পাগড়ির ভেতর থেকে যেনো বেরিয়ে এলো বীরত্বের নিশান!

কোনো কোনোদিন শহর শূন্য হলেও
দেয়ালে জাগ্রত এই বিস্ময় গ্রাফিতি
দিনভর এবং সারারাত ছড়িয়ে দেয় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ-আগুন
জগতে প্রতিবাদের ইতিহাসে এ এক নতুন হাতিয়ার!

পৃথিবীর চোখ থেকে উড়ে এলো বিস্ময়!
তরুণ বিপ্লবীর অবিশ্বাস্য সাহসী উচ্চারণ- ‘পেছনে পুলিশ সামনে স্বাধীনতা!’
সহসা কেঁপে উঠলো বাংলাদেশের বুক
এবং একটি মাস তার শরীর ছাড়িয়ে দীর্ঘ হলো, হয়ে উঠলো ৩৬ জুলাই
হেসে উঠলো গ্রাফিতির আনন্দে!
এমন বিস্ময় জাগানিয়া বিপ্লবের সচিত্র উত্তাপ একবারই দেখলো পৃথিবী

কবিতা গানে গ্রাফিতি হলেন নজরুল –
‘কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল কররে লোপাট
রক্ত জমাট
শিকল পুজার পাষাণ বেদী’
আরও আরও নজরুলীয় বুলেট-
‘দুর্গমগীরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুশিয়ার’
কিংবা ‘বল বীর বল চির উন্নত মম শির’
এভাবেই কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে ছিন্নভিন্ন হলো পাষাণীর বুক
কবিতা হয়ে উঠলো জগতের ফ্যাসিস্ট পতনের নান্দনিক হাতিয়ার!

প্রতিবাদ প্রতিরোধ এবং হৃদয়চেরা ধ্বনিআঁকা
গ্রাফিতির দেয়াল ফ্যাসিস্ট স্বৈরিণীর মরণচিহ্ন,
তার সমস্ত বাণী বচন এবং ষড়যন্ত্রের জাল মুহূর্তে মুছে দেবার অনন্য রঙ
প্রতিটি গ্রাফিতি তার পালিয়ে যাওয়ার ভয়ংকর নোটিশ!

গ্রাফিতির মতো এমন অস্ত্র আমি আর দেখিনি!

পৃথিবীর সকল অহংকার

নুহের নৌকাই ছিলো মহাপ্লাবনের পিঠে একটুকরো কাঠের পৃথিবী।
জোড়া প্রাণীদের ভাসমান ছোট্ট গৃহ। এ গৃহ থেকেই বিশ্বে ছড়িয়েছে মানুষের মিছিল

খুঁজলাম প্লাবনের ছবি!
ইংগিত এলো – প্রতিটি সাগর মহাসাগর সেই প্লাবনের টুকরো টুকরো ছবি।
সাগরগ্রন্থ পাঠ করে দেখো- আগুনের মহাকাব্যগুলো সমুদ্রের তলপেটেই লেখা!
প্রতিটি আগ্নেয়গিরি মহাকাব্যের একেকটি অধ্যায়!
একদা সমুদ্র প্রজ্জ্বলিত হলে ঢেউ হবে আগুনের পাহাড়

লোহিত সাগরে ঢেউয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতেই দেখি ফেরাউনের শেষ নিঃশ্বাসের দাগ
জলের ভাঁজে বিস্ফারিত দৃষ্টির সংলাপ
মুসার অলৌকিক লাঠির আঘাতটি বড় যত্নে রেখেছে লাল সাগর

হাঁটতে থাকলাম ইব্রাহিমের অগ্নি-উদ্যানের প্রতি
কেউ যেনো ইংগিত দিলো একটি প্রাসাদের দিকে
দরোজা খুলতেই দেখি নমরূদের উল্টানো চোখ
বিঁধে আছে মহলের রাজকীয় ছাদের কিনারায়
চোখের পাতায় লেপ্টানো দাম্ভিকতার রঙ
মগজের শিরায় উৎকীর্ণ অন্ধ মশার হুল

হিটলারের আত্মহত্যার কক্ষটি পেলাম
চারদেয়ালে পিস্তলের শব্দ ঝুলছিলো
থেকে থেকে ঝরছিলো স্বেচ্ছাচারী রঙ
সে রঙেই উতলা জগতের সকল রাজা রাণীর মন
অথচ কোনো ক্ষমতাই মৃত্যুর গ্রাস থেকে সরাতে পারেনি নিজের মুখ

ভাবুন তো – কীভাবে মাটিচাপা পড়ে আছে পৃথিবীর সকল অহংকার!,

দুর্দম

বিবেক এখন গাধার পিঠেই হাঁটে
শেয়াল সহসা সিংহের গাল চাটে।
হস্তীর চেয়ে পিঁপড়েরা বেশী ভারী
অন্ধ এখন দৃষ্টির ধ্বজাধারী।

মিথ্যে এখন সত্যের চেয়ে দামী
বিদ্বান সব মুর্খের অনুগামী!
প্রাজ্ঞরা চুপ অজ্ঞরা বলে সব
ঘোড়ার ডেরায় বাস করে গর্দভ!

যেখানে থাকার কেউকি সেখানে আছে
ময়ূর পুচ্ছে দাঁড়কাক শুধু নাচে
বাইরে নায়ক ভেতরে নিন্ম খল
মানুষের ঘাড়ে মানুষ জগদ্দল!

সকল খেলার শেষ আছে সে তো জানো
হোক জমপেশ জমকালো চমকানো
উড়ে গেলে সব ধৈর্যের সঞ্চয়
তখন সাহস উদ্যাম নির্ভয়।

সূর্যের মুখ খামচায় ঠাঁসা রোষে
সাগরের বুক তুলে আনে এক কোষে!
রক্তের নুন চিবিয়ে চুবিয়ে খায়
পাহাড় বনানী সহজেই টপকায়!

ফিসফিস সেও হয়ে যায় গমগম
দুহাত তখন দুর্মর দুর্দম!
বাঘের চোখের তীব্রতা ছেঁকে আনে
মৃত্যুকে শুধু জীবনের দিকে টানে।

বখতে নসরের চোখ

ক্ষুধার্ত সিংহটি দানিয়েলের দৃষ্টির গন্ধ শুঁকছিলো
গুহার দেয়ালে গর্জনের চিহ্ন তখনও জ্বলজ্বলে
গুহাটি এখন অলৌকিক জ্যোতির জংশন!

কেননা গুহায় অদৃশ্যের ঘ্রাণ মাখা দানিয়েল
তার মুখ জোছনা ছাড়িয়ে আরও উজ্জ্বল
চোখ দুটি অনন্তের পবিত্র শিখা
ফলে সিংহের তীব্র হিংস্রতা এখন বিগলিত
শ্রদ্ধার গোলাপ

দানিয়েলের পায়ের কাছে সমর্পিত সিংহটি
দৃশ্যটি দুলিয়ে দিলো বখতে নসরের পৃথিবী
মৃত্যুর জিহবা যেনো নসরের দিকে লকলকে
এখনই বুঝি গলিয়ে দেবে রাজমুকুট
সীমাহীন ক্ষমতার আঙ্গুল কী অসহায়, ভাষাহীন
যার পায়ে সিংহ লুটায় তার নিঃশ্বাস
নিভিয়ে দেয়া এতই সহজ!

সহসা আকাশে উড়লো নসরের চোখ, দেখলো-
উড়ন্ত মেঘের দল যেনো ফেরেশতাদের ডানা
গোটা আকাশ যেনো মিকাঈলের মুখ!
যেনো ঘাড়ে আছড়ে পড়া জিব্রাইলের শ্বাস
নীলাম্বর মৃত্যুর রঙে জ্বলছে!

মাঝে মাঝে ডাকাত পড়ে মানব জাতির মহলে
ইতিহাসের ছাতার নীচে এরাই হাঙর, দানব, দৈত্য ও ঐতিহ্যের চোরাকারবারি

সভ্যতার গালে থাপ্পড় চড়ায়
পৃথিবীর সকল স্বৈরাচার!

ভোগের লেজ ধরে ঝুলছে মানুষ

এখন নিজেকে নিজেই মুখস্থ করি
নিজেকেই পাঠ করি প্রতিদিন
আবিষ্কার করি অজ্ঞতার শিরা-উপশিরা
জানতে চাই-
ধমনীর তলদেশে কে পাঠ করে নদীর নামতা

নদীটির নাম?
এর কোনো নাম নেই, জন্মও ছিলো না
পাহাড় কিংবা পাথর কোনোটিই এর জন্মস্থান নয়
এমনকি সমুদ্রও লেখেনি এর উদ্ভব
এর শুরু ও সমাপ্তির একটিই পাঠ- ‘পড়ো’

তাই পড়ি –

এইতো সমাজ গ্রন্থটি আমার সামনে খোলা
প্রথম অধ্যায়টি- নিকট প্রতিবেশী
আশ্চর্য! এখানে প্রতিহিংসার জয়জয়
পরস্পরের দিকে জ্বলন্ত প্রতিশোধের আগুন

তারপর স্বজন, আত্মীয় এবং রক্তের বন্ধন
বন্ধুত্বের পর্বটিও বেশ দীর্ঘ
এখানে জেদাজেদির রোষ এবং রেষারেষির দাবানল বড় ভয়াবহ

এসব সম্পর্কে একটি দেয়াল বড় দুর্ভেদ্য
দেয়ালটির নাম- স্বার্থ। স্বার্থের উর্ধ্বের কথা বলে
স্বার্থ উদ্ধারের খেলাটি বড় নির্মম !

সিন্ডিকেট অধ্যায়টি কেউ পাঠ করে না
পড়ে না কালো বিড়ালের চোখ
এখানে দ্রব্যমূল্যের অংক লেখে কারা
কাদের ইন্ধনে পাঁচ প্রসব করে পঞ্চাশ
নিঃস্বদের পকেট হাতিয়ে রাতারাতি
শেয়াল থেকে সিংহ বনে কারা!

এসব পাঠ করে দেখি-
সমাজের সবুজ পাতাগুলো ভীষণ হলুদ
তবে কী সমাজটি ঝরে যাবে কালের বৃক্ষ থেকে!

ভাবি- ঝরে যাওয়ার আগেই আমাকে
পাঠ করতে হবে গ্রন্থটি
পড়তে হবে এর প্রতিটি পৃষ্ঠার গল্প
পড়তে পড়তে দেখলাম –
প্রতিটি পর্বেই ভোগের উন্মাদ ঝড়
এ ঝড়েই ঝরে যাচ্ছে মানব-কুঁড়ি

আধুনিক সভ্যতার নামে সর্বত্র অসভ্যতার তুফান
কেবল ভোগের লেজ ধরে ঝুলছে মানুষ!

নিখোঁজ বিবৃতি

সমাজের কিছু পরম শ্রদ্ধেয় বহুদিন ধরে নিখোঁজ
অতলে কোথায় তলিয়েছে চেতনায়-ই রোহিত
অথচ উন্নত জীবনের এরাই চৌকস

নিখোঁজদের তালিকা?
শুনলে বিস্ময়ে ঝিম হবেন!
শুনুন তবে-
প্রথমজন- জনাব সাহস! সত্য উচ্চারণে তিনিই আদর্শের হিমালয়।
সূর্যের বুক থেকে উত্তাপ ছিনিয়ে মিথ্যার মুখোশ উন্মোচনের কে আছে তেমন!

দ্বিতীয়জন- শ্রদ্ধেয় প্রতিবাদ! রাজপথ থেকে সমাজের রন্ধ্রে কোথাও নেই তিনি
মানুষের বুকে ক্রোধের জ্বলজ্যান্ত দোজখ
অথচ মুখে নিস্তব্ধতার তালা
হাশর মাঠের মতো শুধু ইয়া নাফসির ফিসফাস

তৃতীয়জন- সম্মানীয় ঐতিহ্য! কেউ ধারই ধারে না তাঁর।
আধুনিক নায়ক নামে খলনায়কদের দৌরাত্মে ঐতিহ্যানুসারীদের চোখে ঘুম নেই

তারপর তালিকায়- স্বনামধন্য মূল্যবোধ!
বিত্তধরেরা উদ্ভ্রান্তির উপত্যকায় বুঁদ
মধ্যবিত্ত যুবক যুবতীরা ভয়াল দেউলিয়া
ক্ষুধার অনলে নিম্নবিত্তের সবকিছু ছারখার
মূল্যবোধ চাষের কোনো চাষী নেই
সকলেই চেতনার জালে বন্দী

এরপর তালিকায়- বিশিষ্ট বিনয়!
তিনি নেই বলে ঔদ্ধত্যের ষাঁড়গুলো দাপাচ্ছে গোটা সমাজ
পেঁচার দৌরাত্ম্যে পাখিরা পলাতক
আমাদের ভদ্রশ্রেণী কুলুপ আঁটা, ভাষাহীন

সবশেষে- মহামন্য ন্যায়-বিচার!
তিনি নিখোঁজ বলে মানবিক খামারগুলো অপরাধী দামড়ায় ভরে উঠেছে।
শেয়ালের কণ্ঠে সিংহের গর্জন! অবলা গরুও হায়নার হিংস্রতায় দাঁত কাটে!

অজ্ঞদের অশিষ্ট আচারে আকলমানেরা বিব্রত!
মানুষের জনপদে মানুষরূপী এরা কারা!

Facebook Comments

আড্ডাপত্রে লাইক দিন

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০৩১