আড্ডাপত্র

; ;

গল্প । সেই চিঠি । ইলিয়াস ফারুকী

আড্ডাপত্র

সেপ্টে ১৪, ২০২৬ | কথাসাহিত্য, গল্প

মাঘের শীতের খুব ভোরের ঘন কুয়াশার মতো আবছা দৃষ্টি নিয়ে আবছার আলী তার বিবাহের সময় উপহার পাওয়া ইস্পাতের আলমারির সামনে এসে দাঁড়ালেন। গলায় ঝোলানো চাবির গোছা খুলে নিয়ে কাঁপা হাতে প্রথম চেষ্টাতেই চাবিটা জায়গামতো প্রবেশ করিয়ে আলমারির ডালাটা খুললেন। ডালার একটা ছোট কুঠুরি থেকে আরেকটা চাবি বের করে বাম দিকের দেরাজটা খুলে অতি যত্নে রাখা একটি পুরোনো চিঠি বের করলেন। চিঠির খামে প্রাপকের নামের জায়গায় তার স্ত্রী ইলোরা বেগমের নাম লেখা। চিঠির প্রেরক ছিলেন তার স্ত্রীর বিবাহ-পূর্ব প্রেমিক নাওরা। হয়ত ছদ্ম নাম। তবে চিঠির “সোনাপাখি” সম্বোধনে স্পষ্ট বোঝা যায় যে চিঠিটা তার প্রেমিকের লেখা। এবং সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, চিঠিটা বিলির দায়িত্ব ছিলো আবছার আলীর। তিনি ডাক বিভাগে ডাক হরকরার চাকরি করতেন।

টগবগে যুবক আবছার আলী। যে বয়সে মানুষ বাপের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে রোমিও হয়ে পাড়া মাতায়, সেই বয়সেই তাকে অন্নের সন্ধানে মাঠে নামতে হয়েছিলো। নবম শ্রেণিতে এসেই লেখা-পড়ায় যতি টানতে বাধ্য হন তিনি। কারণ আর কিছু না। তার বাবা ঈমান আলী আর সংসার টানতে পারছিলেন না। আবছার আলীর বাবার টাকা পয়সা আয় আমদানি ঠিকমতো না করতে পারলেও সন্তান আমদানির কমতি ছিলো না। ওরা ছিলো এগার ভাই বোন। সুতরাং বড় সন্তান হওয়ার আর জন্মের দায় শোধ করার কারণে আবছার আলীকে সব কিছু ছেড়ে আয়ের প্রতি মনোযোগী হতে হয়েছিলো। আর তাই চাকরির চেষ্টায় স্থানীয় ভাবে ডাক পিওন হিসাবে নিয়োগ পেয়ে যান। শুরু হয়ে তার ডাক হরকরার জীবন। বলে রাখা ভালো যে ডাক হরকরার চাকুরিতে তার কোন আপত্তি ছিলো না। বরং সুকান্ত ভট্টাচার্জের “রানার” তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলো। এতো অল্প শিক্ষায় সরকারি চাকরি! বাড়িতে থেকে নিজের মনমতো চাকরি তার জন্য যেন সোনায় সোহাগা।

বাবা অসুস্থ কর্মহীন, মা-ও চলৎশক্তিহীন হয়ে বিছানায়। সংসারে অচলাবস্থা। আবছার আলীকেই ঘরেরও সব কাজ করতে হয়ে, আবার চাকরি-ও সামাল দিতে হয়। ছোটবেলা থেকেই আবছার আলী আহলাদি ছিলেন না। অন্য আট দশটা বাপ/বেটার মতো তিনি কখনো বাপের কাঁধে চড়ে হিসু করার সুযোগ পাননি। কিংবা কোমরের কায়তুনে (কালো সুতা) ঘণ্টা বেঁধে উলঙ্গ দৌড় বা পাড়ভাঙ্গা নদীতে-ও ঝাঁপ দিয়ে পড়ার সুযোগ পাননি। সুতরাং আবছার আলীর রসহীন জীবন, কাটা ঘুড়ির মতো বাতাসে এদিক-ওদিক দোলতে দোলতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকলো।

খোঁড়া জীবন। আধা কাঁচড়া সংসার। সবদিক সামাল দিতে আবছার আলীর নিজের ঘণ্টা বাজতে শুরু করলো। বাড়িতে একজন নেতৃস্থানীয় কামওয়ালি প্রয়োজন হয়ে দাড়ালো। কারণ ওর বোনেরা কাজে পরিপক্ক হলেও, নেতৃত্বে না। কিন্তু অতো আয় কোথায় যে বেতন দিয়ে কামওয়ালি পুষবে। সুতরাং এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে যেন এক খরচে দশ কাজ। “সাপ-ও মরে, আর লাঠি যেন ঠিক থাকে।” কিন্তু একজন রানারের আয় কত? কে তাকে কনে দেবে! তবুও খোঁজ শুরু হলো। এবং ওদের গ্রামের পশ্চিম পাড়ার মেয়ে ইলোরার খোঁজ পাওয়া গেল। হাই স্কুল বোর্ড পাশ করা। কিন্তু প্রেমিকের হাত ধরে একবার ঘর পালানো ফিরে আশা মেয়ে, বিয়ের বাজারে বড় যৌতুক ছাড়া অচল। মেয়ের পরিবার তেমন সম্পদশালী না যে বড় ক্ষতিপূরণ দিয়ে মেয়ের একটা ব্যবস্থা করবে। সুতরাং মেয়ের পরিবার যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। পাত্রের গাত্র, শিক্ষা বা বংশ পরিচয় যে রং বা বর্ণেরই হোক, পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না। ইলোরার অহমে আঘাত লাগলেও বাড়ির লোকজনের খোঁটার মিসাইল তার প্রতিবাদকে জীবন পেতে দিলোনা। সুতরাং এক সন্ধ্যায়, হেজাগ বাতির আলোতে, মসজিদের ইমাম, এলাকার মাতুব্বর, উঠতি বয়সি যুবক নেতা ও দুই পরিবারের উপস্থিতিতে আবছার আর ইলোরার শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেলো।

বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা বছর ইলোরা বুঝতেই পারেনি, সংসার নামের জিনিসটার আসল অর্থ কী। আবছার মানুষটা খারাপ ছিলেন না। বরং ভালোই। তবে তার ভালোবাসারও যেন একটা সরকারি দপ্তর ছিলোÑসময়মতো খুলতো, সময়মতো বন্ধ হতো। ডাক বিলি, সংসারের হিসাব, বাবার ওষুধ, মায়ের পথ্য, ছোট ভাইবোনের পড়াশোনাÑসবকিছু মিলিয়ে তার জীবনটা এমন ছিলো। যেখানে ভালোবাসার জন্য আলাদা কোনো কলাম রাখা হয়নি। এতো কিছুর পরও একটা চিঠির কথা তাকে সব সময় সচেতন করে রাখতো।

বিয়ের পর বছর যায় কিন্তু সন্তানের দেখা নেই। আবছার আলীর নিকট বিষয়টা নৈমিত্তিক জীবনের মতো। তার কাছে বিষয়টি দুঃখের চেয়ে হিসাবের বেশি। এগার ভাইবোনের সংসারে এটা বরং স্বস্তির। কিন্তু প্রতিবেশীদের মোটেই স্বস্তির ভাব ছিলো না। তাদর কাছে ইঙ্গিতে আকারে অনেক গল্প, আড়ালে আবডালে ফিসফিস। সমাজের মুখ বন্ধ করার কোনো বিদ্যা তার জানা ছিল না। ইলোরার নিজের ভেতরে একটা শূন্যতা কাজ করতো। তবে শূন্যতার মাঝেও যে শব্দ আছে, আর সেই শব্দ-তো শুধু নারীরাই শুনতে পায়।

মন ভোলানো বর্ষার ঝুমুরঝুমুর স্বরে খবরটা এলো। ইলোরা সন্তানসম্ভবা। যে প্রতিবেশীরা এতদিন ইলোরার গর্ভের হিসাব নিয়ে অস্থির ছিল, তারাই এখন ইলোরার সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে এবং গায়ের রঙ নিয়ে ভবিষ্যত বক্তা হয়ে গেল। তার সমাজে এতো কিছু হচ্ছে কিন্তু আবছার আলী চুপচাপ প্রতিক্রিয়াহীন। তার রহস্যময় হাসি হয়ত আনন্দের কিংবা বিষাদের।

সময় এগিয়ে গেলো। আবছার আলী পুত্র সন্তানের বাবা হলেন। ছেলেকে দোয়া করলেন, ‘মানুষ হইস। নিজের চেয়ে অন্যের কষ্টটা আগে বুঝতে শিখবি।’ কিন্তু একটা সমস্যা প্রকট হলো, আবছার আলী যখনই মা ও ছেলেকে একত্রে দেখতেন, একটি চিঠি তার চোখের সামনে ভেসে উঠতো!

ইলোরাও মাঝে মাঝে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে যেতো। সেই সময় তার চোখে এমন কিছু থাকতো, যার ভাষা আবছার আলী পড়তে পছন্দ করতেন না, অথবা পড়তে চাইতেন না। জীবন তবুও এগিয়ে যেতে থাকলো।

ডাক হরকরা আবছার আলী চিঠি নিয়েই যার কাজ কারবার তিনি ধীরে ধীরে এলাকার পরিচিত মানুষ হয়ে উঠলেন। মানুষের সুখের চিঠি তিনি পৌঁছে দিয়েছেন, দুঃখের চিঠিও। চাকরির নিয়োগপত্র, প্রেমপত্র, তালাকের নোটিশ, বিদেশ যাওয়ার কাগজ, মৃত্যুসংবাদ মানুষের জীবনের যত রকম খবর আছে, সবই তার হাত দিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতো। কিন্তু নিজের ঘরের যে চিঠিটা তাকে ঝড়ের এলান দিলো, তাকে তিনি এড়িয়ে যেতেন।

ইলোরাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীরব হতে থাকলো।

টানাটানির পালভরা সংসার, অপুষ্টি আর অবহেলায় নীরবে ভেতরে ক্ষয় বাসা বাঁধলো। এবং একদিন তাকেই সঙ্গী করে সে বিদায় নিলো। মানুষের যখন নাম থাকে তখন সে আদর যত্ন সবই পায়। কিন্তু যখন তার দেহ কমন নাম “লাশ” এ পরিবর্তিত হয় তখন তার মর্যাদার এবং স্থানের পরিবর্তন ঘটে। বাড়ির উঠানে তখন শীতের কুয়াশা। আবছার আলী উঠোনের খাটিয়ায় চাদরে ঢাকা তার স্ত্রীর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কেউ তার চোখে লোনা দেখেনি। তবে তার ভেতরে কষ্টের লাভা থেকে থেকে উতলে উঠতে চাইছিলো।

স্ত্রীর শেষ কাজ শেষ করে তিনি আবারো আলমারিটা খুললেন। চিঠিটা হাতে নিলেন। বহু বছর থেকে যে চিঠিটা তার প্রাপকের আশায় ছিলো। যার প্রেরক ছিলো নাওরা।

বহুবারের মতো আবছার আলী আবার চিঠিটা খুললেন। চিঠির কাগজের বয়স হয়েছে, কালির রং ফিকে। তিনি প্রথম কয়েকটি লাইন পড়ে থেমে গেলেন। গভির ভাবে শ্বাস নিলেন, তারপর আবার পড়লেন। আরও একবার। বারবার, তারপর খোলা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তখন রহস্যঘেরা কুয়াশা। চিঠির কয়েকটি শব্দ তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল। একই সাথে শিশুটির কথা। একটি প্রতিশ্রুতির কথা। এবং একটি অপেক্ষার কথা। আর এমন কিছু কথা, যা সরাসরি কোনো স্বীকারোক্তি নয়, কিন্তু একজন মানুষকে নিজের দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি দিনের দিকে নতুন করে তাকাতে বাধ্য করার জন্য যথেষ্ট।

একদৃষ্টে ক্ষয় যাওয়া অক্ষরের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি আবারো চিঠিটা ভাঁজ করে রেখে দিলেন। চিঠিটা তার জীবনে ধ্রুব হয়ে রইল। তিনি এমন এক সত্যকে নিজের কাছে রেখে দিলেন কারণ হয়তো তিনি জানতেন কিছু চিঠি বিলি করার জন্য আসে না। কিছু চিঠি মানুষের বুকের ভেতর ডাকঘর হয়ে বসে থাকে।

ইলোরা মারা যাওয়ার অনেক বছর পর, যখন ছেলেটা পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে চলে গেল। আবছার আলীর মনে হলো মিথ্যাকে মুকুট বানিয়ে কী লাভ। এতে নিজেও প্রতারিত হওয়া, আবার সেই সন্তানকে প্রতারিত করা।

ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে আবছার আলী নিজেকে যেন বাঁচাতে চেয়েছিলেন। সত্য থেকে নিজেকে লুকোতে চেয়েছিলেন! কিন্তু সত্য যখন নিজেই মুখোমুখি হতে চায়, কে ঠেকাবে তাকে! তাইতো ছেলের কাছ থেকে ফোন পেলেন, সে দেশে আসছে। ‘বাবা আমি দেশে আসছি।’

বাবা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আয়’ এই বাক্যের মধ্যে আবছার আলী জমে যেতে থাকেন। কিন্তু তিনি কী সত্যিই মন থেকে কথাটা বললেন! তিনি চাননা সে আসুক। কারণ একটি চিঠি, যার প্রেরক এমন একজন মানুষ, যার অস্তিত্ব তার নিজের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।

সেই রাতে তিনি আবার আলমারি খুলে বসলেন।

গোপন কুঠুরি থেকে চিঠিটা বের করলেন। এবং অনেকক্ষণ হাতে নিয়ে বসে থাকলেন। তিনি নিজের কথায় সন্তানের বিশ্বাসকে ভাঙ্গতে চান না। তারপর চিঠিটা একটা খামে ভরে ছেলের বিদেশের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলেন। সঙ্গে এক লাইনের ছোট্ট একটি চিরকুট। “তোর মায়ের নামে আসা একটা চিঠি। তোর জানার অধিকার আছে।”

বেশ কয়েকদিন পর ছেলে ফোন করলো।

আবছার আলী ফোনটা ধরলেন। ওপাশে তখন সব কিছু নীরব।

তারপর হঠাৎ যেন শব্দের বোমা ফাটলো.. বাবা…

“হুম”

তুমি চিঠিটা এতোদিন কেন রেখে দিয়েছিলে!

এপাশে নীরবতা।

আবারো প্রশ্ন, তুমি কি সব জানতে? এ সত্যটা উম্মোচন করা কী সত্যিই জরুরী ছিলো!

আবছার আলী চোখ বন্ধ করলেন, বেশ কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বললেন, ‘সব মানুষ সবকিছু জানে না রে। কিছু মানুষ শুধু কিছু সত্যের পাহারাদার হয়ে বাঁচে। হয়ত আমিও তাই।’

আমি কি তোমার ছেলে না? প্রশ্নটা শুনে আবছার আলী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তারপর বললেন, তুই আমার ছেলে কি না, এই হিসাবটা না হয়ে তুই করিস। কিন্তু আমি তো তোকে বুকে রেখেই মানুষ করেছি।

ওপাশে কান্নার শব্দ।

আবছার আলী চুপচাপ। কারণ তার কাছে কোনো জবাব ছিলো না।

পরদিন সকালে অভ্যাস মত আবছার আলী আবার আলমারির সামনে দাঁড়ালেন। সেই পুরোনো ইস্পাতের আলমারি। বিয়ের সময় পাওয়া। যার এখন ঐতিহাসিক জং ধরা হাতল। আর ভেতরের ছোট কুঠুরি। কিন্তু খালি। চিঠিটা নেই। হঠাৎ তার নিজেকে প্রচুর হালকা মনে হলো। তার মনে হলো যেন তিনি এখন জীবনের সবচেয়ে ভারী জিনিসটা থেকে মুক্ত।

আবছার আলী মুক্ত জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তখন মাঘের ভোর। ঘন কুয়াশায় গাছপালা, রাস্তা, মানুষ সব আবছা। তিনি অজান্তে নিজের হাতের দিকে তাকালেন। এই হাত দিয়ে তিনি কত চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন! দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে মনে মনে বললেন, “ইলোরা, তোমার কাছে চিঠিটা পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু তোমার ছেলের কাছে ঠিকই পৌঁছে দিয়েছি।”

তারপর তিনি কুয়াশার মধ্যে বেরিয়ে গেলেন। পেছনে পড়ে রইলো পুরোনো ইস্পাতের আলমারি।
খোলা, খালি এবং স্মৃতিময়। যেন বহু বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডাকঘর অবশেষে বন্ধ ঘোষণা করা হলো।

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Facebook Comments