আড্ডাপত্র

; ;

গুচ্ছকবিতা। বহ্নি কুসুম

আড্ডাপত্র

অক্টো ১৩, ২০২৬ | কবিতা, গুচ্ছ কবিতা

প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘ পথের পর যদি ফের দেখা হয়
খোলসে জড়াবো নিজেকে । নয়নে
ব্যাসার্ধ টেনে তাকাবো সুদূর
যেন ভীনদেশী– আছি ভিন্ন গ্রহান্তরে

বলবো না তোমাকে, সেই শুভ্র শিশির ভেজা চোখ
সেই শুক্লাপক্ষের জোছনাস্নাত হাসি
সেই নাকের তলার জন্ম জঠর
সেই আদুরে ডাক নিয়ে
কেটে গেছে একটা জীবন।

বলবো না, সেই উচ্ছল চোখের দীপ্ত উচ্ছ্বাস
দেখো তো এখন কতটা ধূসর
বহে গেছে ভীষণ লণ্ডভণ্ড ঝড়
দেখো তো এ বুকে কতটা দীর্ঘশ্বাস?

শূন্যতার বেসাতি

খুব বিরহে যেমন করে শেষের বিকেল
সিঁদুর রাঙা ঘোমটা তুলে নিরব কাঁদে
যেমন করে রাতদুপুরে একলা ডাহুক
ঠোঁটের ওপর অশ্রু শুষে করুণ সুরে
তেমন করে বুকের ভেতর ডুকরে ওঠে
অঝোর ধারার মেঘলা আকাশ।

যেমন করে সর্বনাশা বানের ডাকে
মুহুর্মুহু আঁতকে ওঠে চরাচরের জীর্ণ কুটির
তেমন করে হঠাৎ হঠাৎ
চৈত্র দিনের খাঁখাঁ নিয়ে একখানা ঘর
কেমন জানি করে ওঠে বুকের ভেতর ।

হৃদয় মাঝে বইসে যেজন

বেবাক মানষে আমারে দেইখে হাপিত্যেশ করে
আমি কাউরে কইতে পারি না বুঝাইয়া
ক্যান আমার জীবনডা এমন চৈত মাসের
ঠাঠা রোদির লাহান পুইড়া ছারখার হয়া গেল।
ক্যান এ জীবনডা
ফাল্গুন মাসের বাউরি বাতাসের লাহান
দিকবিদিকশুন্য আমি শুদু দৌড়াই আর দৌড়াই ।

কাউরে-ই আমি কইতে পারি না
বুকির মদ্যি একখান কান্দন সারাক্ষণ
চিক্কুর দিয়া কান্দে- আর সমুদ্দুরির ঢেউয়ের লাহান
উথাল পাথাল কইরে আসতে চায় বুক ভাইঙ্গা
আমার নাওয়া খাওয়ার ঠিক থাকে না
রাতের নিকষ আন্ধার জাপ্টাইয়া ধরে আমারে
চোক্কে আর ঘুম আসে না।

নদীর বুকি জাইগা উঠা ভাঁটা শেষের
নিটল পলির লাহান মায়াবী একখান মুখ
বুকির মদ্যি বইসা দাবানলের আগুন হয়া
সারাক্ষণ পুড়ায়। আর পুড়াইয়া পুড়াইয়া
কইলজাডা নিকষ ঝামা কইরা ফেলায়।
তাইতো আমি — জীবনভোর শুদু দৌড়াই আর দৌড়াই
তবু কাউরে পারি না এ কথা কইতে।

ফুরাবার বেলা

অশ্ববেগে ফুরিয়ে আসছে আমার সময়
যেতে যেতে চাতক মন তবুও তৃষ্ণায়
একটিবার যদি তোমাকে দেখতে পাই-
হয়তো দূরবর্তী কোনো ট্রেনের নীরব কামরায়
দু’পাশে প্রান্তরের হু হু এলো বাতাস
মুদে আসা আদ্র উদাস দুচোখ দূরের কোথাও

অথবা সন্ধ্যায় যেতে যেতে
কোনো আলোআঁধারি গোধূলিবেলা-
নদীর থিরথিরে জলে ফেলবে ছায়া
নীড়ে ফেরা পাখির উড়ন্ত সারি সারি পাখা
মৃদু আলোয় দুলবে বৃক্ষের শাখা
প্রতীক্ষার পাহাড়কথায় কেঁদে উঠে বুক
নির্নিমেষ ছলছল ধূসর দু’চোখ
কেমন আছ? বলতেও কেঁপে ওঠে ঠোঁট
এমন ফুরাবার বেলায়
যদি একবার তোমাকে দেখতে পাই!

আজও তোমাকে খুঁজি

আমি আজও তোমাকে খুঁজি
ঝড়ে নীড়ভাঙা দিশেহারা পাখির মতো
ধূসর পথ-প্রান্তর বা লোকালয়
কেন যে খুঁজি নিজে কি বুঝি? তবে
বুকের মধ্যে শ্মশানের মতো একখান শূন্যতা
সারাক্ষণ খাঁখাঁ করে।

বিরহী ঠোঁটে ফোটে ব্যথাতুর হাসি কখনো
এতটা পথের বিচ্ছেদ — তোমাকে চিনব আমি?
শিশির ভেজা সকালের বিশুদ্ধতায়
তুমি কি আর হাসতে পারো?
তেমন মায়ার চোখে পারো চাইতে আর?
কপালে হয়তোবা পড়ে গেছে বয়সের ছাপ।

তবু তোমার কথা ভাবতে ভাবতে আজ
বুকের ভেতর কেন জানি
সর্বনাশা উথাল ঝড়-
দুমড়ে মুচড়ে বুকের খাঁচাটা ভাইঙ্গা ফেলতে চায়।

দূরবাসী

শুক্লাপক্ষের উচ্ছল জোছনায়
তুমি যখন প্রেয়সীর করোটি ছুঁয়ে-
আমি তখন ফসলহীন শূন্য মাঠ,
মরা গাঙের মতো
স্বপ্নগুলো মরে যেতে যেতে
কেমন হয়ে গেছি চুপচাপ।

সমুখে ওই ক্লান্ত রেলপথ।
প্রিয়জনের ছলছল চোখের
হাজার কথন বুকে চেপে
ছুটে গেছে দুরন্ত ট্রেন।

বৃক্ষের শাখায় শাখায়
নীড়ে ফেরা পাখির আহ্লাদী কুঞ্জন।
ওই আকাশের থৈথৈ নীল
হরিহরের জল ভাঙে
নাকি ভাঙে বুকের জমিন।

বহ্নি কুসুম
জন্মঃ ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩
জন্মস্থান : কেশবপুর, যশোর।
পেশা : লেখালেখি, সম্পাদক, প্রকাশক।
প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা : ৭টি।

Facebook Comments