আড্ডাপত্র

; ;

গুচ্ছকবিতা । মামুন সুলতানের

আড্ডাপত্র

আগ ৩, ২০২৬ | কবিতা, গুচ্ছ কবিতা

বাউল-নদী

পথে পথে কাঁটাবন জঙ্গল মাড়িয়ে হাঁটি
সাধুরা সঙ্গীতে মাখে উচ্চাঙ্গ কষ্টাঙ্গ সুর
অষ্টধাতুর সেতারে বাজে রূপালি নুপুর
আধশোয়া জীবনে দেখি অর্ধমৃত সুরাবাটি।

বাউল বাড়ির পথে কেউ করো না শোরগোল
ধ্যানে বসেছে বিকেল অস্তগামী সৈকত
রঞ্জিত সুরের স্বাদ কাক-দোয়েল দ্বৈরথ
পোকা মাকড়ের গ্রামে ওড়ে আসে আরশোল।

বাউল তরঙে ছোটে নতজানু ছোট নদী
বিহঙ্গে বিলায় সুখ গ্রাসে প্রাণ বাজপাখি
সৃজনে বেদনা আছে সাধনায় রঙ মাখি
শকুনেরা হল্লা করে মঞ্চে মঞ্চে নিরবধি।

ছোট নদী বিকি হয় শুনি কুড়ি টাকা দামে
অপশক্তি বালু বেচে নদীকে করিয়া খুন
বাউল দুতারা হাতে করে উহাদের গুণ
সাধনা শুধায় রাতে কী করে বাঁচো এ-ধামে?

জলসুখ

জলের মশারি তলে মাছের শাদা শরীর দেখে
আমি বলে দিতে পারি স্রোত ও জলের ক্ষেত্রফল
নয়ন জলে গোপনে ঝরে তোমার যে দুঃখ
বেদনাসিক্ত গণিতে বলে দিতে পারি সেই মানসাঙ্ক

মেঘের মতো লুকিয়ে রেখো না দুপুরের রোদ
ভোরের দীপ্ত হাসিতে ভরে তুলো মনের উদ্যান
উঠোনে ছড়ানো প্রেম চড়ুই পাখির মতো
তসবির দানার সুখ হৃদয়ে গেঁথে লও যতনে।

মনের অসুখ হলে প্রকৃতির রম্যবনে খুঁজো
চিরসুখের ওষুধ। হৃদয়বৃত্তে গাঁথো সজীবসুর
বাতাসে গুনগুন করে তোমারি মনের লাজ-লহরি
বৃষ্টিপ্রবল মৌসুমে ভিজিয়ে দাও মনের শাড়ি

তোমার মন খারাপ হলে অবসাদে ঝিমায় বিকেল
রিমঝিম বৃষ্টিতে চলো খানিক ভিজে আসি নির্জনে
মাছের শাদা শরীর ছুঁয়ে দেখে আসি জলসুখ
জলের অতলে রাখো জীবন সূত্রের কষ্টবীজ।

এই জুলাই অভ্যুত্থানের নতুন বাংলাদেশ

পশুর মতো জ্বালিয়ে মারার নির্মম রাত
জ্যান্ত মানুষের চোখ তুলে উল্লাসে মাতা দিন
ট্যাগ লাগিয়ে মেধাকে স্তব্দ করার জিঘাংসা
জঙ্গি নাট্যমঞ্চের ট্র‍্যাজেডি বিকেল ছিলো এদেশে

নির্বিচারে দিশেহারা দুর্দিনে মানুষ কেঁদেছিল খুব
বাকরুদ্ধ ছিলো সুরেলা কোকিলের কণ্ঠস্বর
কানাঘুষো খুচরো কথাও ছিলো মস্ত অপরাধ
নীরব বাকশালে নত হতো দাপুটে দামাল নেতা

কথায় কথায় জেল লোহার শিকল আর হাতবেড়ি
পুলিশ-র‍্যাবের ক্রসরীতি
ডিবি অফিসের লোমহর্ষক রাত
আয়নাঘরের আড়াই গজের জীবন
এখনও গা শিউরে ওঠে ভয়ে আহা কী ভয় ছিলো

হাতে হাতে নেমে এলো জুলাই
কাঁধে কাঁধে ঢেউ উঠলো জুলাই প্লাবনে
মুখে মুখে গগন বিদারি শ্লোগান মুক্তির গান
হৃদয়ে হৃদয়ে ঐক্য জাতপাতহীন পদধ্বনি

এই বাংলা সেদিন উত্তাল উজ্জীবিত দশদিক
এই বাংলা সেদিন সমুদ্র-প্লাবনের মত দুর্বার
এই বাংলা সেদিন পাহাড়চূড়ার মতো ব্যারিকেড
এই বাংলা সেদিন জনজোয়ারের জয়োৎসব

রাজু ভাস্কর্যের মিলিত সুরে প্রতিধ্বনিত সারাদেশে
“পিছনে পুলিশ সামনে স্বাধীনতা”
একটা মরবে দশটা আসবে
দশটা মরলে হাজারে হাজারে
রাজপথের অগ্নিঝরা সেই জুলাই বিপ্লবে
আমার প্রাণের আচানক সাহস বিপ্লবী জুলাই

দশ দিগন্ত কাঁপিয়ে জুলাই এসেছিলো এই এদেশে
মৃত্যুর কাফনে মোড়া হাজার লাশের নিশান জুলাই
সাঈদের টানটান বুকের মতো দুঃসাহসী জুলাই
মুগ্ধের পানি লাগবে ধ্বনির মতো তৃষ্ণার্ত জুলাই

পুলিশের গুলিতে বুক ঝাঁঝরা হওয়া জুলাই
আহত গাজির মত হাসপাতালে কাতরানো জুলাই
নিহত পুত্রের বুকে কান্নারত মায়ের আর্তনাদ জুলাই
পঙ্গু যুবকের হাত হারিয়ে শ্লোগান তোলা জুলাই

জুলাই মানে যুদ্ধের মাঠ কারবালার ময়দান
জুলাই মানে রক্তের নদীতে ভাসমান ইতিহাস
জুলাই মানে রাইফেলের সামনে টান টান বুক
জুলাই মানে বোনের কণ্ঠে নারীর জাগরণ

জুলাই মানে মাসের মতো তিরিশদিনের নয়
জুলাই মানে ছত্রিশ দিনের বিরল ক্যালেন্ডার
জুলাই মানে ফিরে আসা নব্য একাত্তর
জুলাই মানে চব্বিশের নতুন স্বাধীনতা

এই জুলাই দুর্নীতির গহীন গোরস্থান
এই জুলাই রাষ্ট্রদ্রোহির ফাঁসির ফরমান
এই জুলাই স্বৈরাচারের নির্ঘাত নির্মূল
এই জুলাই অভ্যুত্থানের নতুন বাংলাদেশ।

তফাৎ

আদরে আদরে আঁকি আকাশে উড়ন্ত পাখি
মেঘের মায়াবী ঘুড়ি পালকে পালকে উড়ি
ঘাটে ঘাটে ঝর্ণা নামে বনে বনে ফুলকুঁড়ি
সবুজ পাতার ফাঁকে হৃদয়খান খুলে রাখি।

বিশাল আকাশ ছুঁয়ে পাখি হয়ে ওড়ে মন
শূন্য সাহারার মতো নির্জন শূন্যতা দেখি
নেই কোনো জনত্রাস দ্বন্দ্ব ও দ্বেষ শেরেকি
পাখিরা পালক নেড়ে উড়ে যায় আজীবন

ফিরে আসি পুনরায় পৃথিবীর জলস্থলে
অবাক দৃষ্টিতে দেখি দাবি-দাওয়া জনরোষ
বিদ্বেষ ছড়ানো গানে গায় অপরের দোষ
বোধের এটুকু জ্ঞান এবো আসেনি ভূমলে।

পাখির আকুতি নিয়ে মাটির মানুষে বলি
আকাশের শূন্যে গিয়ে একবার দেখে আসো
হরেক খেচর চড়ে নিন্দাহীন শতবর্ষ
কত আদরে পাখিরা উড়ে আকাশের গলি।

বৃষ্টি-মুহূর্ত

মিষ্টির দোকানে বৃষ্টি
টিনশেড প্রেম ভেজাচোখের দৃষ্টি
লোডশেডিং আন্ধার ঘর
স্যাঁতসেঁতে আষাঢ়েও করিও না পর

মিষ্টির দোকানে সামান্য অবসরে
দুজনের দেখা ধৈর্য ও সবরে
বজ্রপাতের তুমুল রসে
দুঃখ নামে জামার বোতাম ঘসে

মিষ্টির দোকানে মেঘ-জমা সন্ধ্যায়
যাই যাই করা দৃষ্টি রজনীগন্ধায়
টিকটিক দুজনার ঘড়ি
বৃষ্টি থেমেছে তাই দুজনের পা চঞ্চল তরী।

Facebook Comments