রহিমা আখতার কল্পনা আশির দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খ্যাতিমান কবি। তাঁকে বিবেচনা করা হয় যথাযথ প্রকরণসিদ্ধ বাংলা হাইকু রচনার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে। কবি পরিচয়ের বাইরেও তিনি একাধারে লেখক গবেষক, সম্পাদক, আবৃত্তিকার, উপস্থাপক এবং বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারের এক সময়ের বাংলা সংবাদ পাঠক। তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি একাডেমির ‘ফোকলোর, মিউজিয়াম ও আর্কাইভস’ বিভাগের পরিচালক, শিশুকিশোর পত্রিকা ‘ধানশালিকের দেশ’-এর নির্বাহী সম্পাদক এবং সাহিত্যপত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন। জন্ম ৭ই আগস্ট ১৯৬২,কিশোরগঞ্জ জেলার নান্দলা গ্রামে। পিতা : মোঃ আবদুল মোতালিব ভূঁইয়া (মরহুম)। মাতা : আনোয়ারা বেগম। সাত ভাই দুই বোনের মধ্যে রহিমা আখতার কল্পনা তৃতীয়। স্বামী : জগদীশ চন্দ্র পান্থ। বিশিষ্ট কূটনীতিবিদ। একমাত্র পুত্র অভিনেতা ও কণ্ঠশিল্পী দেবাশিস কায়সার।
রহিমা আখতার কল্পনার এস.ভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ থেকে ১৯৭৭ সালে এসএসসি পাস করেন। এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে কিশোরগঞ্জ জেলার মধ্যে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। ইডেন কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। তিনি ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক ও ১৯৮৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। লোকসাহিত্য বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ICCR (Indian Council for Cultural Relation) বৃত্তিপ্রাপ্ত পি এইচ ডি গবেষক তিনি।
রহিমা আখতার কল্পনা ‘ইছামতি কলেজ’ গালিমপুর, নবাবগঞ্জ-এ বাংলা সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে ১৯৮৮ সালে কর্মজীবন শুরু করেন । ‘দোহার নবাবগঞ্জ’ ডিগ্রী কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করে ১৯৮৯ সাল বাংলা একাডেমির ফোকলোর উপবিভাগে কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে পত্রিকা উপবিভাগে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।এর আগে তিনি একাডেমি কতৃক প্রকাশিত শিশুকিশোর পত্রিকা ‘ধানশালিকের দেশ’-এর নির্বাহী সম্পাদক ও সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আশির দশক থেকে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। তবে প্রথম লেখা ছাপা হয় ১৯৭৫ সালে এস,ভি সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একুশের বিশেষ ম্যাগাজিনে (কবিতা)। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ২৮টি। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ১২টি।
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ :
বেনোজলে বেহুলার ভেলা (কাব্য ১৯৯৩, ঢাকা প্রকাশন); পাথর সরিয়ে দাও (কাব্য ১৯৯৪, সেভেন স্টার); পাখিদের পার্লামেন্ট (ছোটগল্প ১৯৯৬, শব্দাবলী প্রকাশনী); কেউ জানে না (কাব্য ১৯৯৯, ব্যতিক্রম প্রকাশনী ); বাংলা একাডেমি বাংলা সাহিত্যকোষ (সাহিত্য সমালোচনা-সংকলন, ২০০১, বাংলা একাডেমি); দাহপর্ব (কাব্য ২০০২, চিত্রা প্রকাশনী); এম.ওসমান গণি রচনাবলী (সম্পাদনা ২০০৫, বাংলা একাডেমি); গোলকায়ন রুখবে নারী (সম্পাদনা ২০০৬, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা); কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের পালাগান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট (প্রবন্ধ ২০০৮,
গণিত ফাউন্ডেশন); বাংলা একাডেমি লেখক অভিধান, ২য় সংস্করণ (সম্পাদনা ২০০৮, বাংলা
একাডেমি); নির্বাচিত শতকবিতা (কাব্য ২০০৯, জিনিয়াস পাবলিকেশনস); টুকরো ছবির কবিতা (কবিতা সংগ্রহ ২০১০, আলপনা প্রকাশনী); কালো দিন সাদা রাত (কাব্য ২০১১, আলপনা প্রকাশনী); বাংলা কবিতার পঞ্চাশ বছর (সম্পাদনা, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ ২০১১, অরণি); তিনশত বাংলা হাইকু (হাইকু-কবিতা ২০১১, ম্যাগনাম ওপাস); এম ওসমান গণি-শামসুন্নাহার গণি স্মারকগ্রন্থ (সম্পাদনা ২০১২, ড. এম ও গণি মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন); মানবকাহন (কাব্য ২০১৫, ভাষামুখ); আট প্রহরের গল্প (ছোটগল্প ২০১৫, জিনিয়াস পাবলিকেশনস); কবিতাসমগ্র (দশটি কাব্যের সংকলন,২০১৮, অনন্যা); আঙরা (কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার কবিতা, ২০১৮, কালো); সপ্তডিঙ্গা মধুকর ( ছোটগল্প, ২০২১, অনন্যা); মগ্ন জলের মন্দিরা (কাব্য, ২০২১ ) ; পাঁচশত বাংলা হাইকু (হাইকু-কবিতা, ২০২১, জিনিয়াস পাবলিকেশনস) ইত্যাদি।
প্রকাশিত ক্যাসেট/সিডি :
‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকার’ শব্দরূপ ১৯৯২, (এই সিরিজ অব ক্যাসেটস ১৯৯৫ সালে ভারতের ‘আনন্দ পুরস্কার’ অর্জন করে), * ‘বিস্ফোরণের বৃন্দগান’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল; ‘জাগো গো ভগিনীগণ’ (বেগম রোকেয়ার রচনা থেকে আবৃত্তি ও পাঠ), ছিন্ন পাতায় সাজাই তরণী — রহিমা আখতার কল্পনা-র কবিতা, আবৃত্তি – মাহিদুল ইসলাম।
পুরস্কার ও সম্মাননা :
সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র সংসদ, গুণীজন সংবর্ধনা, (২০০৭); সত্যজিৎ রায় সংস্কৃতি ফোরাম গুণীজন সংবর্ধনা, শ্রেষ্ঠ কবি (২০০৮); সুকুমার রায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, সাহিত্য পদক (২০০৮); ‘বিশ্ব মা দিবস পদক’ ও সম্মাননা (২০১১), বিএসবি ফাউন্ডেশন; ক্যামব্রিয়ান কলেজ; মেঠোপথ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পদক (২০১৩), তাড়াইল সাহিত্য সংসদ, কিশোরগঞ্জ; বিশ্ব শিশু দিবস শিশুসাহিত্য সম্মাননা (২০১৭), চিলড্রেন ক্যান চেঞ্জ (সি-থ্রি); সাহিত্য দিগন্ত পাণ্ডুলিপি পুরস্কার (২০১৯) ইত্যাদি।
তিনি ‘বাংলাদেশ হাইকু সোসাইটি’-র মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সেই বৃক্ষের কাছে
পথের পাশে খুঁজতে খুঁজতে পথ পেরুচ্ছি
পথ পেরুচ্ছি বৃক্ষ তোমায় খুঁজে খুঁজে
কোথায় আছো?
বনের পাশে খুঁজতে খুঁজতে বন পেরুচ্ছি
বনের ভেতর পথ হারাচ্ছি তোমায় খুঁজে
কোথায় আছো?
অজান অচিন অন্ধকারে পা বাড়াচ্ছি
পা বাড়াচ্ছি অনিশ্চিতির দু’হাত ধ’রে
বুঝতে পারো?
যন্ত্রবন্দী কুটিল শহর আমার সকল
সবুজ বাগান কিনবে সখের ঘর সাজাতে,
সইতে পারো?
বৃক্ষ তোমার কোন অভিমান অতো প্রবল
নিজের ভেতর বন্ধ দুয়ার, শুনতে পাও না
অমন ডাকি?
রোদ -জ্বলা ভর দুপুরবেলা ঘুঘুর ডাকে
নিঝুম একা কাঁদছিলো কার দুঃখী গলা
চিনলে না কি?
এই জনপদ, ব্যস্ত নগর, ক্লান্ত প্রহর —
সব ছেড়ে যাই তোমার কাছে ছায়ার খোঁজে,
কোথায় হারাও?
তোমার পাতায়, ফুলের ডালে একটুও নেই
আলোর কাঁপন, শূন্য দু’হাত ফিরিয়ে নেই
দেখতে কি পাও?
খুঁজতে খুঁজতে পথের সাথে পথ মিলে যায়
নদীর সঙ্গে নদীর দেখা, কেবল তোমার
হাত এখনো আমার দুয়ার পায় না ছুঁতে —
সে কি কেবল আমার বলেই এমন সুদূর?
আমি কার কাছে
আমি কার কাছে আগুন শিখতে যাবো!
আমার আগুনে ঝাঁপ দিয়ে খোলা চোখে
পুড়ে পুড়ে নিভে গেছে লেলিহান অনেক দোজখ।
আমি কার কাছে শিখি বলো অনন্ত শূন্যতা —
অনিত্য আমিই নৈরামণি চলিষ্ণু চর্যায়
আমার শূন্যতা থেকে জন্ম ঘটে অযুত প্রাণের।
কার কাছ থেকে আমি পাঠ নেবো ঘাট-আঘাটার!
আমিই তো পদপিষ্ট মায়াকাড়া ঘাট —
আমাকে মাড়িয়ে সবে উদিত সূর্যের দেশ খুঁজে খুঁজে
স্বজন পড়শি ছেড়ে অন্ধকারে নিরুদ্দেশে যায়।
আমি কার কাছে উষ্ণতা চিনতে যাই, বলো —
আমার উষ্ণতা দিয়ে মোম নয়, গলিয়েছি উষর পাথর
বহুশত বর্ষা যাকে ভিজিয়েছে, ছাই হয়ে যেতে যাকে
প্ররোচনা দিয়েছে হাজারবর্ষী তীব্র অগ্নি আর খরা।
আমি কার ছবি দেখে চিনবো দহন, তৃষ্ণা!
আমার দু’চোখে কালীদহ নদী, বুকে আরবের মরু
পুড়ন্ত দুপুরে নেই একফোঁটা জল কোনো কলসেই।
আমি কাকে পাঠ করে শিখি শীতলতা, অবিচল ক্ষমা!
সহিষ্ণু পশুর নিষ্ঠা পূর্ণমাত্রা আয়ত্ত করেছি আমি
আমাকে চৌকাঠ করে চাঁদ হাতে ছুঁতে
ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেছে স্বনির্ভর সকল স্বজন।
আমি কার অনুবাদে পড়বো মাটিকে সংশয়হীন !
আমিই যে নির্যাতিতা ফসল-সম্ভবা মাটি
নির্বিবাদে সর্বপাপ সকল পুন্যের বোঝা গর্ভে ধারণ করি
নিরুপায় স্বাক্ষী আমি সহস্র খরার
প্রতিবাদহীন আমিই পৃথিবী বোবা, আমিই পৃথিবী।
চিত্রাঙ্গদা যেদিন প্রথম নারী
যাবতীয় মানুষী আড়াল ভেঙে নীরবে নীরবে
তোমার শরীর জুড়ে জেগে ওঠে অনাহারী সাপ,
নিমেষেই তোমাকে আড়াল করে বাসনা তোমার
তোমার মানুষ চেনে অন্যতর তোমাকে এবার।
পাখির শরীর থেকে খুলে ফেলে পাতার পোশাক
পুণ্যময় করে তোলো পৃথিবীর আদিতম পাপ —
বেদনা-বিষাদে ফোটে স্বর্ণময় কোমল বকুল
তুমি বিষাদিত হলে তুমিও বেদনা, গ্লানি, ভুল।
নিথর নদীর বুকে কূলপ্লাবী জলের কাঁপন
পলকে জাগিয়ে তোলো, কুমারী কুঁড়ির ভাঙে ঘুম
বিবশ দু’বাহু সহসা বিভ্রম-মালা গলাতে জড়ায়
প্রবল জড়ায় বুকে, জীবনের অনাদি অমায়।
সময় নিভিয়ে দেয় লেলিহান শরীরী পাবক
সময় ফুরিয়ে এলে দুই চোখে এঁকে দাও লাজ।
কামিনী নিরাবরণ নিরাভরণার দেহে
সবুজ পালক দাও দীপ্ত আবরণ
মুখে মেখে সূর্যরেণু ফিরে আসে অন্য কেউ
ফেরে না সে পাখি —
চার দেয়ালের ঘোরে আকাশ মিলেছে তার
নারী সে যে পূর্ণ আজ, চিত্তে বাঁধা অগ্নিময় রাখী।
প্রতিমা গিয়েছে হেঁটে, কম্প্রহাতে খুলেছে দুয়ার
ফিরেছে মানবী হয়ে পরিপূর্ণ মানবী তোমার।
রচনাকাল ২০-০৭-১৯৮৯
আঙরা
এমুন বাইস্যা-কালে কুড়া পক্ষী উড়া দিতো চায়,
এমুন বাইস্যা-কালে ভাগ্যবানে লগে সাথী পায়।
ডলকে ভাসায় মাডি, পাড় ভাঙ্গে নিদয়া বানেলা
ত্যাও তো গাঙ্গের মন টানে তারে, বুক রাহে মেলা।
না জানি কেমুন বুলি, কী সুরের জালে বান্ধা মন
প্যাঁক-পানি-আগুনের বাতাসের না মানে শাসন
আতাল পাতাল ভাঙ্গা ঢেউ তোলে, কোমরে মোচড়
রঙ্গিলা গাঙ্গের টানে ছোডে ম্যাঘ, উডে কালি-ঝড়।
আমার পরান-বন্ধু এই দ্যাশো কাডায় জীবন
বাইস্যা কালের এই আসমান, ঘনরঙ্গা বন
পড়ে না কি চোক্ষো তার, মনো তার কে দিলো দুয়ার
জংলী কুড়ার মতো ক্যান মনো উডে না জোয়ার !
ত্যা’ কি তার কানা চোখ — হুঁশ নাই, পড়ন্ত বেইল
না’ হি করে তালিবালি, সুহে খেলে নির্দয়া খেইল !
ডাহি আমি কুড়াপক্ষী, খুঁজি তার পাখনার ছায়া
জগত আমারে বুঝে, হে-ই খালি অচিনা নিমায়া।
কও গো কুডুম কও — দিবা কিনা ফসলী বিছন
না’ হি দিবা জ্বলা তুষ, আঙরা করবা পুড়া মন।
রচনাকাল১২-০৭-২০০৯
অহনো চিনো না
আইজ কাইল তুমিও উরাঙ্গি মারো ভাতের বাসুন
বাসুনো যদিবা দেই মোডা ভাত, মিলে না যে নুন —
এই দুষ কারে দিবা, কার দীল ফানা ফানা অয়
বুঝবা না পরাণ-কুডুম মনো কী তুফান বয় !
আগে পিছে খুঁইজ্জা যহন দেহি কুনু গতি নাই,
তহন বে-দীল হৈয়া ‘নাই’ কথা তুমারে জানাই।
তুমারে দিতাম ছায়া রইদের কালে অই ছাতি
তুমার পাষাণ বুহো জ্বলি আমি হাইঞ্জার বাতি।
ত্যাও যে দ্যাহো না চায়া, কেমুন দরদী তুমি কও
সাপেরে চালান দিয়া ক্যারে তুমি কড়ি তুল্ল্যা লও !
নরসুন্দা পাড়ে বান্ধা ছ্যামা ছ্যামা কী মায়ার ঘর
সাকিন ভুইল্লা তুমি ক্যারে খুঁজো আভাইগ্যা চর !
অভাব খাবলা মারে — তুমি খালি এই দু’খ বুঝো
মনো যে কৈতর কান্দে, তারে তুমি কয়বার খুঁজো।
ও কুডুম চতুরাল্ল্যা, কারে তুমি দিতা চাও ফাঁহি
রইদের তাফালেও কালিরঙ্গা ম্যাঘ থাহে বাহি
ম্যাঘের ডলক নামে, মন-গাঙ্গে আলাঝালা ঢেউ
তুমি যদি না-ই বুঝো, এই ভেদ বুঝতো না কেউ।
আমারে বুঝো গো মানু, দ্যাহো এই দুইন্যাই সিধা
আবোলা জৈবন জ্বলে ঝিমিঝিমি, প্যাডো জ্বলে ক্ষিধা
তুমি মহাজন মা’নু , তুমি-ই তো খুদ কুঁড়া দানা
তুমার জিন্দেগী আমি — আমারে অহনো চিনলা না !
রচনাকাল ১৫-১৬/০৬/২০০৯
আড়াল
আমাকে চিনতে চেয়ে পথ খুব দীর্ঘ হবে
দীর্ঘ পথ হাঁটাবে আমায় একা। সেই ফাঁকে
দেখবে আমার আত্মা ও বহির্কাঠামো, অন্দর-বাহির,
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেবে চোখ, মুখ, ঠোঁটের আদল,
পদক্ষেপে কতোখানি গতিস্পৃহা, জড়তা কতোটা
কতোখানি ভার আমি রেখে যাই পৃথিবীর নির্বিরোধ দেহে,
কতোখানি হাড় মজ্জা, কতোখানি পোশাক আশাক —
এসব ওজন হবে।
কতোটা ঘৃণা ও প্রেম, কতোখানি বিদ্বেষের ধোঁয়া
রেখেছি বুকের ঘরে, গোপন পকেটে
কতোখানি রেখেছি আগুন, অশ্রু, ঈর্ষা ও জিগীষা
এইসব দেখার নিয়ম ধ’রে পথ আর সহযাত্রী পথচারী
দেখবে আমাকে সন্তর্পণে।
চেনা হবে ঘরবাড়ি, পরিচয় হবে, দেখা হবে বাম ও দক্ষিণ,
চেনা হবে ঘরবাড়ি, চলাচল হবে, দেখা হবে নদী ও পর্বত,
তবু কেউ কোনোদিন চিনবে না আমার আমাকে।
আমাকে লুকাতে চেয়ে বন খুব ঘন হবে
বৃক্ষদের সবুজ পত্রালী হবে হলুদ সহসা,
খুব দ্রুত ঝ’রে যাবে। বিবর্ণ পাতার স্তুপে ঢেকে দেবে
নিজদেহে ঢেকে-রাখা গোপন লজ্জার মতো ঢেকে দেবে
আমার দারিদ্র্য আর দরিদ্র শরীর, শব।
এইভাবে দিন যাবে, ঋতুভেদে বৃক্ষ ফের পত্রময় পুষ্পময় হবে,
দিগন্ত-বিস্তারী রোদ নতুন পাতার ফাঁকে
একটি পুরানো মুখ আতিপাতি খুঁজবে ভীষণ
মেঘে ও সমুদ্রে খুব চুপিচুপি সন্ধি হবে; ঝড় হবে
পাতারা নিবিড় হবে আরো —
আততায়ী অন্ধকার জয়ী হবে, জয়ী হবে খুব সহজেই।
তবু কোনো ঘনঘোর আড়ালেই ঢাকবে না আমার আগুন।
আমিও থাকবো জেগে, থাকবে আমার দাহ, আমার মনীষা
শুধু কেউ কোনোদিন বুঝবে না আমার আমাকে। ।
ইয়ামীন
তখনো বুকের মধ্যে শ্বাসবায়ু বয় তার
তখনো বুকের মধ্যে প্রাণপাখিটার ডানা ঝাপটানো
তখনো তাহার ঠিকানা পৃথিবী
ঘাতক বহনকারী যন্ত্রদানবটির ওপর
চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা ইয়ামীন তখনো মানুষ
তখনো মানুষ, শবদেহ নয়।
সহসা হ্যাঁচকা টানে যন্ত্রদানবের ছাদ থেকে
একটা মলিন ছেঁড়া ন্যাকড়ার দলার মতো
ঢিল মেরে ফেলে দেয়া হলো মানুষটিকে
দুমড়ে মুচড়ে দানবের অতিকায় পায়ের নিচে,
চাকার গা ঘেঁসে পড়লো শরীর তার জুবুথুবু
আহা, তখনো সে বেঁচে দিব্যকান্তি তরুণ
তখনো সে মুমূর্ষু বারুদ ।
বুক তার উঠছে নামছে হাঁপরের তালে
প্রাণে তার একফোঁটা পানির কাতর আকুলি বিকুলি,
তৃষ্ণা, তৃষ্ণা- জীবনের শেষ অন্তহীন তৃষ্ণা।
কেউ নেই।
একফোঁটা পানি তার ঠোঁটে তুলে ধরবার কেউ নেই।
আহা কারবালা, তার প্রিয়তম দেশ আজ কারবালা
তারপর অকস্মাৎ স্তব্ধ ইয়ামীনের বুক, মৃত্যুতে অবসান
আকাশ বাতাস চরাচর মুখরিত করে এসো তবে
ক্রন্দনে ক্রন্দনে ধ্বনি তুলি-
হায় ইয়ামীন!
হায় ইয়ামীন!
ধূপের কথা
আমার চোখের জল মায়াময় মাটিতে পড়ুক
মাটি তো শান্ত সর্বংসহা —
আমার পীড়িত দিনে লাঞ্ছিত অশ্রুতে
তারো যদি কিছু ঘটে যায় চিত্তের বিকার
তারো যদি উপজিত হয় বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস,
জেনো হে মানুষ, একদিন আমিও ছিলাম মাটি।
আমার হৃদয়-পোড়া গাঢ় ধূম বাতাসে উড়ুক
বাতাস তো দু’খ তাড়ানিয়া —
আমার দুর্গত আয়ু, রুদ্ধ হতাশ্বাসে
তারো যদি দম অতর্কিতে বন্ধ হয়ে আসে
তারো যদি শ্বাসকষ্ট হয় রুদ্ধ বেদনার ভারে,
জেনো হে মানুষ, একদিন আমিও ছিলাম বায়ু।
আমার দাহের শিখা পুড়ে দি’ক ধূপের শরীর
ধুপ তো নীরব আত্মাহুতি —
আমার ক্ষয়ের লগ্নে বঞ্চনা-অগ্নিতে
তারো যদি আর্তনাদ করে ওঠে প্রাণ
তারো যদি অসহ যন্ত্রণা হয় অবমাননায়
জেনো হে মানুষ, একদিন আমিও ছিলাম ধূপ,
একদিন আমিও নীরবে পুড়ে গেছি
একান্তে গন্ধবিধূর — অপরের প্রয়োজনে।
আমিও মায়ার্দ্র রোদে নিরাময় করতে চেয়েছি যত ক্ষত —
মানবতা সব জানে, সব মানে, করুণা ছিটাতে ভালোবাসে
মানবতা দুর্গতজনের সবল সাহসী স্বর আর
স্বাবলম্বী মেরুদণ্ড সহজেই সহ্য করে মানতে পারে না।
রচনাকাল ১৯-১১-২০২০
আদমসুরত
রাত্রি যখন ভোরের গর্ভে আড়মোড়া ভেঙে জাগছে
ঘুমভাঙা ভোর সুবেহ সাদেকে দ্যুতির নকশা আঁকছে,
বোজা পল্লবে চোখ দু’টি তবু ঘুম ঘুম গান গাইছে
শ্রান্ত শরীর রাত পেরিয়েও একটু আয়েশ চাইছে —
কুয়াশা-চাদরে মোড়া চারপাশ অচেনা অচেনা লাগছে
রাত-জেগে-থাকা প্রহরী পাখিরা শেষবার সুরে ডাকছে —
তখন কে যায় পথ ভুলে গিয়ে ভুলপথে ফের হাঁটতে !
টেনে ধরো তাকে, আঘাতে জাগাও অমানিশা-ঘোর কাটতে।
তখন কে আসে, সুরে ভ’রে দেয় জনপদ, ডাকে — ‘আয় রে!
চিতার আগুন জ্ব’লে নিভে গেছে, সুসময় বয়ে যায় রে !’
আগুনে বাতাসে মাটি আর জলে আদমসুরত হাঁকছে
তোমারি আকাশে উৎসব জুড়ে উদিত সূর্য ডাকছে।
পা্র হয়ে গেছে গ্রহণের কাল, এসো রোদ-মেশা আলোতে
নবান্ন করো — অঘনে জ্বালিয়ো দীপাবলী, ঘন কালোতে।
এই সুসময় চিনে নিতে হবে, বুনে দিতে হবে বীজকে
পলির আদরে পাতারা জাগবে, কুঁড়ি মেলে দেবে নিজকে।
লগ্নভ্রষ্ট
কার মুখ চেয়ে সাজিয়ে রাখছো রুদ্ধ পুষ্পবাণ
কার কাছে চাও শর্তমুক্ত ঠাই —
সব জেনো মিছে, যদি জেনে থাকো
শূন্য অভ্র, চারিপাশ ফাঁকা, প্রিয়জন পাশে নাই।
কার বিপরীতে শাণিয়ে রাখছো ক্রুদ্ধ অগ্নিবাণ
কার মুখে চাও কম্প্র নম্র চোখে —
সব স’য়ে যাবে ঝড়-জল-খরা
স্বর্ণকুম্ভ মাটি হয়ে যাবে, নিয়তি যদি না-রোখে।
কার স্মৃতি পুষে বাসনা ভুলেছো, পূর্ণ অধিষ্ঠান
কার হাতে চাও দিব্য মুক্তি পেতে —
সে-ই হবে দেখো অজেয় শেকল
পূর্ণস্থিতি কোথাও পাবে না, কোথাও পাবে না যেতে।
কার হাত ছুঁয়ে উড়বে আকাশে স্বপ্নঋদ্ধ প্রাণ
কোন ঘাটে যাবে লগ্নভ্রষ্ট তরী —
বলবে না কেউ, চাঁদ ডুবে যাবে,
স্বপ্নচ্যুত আহা ভুল বিভাবরী! আহা, ভুল বিভাবরী!

