মায়াঝড়
নিরাসক্ত হৃদয় নিয়ে হেঁটে যাও
হিমালয়ের ওপারে হিমবাহের মেঘমালায়। যেখানে মায়াঝড় একটু একটু ঝরে। হিম হিম ছোঁয়ার মোড়কে মদিরার ওম লাগে মনে। মনের বাড়ি রোদ্দুর মেখে এক মিষ্টি মৃদু বাতাসে ভেসে যায় তোমার পিছু পিছু।
হৃদয় ওড়ার বাহন হয়ে উড়লে যখন নিজেই। জেনেই গেলো সকল পারিজাত পুষ্পের প্রস্ফুটিত ডানা। চুইয়ে চুইয়ে পড়ছি তখন তোমার হাসির সুরে। একলা রেখে ঘুমাও তুমি ঘুমপাখিদের ঘরে। আমার এঘর শূন্যে ওড়ে পক্ষীকূলের দূরে। জানো না তুমি, তোমার ভেতর ঘর আমার মন মহুয়ার চরে।
পুড়ছি আমি ঘুরছো যখন অজানা বিশ্বাসে। আস্বাদনের সকল আধার হাতের মুঠোয় ধরে। দুখের ওপার সুখকাতরে হরিণী সব নাচে; ডুবলে হারায় চোখের তারা বৃষ্টি ও রোদ্দুরে। এ বড়ই দীর্ঘ নিদেন, দীর্ঘশ্বাসের নদী। শোন এবার নিবিড় করো, শেখাও চন্দ্র হাসি, ডুব সাঁতারে জেগে উঠে বাজাও প্রসূন বাঁশি।
মায়াচিঠি
শিরিষের ডালে হুতোম প্যাঁচার ডাক…
হু হু কান্না তোলে, রাত ভোর ছোঁয় না; ডুবে যায় ডাকের ডাকাতিয়া রবে। কুমেরু সুমেরু বোঝে না, শুধু হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায় অন্ধের অন্ধত্বে।
এ আজন্ম রোগে বিলীন আত্মা আকাশে পাতালে পবনে
মিলে না ঠাঁই। কাস্পিয়ান, ভূমধ্য আর আরব সাগর যেখানেই ভাসায় ডুবার বাহানায় সকল মুখস্থবিদ্যা ভুলে ডুবে যাই সেই অন্ধের অন্ধ কারাগারে। যেখানে আমৃত্যু শকুনের বাস। বুকের বাম পাশ রক্তাক্ত করে কচলিয়ে লবণে গুলিয়ে পান করে সে জন্মান্ধ মদিরা।
ব্যাধিতে সুরেলা সুর মেশায় হেঁটে হেঁটে হারায় হেয়ালি লানকারান পাহাড়ের পাদদেশে। হলুদ পাতাদের কোলে ময়াভরা বুলবুল বুকে নেয় বাবুয়া গীতালি গেয়ে, সুখঘুম শরীর মেশে দেয় ক্ষতে। মনোলোভা চুমায়িত বদনে চেয়ে দেখি ফিরে আসে হারানো কুহুতান পাতায়ার শীতভোলা বসন্তে। সেই ব্যধি কবেকার চিনচিনে বেদনায় কোন রূপ মায়াময় হেসে হেসে নীল খামে পাঠায় শুধু নিরালায়, পাঠায় মায়াচিঠি চুমুচুমু জাগানোর বাঁচানোর মন্ত্র মোহফুল এবেলায় ওবেলায়…
পোকা
প্রতিটি জন্মে ফুল হতে হতে
ঘ্রাণজীবনের সমাপ্তি চাই।
কে ভাই কলকাঠি নাড়িয়ে বানিয়ে দাও এই প্রস্থানহীন কুটিল জীবন? পালাবার পথ নেই শুধু জীবাশ্মের পুনঃ জন্মের গেঁড়াকল!
পোকা পিরিতির পরিণতি সেই অজগরের গল্পের মতোই অবশেষে পুরোটাই তার পেটে। অতঃপর পোকার মল-মুত্র থেকে “কুন ফায়াকুন” বলে আবার কেন ফুল বানাও? ভাল্লাগে না আব্বা তোমার একচোখা পোকার পক্ষপাত ক্ষমতায়ন।
ফুল বানালে তো ভালো কথা তার আবার কেন দিবে মন? হবে কেন সে মনে গোবরে পোকা প্রেম? যে পোকার মনে থাকে নীলবিষ আর খবিশের সঙ্গম!
কুন্টে মানুষ
মানুষগুলো তলিয়ে দানবীয় কালোতে
মনুষ্যত্ব হায়নার থাবায়…
গজিয়েছে বিষদাঁত।
উহু তাণ্ডব, উহ্ রক্ত, উহু মৃত্যু!
জেগে ওঠ কানারে তুই
ওরে ও দলকানা;
জেগে ওঠ মানুষ রে তুই
কোথায় তোর মনুষ্যত্ব!
কই শিক্ষা কই দীক্ষা
কই ধর্ম কই শান্তি?
শুধু টুপি নেই মাথা
শুধু জীব নেই মানুষ
কই জ্ঞানী কই গুণী
কই আলেম কই ওলামা!
শুধু মুখোশ সব মুখোশ
এত ধর্ষণ, এত খুন
সব যার যার,
কেউ নয় কারও
সবাই সবই পর।
নেই দয়া নেই মমতা
শুধু হিংসা শুধু স্বার্থ।
“জাগো বারে”
কুন্টে মানুষ তোরা
অ্যাছু কেউ?
এই দুঃখ এই মড়ক
এই মরার দেশ বাঁচা বারে…
কেউ শুনিস মানুষের কান্দন?
দেখিস রক্তের বান?
মানুষ হইয়া মানুষ বাঁচা,
মানুষের লাগি মানুষ বাঁচা…
ঘোর কলিকাল
লালন পর্দা নিলেন, দেখলেন না ঘোর কলিকাল,
নজরুল দেহত্যাগে একেঁ দিলেন না পদচিহ্ন মুখোশ চাটুকার মুখে,
রবীন্দ্রনাথ অগ্নিস্নানে উড়ালেন আত্মা
গাইলেন না –
“ও মা, মা তোর চোখের পানি বিঁধে বুকে তীরের মতো,
মরি হায় হায় রে…”
“ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চামার মুচি
এক জলে সব হয় গো শুচি।
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না।”
পরকালের যমের আগেই যমদূত
বাংলার আনাচে-কানাচে।
আমাদের কচি, আমাদের কাঁচা
বেড়ে ওঠে না আজ মাচায়।
গোড়া উপড়ে ফেলছিস কারা তোরা?
খুনির দোসর, ম্লিগ, এনপি, শিবরি,
মলবি, সোল্লা, বদর, আজাকার;
কে তোরা, কে?
কেউ কি তোরা মানুষ নয়?
নেই সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত?
কেউ নেই তোরা!
নেই ম্যান্ডেলা, লুথার কিং, আম্বেদকর?
আমার মা, আমার মাটি, আমার স্বদেশ—
আমার কচি-কাঁচা অবুঝ
বাঁচানোর কোনো পথপ্রদর্শক নাই?
কবিতা
কবিতা ছেড়ে গেলে কবিকে
মধ্যগগনে অমাবস্যা নামে,
কবি কাটে ঘাসের মতো আত্মা
কালো নরম অন্ধকারে!
হাতভরা হৃদয়, শূন্য শূন্য বুক
নিকষ কালোতে ফেঁপে ওঠে
বলকানো দুঃখের বায়ু।
জোয়ার নেমে গেলে
রেখে যায় মুক্তো।
কবিতার বদলে মুক্তো, পলি
ফুলে-ফলে ভরে দেয় শূন্যস্থান।
শূন্য হলেই মুখ বুজে অপেক্ষা করো—
যা গেছে, ফিরবে ছাপ্পর ফাইড়ে,
যা দিছো, যা নিছো, তাও আসবে
ছাপ্পর ফাইড়ে…

