আড্ডাপত্র

; ;

গুচ্ছকবিতা । কামরুজ্জামান

আড্ডাপত্র

অক্টো ১, ২০২৬ | কবিতা, গুচ্ছ কবিতা

অন্তর দাহনে

যে পথে কেউ নেই অসামান্য শূন্যতা ভরা
আমি যাই সে পথে, সামনে ভাঙা বেলি ব্রিজ
তার ধাতব রেলিং থেকে ফোঁটা ফোঁটা –
জল ঝরে, তার পাশে যাই স্নেহে স্পর্শ রাখি
রুমঝুম বৃষ্টিতে তবে কি সে-ও কান্নায় ভেঙে পড়ে…

শহুরে ছোট্ট বনে সবুজ বৃক্ষ গুলো বৃষ্টি স্নানে-
আরো হরিৎ সতেজ হয়ে ওঠে পত্র পল্লবে।
বৃষ্টি ধরে এলে থৈথৈ জলের বিথানে শরীরে –
ভেসে চলে শৈশব কৈশোর যৌবন ভেলা…

জনশূন্য পথে একা চলি নিস্তব্ধতা সাথে নিয়ে
জল অবগাহনে প্রকৃতি সঙ্গমে অন্তর দাহনে।

১২ ই জুলাই ২০২৬

মানুষের মুখ

পাহাড় সমুদ্র ঝর্না স্রোতস্বিনী জলে
সমতলে,নর- নারী তরণী তরুণ
যুবক যুবতী সাহেব বেগম বলে-
কথা কাছাকাছি পাশাপাশি কি দারুণ…

কৃষাণ কৃষাণি শ্রমিক মজুর কুলি
পেশাজীবী সেবিকা ডাক্তার রাত ভর
যারা জেগে থাকে জীবিকার সাথে বলি-
দিয়ে জীবন যৌবন এই চরাচর-

মাটি মাঠ ঘাট ফসলের নিজ ভূঁই
ধান শীষে গম শীষে স্বপ্ন যায় নেচে
ফুল ফোটে পথে প্রান্তে ফাট ফুল জুঁই
ঝড় ঝঞ্ঝা বাণ রুখে প্রাণ ওঠে বেঁচে।

যেতে যেতে যাত্রা পথে দুঃখ ব্যথা সুখ –
নিয়ে ভালোবাসি শুধু মানুষের মুখ।

১৬ ই জুলাই ২০২৬

গাবতলী টু ডেমরা

শহরতলী সন্ধ্যায় রিক্সায় চলেছি আমরা দুইজন
আলো আছে ঝলমলে চারিদিকে বেশ কিছু –
যন্ত্রযান গুলো তাদের নিজস্ব আলো থেকে আরো
আলোকিত ছিলো এই পথ
নগরের প্রান্ত সীমায় প্রাইভেট গণপরিবহন –
পাশ কেটে যাচ্ছে চলে
গাবতলী টু ডেমরা
ক্ষণিকের নীরবতা ভেঙে উচ্চারণ করলেন
গাবতলী টু ডেমরা –

আমি বলিনি কিছুই আপনাকে, আমিও তো
ভেতরে রোমন্থন করেছি
গাবতলী টু ডেমরা…

কী সৌভিক একই মায়াজালে দূর বহুদূরে
গিয়েছি ফিরে কৈশোর যৌবন দুরন্ত সময়ের
দুপুর মধ্য দুপুর ঝিম ধরা ঝিঁঝি ডাকা…

ক্রমান্বয়ে বর্ধিঞ্চু এই মহনগর আলোকোজ্জ্বল
যেনো বা চোখের পলকে ইর্স্বাতে বদলে যাচ্ছে
নতুন জনপদ উঠছে বেড়ে সামর্থ্য সাধ্যের মধ্যে।

এই পথ টুকু আমাদের জীবনের সাথে কত ভাবে
নিবিড় সম্পর্ক নিয়েছে গড়ে শত প্রয়োজনে
তুরাগ হয়ে শীতলক্ষ্যা ছোট বড় স্বচ্ছ তোয়া জলায়
কোন সরোবরে অবগাহন করিনি আমরা?

চমকে গিয়েছি চিন্তার মিল কেমন করে –
এক হলো কতবার একসাথে অতিক্রম
করে গেছি এই পথ টুকু গাবতলী টু ডেমরা।

২৭ শে জুন ২০২৬

নাম বদনাম

নাম বদনাম রটে যায় জনে জনে চোখে চোখে
নাকে নাকে মুখে মুখে কানে কানে নয় ছয় বার-
তের তিল থেকে তাল তাল থেকে বিচি কথা আরো
ন্যায় পাপ পূণ্য সত্য মিথ্যা দুঃখ ব্যথা নীল শোকে

কত কথা ভালো মন্দ ছোট বড় রয়ে যায় লোক
গাঁথা ভেসে রয় বৃক্ষ ছায়া মায়াময় গৃহ কোণে
বায়ু বয় মৃদুমন্দ দূরে বাঁশি বাজে মায়া বনে
নাম বদনাম রটে যায় ভালো মন্দ থোক থোক।

দিন গিয়ে রাত সন্ধ্যা চলে যায় সূরা সাকী হীন
দ্রাক্ষা রস আরো গাঢ় ঘণ হয় পেয়ালায়, তবু
যারা কথা বলে চর্চা পরচর্চা পরনিন্দা কভু
কোন অভিযোগ নেই অনুযোগ নেই শুধু ঋণ-

বেড়ে চলে পথ প্রান্তে মেঘে বৃষ্টি রোদ বারিধারা
স্রোতস্বিনী বয়ে চলে আঁখিপাতে বহে অশ্রুধারা।

১০ ই জুন ২০২৬

যান্ত্রিক জঞ্জালে

কথা বলি পরস্পর গোধূলি বেলায় গ্যাছে গত হয়ে
সেইসব স্বর্ণ উজ্জ্বল সহজ দিন, গ্রামগুলো স্বপ্ন –
রঙিন শস্য শ্যামল মাঠে মাঠে সোনালী ফসল, মগ্ন
কৃষাণী কৃষাণ ধান বানা গীত বাতাস আনছে বয়ে…

শৈশব কৈশোরে নদীগুলো স্বচ্ছ খরস্রোতা জলধারা
নানা রঙ পালে পালে ভরে ওঠা শোভা ছিলো দুই কূল
ভেসে থাকা আকাশ খিলানে সাদাকালো মেঘমালা ফুল
মেলা পার্বণে চিনির ঘোড়া ঐরাবত আর প্রাণহরা।

যান্ত্রিক জঞ্জালে মুছে কিছু বাকি নাগরিক হলাহলে
প্রত্নতত্ত্ব যেনো বা আজ চলে যাওয়া মাটির গহ্বরে
আর ফিরবে না কোনদিন সেই দুরন্ত দুপুর, ভরে-
ওঠা ঝোপঝাড় পাখি প্রজাপতি পাখা ঝিঝি কোলাহলে

পড়ন্ত আলোতে কথা বলি স্মৃতিভারাতুর, অমলিন –
হিরক খচিত দূতি ছড়ালো সৌভিক সেইসব দিন।

২৭ শে মে ২০২৬

সিম্পোজিয়াম

এইসব দিন নিয়ে আসে মাথাপিছু আরো ঋণ
কথা থাকে কথা আছে রাষ্ট্র হলে হাতে হাতে কাজ
নিরাপদ বাসগৃহ শিক্ষা শান্তি স্বাস্থ্য সেবা আজ
সুদূরপরাহত এখনো যুদ্ধ হিংসা প্রতিদিন…

হাড়হীম হয়ে আসে, চারপাশে এত আলো তবু
গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার ভেসে আছে দেখি থরে থরে
শিশু হত্যা, অপঘাতে মৃত্যু দুঃখ আনে ঘরে ঘরে
মর্মান্তিক দুর্বিষহ সন্তানের মৃতদেহ প্রভু…

কাঁধে নিয়ে যাত্রা পিতা-পুত্র,পুত্র-পিতা ক্রমাগত
দেশে বিদেশে যত কিছু সেমিনার সিম্পোজিয়াম
সব মিথ্যে সব মানবাধিকার মেকি প্রাণায়াম –
লোক দেখানো লোক ঠকানো রঙ প্রথাগত।

আহত ক্ষত বিক্ষত তবু জানি কালো ছায়া দিন
মুছে গিয়ে আলো হবে, সব অন্ধকার হবে লীন।

২৩ শে মে ২০২৬

কবি পরিচিতি:

কামরুজ্জামান, জন্ম ১৯৬৬ সালের ১১ই মার্চ। পিতা : এটিএম শরফুজ্জামান, মাতা: নূরজাহান বেগম। আদিনিবাস ব্রাহ্মণ্যবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার উলু কান্দি গ্রামে। ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক।

একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থায় হিসাব রক্ষকের কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু। এরপর জীবিকার প্রয়োজনে দেশে বিদেশে নানা কর্মের সাথে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে ডকুমেন্টারি প্রমাণ্যচিত্র নির্মাণ ও স্ক্রিপ্ট রচনাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

প্রকাশিত কবিতার বই :

ঝরনার কাছে একদিন ( ১৯৯০); আমার প্রতিবিম্বের প্রতি ( ১৯৯৪); মায়াবী অভিসার ( ১৯৯৯); Selected Poems ( 2000); জলের কারুকাজ ( ২০০৫); নির্জন প্রিয় পথগুলো ( ২০০৬); নির্বাচিত কবিতা ( ২০০৭); Selected Poems ( 2007); আলোর রাখাল ( ২০০৯); এ পেয়ার অব সুজ ( ২০১০); দাগ থেকে যাবে ( ২০১৪); আগুন আমি ভালোবাসি ( ২০২৩)।
সম্পাদনা করেন ‘ অন্যস্বর ‘ নামে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির কাগজ।
ভ্রমণ করেছেন :
বাহরাইন, ভারত, পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

Facebook Comments